আমি বারবার ফিরে আসি

০১
পড়ন্তবেলায় এসে একেমন উপলব্ধি আমার
জীবনটা ব্যর্থতায় ব্যর্থতায় ভরিয়ে তুললাম
না, আমার এই জীবনে কোনো সফলতা নেই
না না, আমার জীবনে কোনো অর্জনই আসে নাই

০২
আমি একজন চিরকালের ব্যর্থ মানুষ
আমি একজন এই সমাজের চোখে অথর্ব মানুষ
আমি নিজের জন্য কিছুই করতে পারলাম না
আমি আপনজনদের কিছুই দিতে পারলাম না

০৩
আমি কিছুই গড়তে পারলাম না পরিবারের
আমি বাড়ির সবচেয়ে অপাংক্তেয় একজন
আমি আমার পরিজনের কাছে ত্যাজ্য
আমি আমার কন্টকসময়ে, বন্ধুদের কাছে দুর্জন

০৪
আমার প্রয়োজনীয়তা আজ ফুরিয়ে গেছে
আমার সময় যে বহিয়া যায় গোধূলি সন্ধ্যায়
আমি প্রভাত থেকে পড়ন্তবেলায় পৌছে গেছি
আমি এখন জীবনের অন্তিম পর্বে চলেছি

০৫
আমার আর কিছুই দেওয়ার নেই
আমি অনেকের চোখে একটা বোঝা মানুষ
আমি হয়তো ফুরিয়ে গেছি চিরতরে
আমি হারিয়ে গেছি পরিজন বন্ধুদের থেকে

০৬
আজ মনে হয় লোকচক্ষুর অন্তরালে ডুবে আছি
হয়তো আর জেগে উঠার শক্তি আমার নেই
বেঁচে থাকার পথ আর বেশী বাকি নেই
সামনে আমার ঘোর অন্ধকার অপেক্ষা করছে

০৭
আমি নিকশ কালো সুতার উপরে উঠতে থাকি
আমি কি আবার ফিরে যাবো আমার গহীন অরণ্যে
আমি কি আবার ফিনিক্স পাখির মত উড়াল দেবো
আমি কি আবার চিৎকার করে উঠে দাঁড়াবো একাকী

০৮
আমি ছিলাম প্রকৃতির ভালোবাসায় এই ভুবনে
আমি আছি মানববাগানের মানবতার জয়গানে
আমি থাকবো মহাকালে আমার কীর্তি ও কর্ম নিয়ে
আমি বার বার ফিরে আসবো সততা ও নৈতিকতা নিয়ে

০৯
প্রান্তসীমায় আমি কোথায় এসে দাঁড়িয়ে আছি আজ
আমি কি করেছি, আর কি নিয়ে সময় পার করলাম
আমি কোন জীবননদী পার হয়ে পৌছেতে চেয়েছিলাম
আর কোথায় এসে অবশেষে নোঙ্গর করলাম অনিশ্চয়তায়

১০
আমি আমার মেধা মনন সৃজনী বিলিয়ে দিয়েছি সৃষ্টিশীলতায়
আমি আমার কায়িকশ্রম বেঁচে রেমিট্যান্স এনেছি এই দেশে
আমি আমার নিজের সুখের জন্য তথাকথিত স্বপ্নের দেশে
প্রাচ্য প্রতীচ্যের লোভাতুর তৃতীয় শ্রেনীর নকর নাগরিক হইনি

১১
আমি ভালোবেসেছি আমার দেশের জনমানুষকে
আমি দুর্দিনে ঝাপিয়ে পড়েছি বন্যা খরা জলোচ্ছ্বাস দুর্ভিক্ষে
শত প্রলোভনে নিজেকে আত্মসমর্পণ করে বিক্রি করে দেয়নি
পদে পদে লাঞ্চিত-বঞ্চিত অপমানিত হয়ে সহ্য করেছি নিরবে

১২
আমি কেনো অর্থধান্দা না করে শতাধিক মৌলিক বইলিখেছি
আমি কেনো শিল্প সাহিত্য সাংস্কৃতি চলচ্চিত্র সাধনায়
অক্ষর সজ্জায় নিমজ্জিত করেছিলাম পাঁচদশক কালিকলমে
আর সেলুলয়েড-আলোকচিত্রের ফ্রেমের প্রেমে পড়েছিলাম

১৩
আমার ক্যামেরার লেন্সে আমি কেনো বিশ্বভুবন দেখেছিলাম
আমি কেনো হাজার মানুষের শরীরিভাষার ছবি তুলেছিলাম কেনো আমার ভাবনা চিন্তায় জগতের রূপরস অন্বেষণে যৌবন উজাড় করে মানুষের ভালোবাসা খুঁজেছিলাম

১৪
আমি কি দোষ করেছি, এই গোধূলি সন্ধ্যা বেলায়
আমি কি ভুল করেছি, এই সমাজ সংসারের বাস্তবতায়
আমি কি চিরকাল আমাকে বিলিয়ে দেইনি মানবসেবায়
কখনো হালুয়ারুটির ভাগবাটোয়ারায় আখের গড়েছি

১৫
এই দিন দুনিয়ার স্বল্পভ্রমনে আমার ভূমিকা কি ছিলো
সমাজ সভ্যতা ভাষা ও সংস্কৃতি দু’চোখে অবগাহন করে
আমি আমার দুঃখিনি বাংলায় কেনো ফিরে এসেছি বারবার
কেনো কুমার ঘাগট আড়িয়াল খা কর্ণফুলীর কান্না শুনেছি

১৬
হাজার বছর ধরে এই শেকড়ের বঙ্গজনপদে বন্দরে বন্দরে
সারা পৃথিবীর আগ্রাসী দখলদার লোভাতুর দানবশক্তি
ধর্ষন করেছে আমাদের চৌদ্দ পুরুষের জনপদ আবাসভূমি
লুটে নিয়ে গেছে আমাদের ধনসম্পদ আত্মা প্রাণপ্রকৃতি

১৭
আমরা চিরজীবন বারবার মাথাতুলে প্রতিবাদ প্রতিরোধে
সম্মিলিতভাবে মুক্তির যুদ্ধ করে উঠে দাঁড়িয়েছি রুখতে
জাতি ধর্ম বর্ণগোত্র আঞ্চলিকতা রাজনীতির উর্ধে উঠে
হাতে হাত গলাগলি বুক বুক রেখে শান্তির আবাসভূমি গড়েছি

১৮
আমাদের বন্ধন বসন্তে একাকার হয়ে বাঁচতে চেয়েছি চিরদিন
রুপসা থেকে পাথুরিয়া,টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া
বঙ্গ রাঢ সমতঠ থেকে চন্রদ্বীপ পুন্ড্র হরিকেল বহিয়া
আমি আমার এই দেশ এই মাটি মানববাগান ভালোবেসেছি

১৯.
কেনো আমি সুযোগ সন্ধানী হয়ে প্লট বাগিয়ে,
সাহিত্যের পদক পুরস্কার পা চেটে নিলাম না
চলচ্চিত্রের দান খয়রাত অনুদান বগলদাবা করে,
টেন্ডার কন্ট্রাক্টরি করে টুপাইস কামানোর ধান্দা করলাম না

২০.
কেনো আমি পদ পদবী বিক্রি করে রাজনৈতিক সুবিদা নিয়ে
তেলমারা চাকর বাকর মুই কি হনুরে হয়ে সাঙ্গপাঙ্গ হলাম না
ঘুষ দূর্নীতির কমিশন বানিজ্য করে কেউকেটা হলাম না
প্রতিদিন মিডিয়া পত্রিকা ক্যামেরায় বিজ্ঞনাথন সাজলাম না

২১.
কেনো আমি ভন্ড বহুরুপি গিরগিটি সেজে দন্ত কেলিয়ে
সমাজের সৎলেবাসধারী চেহারা নিয়ে ঔষধ খাদ্যে ভেজাল
দিয়ে, সর্বত্রই জনস্বার্থে জনস্বাস্থ্যের বারোটা বাজালাম না
আমাদের জনমানুষের কথা না ভেবে বিত্তভৈবব করলাম না

২২.
দু’দিনের এই জগৎ সংসারে একদিন এসেছিলাম
আবার চলে চলেও যাবো এই অভাগা বাংলাদেশ থেকে
এই জনপদের মাটিতে কেনো আমার জন্ম হয়েছিলো
কোন প্রয়োজনে আমি এই মাতৃভূমি স্বদেশ আঁকড়ে ছিলাম

২৩.
এই নদ নদী হাওড় বাওড় খালে বিলে কেটেছে শৈশব
ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভেসেছি প্রমত্ব পদ্মা মেঘনা যমুনা ব্রম্মপুত্রে
হিজল তমাল দেবদারু’র ভালোবাসায় বংশীধ্বনি’র সুরে
শিমুল পলাশ কৃষ্ণচূড়ার পল্লবিত বাহারী ফুলে হারিয়ে যেতাম

২৪.
খেজুর গাছের রসে, সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকা প্রিয় তালগাছ
আমার সবুজ গ্রামে ভ্যাসালে রায়ক মাছ ধরা দেখে দেখে
ডোঙ্গায় চড়ে এ গ্রাম ও গ্রাম পানিতে ভেসে এবাড়ি ও বাড়ি শীতসন্ধ্যায় পূরবীরাগে নীড়ে ফিরে নাড়ার আগুন পোহাতাম

২৫.
প্রতিদিন খুঁজে ফিরতাম আমার মায়ের হাতের ভাপা,
রসের চিতাই পিঠার সুঘ্রাণে আমার সুখি হাসিমাখা পরিবার
পারইহাটির উজানতলীর কুমারের বুকে ঘাগট নদের স্মৃতি
মধুমাখা কথা সাথে নিয়ে মধ্যরাতে গয়নায় ভেসে ফিরতাম

২৬.
তারপর এই পৃথিবীর রূপরস মানুষের চেহারা দেখবো বলে
একদিন যৌবনের গান গেয়ে ঢাকা থেকে কলকাতা দিল্লী বোম্বাই মাদ্রাজ বেঙ্গালর গোয়া গৌহাটি হয়ে
প্রাচ্যের অজানা পথে সিঙ্গাপুর হয়ে টোকিও পৌছলাম

২৭.
ফিরে এসে আবারও একদিন যৌবন পার করে মধ্য বয়সে
পৃথিবীর শিল্প সাহিত্য সাংস্কৃতিক রাজধানী চলচ্চিত্রের জন্মভূমি প্রতীচ্যের পথে দোহা হয়ে প্যারিসে। তারপর,
এই পড়ন্ত শেষবেলায় কোথায় চলেছি আমি কোন অজানায়

১০ ডিসেম্বর ২০২৫ ঢাকা

আরও পড়ুন