জীবনানন্দ দাশের শহরে প্রিয় বইমেলা

খুলনা বইমেলায় মনে মনে বলেছিলাম, হায়, মানুষ মেলা পছন্দ করে, কিন্তু বইমেলা নয়। আর এখন জীবনবাবুর শহরে এসে মাইক নিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে—
মানুষ মেলা পছন্দ করে, বরিশালের মানুষ বইমেলাকেও ভালোবাসে। এ শহরে না এলে যা অজানা-ই থেকে যেত। প্রিয় বরিশালবাসী, আপনাদের টুপি-খোলা অভিবাদন জানাচ্ছি। ভালোবাসা।

২.
বইমেলায় আসার জন্য মন সবসময় আকুলিবিকুলি করে। মনস্থির করতে পারছিলাম না, শেষে লেখক ও স্বপ্ন ৭১ প্রকাশনের প্রকাশক আবু সাঈদ ভাইয়ের হাতছানিতে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়লাম। পেছন থেকে সুবাইতার আম্মু বলল, বইমেলার জন্য তোমার মন ছুটে গেছে বুঝতে পারছি, যাও যাও… ঘুরে এসো…!

ধন্যবাদ ও ভালোবাসা তার জন্য কম হয়ে যায়।

খুলনা থেকে বরিশাল দূরত্বে ভালো কোনো বাস সার্ভিস নেই, ধানসিঁড়ি পরিবহন প্রত্যন্ত অঞ্চলের লোকাল বাস সার্ভিসের চেয়েও অতি জঘন্য। মাঝপথে একবার মনে হয়েছিল নেমে যাই। বিরক্তি কাটাতে বই খুলে পড়ায় মন বসাতে চেষ্টা করি, কিন্তু মনযোগ ছুটে যাচ্ছিল চিংড়ির বড়া, বাদামঅলা আর আমড়ামাখার কারণে, শেষে মনকে প্রবোধ দেই, থাক, এই বিক্রি করেই তো এদের সংসার চলে। তবে মনে মনে একটু রাগ-ই হচ্ছিল, পাশের সিটের তরুণ ছেলেটির ওপর, বুড়ো বয়সে ডান হাতের বুড়ো আঙুলে মোছা পরে ফ্রি-ফায়ার গেমস খেলতে ব্যস্ত। একবার মনে হয়েছিল বলি, আরে হ্যাঁ, এই বুড়ো বয়সে তোকে এসব কে খেলতে বলছে, বল আমারে?
হা হা…

৩.
পথ ফুরোচ্ছে না, সময় কাটছে না।
অতপরঃ
রূপাতলী বাস স্পপেজে নেমে পেট জানাল দিল, এবেলা খেয়ে নাও, চোখের সামনে খাবারবাড়ি রেস্তোরাঁ ও সুইটস-এ ঢুকে পড়ি, ঢুকেই মনে হলো ভুল দরজায় চলে এলাম নাতো?

যা হবার হবে, বসে পড়লাম। এই সময় সামনের চেয়ারে দুই তরুণ এসে বসল। এক ফাঁকে দেখলাম, ওদের হাতে বইয়ের প্যাকেট! বইমেলা থেকে এলে বুঝি? কী বই কিনলে তোমরা?

আন্তরিক, মিশুক, ভদ্র দুই তরুণ। শেষে ওরা বেলস্ পার্কে যাওয়ার অটোতে উঠিয়ে দিল।

হোটেলেও সার্ভ করা মানুষটিও বলেছিল, স্যার, আমি ল পড়ছি, পাশাপাশি এখানে কাজ করি। আমার তরফ থেকে এক কাপ চা খেলে খুশি হবো।

কিন্তু তাকে খুশি করা হয় না। সবসময় ঋণী থাকতে ভালো লাগে না।

মেলায় পাঠকের ভিড়। ছবি: লেখক

৪.
বাস জার্নির বিরক্তি ও ক্লান্তি উবে গেল। অটোতে বসে শীতের হিম হিম বাতাসে মনও ফ্রেশ হয়ে যাচ্ছে, ১৫ টাকা অটো ভাড়ায় বেলস্ পার্কে চলে এলাম ১০ মিনিটের মধ্যে। নো জ্যাম।
খোলা প্রান্তর। বড় করে লেখা ‘বরিশাল বিভাগীয় বইমেলা ২০২৪’ দেখেই মন নেচে ওঠল। আরে এখানে আমার জন্যই ত এক শহর ছেড়ে ছুটে এসেছি। বইমেলার চারপাশে আরেক মেলা জমে উঠেছে, এখানে প্রচুর ভিড়। ফুচল, বেলপুরির সারিসারি দোকান। সবগুলোতেই কর্মব্যস্ত দোকানি। মনেমনে ইচ্ছে করছে বটে, কিন্তু আমার গন্তব্য তো ফুচকার দোকান নয়, বইমেলা চত্বর। অতপরঃ আর কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা মেলার ভেতরে ঢুকে পড়ি। তারপর হাতের ডান পাশ থেকে শুরু করে চেনাজানা স্টলগুলোতে গিয়ে হাই-হ্যালো।

বরিশাল মেলায় এসে কেমন মনে হচ্ছে? পরিচিত বিক্রয়কর্মীদের কাছে জানতে চাইলাম।
সবাই সন্তুষ্টিজনক উত্তর করল। তবে একটা ব্যাপারে সবারই অনুযোগ, যে, পরিসরটা আরেকটু ছোট হলে ভালো হতো। পাঠক দর্শনার্থী সবাই সব পাশে যায় না, এক পাশ থেকে চলে যায়।

আমারও তাই মনে হয়েছে। মেলার মাঝখানে বিশাল ফাঁকা জায়গা। ফাঁকাটা আরেকটু কম হলেই বেশ হতো। তবে অনেকেরই বেচাবিক্রি ভালো নাকি।

শিশুদের বইয়ের চাহিদা বেশি। দেখলাম বিক্রয়কর্মীর মুখেও চওড়া হাসি। আরেকজন বলল, আমাদের সব ভারি ভারি বই, এসব বই তো সবাই কিনবে না। তাই বিক্রিও কম।

৫.
কদিন বইমেলায় ঘুরে যা দেখলাম, তাতে বুঝতে পারলাম যে, বরিশালের মানুষও বই কিনতে, পড়তে ভালোবাসে। সেজন্য বই তাদের হাতের নাগালে এনে দিতে হবে।

তাই তো, একুশে বইমেলার মতো প্রতিটি বিভাগে, জেলা শহরে, থানা ও স্কুল-কলেজ পর্যায়ে বইমেলা গুরুত্ব সহকারে সুন্দর পরিপাটি করে সাজাতে হবে। তবে-ই, ঢাকার একুশের বইমেলার মতো বাকি বইমেলাও জমে উঠবে। বইয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়বে, বাড়তে বইপড়ার গুরুত্ব। মননশীল চর্চাও বাড়বে মানুষের মধ্যে।

৬.
বই নিয়ে ছবি তোলার হিড়িক দেখেও আমরা খুশি হতে পারি। বই না কিনুক, না পড়ুক, বই নিয়ে ছবি তুলছে অনেক আগ্রহ নিয়ে, তারপর যে কারণেই হোক বইয়ের প্রচার সে ফেসবুকে করছে, এই চর্চাটাও নেহাত কম নয়।

মেলায় আগত অনেক শিক্ষার্থীর একই কথা যে, একাডেমিক বই পড়েই সময় পাই না, এসব বই পড়বো কখন?

হয়ত কথাটা ঠিক। আবার হয়ত ঠিক না। কেননা, অনেক ছাত্রকেই দেখলাম নিমগ্ন পাঠক। বেছে বেছে পছন্দের বই কিনছে, আবার বিক্রয়কর্মীও একটার পর একটা বই তাদের হাতে তুলে দিয়ে বলছে, আমাদের বইগুলো হাতে নিয়ে পড়ে দেখুন।

তারা বই হাতে নিচ্ছে, নেড়েচেড়ে দেখছে, কেউ কেউ অনেকটা সময় পড়ছেও, তারপর মাথা নেড়ে আপনমনে বলছে, ‘হুম, বইটা ভালো, দিন এটা, কত দাম?’

আবার এক শ্রেণির দর্শক আছেন যারা অস্থির চিত্তের, তারা নির্দিষ্ট কোনও একটা বই কেনার জন্যও মেলায় আসে, তারপর হন্য হয়ে সে বইটা স্টলে স্টলে খুঁজে বেড়ান।

আরও কতক কোনো স্টলের বই-ই ছুঁয়ে দেখেন না, স্টলের হাত দুই দূরত্বে দাঁড়িয়ে মজার-মজার মন্তব্য করেন, কখনও কখনও তাদের সে কমেন্ট মাত্রাও ছাড়িয়ে যায়।

দিনশেষে বিক্রয়কর্মীও শান্তি পায় তখন কোনও কোনও পাঠকক্রেতা তাদেরকে বলে যান, ‘আপনার ব্যবহারে আমি মুগ্ধ ভাই। ’ ‘আপনি অনেক আন্তরিক।’ ‘আমার বড়বোনকে কাল নিয়ে আসবো, তাকেও কিছু ভালো বই বেছে দেবেন।’

এভাবেই বিচিত্র সব বইয়ের মাঝে বর্ণিল সব মানুষের মিলনমেলায় জমে ওঠে আমাদের বইমেলা।

৭.
মেলা চত্বরে রাত বাড়ছে, কুয়াশা চাদরে ঢাকা পড়ছে বইমেলা চত্বরে, এসময় শীতে জবুথবু কেউ একজন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল, কী হে, কবিতার বইয়ের কাটতি কেমন?
মাথা নাড়লাম আমি।

স্পষ্ট হাহাকার কবির সমন্ত বুকজুড়ে। তারপর কবি ধীর পায়ে সামনে হেঁটে গেলেন…
মানুষটাকে আমি চিনতে পারলাম, কবি জীবনবাবু,
একটুও পাল্টাননি, আগের মতোই আছেন—চুপচাপ, শান্ত, বিষন্ন…
তখন কোথাও করুণসুরে বেজে উঠল—
হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন…

আমিও মনে মনে নিজের মতো করে আওড়ালাম—

আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে –এই বরিশালে
হয়তো মানুষ নয় – হয়তো বা শঙখচিল কিংবা বিক্রয়কর্মীরবেশে!

মাসুম বিল্লাহ: গল্পকার ও শিশুসাহিত্যিক

আরও পড়ুন