নজরুলের ‘প্রমীলা’র প্রয়াণ দিবস, জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা…

ড. বুদ্ধদেব বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমীলা-নজরুল গ্রন্থে লিখেছেন—‘আমরা যদি পৃথিবীব্যাপী কবি- সাহিত্যিকদের জীবনীপঞ্জি খুঁজে দেখি, সংগত ভাবেই দেখতে পাব, পারস্পারিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতার মেলবন্ধনে সৃজনীশক্তির অসামান্য বিকাশ ঘটেছে দেশে, দেশান্তরে। যে প্রতিভাটি বিকশিত হল তার আড়ালে নিয়ামক শক্তি হিসাবে রয়ে গেল আরও একটি প্রতিভা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আড়ালের এই শক্তিটি লোকচক্ষুর অগোচরে থেকে যায়। মানুষ তার খোঁজ পায় না কখনো। বহুক্ষেত্রে খোঁজ রাখতেও চায় না। ফলে সংশ্লিষ্ট ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়।’

বিদ্রোহী কবি জনমানসের কবি, ভারতীয় ভাবধারার অন্যতম প্রধান কবি-সারথী কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সাহিত্য পর্যালোচনা করলে আমরা উপরোক্ত সত্য-বীক্ষণে স্থিত হতে পারি। তাঁর ঝঞ্ঝাবহুল ও তীব্র গতিময় জীবনে বড় একটি অংশে দক্ষ কাণ্ডারির মত হাল ধরেছিলেন তাঁর সহধর্মিনী প্রমীলা নজরুল ইসলাম।’— ৩০ জুন প্রমীলা দেবীর প্রয়াণ দিবস উপলক্ষ্যে আরও একবার ফিরে দেখা নজরুলের সহধর্মিনী, সাহিত্যপ্রেমী, সঙ্গীত-অনুরাগী, রুচিশীল প্রমীলা দেবীকে।

তৎকালীন ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জ মহকুমার তেওতা গ্রামে ১৩১৬ বঙ্গাব্দের ১৭ বৈশাখ প্রমীলা দেবী জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাল্য নাম ছিল আশালতা সেনগুপ্ত। ডাক নাম ‘দোলন’ বা ‘দোলনা’। গুরুজনেরা ভালোবেসে ‘দুলি’ নামে ডাকতেন। পিতার নাম বসন্তকুমার সেনগুপ্ত। মাতা গিরিবালা দেবী। চাকরি সূত্রে তাঁর পিতা স্ব-পরিবারে ত্রিপুরায় থাকতেন। প্রমীলা ছিলেন ভারী সুন্দরী। চাঁপার কলির মত ছিল গায়ের রং। মধুর স্বভাবের জন্য তিনি ছিলেন সকলের আদরের। প্রমীলাকে নিয়েই তাঁর বাবা-মার সংসার পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এই সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। হঠাৎ-ই অকালে প্রয়াত হলেন বসন্ত কুমার সেনগুপ্ত। ছোট্ট দুলিকে নিয়ে গিরিবালা দেবীর জীবন সংগ্রাম শুরু হল। তিনি ছিলেন সংগ্রামী নারী। স্বামীর অকাল প্রয়াণে তিনি শোকাতুর হলেও কর্তব্যচ্যুত হননি। তাঁর দেবর ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত কুমিল্লার কোর্ট অব ওয়ার্ডসের ইন্সপেক্টর ছিলেন। গোমতী নদীর তীরে কান্দির পাড়ে তাঁর বাড়ি ছিল। শিশুকন্যাকে নিয়ে এখানেই এলেন গিরিবালা দেবী। শুরু হল জীবনের নতুন অধ্যায়। এই পরিবারের সকলেই বিশ্বাস করতেন দেশকে পরাধীনতার হাত থেকে উদ্ধার করার কাজে সকলকে ব্রতী হতে হবে।

এছাড়াও এই পরিবারে রবীন্দ্র সঙ্গীত এবং কাব্য সাহিত্যের ধারাবাহিক চর্চা ছিল। ইন্দ্রকুমারের স্ত্রী বিরজাসুন্দরী দেবী ছিলেন বিদুষী। তিনি কবিতা লিখতেন। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করতেন। ১৩ই মাঘ, শনিবার, ১৩২৯ বঙ্গাব্দে ধূমকেতু পত্রিকায় বিরজাসুন্দরী দেবীর লেখা মায়ের আশীষ -২ (শ্রীমান কাজী নজরুল ইসলামের প্রতি) নামাঙ্কিত কবিতাটি প্রকাশিত হয়।

ওরে লক্ষ্মীছাড়া ছেলে—
আমার এ বেদন ভরা বুকের মাঝে
জাগিয়ে দিলি নূতন ব্যথা
‘মা’ ‘মা’ ব’লে কাছে এসে
আবার কবে কইবি কথা? (অংশ বিশেষ)

কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সর্বহারা কাব্যগ্রন্থটি বিরজাসুন্দরী দেবীকে উৎসর্গ করেছেন একটি কবিতার মাধ্যমে—

মা (বিরজাসুন্দরী দেবী)র
শ্রীচরণারবিন্দে
সর্বসহা সর্বহারা জননী আমার!
তুমি কোনোদিন কারো করনি বিচার,
কারেও দাওনি দোষ। ব্যথা-বারিধির
কূলে বসে কাঁদো মৌনা কন্যা ধরণীর
একাকিনী! যেন কোন্ পথ-ভুলে আশা
ভিন্ গাঁর ভীরু মেয়ে! কেবলি জিজ্ঞাসা
করিতেছ আপনারে, ‘এ আমি কোথায়?’- (অংশবিশেষ)

মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ – এর কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা‘ থেকেও বিরজাসুন্দরী দেবীর সাহিত্যপ্রীতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়—

‘নজরুলের দৌলৎপুর হতে ফিরে আসার পরে এবং আমার কুমিল্লা পৌঁছানোর (৬ই জুলাই, ১৯২১) আগে সে আরও অনেকগুলি কবিতা লিখেছিল। তার মধ্যে দুটি কবিতার কথা আমি এখানে বলব। এই কবিতা দু’টির সমস্ত কথা শ্রীযুক্তা বিরজাসুন্দরী দেবীর, নজরুল শুধু সেই কথাগুলি ছন্দে গেঁথেছে। তার একটি কবিতার নাম ‘অভিমানিনী’। শ্রীযুক্তা বিরজাসুন্দরীর একটি মেয়ে ছিল খুব অভিমানিনী। অসুখে সে মারা যায়। মরবার কিছুক্ষণ আগেও সে অভিমান করে কথা বন্ধ করেছিল। সেই অবস্থাতেই তার মৃত্যু ঘটে।

অভিমানিনী

ওরে অভিমানিনী!
এমন করে বিদায় নিবি ভুলেও জানিনি।
পথ ভুলে তুই আমার ঘরে দুদিন এসেছিলি,
সকল-সহা! সকল সয়ে কেবল হেসেছিলি!
হেলায় বিদায় দিনু যারে
ভেবেছিনু ভুলবো তারে হায়!
আহা ভোলা কি তা যায়?
ওরে হারা-মণি! এখন কাঁদি দিবস-যামিনী (পূবের হাওয়া)

স্নেহাতুর
[নজরুলকে নিয়েই বিরজাসুন্দরী দেবীর কথাগুলি। সে যে তাঁকে মা ডেকেছিল সে কথা আগেই আমি বলেছি।]

এমন করে অঙ্গনে মোর ডাক দিলি কে স্নেহের কাঙালী।
কেরে ও তুই কেরে, আহা ব্যথার সুরেরে, এমন
চেনা স্বরেরে,-
আমার ভাঙা ঘরের শূন্য তারি বুকের পরেরে,-
কোন পাগল স্নেহ-সুরধুনীর আগল ভাঙালি! ! (পূবের হাওয়া)

ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের কথাও এই প্রসঙ্গে উল্লেখের দাবী রাখে। তিনি ছিলেন গৃহকর্তা। তাঁর পরিবারে ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক সংকীর্ণতার কোনও ঠাঁই ছিল না। তাই পরবর্তীকালে নজরুলও এই পরিবারের সাথে একাত্ম হতে পেরেছিলেন। এইরকম একটি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল প্রমীলার উপর সদর্থক প্রভাব বিস্তার করেছিল। ফয়জুন্নেসা বালিকা বিদ্যালয়ে তাঁকে ভর্তি করেছিলেন গিরিবালা দেবী। ছোট মেয়ের কণ্ঠে রবীন্দ্র সংগীত শুনে সকলেই মুগ্ধ হতেন।

ডঃ সুশীল কুমার গুপ্ত তাঁর নজরুল-চরিতমানস গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন— ‘১৯২১ সালের নভেম্বর মাসে যখন ব্রিটেনের যুবরাজ ভারতে আসেন, তখন নজরুল একবার কুমিল্লায় যান। এই সময় যুবরাজের আগমন উপলক্ষ্যে কংগ্রেসের আহ্বানে সমগ্র দেশব্যাপী হরতাল পালিত হয়। নজরুল কুমিল্লায় প্রতিবাদ-মিছিলে যোগ দিয়ে হারমোনিয়াম কাঁধে ঝুলিয়ে ‘জাগরণী’ গানটি গেয়ে সারা শহর পরিভ্রমণ করেন।’

১৯২২ সালের শেষের দিকে নজরুল আর একবার কুমিল্লায় গিয়ে বেশ কিছুকাল থেকে আসেন। এই সময় বীরেন্দ্র কুমার সেনগুপ্তের ভগিনী প্রমীলার সঙ্গে নজরুলের গভীর প্রেম সম্পর্ক স্থাপিত হয়।

অসহযোগ আন্দলোনের শুরুতেই প্রমীলা স্কুল ছেড়ে ছিলেন। প্রমীলার প্রাণময়তা,স্বাদেশিক মনোভাব,ব্যক্তিত্ব,সঙ্গীতপ্রীতি প্রভৃতি নজরুলকে বিশেষভাবে আকর্ষন করেছিল। ‘বিজয়িনী’ কবিতাটি এই সময় রচিত।’

শুধুমাত্র বাল্যজীবনেই নয়, বিবাহ পরবর্তীতে প্রমীলা দেবী তাঁর সাহিত্যচর্চা অক্ষুণ্ন রেখেছিলেন। খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন— এর যুগস্রষ্টা নজরুল থেকে প্রমীলাদেবীর সাহিত্যচর্চা সম্পর্কে আমরা অবগত হই। তিনি স্মৃতিচারণ করেছেন এইভাবে—‘একদিন আমি হুগলী গেলে কবি আমার হাতে একটি কবিতা দিলেন। গোটা গোটা অক্ষরে মেয়েলী হাতের লেখা কবিতা। বিস্মিত দৃষ্টি মেলে কবির মুখের দিকে তাকালাম। বললাম, ‘কার লেখা এটা?’

তিনি একটু হাসলেন। বললেন ‘তোর ভাবীও যে আজকাল কবিতা লিখতে শুরু করেছেন।’

তিনি নাকি? আনন্দে নেচে উঠলাম। বললাম, ‘এটা কিন্তু আমি সাম্যবাদীতে ছেপে দেব। ’

কবি বললেন, ‘হ্যাঁরে, এজন্যই তোকে দিলাম। ’

কবিতাটি প্রথমে আমি ‘সাম্যবাদী’তে প্রকাশ করি, এর অনেকদিন পর সওগাতের মহিলা সংখ্যায় পুনর্মুদ্রিত হয়। অমরেশ কাঞ্জিলাল সম্পাদিত একটি সাপ্তাহিকেও পুনর্মুদ্রণ করা হয়েছিল। ’

শঙ্কিতা

কেন আজি প্রাণমন বেদনা-বিহ্বল,
কেন আজি অকারণে চোখে আসে জল!
সন্ধ্যায় সমীরণ হু হু করে বয়ে যায়,
রয়ে রয়ে মোর প্রাণ কেন করে হায় হায়!
কোন বেদনায় মম বুক আজি কম্পিত,
কে জানে গো হিয়া মাঝে কত ব্যথা সঞ্চিত!
বেলা শেষে নীলিমায় চেয়ে আছি অনিমিখ্,
কে ছড়ালো বিদায়ের সিন্দুর চারিদিক।
কিছুই বুঝিনা হায় কেন প্রাণ ভারাতুর,
কে দিল হৃদয়ে বেঁধে মল্লার-রাগসুর?
মনে হয়, এ-নিখিলে কেহ নাই, নাই মোর
তুমিও কি বল সন্ধ্যা? কেহ নাই, নাই মোর,
তুমিও কি বল সন্ধ্যা? কেহ নাই,নাই তোর?

তাঁর লেখা আরও একটি কবিতা ১৩৩২ সালে আষাঢ় সংখ্যায় ‘সাম্যবাদী’তে প্রকাশিত হয়।

করুণা

সেই ভালো তুমি যাও ফিরে যাও
মোর সুখনিশি হয়েছে ভোর
সেধে সেধে কেঁদে থাকি পায়ে বেঁধে
ভেঙ্গেছে সে ভুল ছিঁড়িনি ডোর্।।
জনমের মতো ভুলে যাও মোরে
সহিব নীরবে যাও দূরে সরে
করুণা করিয়া দাঁড়ায়োনা দোরে
পাষাণ এ-হিয়া বাঁধিব গো।।
চিরদিন আমি থাকিব তোমার
কাঁদিবে বেহাগ কণ্ঠে আমার
আপনি একলা কত স্মৃতি হার
গাঁথিব ছিঁড়িব কাঁদিব গো।।
প্রাণ নাহি চায় দায়ে ঠেকে আসা
একটু আদর কিছু ভালোবাসা
চাইনা কো আমি ঘুমের কুয়াশা
থাকুক জড়ায়ে নয়নে মোর।।
দোষ করে থাকি ক্ষম মোরে ক্ষম
সুখী হও তুমি প্রার্থনা মম
চাহিনাকো সুখ, ভিখারীর সম
সেই ভালো তুমি হও কঠোর।।

রাঁচি থেকে কাজী অনিরুদ্ধকে লেখা প্রমীলা দেবীর দুটি চিঠি বিশেষ উল্লেখের দাবী রাখে। ‘নিনি’ সম্বোধন করে লেখা এ চিঠি দুটি পড়লেই বোঝা যায় যে–সেই সময় প্রমীলা দেবী তাঁর কনিষ্ঠ পুত্রের উপর কতখানি নির্ভর করতেন। “এই চোখের জলের সঙ্গে নিয়ত প্রার্থনা করছি, তোমার সকল অশান্তি, সব বিঘ্ন দূর হোক। বাবা, হতাশ হয়ো না। কায় মনে ওঁকে স্মরণ কর, যার কৃপায় অলৌকিক ঘটনা ঘটে। আমাদের ব্যাধির জন্যে কষ্ট কোরো না। অনেকদিন গত হয়েছে। এতে প্রাণ ভয় নেই। তুমি ছাড়া শান্তি পাওয়ার আর কিছু নাই জীবনে। তোমাকে ভালো দেখতে না পেলে এই মৃত্যুহীন প্রাণ অসহায় হয়ে ওঠে। আমারই জন্য এবং যাঁর ছেলে তুমি তাঁর প্রতি কর্তব্যবোধে মন কে সবল রাখো। ওঁর অসুখের প্রথম অবস্থায় তোমারই জন্য কেবল ব্যাকুল হতেন এবং তোমার নাম করতেন। ওঁর প্রতি সকলেরই কর্তব্য আছে, কিন্তু যে তার অর্থ না বোঝে তাকে বলা বৃথা।” বিলেত থেকে প্রমীলা দেবী চিঠি লিখেছেন পুত্রবধূকেও। চিঠির প্রতিটি লাইনে ঝরে পড়েছে মাতৃস্নেহ।

শুধুমাত্র প্রমীলা দেবীই নন, প্রমীলা জননী গিরিবালা দেবীও কিছু কিছু সাহিত্য চর্চা করেছেন। তিনি মূলত গল্প লিখতেন, তাঁর লেখা ছোট গল্প অলকা, ভ্রান্তি এবং ঠিক —ভুল, নারায়ণ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। তিনি খুব সুন্দর চিঠি লিখতেন। প্রমীলা দেবীর সাহিত্যচর্চায় তাঁর যে বিরাট ভূমিকা ছিল তা বলাই বাহুল্য।

নজরুলও তাঁর লেখা প্রমীলা দেবীকে দেখিয়ে শান্তি পেতেন, এই প্রসঙ্গে অন্তরঙ্গ আলোকে নজরুল ও প্রমীলা গ্রন্থে আসাদুল হক লিখেছেন —‘প্রমীলার কাছে শুনেছি, কবি যখন যা কিছু রচনা করতেন তা প্রমীলাকে না শুনিয়ে আনন্দ পেতেন না। নজরুলের সৃষ্টি-সুখ, তাঁর আত্মতৃপ্তিবোধ পরিপূর্ণতা পেতো তাঁর স্ত্রীর একান্ত সান্নিধ্যে এসে, তাঁকে কাছে পেয়ে। নজরুল তাঁর জাদুস্পর্শে অমৃতের সন্ধান পেতেন, নিজেকে ধন্য মনে করতেন। সমস্ত কবি হৃদয়ে শান্তির ফল্গুধারা প্রবাহিত হতো, প্রমীলার সান্নিধ্য ও ভালোবাসায়। কবি তাঁর সহজাত প্রকৃতির কারণে এবং ব্যস্ততার দরুন স্ত্রীর প্রতি সার্বিক দায়িত্ব পালনে অনেক সময় ব্যর্থ হলেও, কোনোই অনুযোগ ছিল না প্রমীলার। সবই মুখ বুজে হাসিমুখে বরণ করে নিতেন তিনি।

নজরুল শহরে-শহরে, এমনকি গ্রামে-গ্রামে সভা- সমিতি করে নানা সময়ে নানাভাবে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করতেন। তাই অতি স্বাভাবিক ভাবেই স্ত্রীকে যতটুকু সময় দেবার প্রয়োজন তা কবির পক্ষে দেওয়া সম্ভব হতো না। তবুও তিনি স্বামীর সেবা-যত্নের ও তাঁর জীবনকে সুখময় করে তোলার জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা করতেন।” শুধুমাত্র সাহিত্য-অনুরাগী নন, সঙ্গীতের প্রতি প্রমীলার অসম্ভব ভালোবাসা ছিল। নজরুলের কনিষ্ঠ পুত্রবধূ কল্যাণী কাজীর স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায় – “তিনি যে সঙ্গীত-রসিকা ছিলেন, একথা অনেকেই জানেন। কিন্তু প্রচার-বিমুখ এই মহিলাটি যে সুগায়িকাও ছিলেন একথা অনেকেই জানেন না। একবার বাড়ীতে Tape Recorder কেনা হলে আমরা জোর করে মাকে দিয়ে একটা গান গাইয়ে Tape করেছিলাম। গানটি ছিল কবি গুরুর ‘হায় গো, ব্যথায় কথা যায় ডুবে যায় যায় গো’। সেদিন গানের বাণী, সুর কণ্ঠে একাত্মীভূত হয়ে গিয়ে এক অপূর্ব পরিবেশের সৃষ্টি করেছিল। আমরা অনেকক্ষণ পর্যন্ত কোন কথা বলতে পারিনি। কবির জন্মদিনে কবিকে যেমন শিল্পীরা গান শোনাতে আসতেন, আবার অন্য ঘরে গিয়ে মাকেও গান শুনিয়ে যেতেন। জন্মদিন ছাড়া অন্যদিনেও বহু শিল্পী এসে মাকে গান শুনিয়ে তাঁর মন্তব্য চাইতেন। শ্রবণ শক্তি ছিল খুব তীক্ষ্ণ। বেতারে ছেলেদের কোন অনুষ্ঠানের সামান্যতম ত্রুটিও তাঁর কান এড়িয়ে যেতো না। তিনি বর্তমান আধুনিক গানের বাণীর মধ্যে অসামঞ্জস্য লক্ষ্য করে প্রায়ই আক্ষেপ করতেন। আবার অনেক গানে বাবার গানের সাদৃশ্য দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করতেন।”

ক্রীড়াপ্রেমী নজরুল বাড়িতেও নিয়মিত তাস খেলতেন। সেই খেলার সঙ্গী হতেন প্রমীলাও।

কবি শিষ্য শ্রীযুক্ত নিতাই ঘটকের স্মৃতিচারণা – “সন্ধ্যায় এই বাড়িতে তাসের আসর বসতো। খেলতাম আমি, কবি, কবি-পত্নী (দুলি বৌদি) ও চতুর্থ ব্যক্তি হয় আমার বোন গৌরী, না হয় সুবোধদা (শান্তিপদ সিংহ মহাশয়ের ছোট ভাই) কিংবা কবির জ্যাঠতুতো ভায়রা ভাই। খেলা হতো স্ক্রু কিংবা ব্রে। খেলায় দুলি বৌদিকে ব্রে করার জন্য কবি উঠে পড়ে লাগতেন। বৌদি ব্রে হলে কবি আনন্দে আত্মহারা হয়ে যেতেন। মাঝে মাঝে তিনি নিজেও ব্রে হতেন। সেদিনের আবহাওয়া হয়ে যেত থমথমে। খেলা সেখানেই বন্ধ হয়ে যেত।”

প্রমীলা ছিলেন অত্যন্ত রুচিশীল। পোশাক-পরিচ্ছদ সম্বন্ধে তাঁর খুব রুচিজ্ঞান ছিল। জনাব হুদা তাঁর স্মৃতিচারণের এক পর্যায়ে বলেন, “দীর্ঘ বহু বছর আমি কবির কলিকাতার বিভিন্ন স্থানের বাড়িতে যাতায়াত করেছি। প্রসাধন ও সুন্দর পরিচ্ছদ প্রিয় কবি নজরুল বেশির ভাগ সময়ই গিলা করা শান্তিপুরী ধুতি ও হালকা গেরুয়া বর্ণের সিল্কের পাঞ্জাবি, গলায় চাদর, মাথায় খদ্দরের দোপাল্লা টুপি পরে বের হতেন এবং তাঁর যাত্রার অনেক সময়ই আমি সাথী হতাম। হাসি খুশি চঞ্চল ও ভয়ানক খামখেয়ালি প্রকৃতির কবি নজরুলের সুন্দর পরিচ্ছদ ও প্রসাধনের পিছনে যাঁর অবদান ছিল তিনি হলেন কবি পত্নী প্রমীলা। অপূর্ব সুন্দরী, বিদুষী ও স্বামীভক্তা প্রমীলা নজরুলকে দেখে আমিও মুগ্ধ না হয়ে পারিনি।” কল্যাণী কাজীর লেখাতেও একইভাবে ধরা দেন রুচিশীল প্রমীলা— ‘বাচ্চাদের পোশাক তৈরির ব্যাপারে তিনি এমন নির্দেশ দিতেন যাতে বাচ্চাদের কোন কষ্ট বা অসুবিধে না হয়ে দেখতে সুন্দর হয়। আমাদেরও বলতেন কোন অনুষ্ঠানে কি রকম পোশাক পরে যেতে হয়। পোশাক বা অলংকারের জাঁকজমক তিনি মোটেই পছন্দ করতেন না। তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও মধুর ব্যবহারের জন্য আমরা যারা আত্মীয় তারাই কেবল নয়, বাইরের বহু লোকও তাঁকে মা বলে ডেকে তৃপ্ত হতেন। ছেলেরা প্রায়ই বাড়ি থাকতেন না। কবিকে দেখার জন্য বাঙালী- অবাঙালী বহু লোক আসতেন। তাঁদের আপ্যায়নের সব ব্যবস্থা তাঁকেই করতে হতো। ব্যক্তিত্ব ও দায়িত্ববোধে তিনি ছিলেন অনন্যা।’

প্রমীলা দেবীর অসুস্থতার পর নজরুল বিচলিত হয়ে ওঠেন। সর্বতোভাবে চেষ্টা করেছিলেন তাঁর রোগ নিরাময়ের কিন্তু শেষ পর্যন্ত সফল হননি। বাড়িতে অসুস্থ প্রমীলার প্রতি তাঁর ভালোবাসা অটুট ছিল। তৎকালীন সময়ের অন্যতম নজরুল-সঙ্গীত শিল্পী আঙুরবালা দেবীর স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায় – “কাজীদা যখন কাজে বসতো সময়ের দিকে তাঁর নজর থাকতো না। তবে শেষের দিকে বৌদি অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হবার পর কাজীদা খুব সময় মেনে চলতেন। দরকারী রিহার্সেলও ছেড়ে ছুড়ে উঠে দাঁড়াতেন।” কবি নজরুল না কি বলতেন, “তোমরা কাজ চালিয়ে যাও,আমাকে বাড়ি যেতে হবে, জানো তো তোমাদের বৌদি একা শুয়ে আছেন।” এভাবেই সারা জীবন তাঁরা একে অপরের পাশে থেকেছেন। অসুস্থ অবস্থাতেও সংসারের প্রতি কর্তব্যে অবিচল থেকেছেন প্রমীলা। অসুস্থ কবির প্রতি তাঁর দায়িত্বজ্ঞান ও কর্তব্যবোধ ছিল অটুট। কল্যাণী কাজীর ‘আমাদের মা’ শীর্ষক লেখায় তার অসাধারণ বর্ণনা পাওয়া যায় – “গভীর রাত্রে সবাই যখন সুপ্তির কোলে নিমগ্ন, তখন তিনি একা খেলে চলেছেন হয় লুডো নয় তাস – নয়তো চাইনিজ্ চেকার। উদ্দেশ্য বাবাকে রাতে অতন্দ্র প্রহরীর মত পাহারা দেওয়া। কারণ, বাবা ঠিক একনাগাড়ে ঘুমাতেন না। মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করতেন। তাই মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে মাঝে-মাঝে শুনতে পেতাম ঠক্ ঠক্ করে ঘুঁটির আওয়াজ হচ্ছে আর থেকে-থেকে একটি কণ্ঠস্বর বলে উঠছে ‘এদিকে এসো, বাইরে যেয়ো না। শোনো শুয়ে পড়ো।’ মাকে কোথাও না নিয়ে গেলে বাবাও যেতেন না। আমার স্বামীর মুখে শুনেছি, যখন বাবাকে বিলেতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল – তখন যতক্ষণ না মাকে সাথে নিয়ে যাওয়া হলো ততক্ষণ তিনি এক পা-ও নড়েন নি। মা মারা যাওয়ার পর যখন আমার ভাশুর, বাবাকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে গেলেন তখন যাবার সময় এক করুণ দৃশ্যের অবতারণা হয়। বাবা ও মা একঘরে থাকতেন। ভাশুর যখন বললেন, ‘বাবা,চলো যাই’। তিনি কিছুতেই নড়ছিলেন না। বোধহয় ভাবছিলেন – ‘আমার সঙ্গে চিরদিন যে থাকত, সে কোথায় গেলো!’ অবশেষে হাত ধরে টানতে টানতে তিনি দু’পা এগোলেন বটে – কিন্তু বার বার পিছন ফিরে শূন্য চৌকির উপরে কাকে যেন খুঁজছিলেন। সে দৃশ্য দেখে চোখের জল সেদিন রোধ করতে পারিনি।”

প্রমীলা দেবী সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন যথার্থই বলেছেন – “নজরুলের স্ত্রী হচ্ছেন শান্ত স্বভাবা আর ভদ্র। আজকালকার মেয়েদের সঙ্গে তাঁর তুলনা হয় না। নিজে তিনি শিক্ষিতা, বিদুষী। কিন্তু যে কোন সহজ, অনাড়ম্ভর জীবনের অধিকারিণী গ্রাম্য মেয়েদের মধ্যে ফেলে দিলে ইনি নির্বিবাদে তাঁদের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন। অন্তত আমার স্ত্রীর তো তাঁর সম্বন্ধে এই ধারণা। মাসিমার সাহায্য না পেলে এঁর পক্ষে নজরুলের জীবনকে সুনিয়ন্ত্রিত করা হয়তো কঠিন হতো।” নজরুলের অত্যন্ত স্নেহভাজন শামসুন্ নাহার লিখেছেন – “আমি চট্টগ্রাম থাকতে কবি-পত্নীর সঙ্গে মাঝে মাঝে আমার পত্রালাপ চলত। আজকাল দেখতে পাই, তিনি নাম স্বাক্ষর করেন ‘প্রমীলা নজরুল’, তখন কিন্তু আমাকে লিখতেন ‘তোমার আশা বৌদি’।

এভাবেই কুমিল্লার আশালতা সেনগুপ্ত নজরুলের সহধর্মিনী হয়ে নিজের অজান্তেই হয়ে উঠেছিলেন ‘প্রমীলা নজরুল’।

তথ্য ঋণ:
১) প্রমীলা-নজরুল, ডঃ বুদ্ধদেব বন্দ্যোপাধ্যায়
২) অন্তরঙ্গ অনিরুদ্ধ, কল্যাণী কাজী
৩) কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা, মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ
৪) নজরুল-চরিতমানস, ড. সুশীল কুমার গুপ্ত
৫) বাংলাদেশে নজরুল, সম্পাদনা- রশীদ হায়দার
৬) যুগস্রষ্টা নজরুল, খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন
৭) অন্তরঙ্গ আলোকে নজরুল ও প্রমীলা, আসাদুল হক
৮) নজরুল-স্মৃতি, বিশ্বনাথ দে

সোমঋতা মল্লিক, নজরুল সঙ্গীতশিল্পী ও সভাপতি, ছায়ানট (কলকাতা)

আরও পড়ুন