পাদুকা সম্রাট আর ভ্রমণ সম্রাজ্ঞীর  ‘শুভযাত্রা’

জীবন ফুরাইয়া যাইতেছে। কত দেশেই গেলাম, ইউরোপ দেখা হইলো না। শিল্প সভ্যতা ও সংস্কৃতির আতুর ঘর ইউরোপ মহাদেশ দর্শন না করিলে জীবন যে বৃথা। ‘আমার সাধ না মিটিল আশা না ফুরিল সকলি ফুরায়ে যায় মা…।’ গান গাই আর গভীর রাতে ঘুম ভাঙিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলি। দেয়ালের টিকটিকি টিকটিক করিয়া আমার সমব্যথি হয়। ইহার চাইতেও বড় কথা আমার বন্ধু রোকেয়া বেগম যে কীনা ফেল করিতে  করিতে শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করিয়াছে।  দেখা হইলে যে এখনো  নাকি সুরে বলে- ‘রুমু, ক্যারম আছো? তাহারেও ফেসবুকে দেখিলাম ইউরোপে যাইয়া সাহেবি পোশাকে রং ঢং ছবির বন্যা বইয়া দিয়াছে। মনের কষ্ট মনে চাপিয়া ওর পোস্টে ‘‘লুকিং গ্রেট, অসাম, এমেযিং কমেন্ট করি। একসময় আমার মন বিদ্রোহ করিয়া উঠিল। রমনাপার্কে পিকে ফেসবুকিং করিয়া কত আর ইজ্জত রক্ষা যায় আপনারাই বলুন!!

বইয়ের পাতায় সর্বক্ষণ মুখ গুঁজিয়া থাকা গৃহকর্তাটির মুড বুঝিয়া একদিন তাকে ইউরোপ যাইবার অভিলাস ব্যক্ত করিলাম। নো রিয়েকশন নো চ্যাদবেদ। তবে পরদিন প্রত্যুষে সে  ‘হাত ধরে নিয়ে চল সখা আমি যে পথ চিনি না…’ এই ভাব লইয়া তাহার পাসপোর্টখানি আমার হাতে তুলিয়া দিলেন। আর আমিও ‘ওগো যা পেয়েছি সেইটুকুতেই খুশি আমার মন’ গাইতে গাইতে  আহলাদে আটখানা হইয়া গেলাম। আটঘাট বাঁধিয়া টুর প্যাকেজ, ভিসা, টিকেট, হোটেল বুকিয়ের কাজ শুরু করিয়া দিলাম। 

যাত্রার দিন ঘনাইয়া আসিল। বেড়ানোর বাজেট কষিতে যাইয়া এই মধ্যবিত্তের হিসাবি মন খচখচ করিয়া উঠে প্রায়শ।  ইহা ছাড়া নানা রকমের ঝুট ঝামেলা তো আছেই।

আমার অস্থির ছ্যাড়াব্যাড়া অবস্থা দেখিয়া বাসার রেহানা বুয়া গম্ভীর হইয়া একদিন বলিল ‘খালাম্মা, এত পেরেশানি কইরা,  পয়সা খরচ কইরা মাইনশ্যে কিয়ের লাইগ্যা বিদেশ যায়,  ওইহানে কি দেহে ? প্রশ্নটা তো বেশ যুক্তিযুক্ত!  কিছুক্ষণ চুপ থাকিয়া ফিসফিস করিয়া নিজ মনে বলি,‘ পিপাসা -রে পিপাসা।  রেহানা তাড়াতাড়ি পানি নিয়া আসে। দেখিয়া সত্যিই তেষ্টা পাইল। গ্লাসে চুমুক দিয়া বলি এটা সেই পিপাসা নারে পাগলা। এটা  ‘ভ্রমণ পিপাসা’। এ বড় সাংঘাতিক ব্যারাম।

রাতের এমিরেটস ফ্লাইটে শুরু হইবে মহাকাঙ্খিত ভ্রমণ। দুপুর নাগাদ বাসায় ফিরি কাজ হইতে। তড়িৎ গতিতে সংসার গুছাইয়া, লাইট ফ্যান গ্যাসের চুলা, জানালা দরজা বন্ধ করিয়া, ড্রাইভার বুয়া দারোয়ানের পাওনা বুঝাইয়া দিয়া মোটামুটি প্রস্তুত আমি। তখনই খেয়াল হইল আরে আমার ভ্রমণসঙ্গী মানে গৃহকর্তাটিকে দেখেতিছি না? সে কী অফিস হইতেই ফিরেনি? রাত সাড়ে ১০ এ রিপোর্টিং। এখন বাজে সাড়ে আট। তাহাকে ফোন করিলাম। বলিলেন শান্তিনগর বাজারে আছি। শেষ মুহুর্তে দরকারি কেনাকাটা কিছু থাকিতেই পারে-এই ভাবিয়া বিরক্ত মনকে সান্ত্বনা  দিলাম। মিনিট ১৫ পর তিনি এলেন ধীর পায়ে। হাতে বাদামি কাগজ মোড়া একখানা পোটলা। টেবিলে রাখিয়া বলিলেন,  আম কিনিয়া আনিয়াছি। কাল তো চলিয়াই যাইব। ইউরোপে এই আম পাইব কই, খাইয়া যাই।

কাল মানে!!  ফ্লাইট তো আজ, মাত্র কয়েক ঘণ্টাপর । কী বলিব ভাবিয়া পাইতেছিলাম না।  অন্তত একখানা আম যদি সেই মুহুর্তে মাথা বরাবর ঢিল মারিতে পারিতাম!  নিজেকে সংবরণ করিয়া বলিলাম- বিমানের টিকিটখানি যে তোমাকে দেয়া হইয়াছিল তাহা কি দেখিয়াছিলা? মহারাজ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলিলেন, ‘দেখিয়াছি, কাল রাতে ফ্লাইট।’  আমি মোবাইল অন করিয়া টিকিটখানি দেখাইলাম। 

একটু বুঝি তিনি হকচকাইয়া গেলেন। বেশ দ্রুতই তৈরি হইলেন । উবার আসিয়া গিয়াছে। মালপত্তর লইয়া উহাতে উঠিয়া বসিতেই ক্যাড় ক্যড় শব্দ করিয়া গাড়ি একনার থামে আবার স্টার্ট  নেয়। নানান কসরতের পর গাড়ি মশাইয়ের অভিমান ভাঙিয়া। চলিতে শুরু করিলাম। কিছু দূর যাইতেই মনে পড়িল অহোহ ফোনের চার্জার তো  ফেলাইয়া আসিয়াছি। গাড়ি ঘুরাইয়া বাসা হইতে উহা আনিয়া নিলাম। ‘শুভ যাত্রা’ বটে।

এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কল্যাণে দ্রুতই আমরা এয়ারপোর্ট  পৌছাইলাম।  ত্রস্তে বোর্ডিং করিয়া ইমিগ্রেশনে ঢুকিয়া যাইব। তখনই আমার ভ্রমণসঙ্গীর পিঠখানি হালকা বোধ হইল। তাহার মনে পড়িল পিঠের ব্যাকপ্যাকটি নাই। ছুটিয়া গেলেন খুঁজিতে। মিনিট দশেক পর অলিম্পিকে জিতিবার আনন্দ  লইয়া হাঁপাইতে হাঁপাইতে হাজির হইলেন ব্যাগটি লইয়া।  স্ক্যানিং মেশিনের উপর ফেলিয়া চলিয়া আসিয়াছিলেন। পাপী মন আমার বলিয়া উঠিল ‘ব্যাগখানা হারাইলেই বেশ হইত, শিক্ষা হইত। আপনাদেরকে বলি এই কথাটি যেন আবার আমার আলভোলা গৃহকর্তাটির কানে পৌছাইয়া গৃহশান্তি নষ্ট না করেন।

যাত্রা শুরুর নানা বিড়ম্বনায় মাথাখানি গুলিস্তানের জ্যামের মত থমথমাইয়া আছে। এয়ারপোর্টের ফর্মালিটি শেষ করিয়া বলাকা লাউঞ্জে ঢুকিলাম। হালকা কিছু পেটে চালান করিয়া হাসি হাসি মুখে ভ্রমণসঙ্গীকে প্রায় জড়াইয়া ধরিয়া একখানি সেল্ফি তুলিলাম। ‘Off to Copenhagen…’ একটা স্ট্যটাস এই মুহুর্তে না দিলেই নয়! !

হঠাৎ বাতাসে ভাসিয়া আসিল – this is last call for Maliha Parveen …Mustain billah…’  খিচিয়া দৌঁড় দিলাম এই দুই পৌঢ় জুটি।

এক কর্মকর্তা প্রায় এক প্রকার ঠ্যালিয়া আমাদেরকে বিমানের উদরে ঢুকাইয়া দিলেন।

গাদাগাদি চিপাচাপি ঠেলিয়া, প্যাসেঞ্জারদের বিরক্ত চেহারা  হজম করিয়া বরাদ্দকৃত আসনে বসিলাম। ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করিয়া কেদারাটি  আমায় সমেত একদিকে কাইত হইয়া গেল। এ কী! আমার অতি ওজনের ফলাফল ভাবিয়া লজ্জিত বদনে বাকিয়াই  বসিয়া রইলাম । বোধকরি  ধবধবে  ফর্সা লাল ঠোঁট লাল টুপির এয়ার হোস্টেসের সাথে কথা বলিবার ছুঁতা পাইল আমার ভ্রমণসঙ্গী।  তিনি করিতকর্মা হইয়া উঠিলেন।  সেই এয়ারহোস্টেসকে ডাকিয়া আনিয়া বিকল্প আসনের ব্যবস্থা করিলেন।

আমার ক্লান্ত দেহখানি সঁপিয়া দিলাম তাহার কোলে।  ভুল বুইঝেন না। প্লেনের সিটের কোলে বসিবার কথা বলিতেছি।

যাত্রার শুরুতে এত বাঁধা! সামনে না জানি আরো কত বিড়ম্বনা!  খানিক শঙ্কিত হইলাম বইকি। বিশাল বপুর উড়োজাহাজখানি নড়িতে চড়িতে লাগিল । ভ্রমণসঙ্গী স্বহস্তে আমার সিটবেল্টটি লাগাইয়া দিলেন। মন আমার নাচিয়া উঠিল। কী যত্ন কী যত্ন! চোখ বুজিয়া আসিল আবেগে।

তখনই আমার মহারাজার কন্ঠস্বর শুনিলাম। তাকাইয়া দেখি সে তাহার স্কন্ধের ব্যাগখানি ডাল ঘুটিবার মতন  ঘাটিতে ঘাটিতে  বলিতেছেন ‘ আরে, আমি তো আমার ক্রেডিট কার্ডখানি বোধকরি বাসায় ফেলিয়া রাখিয়া আসিয়াছি… ।’

মারহাবা মারহাবা! ইউরোপে কার্ড ছাড়া এক পাও যে  আগোনো যায় না। কী বলিব, কী করিব বুঝিয়া পাইতেছিলাম না।  ইচ্ছা করতেছিল প্লেনের জানালাখানি ভাঙিয়া ধাক্কা দিয়া ফালাইয়া দেই পাশের এইজনটিকে।

যাক!  এই অপূর্ণ  ইচ্ছা লইয়াই শুরু হইলো ১৫ দিনের ইউরোপ যাত্রা । Morning shows the day…’ বাক্যটিকে মিথ্যা প্রমাণিত করিয়া  এবারের ভ্রমণটি অবশেষে ভালো মন্দ নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়া সমাপ্ত হইয়াছিল।  সেইসব গল্প না হয় আরেকদিন হইবে।

আরেকটা কথা।  আমার এই ভ্রমণসঙ্গী সে অর্ধাঙ্গী প্রেমি না হইলেও প্রচণ্ড  পাদুকাপ্রেমী। মানে পৃথিবীর যেখানেই যাইবেন সেখান হইতেই তাহাকে পাদুকা সংগ্রহ করিতে হইবে। এই জোশে ইউরোপ হইতেও তিনি প্রায় ডজন খানেক পাদুকা ক্রয় করিয়া ফেলিলেন। কিন্তু সংকীর্ণ মনা সুটকেসে ইহাদের স্থান মিলিল না। পিঠব্যাগে ঝুলাইয়া বিশাল জুতার বোঝা নিয়া ‘ আমি এক যাযাবর’ ভাব করিয়া বয়স্ক এক লোক হাটিতেছেন  ইউরোপের পথে পথে। সে এক দৃশ্য বটে!  তা দেখিয়া ইউরোপবাসী আমার ভাস্তি নাম দিয়াছে ‘পাদুকা সম্রাট।’ তবে এই পাদুকাসম্রাট  ভ্রমণসঙ্গী হিসেবে যতই বিড়ম্বনার কারণ হউক না কেন পাদুকা সম্রাটের ‘ ভ্রমণ সম্রাজ্ঞী’ হইয়া আমি বাকি জীবন তাহার সাথে ভ্রমণ করিতে চাই । গাহিতে চাই- ‘চল না ঘুরে আসি অজানাতে, যেখানে নদী এসে মিলে গেছে…’

 কারণ কি জানেন? গোপনে বলি। এমন নিবেদিত প্রাণ বেতন ছাড়া ক্যামেরাম্যান আর কোথায় মিলিবে বলেন !

আরও পড়ুন