ছোট কিন্তু চড়া মাশুলের ৫টি ভুল, যার কারণে বাংলাদেশিরা রিমোট চাকরি পান না

খুলনায় বসে দুবাই-ভিত্তিক একটি কোম্পানিতে রিমোট জব করছি। শুরু করেছিলাম একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট মার্কেটিং ম্যানেজার হিসেবে, আর আজ সেই একই কোম্পানির (MasdarEOR) হেড অফ মার্কেটিং হিসেবে কাজ করছি। প্রায় চার বছরের এই পুরো যাত্রায় কোন কাজে আমাকে একবারও ফিজিক্যাল অফিসে যেতে হয়নি। এরই মাঝে বেশ কয়েকজনকে রিমোট জব পেতে পরামর্শ দিয়েছি এবং তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন সফলও হয়েছেন। তবে তার চেয়ে বেশি মানুষকে দেখেছি, কিছু ভুলের কারণে রিমোট জব না পেতে। সেই ভুলগুলো নিয়েই আজকের এই লেখাটা সাজিয়েছি। শুধু ভুল নয়, ভুলের থেকে সমাধানের পথও বলেছি।

প্রথমে কিছু পরিসংখ্যান দেখে নেওয়া যাক। গবেষণা প্রতিষ্ঠান FMC Group-এর মতে, পৃথিবীতে এই মুহূর্তে প্রায় ৭ কোটি ৩০ লাখ জব রিমোটে করার উপযোগী। FlexJobs-এর Remote Work Index (২০২৬) বলছে, টানা দ্বিতীয় কোয়াটারে রিমোট জবের বিজ্ঞাপন বেড়েছে ২২ শতাংশ। আর গবেষকদের পূর্বাভাস হলো, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রতি তিনজন পেশাজীবীর একজন কোনো না কোনোভাবে রিমোটে কাজ করবেন।

বাংলাদেশও এই দৌড়ে খুব একটা পিছিয়ে নেই। Oxford Internet Institute-এর গবেষণায় ফ্রিল্যান্সার সরবরাহে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। আর ICT Division-এর হিসাব মতে, দেশের প্রায় সাড়ে ছয় লাখ ফ্রিল্যান্সার ২০২৩ সালে আয় করেছেন একশ কোটি ডলারের বেশি।

যদিও ফিক্সড বেতনের রিমোট জবের ব্যপারে বাংলাদেশে যে বৃহৎ সুযোগ রয়েছে সেটা নিয়ে তা নিয়ে খুব একটা আলোচনা হতে দেখি না।ফ্রিল্যান্সারাই একটা সময় গিয়ে রিমোট জবে ফিক্সড হয়ে যেতে পারেন তবে সঠিক গাইডলাইনের প্রচন্ড অভাব রয়েছে।

ভুল ১: নেটওয়ার্কিং না করা

সবচেয়ে বড় ভুলটা দিয়েই শুরু করছি। রিমোট জব কেবল বিজ্ঞাপন দেখে আবেদন করে পাওয়ার বিষয় নয়, এটি মূলত পেশাদার সম্পর্ক বা নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে আসে।

আমি আমার প্রথম রিমোট জব লিংকডইন থেকে পেয়েছিলাম। আমি জব খোঁজার শুরুর দিকে লিংকডইনে ২৫ জনের একটা টার্গেট মানুষের লিস্ট তৈরি করি যারা কিনা আমার পোটেনশিয়াল ক্লায়েন্ট হবার মতো। তারপর নিয়মিত তাদের লিংকডইন পোস্টে কমেন্ট করতে শুরু করি। তাদের পারসোনালি মেসেজ দিই তবে সেটা কোন জব চেয়ে মেসেজ নয়। তাদের পোস্টের বিষয়বস্তু নিয়ে মতামত দেয়া হতে পারে বা যেকোন একটা বিষয় নিয়ে কথা বলে কথা বলার স্কোপটা শুরু করা। এভাবে একটা প্রফেশনাল সম্পর্ক শুরু হয়।

এর মধ্যে একজন আমার ব্যপারে আরও জানতে আগ্রহী হয়। আমি তাকে আমার ডিটেইলস বলি। সে আমার কাছে জানতে চায় আমি মাসে কত টাকায় তার জন্য কাজ করতে পারব। আমি তাকে জানাই, সে সঙ্গে সঙ্গে সেটা গ্রহণ করে আমাকে জব দেয়।

আমি প্রায় তার আন্ডারে ৯ মাস জব করি। পরে আমি অন্য একটা জব পেয়ে সেটা ছেড়ে দিই। এখানে মূল কথা হল নেটওয়ার্কিং করা। নেটওয়ার্কিং করার মূল প্লাটফর্ম হল লিংকডইন। স্পাম না করে ধৈর্য্য ধরে লেগে থাকলে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়।

ভুল ২: লিংকডইনকে শুধু সিভি বানিয়ে রাখা

লিংকডইনে কেবল একটি প্রোফাইল খুলে রাখা আর সেটি ঠিকমতো ব্যবহার করা—দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

এ বছর শুরুর দিকে সিঙ্গাপুর-ভিত্তিক একটা কোম্পানি থেকে আমি জব অফার পাই । তারা আমাকে তাদের কোম্পানির হেড অফ মার্কেটিং পজিশনের জন্য ইন্টারভিউ নিতে চায়। হায়ারিং ম্যানেজার সরাসরি আমাকে লিংকডইনে মেসেজ দেয়। এরজন্য আমি যা করেছি সেটা নিচে বলছি:

আমি আমার প্রোফাইল সবসময় অপটিমাইজ করে রেখেছি। যেমন আমি নিয়মিত অন্য রিলেভেন্ট পোস্টে বিশ্লেষণধর্মী কমেন্ট করি তেমন করে তাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখি। প্রোফাইল সম্পূর্ণ আপডেট রাখি। যার কারণে লিংকডইন আমার প্রোফাইল রিক্রুটারদের সামনে বেশি এগিয়ে দেয়। রিলেভেন্ট কিওয়ার্ড সার্চে আমার প্রোফাইল সামনে রাখে।

কিন্তু আমার দেখা বেশিরভাগ মানুষ প্রোফাইলটিকে একটি অনলাইন সিভি হিসেবে তৈরি করে। তারপর নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। যেটা সবথেকে বড় ভুল ।

আমার পরামর্শ হল, সপ্তাহে অন্তত তিন-চার দিন লিংকডইনে সময় দিন, নিজের কাজ ও নতুন কিছু শেখা নিয়ে ছোট করে লিখুন। টার্গেট ইন্ডাস্ট্রির মানুষদের পোস্টে প্রাসঙ্গিক ও ভেবেচিন্তে কমেন্ট করুন। আর কানেকশন রিকোয়েস্ট পাঠানোর সময় আপনি কেন যুক্ত হতে চাইছেন, তা জানিয়ে দুই লাইনের একটি ছোট ব্যক্তিগত নোট বা মেসেজ জুড়ে দিন।

নিষ্ক্রিয় প্রোফাইল মানে অদৃশ্য প্রোফাইল, আর কোনো অদৃশ্য মানুষকে কেউ চাকরি দেয় না।

ভুল ৩: লিখিত ইংরেজিকে অবহেলা করা

বিদেশি নিয়োগকর্তারা আপনাকে সামনাসামনি দেখার আগে আপনার লেখা পড়েন। সিভি, কভার লেটার, কোল্ড ইমেইল থেকে শুরু করে লিংকডইন প্রোফাইল—সবকিছুতেই আপনার লেখার দক্ষতা ফুটে ওঠে।

আমি যখন কোন ইমেইল লিখি তখন আমি কোন চ্যাটজিপিটির প্রথম লেখা সরাসরি পাঠাই না। আমার একজন ক্লায়েন্ট ছিল যিনি আমেরিকাতে একটা মিড সাইজ কোম্পানির সিইও। তিনি ছিলেন ইন্ডিয়ান। সে ইংরেজি লিখলে অনেক সময় নেটিভ ইংলিশদের মতো হত না। একটা মিটিং এর সময় আমি দেখলাম সে মেইল পাঠানোর আগে Claude Ai ব্যবহার করে নেটিভদের মতো করে ২-৩ বার ভালো করে পড়ে রিভিউ করে তারপর পাঠাল। আমি তখন সেটা শিখে নিলাম।

মূল কথা হল কেউ আপনার কাছে সাহিত্য আশা করে না; তারা চায় ছোট, স্পষ্ট ও নির্ভুল বাক্য, যা পড়ে এক দেখাতেই আপনার মনের ভাব বোঝা যায়। যিনি নিজের কাজের কথা দুই লাইনে গুছিয়ে লিখতে পারেন, রিমোট চাকরির দুনিয়ায় তাঁর কদর সবচেয়ে বেশি। কারণ, রিমোট জবে দিনের অর্ধেক যোগাযোগই হয় লিখে।

বর্তমান সময়ের সেরা এআই টুল ব্যবহার করতে জানলে ইংরেজি লেখা খারাপ হওয়ার কথা না।

ভুল ৪: সিভিতে দায়িত্বের তালিকা, কিন্তু ফলাফলের দেখা নেই

সিভিতে শুধু “Responsible for social media marketing” লিখলে আসলে কাজের কিছুই বোঝানো হয় না। এই লাইনটি শুধু বলে যে আপনার পদবি কী ছিল, কিন্তু সেই পদে বসে আপনি কোম্পানিকে কী এনে দিয়েছেন, তা প্রমাণ করে না।

এর বদলে যদি লেখেন, ‘ছয় মাসে অর্গানিক লিড ৪০ শতাংশ বাড়িয়েছি’—কাজ একই হলেও কথাটির ওজন সম্পূর্ণ আলাদা। বিদেশি কোম্পানি আপনার পদবি দেখে না, তারা কাজের ফলাফল দেখে।

সেই সঙ্গে মান্ধাতার আমলের বায়োডাটা ধাঁচের তিন পাতার সিভিটাও বাদ দিন। ছবি আর বাবা-মায়ের নাম দেওয়া ফরম্যাট বিদেশি নিয়োগকর্তাদের কাছে সম্পূর্ণ অচেনা। তাঁরা এক পাতার পরিচ্ছন্ন সিভি চান, যা আপনার কাজের ফলাফল দিয়ে সাজানো থাকবে এবং প্রতিটি আবেদনের জন্য আলাদাভাবে কাস্টমাইজ করা হবে।

যদি নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা বা ডেটা খুঁজে না পান, অন্তত আগের ও পরের অবস্থার একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরুন।

ভুল ৫: স্পোকেন ইংরেজির চর্চা না করা

আপনার প্রথম ইন্টারভিউটি হবে ভিডিও কলে, ইংরেজিতে এবং ভিনদেশি একজন অচেনা মানুষের সাথে। লেখা ইংরেজি বারবার এডিট করা যায়, কিন্তু বলা ইংরেজি এডিট করার সুযোগ নেই। ভয়টা এখানেই কাজ করে, তবে এর সমাধানও বেশ সহজ।

আমি সাবলিল ইংরেজি বলা শিখেছি আমার প্রথম দিকের ফ্রিল্যান্সিং ক্লায়েন্টদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে। প্রথমে দিকে খুব বেশি আটকে যেতাম তবে ধীরে ধীরে সেটা ঠিক হয়ে গেছে। তবে আমার প্রায় ৬ মাস থেকে ১ বছর সময় লাগছে সম্পূর্ণ ভালো করতে।

আপনার ব্রিটিশ বা আমেরিকান উচ্চারণের কোনো দরকার নেই; শুধু আটকে না গিয়ে সাবলীলভাবে বিশ মিনিট নিজের কাজের কথা বুঝিয়ে বলতে পারার ক্ষমতা থাকলেই হবে। প্রতিদিন কিছুটা সময় বিভিন্ন ফ্রি কথা বলার Apps গিয়ে অন্য দেশের মানুষের সাথে কথা বলে প্র‍্যাকটিস করতে পারেন। তাতেই অনেকটা এগিয়ে যেতে পারবেন। আমি এটা অনেকবার করেছি।

ইংরেজিতে সাবলীলভাবে কথা বলতে পারাটা পুরোপুরি অনুশীলনের বিষয়, চর্চা ছাড়া এটি কখনোই উন্নত হয় না।

একজন ফ্রিল্যান্সার থেকে রিমোট জব পাওয়ার সম্পূর্ণ যাত্রায় কোন কোর্স বা কিছু কিনিনি। আমি সম্পূর্ণ নিজের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা, ধৈর্য্য ও বিশ্বাস রেখে সবটা করেছি। যদি কেউ চেষ্টা করতে থাকে তবে সব রিসোর্স তিনি গুগল ও ইউটিউবে পেয়ে যাবেন। শুধু ইচ্ছে আর ধৈর্য্য থাকলেই সবটা জয় করা সম্ভব। তবে এগুলো নিয়ে অবশ্যই আপনাকে অন্যের লেখা পড়তে হবে, ভিডিও দেখতে হবে এবং রিসার্স করতে থাকতে হবে। এটাই এখানে সফলতার চাবিকাটি।

প্রসেনজিৎ বিশ্বাস: হেড অফ মার্কেটিং, MasdarEOR

আরও পড়ুন