‘যদি মন কাঁদে, চলে এসো…’

বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে বেশ জোরে—লন্ডনের চিরায়ত পিট পিটে বৃষ্টি নয়, বরিশালের ঝম ঝমে বৃষ্টি। শামীম গান চাপিয়েছে, ‘যদি মন কাঁদে, চলে এসো, তুমি চলে এসো এক বরষায়’। গানটি শুনতে শুনতে দিনপঞ্জির দিকে চোখ গেল। ঝট্ করে মনে পড়ল আজ ১৩ নভেম্বর, কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন।
অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি, সারা জীবনে হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে মাত্র একবার- মধ্য-আশির দশকের কোনো এক বর্ষার রাতে। অথচ পরিচিত হওয়ার বা কথা বলার সম্ভাবনা তো ছিল প্রচুর- দুইজনে দুইদশক ধরে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছি। দুইজনেই টেলিভিশনের সঙ্গে আশির দশকে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলাম। আমার সতীর্থ বন্ধু টুনু আর তার বর ইউসুফ ভাই আবাসিক শিক্ষক হিসেবে প্রতিবেশী ছিলেন হুমায়ূন ও গুলতেকিন আহমেদের শহীদুল্লাহ হলে।
হুমায়ূন আহমেদের মতো ইউসুফ ভাইও রসায়ন বিভাগেরই শিক্ষক ছিলেন। হৃদ্যতা ছিল দু’পরিবারের—হুমায়ূন আহমেদ তাঁর একটি গ্রন্থ উৎসর্গ করেছিলেন টুনু ও ইউসুফ ভাইকে। সুতরাং সুযোগ থাকা সত্ত্বেও হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে কখনও কথা হয় নি—শুধু এক বর্ষণমুখর রাত ভিন্ন।

হুমায়ূন আহমেদ। ছবি: সংগৃহীত
সেদিনও বিকেল থেকে আকাশের অবস্থা খারাপ। ঝম ঝমে বৃষ্টি, থামার কোনো লক্ষণই নেই। বাতাসের তোড়ও কম নয়। রাত ন’টার মতো তখন। আমি নিউমার্কেটের অলিম্পিয়া থেকে রুটি কিনে এক দৌড়ে ওপারের সারিবদ্ধ দোকানের বারান্দা থেকে এপারের বারান্দায় উঠে এসেছি। গায়ের জল ঝারতে ঝারতে হেঁটে এসে দাঁড়িয়েছি বারন্দার মুখে, যেখানে এখন জনা ক’য়েক ফলবিক্রেতা বসেন এবং পাশেই একটি চাট্ বা ফুচকার দোকান আছে। হাত পাঁচেক দূরেই নিউমার্কেটের দ্বিতীয় গেট, যেটা আজিমপুরের গেট বলেই পরিচিত। ওই গেটের বাইরেই বই-সাময়িকীর দোকান আর ওখানেই খালি রিকশার সারি থাকে।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বুঝলাম, দোকান পাট আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, বাতিও নিভে আসছে এ দোকানে-ও দোকানে। তাকিয়ে দেখি, গেটের বাইরে রিক্সার কোন চিহ্নমাত্র নেই। জল জমে গিয়েছে সারা নিউমার্কেটের রাস্তায়। জলের স্রোত প্রায় উঠে এসেছে বারান্দা পর্য়ন্ত। খেয়াল করে দেখলাম যে কোনদিকে কোনো লোকজন নেই। অন্ধকার নেমে আসছে ঘন হয়ে। শীতও লাগছে একটু একটু। হঠাৎ মনে হল, আমি একা, ভয়ঙ্কর রকমের একা।
ঠিক এ সময়েই মনে হলো, কে একজন যেন পাশে এসে দাঁড়ালেন। লোকটির মুখের আগুনের ছোট বিন্দু দেখেই ঠাহর করলাম যে, তিনি সিগারেট ধরিয়েছেন। চোখে সয়ে এলে ছায়ামূর্তিটির দিকে তাকিয়ে বুঝলাম, তিনি হুমায়ূন আহমেদ—তাঁরও হাতে একটি খাম। তিনিও আমার দিকে তাকালেন এবং তাকানোর ভঙ্গিতেই মনে হল, তিনিও আমাকে চিনেছেন।
চুপচাপ দুইজনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছি। হয়ত আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচিত হইনি বলে, কিংবা দুইজনেই মিতভাষী বলে কারও মুখে কোনো কথা নেই। দুইজনেই আকাশের দিকে তাকিয়ে নির্বিকার চিত্তে অবিশ্রান্ত জলধারা দেখেই যাচ্ছি। সিগারেট শেষ করে হতাশ কণ্ঠে তিনিই বললেন, ‘এ বৃষ্টি তো থামবে বলে মনে হয় না’। আমি হেসে বললাম, ‘বৃষ্টি যখন, তখন তো কোন না কোন সময় থামবেই’। আবার চুপচাপ দু’জনেই।
অনেকক্ষণ পরে তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘এরকম বৃষ্টিতে বেরিয়েছেন কেন?’ হাতের রুটিটি দেখিয়ে বললাম, ‘রুটি কিনতে। অলিম্পিয়ার রুটি ছাড়া মেয়েরা খেতে চায়না’। ‘আপনি?’, শুধোই তাঁকে। ‘আর বলেন কেন’, বিরক্তির স্বরে তিনি বলেন, ‘মেয়েরা ছবি দিয়েছিল প্রিন্ট করতে। আজ বিকেল থেকে তাল তুলেছে রাতের মধ্যেই স্টুডিও থেকে নিতেই হবে। নইলে কী আর বেরুই এমন বৃষ্টিতে?, সখেদে বলেন তিনি। তারপর আবার নিস্তব্ধতা—সম্ভবত: দুইজনেই নিজ নিজ বাচ্চাদের মনে মনে আচ্ছা বকা দিচ্ছিলাম।

হুমায়ূন আহমেদ। ছবি: সংগৃহীত
হঠাৎ ঈশ্বর-প্রেরিত দেবদূতের মতো বইয়ের দোকানগুলোর দিক থেকে একটি টিম টিমে বাতির রিকশাকে আসতে দেখা গেল। নিউমার্কেটের মধ্যে রিকশা প্রবেশ নিষেধ, কিন্তু হয়ত বৃষ্টি বলেই কোনো দোকান মালিককে ভেতরে পৌঁছে দেয়ার জন্যে রিকশা ভেতরে ঢুকেছিল। অগ্রসরমান রিকশাকে দেখেই রিকশাচালকের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে আমরা দুইজনেই হই হই করে উঠলাম। রিকশা এসে আমাদের সামনে থাম। দেখলাম, বৃষ্টিতে ভিজে ঠান্ডায়-শীতে রিকসাচালক রীতিমত কাঁপছেন।
রিকশাচালককে বললাম যে, এলিফেন্ট রোডে কাঁটাবনের কাছে আমাকে নামিয়ে দিয়ে তিনি হুমায়ূন আহমেদকে শহীদুল্লাহ হলে নিয়ে যেতে পারবেন কিনা। রিকশাচালকের সাফ জবাব —এই বৃষ্টিতে তিনি দুইজায়গায় যাবেন না, এক জায়গায় যাবেন। আমাদেরকে ঠিক করতে হবে, কে যাবো।
‘আপনিই যান’, হুমায়ূন আহমেদ বললেন। ‘না, আপনিই রিকশাটি নিয়ে নেন। এ্যলিফেন্ট রোড কাছে। আমি রিকশা পেয়ে যাব।শহীদুল্লাহ হলের দিকে রিকশা পাওয়া যাবে না’। দ্বিরুক্তি না করে হুমায়ূন আহমেদ রিকশায় উঠে বসলেন। প্লাস্টিকের পর্দাটা গায়ের ওপরে বিছাতে বিছাতে আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, ‘আপনি যে ভালো ডিবেটার ছিলেন, ভুলেই গিয়েছিলাম। যুক্তি-তর্কের মানুষ’। হাত তুললেন তিনি। আমিও প্রত্যুত্তর দিলাম। জলে ঝর্ ঝর্ শব্দ তুলে রিকশা চলে গেল।
সে রাতের ঘটনার পরও আমি সাত বছর ঢাকায় ছিলাম। কিন্তু আশ্চর্য্যের ব্যাপার হলো, আমরা আর কখনো মুখোমুখি হই নি—না বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে, না টেলিভিশন ভবনে, না সভা-সমিতিতে। কোথাও না।আর কখনোই তাঁর সঙ্গে আমার কথা হয় নি। কেউ কোথাও ছিল না।
প্রায়শ:ই লোকজন আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি কি হুমায়ূন আহমেদকে চিনতেন?’ আমি বড় বিপাকে পড়ে যাই এ প্রশ্নে। ‘চিনতাম’, এ কথা তো বলা যাবে না। চেনার জন্যে যে জানা-শোনা প্রয়োজন, তা’ তো আমাদের ছিল না। কিন্তু এ কথাই বা কি করে বলি, ‘না, তাঁকে চিনতাম না’। চার দশক আগে এক বর্ষণমুখর রাতে তাঁর সঙ্গে তো আমার পরিচয় হয়েছিল।
টের পাই শামীমের চালিয়ে দেয়ার গানের শেষ লাইন শোনা যাচ্ছে— ‘যদি মন কাঁদে, চলে এসো, তুমি চলে এসো এক বরষায়’। না, হুমায়ূন আহমেদ আর চলে আসবেন না, ফিরে আসবেন না কোনো বরষাতে— ঐ যে অমিয় চক্রবর্তী লিখেছিলেন, ‘কেঁদেও পাবে না তাঁকে বরষার এই জলধারে’।
ড. সেলিম জাহান : বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষক
