ভালোবাসাকে কোনো ভাবেই সংজ্ঞায়িত করা যায় না

গল্পকার মাসুম বিল্লাহ খুলনায় জন্মগ্রহণ করেছেন। ছেলেবেলা থেকে লেখালেখির সঙ্গে জড়িত। এক সময়ে ম নামে একটি ছোট কাগজ সম্পাদনা করতেন। এখন পর্যন্ত ৭টি বই প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম বই ফিচারধর্মী (২০১৩), মেঘের শাড়ি পরা মেয়ে, কিশোর উপন্যাস ভূতু (২০১৫), উপন্যাস অবুঝ সেফটিপিন (২০১৬), গল্পগ্রন্থ প্রেম অথবা ঘুমের গল্প (২০১৭), গল্পের বই পিঙ্গল প্রেম ও কিশোরগল্পগ্রন্থ ডানা ভাঙা সাইকেল (২০২০) , গল্পগ্রন্থ একটা দুপুর মরে গেল (২০২১), কিশোর উপন্যাস আবারও ভূতু ও গল্পগ্রন্থ মহামারির কষ্টপুরাণ ও অন্যান্য গল্প ( ২০২৪)। মাসুম বিল্লাহর সঙ্গে আলাপচারিতায় আবদুস সোবাহান বাপ্পী।
● আবদুস সোবাহান বাপ্পী : প্রকৃত আপন কে এবং কারা?
●● মাসুম বিল্লাহ: ব্যক্তির প্রথম এবং একমাত্র আপন সে নিজে। দুধের শিশুও আপন সুবিধা-অসুবিধা বোঝে। ওয়া ওয়া…ট্যাঁ ট্যাঁ করে ওঠে। এরপর আপন বলতে তারাই যাদের সঙ্গে সে রাত্রিযাপন করে। ভেঙে বললে বলা যায়- পরিবার। তবুও এখানেও স্বার্থ আর দ্বন্ধের খেলা চলে। এরপর চলার পথে ক্ষণিকের পরিচয়ও মানুষ মানুষের আপনজন হয়ে ওঠে।
● প্রশ্ন: সৃষ্টি এবং স্রষ্টা সম্পর্কে…
●● মা. বি.: ভূগোল সম্পর্কে আমার জ্ঞান শূন্যের কোটায় ছিল কিছুদিন আগেও। এব্যাপারে আমাকে অশিক্ষিত বলা যেতে পারে। পৃথিবী যে শূন্যের ওপর ভাসছে এ কথাও সুবাইতার আম্মু না-বললে হয়ত আমার জানাই হত না! হা হা হা… তাই আমি অবাক হই, মহাবিশ্বে একমাত্র পৃথিবীতেই প্রাণের অস্তিত্ব! কেন? শুরুটা কীভাবে! আমি তল পাই না। আবার প্রাণের বিনাশ দেখেও খারাপ লাগে। তবে সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়, বিনাশ না-হলেও তো জায়গা সংকুলান হত না। একে অন্যের ওপর বিরক্ত হয়ে পড়ত মানুষ। তাই সৃষ্টির নিয়ম নিয়ে আমার দ্বিমত নেই। ধরে নিই, কারণ, অবিশ্বাস করার মানে হয় না, আমি মনে করি, অবিশ্বাস করে মরার চেয়ে বিশ্বাস করে মরা ভালো। লাভ-ক্ষতি নিয়ে ভাবি না।
● প্রশ্ন: মনুষ্য ধর্ম কেমন? মানুষের প্রয়োজনে আমরা অনেক জীবকে হত্যা করি, যেমন-গাছ, কিছু পশু-পাখি ইত্যাদি, এটা ঠিক আছে, কিন্তু বিলাসিতার জন্য অন্য সৃষ্টিকে হত্যা করা, ধবংস করাকে ধর্মের অংশ মনে করেন?
●● মা. বি.: সৃষ্টার সব সৃষ্টিকে ভালোবাসতে হবে, মানুষে মানুষে বিভেদ থাকবে না, মানুষের মঙ্গল, ভালোবাসাই মনুষ্য ধর্ম। তারপর সমস্ত মানুষই একজন সৃষ্টার আরাধনা করবে। প্রেমে মশগুল থাকবে।
আমরা প্রতিদিন মাছ খাই, কেন খাই? জীবনধারণের জন্য। মাছ কি খায়? পুকুর-নদীর ক্ষুদ্র জীব। জীববিজ্ঞানের বাস্তুসংস্থানে বিষয়টির বিস্তারিত আছে। একটা মাছের আয়ু কতদিন হলে তার জন্য ভালো হত? মানুষ সৃষ্টির সেরা তবুও তার আয়ু বড় কমই। এখানেই সৃষ্টির রহস্য। যদি মানুষ মাছ শিকার না-করত, না-খেত তাহলে পুকুর-নদী মাছে টইটুম্বুর হয়ে যেত। ঠিক সেকারণেই সব প্রাণেরই একটা আয়ুরেখা আছে। তবে অযথা শিকার করা পাপ। কখনো কখনো একটা প্রাণীর প্রতি মায়াবশত তাকে ছেড়ে দেওয়া, একটা মা-মাছ না-ধরা, তাকে ছেড়ে দেওয়াও মানুষের ধর্ম হওয়া উচিত।
● প্রশ্ন: লিখেন কেন?
●● মা. বি.: কী এমন লিখি? কী লিখি? কতটুকু লিখি? বছরে হাতেগোনা কয়েকটা গদ্য লিখে লেখক মনে করাই বোকামি। দেখতে হবে আমার এ লেখা কাউকে টানে কিনা, আলোড়িত হয় কিনা, আলোচিত কিনা, সমাজ, দেশ নড়েচড়ে বসে কিনা! আমার জানা মতে, এমনটি হয় না। তারপরও গোড়া থেকে বলতে গেলে বলল, অন্যকে দেখে লিখতে মন চাইল, নিজের চিন্তা-ভাবনার প্রকাশ করতেই লেখার শুরু। এখন লিখি অন্য কোনো কাজ পারি না বলে, কাজ করতে মন চায় না বলে, আমি ১ নম্বর অলস বলে; ফাঁকিবাজি যাকে বলে!
● প্রশ্ন: ফাঁকিবাজি ছাড়েন ভাই। আপনমনে লিখেন যান। ধরে নেন, শুধু নিজের ভালোলাগার জন্য লিখছেন, নিজের জন্যই লিখছেন। আমি বিশ্বাস করি, যা কিছু নিজের জন্য, তা অবশ্যই মানুষের জন্য কোনো না কোনো ভাবে। সুতরাং লিখেন। কখনো এর সুফল পাবেন।
●● মা. বি.: লেখায় ফাঁকি দেই না। যত ফাঁকি নিজেকেই দেই। বই বের না-হলে মন তো একটু খারাপ হয়-ই। যেখানে প্রতি বছর হাজার হাজার বই বের হচ্ছে। সেখানে মাসুম বিল্লাহ বই না-থাকলে কেমন দেখায়! হা হা হা। তবে মন খারাপ হয়েছে ১ মিনিটের জন্য। তারপর সব স্বাভাবিক। না, আমার লেখার ভবিষ্যৎ নিয়ে মোটেও ভাবি না। আমি চাই, আমি মরে যাওয়ার পর থেকেই আমার সব লেখা মাটিচাপা পড়ে যাক। নতুন কোনো এক মাসুম বিল্লাহ জন্ম হোক। তার লেখা সবাই পড়ুক। এইভাবে চলছে পৃথিবী। সবই অস্থায়ী। মাটি ছিলাম। মাটি হয়ে যাব। নো টেনশন।
● প্রশ্ন: জীবিকার ব্যাপারে বলুন…
●● মা. বি.: আমার ভাবনা নেই। কিন্তু চারপাশ বলে, তুমি স্বার্থপর! বাপের ঘাড়ে, সুবাইতার আম্মু ঘাড়ে বসে খাই। মাঠের কাজ কখনো করিনি, কিন্তু ফসল ফলাতে ইচ্ছে করে, একটা বইয়ের দোকানে বসে মানুষের আসা-যাওয়া দেখতে ইচ্ছে করে। আয় করার কোনো বুদ্ধি আমার শেখা নেই, জানা নেই। ভাগ্যের দোষ দিই না। আমি কেমন যেন! ফালতু।
● প্রশ্ন: যা কিছু অপ্রিয়…
●● মা. বি.: টিকটিকি ও সাপের ছবি দেখলেও খারাপ লাগে। কথা দিয়ে না-রাখা। সময়জ্ঞানে হেরফের হলে। কেউ মিথ্যে বলে ফাঁসালে। বাংলা বানানে কেউ ভুল করলে। রিকশায় বসে কেউ তার প্রেমিকা অথবা বউয়ের কোমর জড়িয়ে ধরে রাখলে। নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনকে নিয়ে কেউ ভিন্ন কিছু মানে বাজে কিছু বললে আমার খারাপ লাগে। আরও আছে, এখন আর মনে পড়ছে না…
● প্রশ্ন: ভালোবাসা কত বড়? আরেকটু বিস্তারিত বললে-ভালোবাসা কী শুধু পরিবার, পশুপাখির মধ্যে সীমাবদ্ধ?
●● মা. বি.: ভালোবাসাকে কোনো ভাবেই সংজ্ঞায়িত করা যায় না। এর পরিধিও মাপা যায় না। ভালোবাসা নানা রংয়েরই হয়।
