অডিও বইয়ের উত্থান এবং পাঠাভ্যাসের পরিবর্তন

আশির দশকের দ্বিতীয় ভাগে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়ার সময় আমি নিজে নোট তৈরি করতাম। তবে মুখস্থ করতাম না, এমন কী সেটাও চাইতাম না। মুখস্থ করতে একদমেই ইচ্ছে বা ভালো লাগত না। পরীক্ষার আগে ঐ নোটগুলো ক্যাসেট-প্লেয়ারে নিজের কণ্ঠে রেকর্ড করতাম এবং চার-পাঁচটা নব্বই মিনিটের ক্যাসেট প্রায় চার-পাঁচদিন দিন-রাত ধরে শুনতাম। মুখস্থ হত না কিন্তু বেশ মনে থাকত। পরীক্ষায় প্রশ্ন যেমনি আসুক, আমার নোট শোনার স্মৃতি কাস্টোমাইজ করে উত্তর লিখে ফেলতাম। পরীক্ষার ফলাফল বেশ ভালোই হত।

সেই তখন থেকেই শোনার প্রতি একটা আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল। ছেলেবেলার রেডিওতে নাটক শোনার অভিজ্ঞতাও কাজে দিয়েছিল। রেডিওতে নাটক শুনতে খুব ভালো লাগত। ব্যাপক আগ্রহ নিয়ে রেডিওর নাটক শুনতাম।

ঠিক সেই অনুভূতিটা ফিরে পেলাম যখন কোভিডের অতিমারির সময় প্রথম ইউটিউবে অডিও বই শুনলাম। ইংরেজি বই। প্রথম শুনেছিলাম ‘ট্রু ফ্ল্যাগ’ নামের আমেরিকার বৈশ্বিক হেজেমনি নিয়ে একটি বই। লেখকের নিজের গলায়। কী যে অদ্ভুত লেগেছিল। তারপর তখন থেকে এখন পর্যন্ত বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে প্রায় একশ বই ‍পড়ে ফেলেছি। ‘পড়া’ বলছি তার কারণ হচ্ছে, যা কিছু আমাদের মাথায় ঢোকে, তাইই পড়া।

বাংলায় অডিও বই তখন ছিল না বললেই চলে। কিন্তু বছর দুয়েকের মধ্যে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বাংলার বই-কথকেরা অনেক অনেক বাংলা বই নিয়ে এসেছেন। সব কথকের ন্যারেশন শুনতে ভালো লাগে না, তবে অনেকেই বোঝেন অডিও বই আসলে কেমন করে পরিবেশন করতে হয়।

এখন সারা বিশ্বজুড়ে অডিও বই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। মানুষের সাহিত্যের স্বাদ উপভোগের ধরণ পরিবর্তন এসেছে। শুনে পড়া যায়, এমন মাধ্যমটি লাখো-কোটি পড়ুয়ার জন্যে এক অনন্য সুবিধা ও আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে। এখন প্রায় বিশ্বের সব ভাষায়ই অডিও বই চালু হয়ে গেছে। ইউটিউবে সার্চ দিলেই বোঝা যায়।

অডিও বই পড়ছেন। অলংকরণ: সংগৃহীত

অডিও বই বিভিন্ন ধরনের শ্রোতাদের জন্য সাহিত্যে প্রবেশাধিকার উন্মুক্ত করে এই মাধ্যমকে এক অন্তর্ভুক্তিমূলকমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ধরুন, যাদের দৃষ্টিশক্তি দুর্বল, পড়তে পারেন না, তাদের জন্যে বই শ্রবণযোগ্য করে তাদেরকে পড়ার জগতে বিচরণ করতে সাহায্য করেছে। আবার ধরুন, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে যারা একেবারে লেখা পড়াই শিখতে পারেননি, তারা এই অডিও বই শুনে বিভিন্ন জ্ঞান অর্জন করতে পারেন।

বর্তমান জীবনব্যবস্থা ব্যস্ততায় পরিপূর্ণ। অনেক কিছুর সঙ্গে যুক্ত থাকতে হয়। পড়ার ইচ্ছে থাকলেও হাতে বই পড়ার সুযোগ-সময় একেবারেই কঠিন। এক্ষেত্রে গাড়িতে-বাসে বসে, রিক্সায় চড়ে, ব্যায়াম করতে করতে কিংবা গৃহস্থালির কাজের সময় অডিও বই পড়ে নেওয়া যায়। এতে সময়ও বাঁচল, পড়াটাও হলো। আমার কয়েকজন বন্ধু আছেন, যারা নিয়মিত ব্যায়ামাগারে বা পার্কে হাঁটতে হাঁটতে অডিও বই পড়েন।

অনেকে শোনাকে ‘পড়া’ বলে মানতে চান না, তবে আমি মনে করি আমরা যা কিছু মস্তিষ্কে গ্রহণ করছি, তাইই পড়া। আমাদের চিন্তাও এক নিবিড় পড়া।

অডিও বই শ্রবণ ক্ষমতা ও স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে, বিশেষ করে যারা শ্রবণশক্তির মাধ্যমে বেশি শিখতে পারেন। আমার ক্ষেত্রে এটা অনেক সহায়ক করে। আমি শুনে বেশি মনে রাখতে পারি। বিষয়বস্তু শোনা এবং কল্পনা করার মধ্যে একটা সম্মিলিত প্রচেষ্টা থেকে ভালো করে বোঝা ও স্মৃতিশক্তি বাড়ানো সম্ভব। বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্যালান্ট ল্যাবের একটা গবেষণা বলছে, অডিও বই শুনলে পাঠের মতো মস্তিষ্কের সেই একই অংশগুলো সক্রিয় হয়।

যারা ভাষা শিখতে চান তাদের জন্যে অডিও বই একটা গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে, যা সঠিক উচ্চারণ, স্বর ও ছন্দের সঙ্গে পরিচয় করে দেয়। আমি এক সময় ফরাসি ভাষা শিখতাম যা এখন প্রায় ভুলে গেছি। কিন্তু যখনই ফরাসি ভাষা শেখার কোনো বই আমি ইউটিউবে শুনি তখনই আবার অনেক কিছু মনে পড়ে যায়।

অডিও বই মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। এটা একটা অবসরের মাধ্যম, মনে চাপ কমায় এবং উদ্বেগ ও হতাশা কমাতে সাহায্য করতে পারে। বয়স্ক ব্যক্তিরা অডিও বই শুনলে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি হয় বলে আমার ধারণা– কারণ আমার হয়।

গত এক দশকে প্রযুক্তির উন্নতি এবং গ্রাহকের পছন্দের কারণে বৈশ্বিক অডিও বইয়ের বাজার উল্লেখযোগ্য-ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সব তথ্য সঠিকভাবে পাওয়া যায় না, তবে কিছু পরিসংখ্যান পাওয়া যায়।

শিশুরা শুনছে অডিও বই। ছবি: সংগৃহীত

২০২৩ সালে বৈশ্বিক অডিও বই বাজার ছিল প্রায় ১৪.৮৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের, ধারণা করা হচ্ছে বর্তমানে তা এসে দাঁড়াতে পারে ১৮.৭২ বিলিয়ন ডলারে। এই বাজার আরও বৃদ্ধি পাবে এবং ২০৩২ সাল নাগাদ ১১৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।

উত্তর আমেরিকা এখন অডিও বইয়ের এক বড় বাজার। কর্মজীবী ও পেশাজীবীদের মধ্যে অডিও বইয়ের ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতার কারণে এই বাজার বড় হচ্ছে। ইন্টারনেট, স্মার্ট ডিভাইস এবং অ্যাপ্লিকেশনের প্রসার অডিও বইকে আগের চেয়ে আরও সহজলভ্য করছে।

বিশ্বব্যাপী অডিও বইয়ের বাজার বড় হলেও বাংলাদেশে তা খুব ধীরে ধীরে বাড়ছে। কেউ বাণিজ্যিক ভাবে এই কাজে হাত দিতে সাহস পাচ্ছেন না। অনেক প্রকাশক অডিও বইয়ের ভাবনা শুরু করেছেন কিন্তু পাঠকের মাঝে তা গ্রহণযোগ্য হবে কিনা তা বুঝতে পারছেন না। বাংলাদেশে কতজন মানুষ বই পড়েন, সেই হিসেবই পাওয়া যায় না– অডিও বই তো অনেক দূরের বিষয়। আমাদের সংবাদ মাধ্যম অমর একুশে বইমেলা ছাড়া আর বই নিয়ে আলোচনা বা প্রতিবেদন ছাপে না। কিছু বই পরিচিতি সাপ্তাহিক সাহিত্য পাতাগুলোতে ছাপা হয় তবে সেগুলো এতই অপ্রতুল যে উল্লেখ করার মতো নয়।

তবে খুশির বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের অনেক বই-কথক ইউটিউবে অডিও বই প্রকাশ করা শুরু করেছেন বেশ দু’তিন বছর ধরে। তবে সবার কথন শুনতে ভালো লাগে না। ভুল উচ্চারণ এবং যেই গল্প বা উপন্যাস পড়ে শোনাচ্ছেন তা না বুঝতে পারা এবং গল্প বলার গতি– এসব মিলে বাংলাদেশে অডিও বই খাতে এখনও মন দিয়ে কাজ হচ্ছে বলে দাবি করা যাবে না। ইউটিউবে ‘বাংলা অডিবল’ এবং ‘গল্প-কথন বাই কল্লোল’ – এই দুটি চ্যানেলে বই শুনে পড়তে ভালো লাগে। এই দুই চ্যানেলের অনেক পাঠক।

পশ্চিম বাংলার চ্যানেলগুলোও চেষ্টা করে দেখেছি। ওদের দুরবস্থা দেখেও মন খারাপ হয়েছে। তবে এই চ্যানেলগুলো আমাদের দেশেও পাঠাভ্যাসে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে বলে আমার মনে হয়। মানুষকে সাহিত্য-কন্টেন্ট উপভোগ করার এক ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।

বাংলা ভাষায় অডিও বইয়ের একটা বড় বাজার আছে বলে আমার মনে হয়। প্রযুক্তির এই যুগে অডিও বইয়ের মাধ্যমে সাহিত্য ও শিক্ষাকে প্রাণবন্তভাবে উপস্থাপন করার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে, অডিও বই একটা উন্নত মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

আমাদের শিক্ষকদের সবার একটা করে অডিও বই চ্যানেল চালু হলে খুশি হব।

ইকরাম কবীর : গল্পকার

আরও পড়ুন