একবার ঘুরে আসবেন নাকি, ইরানের পথে-প্রান্তরে?

ইরান। ইসলাম আর আধুনিকতার চমৎকার মিশেলে গড়ে ওঠা এক অসাধারণ সাম্রাজ্য।
একবার ভাবুন তো, আপনি বাংলাদেশে বসে হেঁটে বেড়াচ্ছেন ‘তাখতে জামশিদ’ বা পারসিপোলিস প্রাসাদে বা শিরাজের সোনালী আঙুর খেতে অথবা হঠাৎ উপস্থিত হলেন মাতৃভক্তির জন্য বিখ্যাত হযরত বায়েযিদ বোস্তামির সমাধিসৌধে!
জি, বলছিলাম ‘ইরানের পথে প্রান্তরে’ বইটির কথা। বইটিকে শুধু ভ্রমণকাহিনি বা শুধু প্রবন্ধ গ্রন্থ বা শুধু দিনলিপি বললে অবশ্যই অত্যুক্তি হবে। এই বইটিতে আপনি তিনটি বিষয়েরই অসাধারণ সমন্বয় খুঁজে পাবেন। বইটি একদিকে যেমন ইরানের কৃষ্টি, কালচার, সভ্যতা, সংস্কৃতির সঙ্গে আপনাকে পরিচয় করে দেবে, অন্যদিকে বিশ্ব অঙ্গনে ইরানের অবস্থান আপনার কাছে তুলে ধরবে।
বইটি পড়তে গিয়ে কখনো বা ফিরে গিয়েছি সেই প্রাচীন ইসলামী যুগে, আবার ফালুদা ও খমের (ইরানের বিখ্যাত দুটি খাবার) ঘ্রাণে নিজেকে খুঁজে পেয়েছি শিরাজে। আধুনিক ও প্রাচীন ইরানের বর্ণনায় টইটুম্বুর হয়ে আছে বইটি।
পাতায় পাতায় প্রতিনিয়ত লেখকের সূক্ষ্ম রসবোধ ফুটে উঠেছে। কখনও কৌতুক পাঠকদের উদ্দেশ্যে লেখক তুলে ধরেছেন, ‘এক ইসফাহানি একটি ভেড়া নিয়ে কসাইয়ের দোকানে গিয়ে কসাইকে বলল: এটি আমার জন্য জবাই করবে। আমি চাই এটাকে টুকরো টুকরো করবে যেন কাবাব বানাতে পারি ও ঝোল করে ডিজি বানিয়ে খেতে পারি। কিছু মাংস কিমা করে দেবে যেন কোপ্তা বানাতে পারি। মাথাটাকেও সুন্দর করে বানিয়ে দিও বাচ্চারা ওটা খেতে খুব পছন্দ করে। নাড়ি-ভুঁড়ি আর পাকস্থলী ফেলে দিও না কিন্তু,ওটা সপ্তাহখানেক পরে মজা করে খাওয়া যাবে। চামড়াটা আবার নিজে রেখে দিও না ভাই।ওটা দিয়ে জায়নামাজ বানাবো। মলমূত্রগুলো ফেলে দিও না ওগুলো বাগানে সার হিসেবে কাজে লাগবে। হাড়গুলো ফেলে দিও না, গিন্নি বলেছে স্যুপ তৈরি করবে। এবার ভেড়াটি ইসফাহানির দিকে তির্যক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললঃআমার কন্ঠটিও রেকর্ডিং করে রাখো! ওটা তোমার মোবাইলের রিংটোন হিসেবে কাজে লাগবে!’
হাসির ছলে এমন বেশকিছু বিষয় তুলে ধরতে লেখক বেমালুম ভুলে যাননি। প্রতিটি পাতায় লেখক যেন গল্প বলেছেন তার পাঠকদের উদ্দেশ্যে। লেখকের ঝুলি থেকে বের হওয়া সেসব গল্পে কখনোবা হারিয়ে গিয়েছি আলামূতের চূড়ায়, আবার কখনও নিজেকে খুঁজে পেয়েছি পারসিপ্যালেস প্রাসাদের খোদাইকৃত চিত্রকর্মে, আবার কখনও কাস্পিয়ান সাগরের উপকূলে দাঁড়িয়ে উপভোগ করেছি সূর্যাস্তের আকর্ষণীয় দৃশ্য। আবার কখনও উরুমিয়েতে (হ্রদ) গিয়ে হেঁটেছি,আর উরুমিয়ের অশ্রু উপলব্ধ করেছি।
এছাড়াও আপনি এবারেই প্রথম পরিচিত হবেন পৃথকভাবে ইরানের সবচাইতে ধনী শহর, মোটর সাইকেল ব্যতিত শহর, মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র অলিগলিহীন শহর, সময়হীন গ্রাম ও লিলিপুটদের গ্রামের সঙ্গে।
বইয়ের প্রতিটি পরতে পরতে রয়েছে নৃতাত্ত্বিক, পুরাতাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের বর্ণনার সমাহার। আপনার মানসপটে বর্ণনাকে জীবন্ত করে তুলতে পুরো বইজুড়ে রয়েছে অসংখ্য চিত্র। যা আপনার চোখের সামনে তুলে ধরবে ইরানের আদ্যোপান্ত।
বইটি পড়ে জেনেছি ইরানের ‘সিরজান’ অঞ্চলে সেহরিতে জাগ্রত করার জন্য বাড়ির দরজায় টোকা দিতে দিতে কর্তাকে সম্ভাষণ করে বলা হয় ছড়া। ফারসি অনুবাদে সিদ্ধহস্ত লেখকের ভাষায়-
‘ওহে বয়োজ্যেষ্ঠ, উঠুন সেহরি খাই
খাই বরফ,চিনিমিশ্রিত ফালুদা
আর তো সময় নাই।’
বইটি যেমন সুখপাঠ্য, তেমনি তথ্যবহুল। খুব অল্প সময়েই আপনাকে পরিচয় করিয়ে দেবে পারস্য সভ্যতার পসরা সাজিয়ে বসা প্রাচীন সভ্যতার দেশ ইরানের সঙ্গে। একবার ঘুরে আসবেন নাকি, ইরানের পথে-প্রান্তরে?
সায়মা সুহেরি, পি এস টু ইরানিয়ান এম্বাসেডর ইন ঢাকা, বাংলাদেশ
‘ইরানের পথে-প্রান্তরে’
ড. মুমিত আল রশিদ
প্রকাশন: কাকলী প্রকাশনী
