বই হচ্ছে সবচেয়ে নির্দোষও ফলদায়ী বিনোদন

বই সব কিছু মিলিয়ে মানুষের সেই জগতের সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা, ভালো-মন্দের সঙ্গে একাত্মতা করে। মডেল: জারিন রাহমান

ছেলেবেলায় আমার বই পড়া নিয়ে আমার মা আমাদের প্রতিবেশী মাসি’মার কাছে বিরাট অনুযোগ করেছিলেন, ‘আমার ছেলে তো বাড়িতে জিনিস আনা কাগজের ঠোঙার লেখাও পড়ে।’ খুব যে অতিশয়োক্তি করেছিলেন, তা নয়। ছেলেবেলায় আমার পড়ার কোনো বাছবিচার ছিল না। হাতের কাছে যে বই পেতাম, তাই পড়তাম। বই পড়ার জন্যে বরিশাল শহরের নানা পাঠাগারে যাতায়াত ছিল, বই কেনার জন্যে দ্বারস্থ হতাম নানা বই বিপণির, মায়ের বইভরা ট্রাঙ্ককে মনে হত সোনার খনি এবং বই চালাচালি করতাম বন্ধুদের সঙ্গে। ছোটবেলার সেই বই পড়ার অভ্যেস রয়ে গেছে সারা জীবন।
বই কেন পড়ি? পড়ি, কারণ পড়তে ভালো লাগে। কেন ভালো লাগে? না, ঐ ‘জ্ঞান বাড়ে’, ‘ঋদ্ধ হই’— ঐ সব বড় বড় কথায় যাব না। বই পড়লে জানার পরিধি তো বাড়েই, মনের প্রসার তো হয়ই—এ সব জানা কথা। আমি কিন্তু বই পড়ি তিনটে সুনির্দিষ্ট কারণে।

এক, বই পড়ে আমি আনন্দ পাই, বই আমাকে অন্য এক জগতে নিয়ে যায়। সে জগত শুধু যে সুখের তাই নয়, সেখানে দুঃখও আছে; সে জগত যে শুধু আশার, তাই নয়, সেখানে নিরাশাও অনেক; সেই জগতে সব কিছু যে ভালো, তা নয়, সেখানে মন্দও আছে। কিন্তু সব কিছু মিলিয়ে মানুষের সেই জগতের সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা, ভালো-মন্দের সঙ্গে আমি একটা একাত্মতা অনুভব করি।

দুই, বই আমাকে নানান বলয়ে নিয়ে যায়। যে জায়গায় আমি কখনো যাই নি, কখনো দেখি নি যে জিনিসগুলো, যে মানুষদের আমি চিনি না, বই আমাকে যে সব জায়গা ঘুরিয়ে দেখায়, সে সব জিনিস চিনিয়ে দেয়, সে সব মানুষদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। কী আশ্চর্য ক্ষমতা বইয়ের!
তিন, আমি বই পড়ি, কারণ, বই আমাকে ভাবায়। ইতিহাস, সমাজ, অর্থনীতি, রাষ্ট্র বিষয়ে বই পড়লেই সে বইয়ের নানা ভাষ্য নিয়ে আমি ভাবি, বহু বিষয়ের নতুন নতুন দিক আমার কাছে উন্মোচিত হয়, বহু যুক্তি আমাকে ভাবায়, বহু কথা আমার চিন্তার জগতকে খুলে দেয়। অন্যের চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে নিজের চিন্তা মিলিয়ে নিই। সেই সব চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে নিজেই নিজের সঙ্গে নিরন্তর বিতর্ক করি। সেও এক বিরাট প্রাপ্তি এবং তার মূল্যও বড় কম নয়।

শেষের দু’টো কথা বলি। এক, তথ্য-প্রযুক্তি বিপ্লবের কল্যাণে পড়ার অনেক মাধ্যম আজ আমাদের কাছে লভ্য। কিন্তু বই হাতে নিয়ে বই পড়ার সোয়াদই আলাদা। একটি বই নিয়ে তার পাতা ওল্টানো, তার স্পর্শ, তার গন্ধ এ সবই বই পড়ার মাত্রিকতা।

দুই, একটি আক্ষেপ আমি বয়ে বেড়াই সতত। আমার নিজের সংগ্রহেই যে বইগুলো আছে, তাও পড়ে শেষ করতে পারব কী না, কে জানে? সেই সঙ্গে নতুন কেনা বই তো আসছে প্রতি বছরই। মনে হয় বলি,
‘যা পড়েছি তাও থাক,
যা পড়ি নি তাও,
তুচ্ছ বলে যা দেখি নি,
তাই পড়ি দাও।’

সেলিম জাহান, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও লেখক

লেখাটি বইচারিতার ৪র্থ সংখ্যা ( ডিসেম্বর ২০২৪) প্রকাশিত

আরও পড়ুন