কাজী আরজিনার কবিতাগুচ্ছ

দুচোখে স্বপ্ন পটে আঁকা

রাজপথ রঞ্জিত হলো।
পরিবারের একমাত্র সম্বল
জয়নালকে পিষে গেল এক মালবাহী ট্রাক।
পরিবার নিঃস্ব হলো,
রহিমা বিবি বিধবা হলো।
ছেলে-মেয়েগুলো লাশের উপর হামাগুড়ি দিল,
আহাজারি করে বুক ভাসাল।
দুচোখে স্বপ্ন, বাম হাতে জীবনসংখ্যার সার্টিফিকেট,
ডান হাতে অসুস্থ মায়ের ওষুধ।
আবরার! নতুন চাকরির ইন্টারভিউ শেষ করে,
বাড়ি ফিরতে গিয়েও যার বাড়ি ফেরা হয়নি।
জেব্রা ক্রসিংয়ের সময় তাকেও পিষে গেল এক মাতাল বাস ড্রাইভার।
প্রাণচঞ্চল দেয়া মেয়েটিও নিশ্চল!
যার লাশ পড়ে থাকল রাস্তার মাঝখানে।
ভিড় জমল, কার লাশ, কে—এই নিয়ে আতঙ্ক ছড়াল জনমনে।
সদ্য প্রেগন্যান্ট হওয়া শায়েলা বেগম,
সেও প্রাণ হারাল ধেয়ে আসা দ্রুতগামী বাসের ধাক্কায়।
তারপর!
পত্রপত্রিকায় লেখালিখি হলো, আন্দোলন হলো,
মোমবাতি জ্বালিয়ে শোক পালন করা হলো।
নিউজে প্রধান হেডলাইন হলো—আসামি ধরা পড়েনি।
ধরা পড়লেও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে জানোয়ারের বেশে বেরিয়ে এলো।
এই তো তারপর!
নিউজে প্রধান হেডলাইন অন্য কিছু হবে।
পত্রপত্রিকায় লেখালিখি করা সাংবাদিক কিংবা লেখক ক্লান্ত হয়ে,
ভিন্ন খবরে নিমগ্ন হবে।
রাজপথে ধেয়ে আসা হাজারো মানুষ,
তাদের কর্মস্থলে ব্যস্ত হয়ে পড়বে।
আইনের দুর্বলতা, অদক্ষ চালক, মাতাল ড্রাইভার, গাড়িতে গাড়ি রেসিং, প্রতিযোগিতা—
আর কত?
আর কত প্রাণ ঝরবে?
দুচোখে স্বপ্ন পটে আঁকা ভাঙবে,
নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চবিত্তের।

স্বাধীনতা

গরম ভাতের ধোঁয়া তখনো উড়ছে।
মুসলিম পাড়ার রহমত
আধভাত মাখা হাতে উঠে দাঁড়াল,
হাড্ডিসার শিশুটির কপালে চুমু খেল,
বুকে তেজ নিয়ে বলল—ফিরব, দেশ স্বাধীন করেই ফিরব।
এরপর সপ্তাহ খানেক পর গ্রামে মিলিটারি এলো।
সব লণ্ডভণ্ড করে পুড়িয়ে, জ্বালিয়ে দিল।
বরকত চাচার শেষ সম্বল দোকানটাও পুড়ে ছাই হলো।
হিন্দু পাড়ার সাহসী তরুণী দুর্গাকেও টেনে-হিঁচড়ে সঙ্গে নিল।
গ্রামের মানুষ আতঙ্কে দেশ থেকে দেশান্তরি হলো।
সাহসী তরুণ-তরুণিরা রক্তস্রোতে আগুন জ্বালা ভাষণ শুনতে লাগল—

“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।
এইবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

একে একে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতিন—
শিক্ষিত ছেলে,
যাকে নিয়ে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চোখ স্বপ্ন পটে আঁকা।
সেও যুদ্ধে গেল।
বিধবা রেহানা বেগম সেও যুদ্ধে গেল, নেতৃত্ব দিল।
এরপর মাস কাটল।
মিলিটারিরা আবার এলো, হিংস্র জানোয়ারের মতো চিৎকার করতে করতে।
একে একে সাহসী তরুণদের তুলে নিল।
নদীর ধারে বটগাছের নিচে শুয়ে থাকা পাগল ছকিনাকেও ছাড়েনি,
ছাড়েনি রমেশ পালকেও,
যে কালিমা বলতে গিয়েও বলতে পারেনি।
গ্রেনেড ফাটাল, চোখ উপড়ে নিল, নখে সূচ ফুটাল,
কাটা অংশে লবণ-মরিচ ছিটাল—
বধ্যভূমি তৈরি হলো।
যুদ্ধ চলল নয় মাসব্যাপী।
বাতাসে লাশের গন্ধ,
চারদিকে আহাজারি আর আনন্দের ধ্বনি।
ফিরল স্বাধীনতা, মুক্তি, অধিকার, লাল-সবুজের পতাকা।
কিন্তু ফিরল না সে—
রহমত, রেহানা বেগম, মতিন—
কেউই আর ফিরল না।

আজ বৃষ্টি আসুক
আমি চাই, আজ বৃষ্টি আসুক।
কালো মেঘে ঘনঘটা হয়ে,
এক বৈশাখী ঝড়ের মতো—
এক পালতোলা নৌকার উত্তালে মাতাল হয়ে,
সবকিছু ভাসিয়ে, উড়িয়ে, ধুয়ে-মুছে দিক।
আমি চাই, বৃষ্টি আসুক ভয়ংকর এক রূপে—
গা ভাসিয়ে দিক সমস্ত বিষণ্ণতাকে।
চিহ্ন করে যাক সমস্ত প্রজাতির বাসস্থান,
পেরিয়ে যাক সমস্ত ক্লান্তি, মন খারাপের দেয়াল।
টিনের চালের ঝড়ো শব্দে,
গাছের পাতার টইটম্বুরে,
ল্যাম্পপোস্টের একা, ধীরস্থির নিস্তব্ধতায়—
বৃষ্টিস্নাত রাতে, কোনো এক মোহল্লায়
কয়েকটি কুকুরের চুপসে যাওয়া শরীরে,
ভেসে উঠুক সেই আবহ।
আমি চাই, আজ বৃষ্টি আসুক—
সমস্ত মুমূর্ষু মুখগুলো দূরে সরিয়ে,
স্মৃতিগুলোকে মুছে দিয়ে,
এক নতুন, গন্তব্যহীন পথে নিয়ে যাক আমাকে।
আমি চাই, আজ সত্যিই বৃষ্টি আসুক—
আমার প্রতিটি অনুভূতিকে জড়িয়ে ধরে।

আরও পড়ুন