কার্মাটাঁড়ে বিদ্যাসাগর: নির্জনতার আশ্রয়ে মানবতার মহাকাব্য

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে আমরা সাধারণত দেখি সমাজসংস্কারক, শিক্ষাবিদ, ভাষার নির্মাতা কিংবা বিধবা বিবাহ আন্দোলনের অগ্রদূত হিসেবে। কিন্তু তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়টি যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কাহিনি। সেখানে নেই জনসমুদ্রের করতালি, নেই সভা-সমিতির বক্তৃতা কিংবা সংস্কারের উত্তাল সংগ্রাম। আছে এক গভীর নিঃসঙ্গতা, মানুষের প্রতি সীমাহীন মমতা এবং সভ্যতার কোলাহল ছেড়ে প্রকৃত মানুষের কাছে ফিরে যাওয়ার এক অনন্য যাত্রা। সেই যাত্রার নাম—কার্মাটাঁড়।
বিদ্যাসাগরের জীবনের শেষ পর্ব ছিল একের পর এক ব্যক্তিগত আঘাতের ইতিহাস। একমাত্র পুত্র নারায়ণচন্দ্রের অসংযত জীবনযাপন ও অবাধ্য আচরণ তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। ১৮৭২ সালে তিনি আইনিভাবে পুত্রকে ত্যাজ্য ঘোষণা করেন। এর কিছুদিন পরেই প্রয়াত হন তাঁর সহধর্মিণী দীনময়ী দেবী। পারিবারিক জীবনের এই শূন্যতা তাঁকে ভিতর থেকে ভেঙে দেয়। দীর্ঘ কর্মজীবনে অসংখ্য মানুষের উপকার করেও তিনি বহু ক্ষেত্রে কৃতঘ্নতা ও অপমানের সম্মুখীন হন। নাগরিক সমাজের ভণ্ডামি, স্বার্থপরতা ও অন্তহীন দ্বন্দ্ব তাঁর মনকে ক্রমশ ক্লান্ত করে তুলেছিল। তিনি বুঝেছিলেন, মানুষের ভিড়ের মধ্যেও মানুষ ভীষণ একা হয়ে যেতে পারে।
এই মানসিক অবস্থাতেই তিনি কলকাতা থেকে বহু দূরে, বর্তমান ঝাড়খণ্ডের কার্মাটাঁড়ে আশ্রয় খুঁজে নেন। রেলস্টেশনের অদূরে এক ইংরেজ বিধবার কাছ থেকে মাত্র পাঁচশো টাকায় প্রায় চৌদ্দ বিঘা জমিসহ একটি আমবাগান কিনে নেন। স্বামী মারা যাওয়ার পরে ওই মহিলা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন। সেই জমিতেই বিদ্যাসাগর গড়ে তোলেন তাঁর স্বপ্নের নিবাস—‘নন্দনকানন’।
নন্দনকানন ছিল না কোনও জমিদারবাড়ি। ছিল অত্যন্ত সাধারণ, অনাড়ম্বর একটি বাসভবন। মাঝখানে একটি বড় হলঘর, যেখানে রাতের বিদ্যালয় চলত। একদিকে তাঁর শোবার ঘর, অন্যদিকে পড়ার ঘর। বাড়ির প্রবেশপথে নিজের হাতে লাগিয়েছিলেন একটি কিষাণভোগ আমগাছ। বাগানের শেষ প্রান্তে মালি কালী মণ্ডলকে দিয়ে লাগিয়েছিলেন ভাগলপুরি ল্যাংড়া আমগাছ। নির্জন প্রকৃতির মাঝখানে এই বাড়িটিই হয়ে ওঠে তাঁর শেষ জীবনের কর্মক্ষেত্র। এখানেই তিনি সীতার বনবাস গ্রন্থের কাজ করেন, বর্ণপরিচয়-এর তৃতীয় সংস্করণের প্রুফ সংশোধন করেন এবং বহু সাহিত্যকর্ম নিয়ে চিন্তাভাবনা করেন।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন, “বাঙালি উচ্চারণে কর্মাটা। আসল নাম কর্মাটাঁড়। অর্থাৎ কর্মা নামে এক সাঁওতাল মাঝির টাঁড়—উঁচু জমি, যা বন্যায় কখনও ডোবে না।” এই নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এলাকার ইতিহাস। উঁচু লালমাটির বিস্তীর্ণ প্রান্তর, চারদিকে বনভূমি, সরল জীবনযাত্রা আর সাঁওতাল সমাজের আন্তরিকতা—সব মিলিয়ে কার্মাটাঁড় ছিল এক ভিন্ন পৃথিবী। বিদ্যাসাগর সেই পৃথিবীতেই খুঁজে পেয়েছিলেন মানুষের প্রকৃত মুখ।
সাঁওতালদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল আত্মীয়তার। তাঁরা প্রতিদিন ভুট্টা বিক্রি করতে আসতেন। বিদ্যাসাগর সব ভুট্টা কিনে রেখে দিতেন। বিকেলে কাজ শেষে যখন তাঁরা ফিরতেন, তখন সেই ভুট্টাই আগুনে পুড়িয়ে তাঁদের হাতে তুলে দিতেন। কখনও নিজেও তাঁদের সঙ্গে বসে একই ভুট্টা খেতেন। একজন সমাজসংস্কারকের কাছে এটি হয়তো ছোট ঘটনা; কিন্তু একজন মানুষের কাছে এটি ছিল ভালোবাসার সবচেয়ে সহজ প্রকাশ।
তিনি বুঝেছিলেন, দারিদ্র্যের চেয়েও বড় কষ্ট অবহেলা। তাই তিনি শুধু দান করেননি, মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সকাল থেকে বেলা পর্যন্ত হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করতেন। ওষুধের সঙ্গে নিজের খরচে সাগু, মিছরি, বাতাসা, বার্লি ইত্যাদি পথ্যও দিতেন। বিকেলে আবার রোগীর কুটিরে গিয়ে খোঁজ নিতেন। কলেরা ছড়িয়ে পড়লে তিনি নিজ হাতে রোগীদের সেবা করেন। মেথরপল্লিতেও গিয়েছেন বিন্দুমাত্র সংকোচ না করে। তখনকার সমাজে এই কাজ ছিল অকল্পনীয়।
ভাই শম্ভুচন্দ্র লিখেছেন, সাঁওতালরা তাঁকে দেখলেই বলত—“তুই আসেছিস!” এই ‘তুই’ সম্বোধনে কোনও অসম্মান ছিল না; ছিল আত্মীয়তার উষ্ণতা। বিদ্যাসাগর সেই সম্বোধন শুনে আনন্দ পেতেন। একদিন তিনি বলেছিলেন, “বড়লোকের বাড়িতে খাওয়ার চেয়ে এদের কুটিরে খেতে আমার বেশি ভালো লাগে। এরা কখনও মিথ্যা কথা বলে না।”
এই একটি বাক্য তাঁর জীবনদর্শনের সারাংশ। মানুষের পরিচয় তাঁর কাছে জাতি, বর্ণ, ধর্ম কিংবা সম্পদে নয়; সততা, সরলতা ও মানবিকতায়। তাই সাঁওতাল সমাজ তাঁকে কেবল একজন অতিথি হিসেবে গ্রহণ করেনি; নিজেদের একজন মানুষ বলেই গ্রহণ করেছিল।
প্রতি দুর্গাপূজায় তিনি নতুন জামাকাপড় কিনে দিতেন আদিবাসী পরিবারগুলিকে। শীতকালে কম্বল ও মোটা চাদর বিতরণ করতেন। কলকাতা থেকে ফিরলে শিশুদের জন্য নিয়ে আসতেন আম, কমলালেবু, আপেলসহ নানা ফল। তিনি কখনও প্রচারের জন্য এসব করেননি। মানুষের মুখে হাসি দেখাই ছিল তাঁর পরম আনন্দ।
কার্মাটাঁড়ে তিনি কোনও রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, কোনও বিদ্বজ্জন-সমাবেশের কেন্দ্রও ছিলেন না। সেখানে তিনি ছিলেন শুধু একজন মানুষ। হয়তো এ কারণেই জীবনের সবচেয়ে শান্ত দিনগুলি তিনি সেখানেই কাটিয়েছিলেন।
কার্মাটাঁড়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি বিখ্যাত ঘটনা। এক যাত্রী ট্রেন থেকে নেমে উচ্চস্বরে কুলি ডাকছিলেন। বিদ্যাসাগর নিজেই এগিয়ে এসে তাঁর মালপত্র মাথায় তুলে গন্তব্যে পৌঁছে দেন। যাত্রী পারিশ্রমিক দিতে গেলে তিনি নীরবে চলে যান। পরে স্থানীয় লোকজনের কাছে জানতে পারেন, যিনি মাল বহন করেছিলেন, তিনি আর কেউ নন—ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। লজ্জায় যাত্রীর মাথা নত হয়ে যায়। এই ঘটনায় বিদ্যাসাগরের বিনয় ও অহংকারহীন ব্যক্তিত্বের এক বিরল দৃষ্টান্ত ফুটে ওঠে।
প্রায় সতেরো বছর কার্মাটাঁড়ের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক ছিল। কিন্তু বার্ধক্য ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে ১৮৯০ সালের পর আর সেখানে স্থায়ীভাবে থাকতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত তাঁকে কলকাতায় ফিরতে হয়। ১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই কলকাতাতেই তাঁর জীবনাবসান ঘটে। তবে তাঁর হৃদয়ের একটি বড় অংশ রয়ে যায় কার্মাটাঁড়ের লালমাটিতে।
দুঃখের বিষয়, তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র নারায়ণচন্দ্র কার্মাটাঁড়ের বাড়ি ও সম্পত্তি বিক্রি করে দেন কলকাতার এক মল্লিক পরিবারের কাছে। দীর্ঘদিন বাড়িটি অবহেলায় পড়ে থাকে। পরে ১৯৩৮ সালে বিহারের প্রবাসী বাঙালিরা ‘বিহার বাঙালি সমিতি’ গঠন করে বাড়িটি কিনে নেন। বিদ্যাসাগরের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে সেখানে তাঁর মা ভগবতী দেবীর নামে একটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।
২০০১ সালে ঝাড়খণ্ড রাজ্য গঠনের পর নতুনভাবে গড়ে ওঠে ‘ঝাড়খণ্ড বাঙালি সমিতি’। ২০১৬ সালে বিহার ও ঝাড়খণ্ডের দুই সমিতির যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বিদ্যাসাগর স্মৃতিরক্ষা সমিতি’। বর্তমানে তারাই ঐতিহাসিক এই স্থানটির রক্ষণাবেক্ষণ করছে। পুরোনো ডিসপেনসারি না থাকলেও আজ সেখানে ‘বিদ্যাসাগর হোমিও চিকিৎসালয়’ চালু রয়েছে।
আজ কার্মাটাঁড়ের সরকারি নামই ‘বিদ্যাসাগর’। রেলস্টেশনটির নামও বিদ্যাসাগর। প্ল্যাটফর্মের দেওয়ালজুড়ে তাঁর জীবনের নানা পর্যায়ের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। কোথাও বীরসিংহের ছোট্ট ঈশ্বর, কোথাও সংস্কারক বিদ্যাসাগর, কোথাও সাঁওতালদের সঙ্গে পোড়া ভুট্টা ভাগ করে খাওয়া এক সহজ মানুষ। বর্ণপরিচয়-এর প্রচ্ছদও স্থান পেয়েছে সেই চিত্রমালায়। যেন একটি রেলস্টেশনই পরিণত হয়েছে বিদ্যাসাগরের জীবনের উন্মুক্ত প্রদর্শনীতে।
প্রতিবছর ২৯ মার্চ ‘গুরুদক্ষিণা দিবস’, ২৯ জুলাই তাঁর প্রয়াণদিবস এবং ২৬ সেপ্টেম্বর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে এখানে অনুষ্ঠান হয়। নেই বাহুল্য, নেই জাঁকজমক। কয়েকজন মানুষ আন্তরিক শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন বাংলার এই মহাপুরুষকে। সেই নিরাভরণ পরিবেশ যেন বিদ্যাসাগরের জীবনদর্শনেরই প্রতিফলন।
আমরা বিদ্যাসাগরকে যতটা তাঁর লেখা বইয়ের পাতায় খুঁজে পাই, তার চেয়ে অনেক বেশি খুঁজে পাই কার্মাটাঁড়ের সেই লাল মাটিতে, যেখানে তিনি মানুষের পরিচয়কে জাতি বা ধর্মের গণ্ডিতে নয়, মানবতার আলোয় দেখেছিলেন। সমাজসংস্কারক হিসেবে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য; কিন্তু কার্মাটাঁড় তাঁকে আমাদের সামনে তুলে ধরে এক অন্য রূপে—তিনি সেখানে কেবল বিদ্যাসাগর নন, তিনি মানুষের মানুষ।
আজ যখন সমাজ বিভাজনের নানা রেখায় ক্রমশ ক্ষতবিক্ষত, তখন কার্মাটাঁড়ের বিদ্যাসাগর আমাদের শেখান—মানুষকে ভালোবাসাই সভ্যতার সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষা। তাঁর নন্দনকানন কেবল একটি বাড়ি নয়; তা এক মানবতাবাদের বিদ্যালয়, যেখানে পাঠ্যবইয়ের চেয়ে বড় ছিল সহমর্মিতা, আর বিদ্যার চেয়ে বড় ছিল মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। সেই কারণেই কার্মাটাঁড় আজও শুধু একটি স্থান নয়; বাংলার বিবেকের এক নীরব তীর্থক্ষেত্র।
দীপক সাহা: প্রাবন্ধিক, শিক্ষক
