বিষণ্ণ আলোয় বিস্মৃতি

বিদর্ভ বাংলাদেশ ক্লান্ত প্রাণ এক, পুরো দেশই যেন এক লাশ কাটা ঘর। যে বিপ্লব হতে পারত মহাসমুদ্রের উচ্ছ্বসিত ঢেউ, হতে পারত নতুন ভোর, সে বিপ্লব আজ যতই স্পর্শ করতে যাই, ততই যেন দেখতে পাই আঁধার। যে সহযোদ্ধাদের ভেবেছি বিপ্লবী, তারাই যেন আজ ইতিহাসের আততায়ী— এক অদ্ভুত উল্লাসে, প্রতিহিংসার লাল কালিতে খুঁড়ে ছিঁড়ে ফুঁড়ে নিয়ে আসছে তারা পুর্ব পুরুষের কঙ্কাল।

বত্রিশ নম্বরের পোড়া গাছে পাতা জন্মেছে, অনেকটা থিতু হয়ে এসেছে রিসেট বাটনের আলোচনা, তবু ইতিহাস বিকৃতি নিয়ে মুখ খোলেনি এদেশের মুখে সুপারী পোরা নব্য দেশ প্রেমিকেরা। তাই বলতেই হয়, দেশে ভদ্রলোকের সংখ্যা অত্যধিক বেড়ে গেছে অথবা অন্ধলোক, ফেসবুকের কুৎসিত হট্টোগোল ছেড়ে বড় নিসর্গপ্রিয় তাই। এদেরকে দেখলে সেই ইংরেজি বাগধারার কথা মনে আসে—বেবি আউট অব বাথ।দেশটাকে এক বিশৃংখল অবস্থায় ছেড়ে দিয়ে যেন স্নায়বিক শক্তির অপচয় আর করতে চান না তারা।

কিন্তু সেই মেটিকুলাস প্ল্যান যখন স্বয়ং মাস্টার নিজেই মেলে ধরলেন আর জানালেন, তখন আমরা অন্তত লেখক সাহিত্যিকদের কাছ থেকে একটু নিরপেক্ষতা আশা করেছিলাম। তবে আশ্চর্যের বিষয় এখন অনেক লেখক কবির কলমেও যেন হিংস্রতা, কদর্যতা, দলান্ধতা। এদিকে বিপ্লবীদের অনুসারীরাও মহাফ্যাসাদে। একজন বলেন ইসকনকে নিশ্চিহ্ন করতে হবে, আবার তাদের এক জ্ঞাতিভাই ইসকনদের সঙ্গে পুষ্পমাল্য গলে পূজায় অংশ নিলেন! সুদীর্ঘ শুভ্র শ্মশ্রুর এই জ্ঞাতিভাইই আবার জানিয়েছেন, তিনি বাংলাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দিয়ে দেবেন। তখন সংশয় জাগে বাংলাদেশে কী ইসলাম তবে আগে ছিল না!

তবে মনের প্রশ্ন মনেই থেকে যায়। কারণ এখন অতিমাত্রায় বাক স্বাধীনতা বহাল দাবি করা হলেও প্রশ্ন করা বারণ। দেশের মানুষ খেতে পায় না, কিন্তু কেন খেতে পাচ্ছি না, সে প্রশ্ন করলে একদল আসবে তথ্য নিয়ে—আগে কোন কোন বেলায় এদেশে খাওয়া হয়নি। গড়ে রোজ একটি করে খুন ডাকাতি, প্রকাশ্যে জবাই। জবাব আসবে—আগে কি এই দেশে খুন হয়নি? আগে সরকারের সমালোচনা করলে লোকে বেশ বাহবা দিত—এই তো আপা আপনার লেখাগুলো ভীষণ সাহসী আর নিরপেক্ষ। আর এখন মুখ খুললেই গালে থাপ্পড় খেতে হয়, আফসোস লীগ, স্বৈরাচারের দালাল নানা ট্যাগ বসে যায়।

বিপ্লবীদের নরম মাখন হৃদয় যা আগে রক্ত দেখলে কেঁদে উঠত তা হয়ত এখন বাসি পাউরুটির মতো শক্ত। বিপ্লবীরা নিজেরাই কয়েক পক্ষে বিভক্ত হয়ে অভিযুক্ত করছে একে অন্যকে। তাই আহতের হাসপাতালের গোঙানিকে নিয়ে ব্যঙ্গ আর প্রতিপক্ষের লাল রক্তে ক্ষুধা নিবারন। বিজ্ঞানের যে উন্নতি ক্ষুধার ভ্যাক্সিন হয়ত একদিন আবিস্কার হবে, কিন্তু ক্ষমতার ক্ষুধার ভ্যাক্সিনে ঠিক দরকার কতটি প্রাণ, তা এখনও বোধগম্য নয়। চারদিকে প্রতিহিংসা ঘৃণার বীজ, যেন ভুলতেই বসেছি, আমরা যে একই দেশের মানুষ। আবার যদি দ্বিতীয় অভ্যুত্থানের ডাক আসে! যত প্রাণ যাই যাক, বড় তৃপ্তি হাসিনাকে হটিয়েছে। হাসিনাকে হটাতেই তো বিপ্লব কিন্তু ইতিহাস হটাতেও কি? সমন্বয়কদের বঙ্গবন্ধু নিয়ে পূর্বে দেওয়া আবেগে থরথর বক্তব্য ভাসে সবখানে, ভাবি কত সব অভিনেতার জন্ম এই বঙ্গদেশে। এইসব অভিনেতার তালিকা ধীরে ধীরে বাড়ে আজকাল আর রঙ্গটা বাঁধে যখন এরা নেতা হবার আকুল আশায় ইতিহাসের পৃষ্ঠায় ছড়ি ঘোরায় আর গণজাগরণের মঞ্চ কাঁপানো বক্তারা শিবিরের আঁচলতলে ঠাই নেন। তবে এদের কর্মকাণ্ড যে সহি সেই প্রত্যয়নপত্র দেবার জন্য জুটে গেছে কিছু রাখাল সর্দার। যারা গত সরকারের সময়েও গণভবনে পাঠা চরিয়েছিল।

বলশেভিক ব্যর্থ হলেও মানুষ নিকোলাই লেনিনকে মনে রেখেছে। এই সমন্বয়করাও হয়তো ভাবছেন—তারাও একদিন লেনিন হবেন। তাই কী কেউ ভাবি জাতির পিতা হবার আশায় নিজের ছবি আগেই টাঙিয়ে রেখেছেন। বঙ্গবন্ধুকে অবদমন করতে এখন ভাসানীর ইতিহাস খুব বেশি চর্চা হচ্ছে। সেটা খুব ভালো দিক কিন্তু আমাদের সব সংগ্রামের ইতিহাস তো কাউকে ম্লান করে নয়। তবে এই ম্লান পন্থা বেছে নিয়ে দিন রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তাজউদ্দিন আহমদের ছেলে-মেয়েরা। তাদের বক্তব্য শুনলে মনে হয়, বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে মুজিব এক অপাংক্তেয় পলাতক। তবে একাত্তরে কেন অস্থায়ী সরকার গঠন করার সময় তাজউদ্দিন আহমদের নামে সরকার গঠন করা হলো না? মুজিব পাকিস্তান চেয়েছিলেন বলা হচ্ছে— তবে কেন স্বাধীনতার আহ্বানে প্রতিটি ঘোষণায় মুজিবের নামই উল্লেখ করা হলো, তারা অন্য নাম নিলে জেল থেকে মুজিব কী বাঁধা দিতে পারতেন বা কান্নাকাটি করে অনুরোধ করার সুযোগ ছিল তার? আর যদি এই নব্য ইতিহাসবেত্তাদের কথাও সত্যিও ধরে নিই, তবে এত এত মুক্তিযোদ্ধারা কেন মুজিবের নামেই সংগ্রামের শপথ নিয়েছেন, এখনও যাঁরা বেঁচে আছেন, আওয়ামীপন্থী না হয়েও কেন তাদের হৃদয় গোপন বেদনায় সিক্ত হচ্ছেন মুজিবের অসম্মানে?

বাঙালি পরাভূত হবার জাতি নয়। জুলাই অভ্যুত্থানকে উজ্জীবিত করা সেই কথামালা -‘ফুলগুলো সব লাল হলো ক্যান’। তাই এই তরুন সমন্বয়করদের কাছে আহবান- “তোমাকে সব দিলাম নবীন কিশোর” আমার ৫৩ বছরের দুঃখিনী বাংলাদেশ। তাই ইতিহাসের এ আত্মহনন অন্তত আর ঘটতে দিও না।

ড. জান্নাতুন নাহার তন্দ্রা, লেখক ও শিক্ষক।

আরও পড়ুন