একবার হলেও ‘আমাদের খনজনপুর’-এ ঘুরে আসা উচিত

কবি ইমতিয়াজ মাহমুদ ‘আমাদের খনজনপুর’ নিয়ে বলেছেন—
❝শহর নিয়ে পৃথিবীতে অনেক সেরা উপন্যাস হয়েছে। এমন প্রয়াস বাংলা ভাষায়ও একাধিক আছে। কিন্তু তাদের কোনোটিই ‘আমাদের খনজনপুর’-এর সাথে তুলনীয় নয়। এটি এই ধারায় বাংলাতো বটেই, বিশ্ব সাহিত্যেরই সবচেয়ে জীবন্ত উপন্যাস। পৃথিবীতে যতদিন মফস্বল শহর থাকবে, ততদিন এই উপন্যাসটি থাকবে। আমাদের তুচ্ছ আর দৈনন্দিন দীর্ঘশ্বাসগুলিকে চিরকালীন করে ‘আমাদের খনজনপুর’ থাকবে।❞
আমাদের খনজনপুরের শুরুটা যেভাবে…
“আমার বয়স যখন সতের, তখন আমি রেবেকার প্রেমে পড়ি। রেবেকারা আমাদের পাশের বাসায় থাকত। ও তখন ক্লাস নাইনে।”
এই শুরুটা যতটা সরল, তার ভেতরের পৃথিবী ততটাই বিস্তৃত। সতেরো বছর বয়সের প্রেম, কিশোর মনের অসহায়ত্ব, ছোট শহরের অলিগলি, পাশের বাড়ির মানুষ, বন্ধুত্ব, সম্পর্ক, অভিমান, স্বপ্ন—সবকিছু মিলিয়ে খুব অচেনা কোনো জগৎ নয়, বরং মনে হয় বহুদিন আগে ফেলে আসা নিজেরই কোনো শহরে ফিরে গেছি।
ছোটবেলায় আমরা যে শহরে থাকতাম, তার নাম খনজনপুর। ছোট শহর, সুন্দর ও মায়াময়, রোদ আর ছায়ামাখা। আমাদের পাড়ার নাম রোদভাঙা হলো কেন, তা আমরা কেউ জানি না।
এই জায়গাগুলো পড়তে পড়তেই মনে হয়, খনজনপুর আসলে শুধু একটি শহরের নাম নয়। আমাদের প্রত্যেকেরই ভেতরে কোথাও না কোথাও একটি খনজনপুর আছে। সেখানে আছে শৈশব, কৈশোর, প্রথম বন্ধুত্ব, প্রথম প্রেম, প্রথম হারানোর কষ্ট, বিকেলের মাঠ, নির্জন রাস্তা, পরিচিত মুখ আর এমন কিছু মানুষ, যাদের অনেক বছর পরও ভুলে যাওয়া যায় না।
রেবেকার একটি কথা আজও মনে দাগ কেটে থাকে—
“সংসার করতে-করতে একটা সময় এসে কী হয় জানো? স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটা ভাইবোনের মতো হয়ে যায়।”
আরও বলেছিল, “একটা সময় স্বামী-স্ত্রী দুজন দুজনের কাছে একটা অভ্যাস মাত্র।”
উপন্যাসের অনেক কথাই হয়তো পড়ার সময় শুধু গল্পের অংশ মনে হয়। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু বাক্যের অর্থ বদলে যায়। কিছু কথা বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসে আমাদের নিজেদের জীবন, সম্পর্ক আর স্মৃতির সামনে দাঁড় করায়। ‘আমাদের খনজনপুর’ আমার কাছে তেমনই একটি বই।
একসময় এক বসায় আস্ত একটা বই পড়ে শেষ করে ফেলতাম। এখন ব্যস্ততা বেড়েছে, চারপাশে স্ক্রিন বেড়েছে, পড়ার টেবিলে বইয়ের বদলে নানা রকমের কাজ এসে বসেছে। ফলে একসময় টানা পড়ে ফেলার অভ্যাসে জং ধরেছিল। তবু নিজেকে কথা দিয়েছিলাম—আবার একদিন বসব, আবার পড়ব, আবার কোনো বইয়ের ভেতর হারিয়ে যাব। অবশেষে সেই কথাটা রাখতে পেরেছি। আবারও এক বসায় ‘আমাদের খনজনপুর’ ঘুরে এলাম। হ্যাঁ, পড়লাম না—ঘুরে এলাম।
কারণ কিছু বই পড়তে হয় না, সেখানে যেতে হয়। কিছু উপন্যাস কেবল গল্প বলে না, আপনাকে আপনারই অতীতের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। ‘আমাদের খনজনপুর’ তেমন একটি উপন্যাস।
স্মৃতির পুকুরে আমরা সবাই একবার না একবার ডুব দিতে চাই। পুরনো বন্ধুদের কথা মনে পড়ে, হারিয়ে যাওয়া দুপুর মনে পড়ে, স্কুলের রাস্তা মনে পড়ে, পরিচিত কোনো গলি মনে পড়ে, এমনকি বহুদিন ভুলে থাকা কারও মুখও হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
এই উপন্যাস পড়তে পড়তে হয়তো আপনারও এমন কোনো মুখ মনে পড়বে। কোনো বন্ধুর কথা। কোনো অসমাপ্ত সম্পর্কের কথা। কোনো বিকেলের কথা। কিংবা এমন কোনো সময়ের কথা, যখন জীবন এত জটিল ছিল না, অথচ দুঃখগুলো ছিল অসম্ভব সত্যি। বুকের ভেতর একটা হাহাকারও উঠতে পারে।
বর্তমানের সঙ্গে অতীতকে মেলাতে গিয়ে বুঝতে পারবেন—মানুষ বদলায়, শহর বদলায়, রাস্তা বদলায়, সম্পর্ক বদলায়; কিন্তু স্মৃতির ভেতরে কিছু জায়গা থেকে যায় ঠিক আগের মতো। সেখানে বয়স বাড়ে না। সেখানে আমরা এখনও সেই কিশোর, যে বিকেলে বন্ধুর সঙ্গে বেরিয়েছে; এখনও সেই ছেলে বা মেয়ে, যে প্রথমবার প্রেমে পড়েছে; এখনও সেই মানুষ, যার পৃথিবীটা একসময় ছিল অল্প কয়েকজন মানুষ আর কিছু ছোট ছোট স্বপ্নে ভরা।
এই জায়গাতেই ‘আমাদের খনজনপুর’ আমার কাছে খুব আলাদা একটি বই।
এটি শুধু একটি মফস্বল শহরের গল্প নয়। এটি আমাদের বেড়ে ওঠার গল্প। আমাদের ছোট হয়ে যাওয়ার গল্প। আমাদের হারিয়ে ফেলা সময়ের গল্প। আমাদের তুচ্ছ, সাধারণ, দৈনন্দিন জীবনযাপনের ভেতরে জমে থাকা অসংখ্য অনুভূতির গল্প।
ফরাসি দার্শনিক জ্যাক দেরিদার একটি বিখ্যাত ভাবনা—পাঠের বাইরে কিছুই নেই। আর আমিও আমার মতো করে বলতে চাই, বই হোক আত্মার আত্মীয়।
কারণ ভালো বইয়ের সঙ্গে দেখা হলে শুধু একটি গল্প জানা হয় না; নিজের ভেতরের কিছু দরজাও খুলে যায়। আমরা নিজেদের অন্যভাবে দেখতে শিখি। অতীতকে নতুন করে ভাবি। মানুষকে একটু বেশি বুঝতে শিখি।
তাই ‘আমাদের খনজনপুর’ শুধু পড়ার বই নয়, একবার ঘুরে আসার মতো একটি জায়গা।
মাসে না হোক, বছরে অন্তত একবার তো মানুষ গ্রামে বেড়াতে যায়। নিজের শৈশবের বাড়িতে যায়। পুরনো পরিচিতদের খোঁজ করে। তাহলে বছরে একবার খনজনপুরে যাওয়া যাবে না কেন?
আমার মনে হয়, যাবে।
বরং আমাদের প্রত্যেকেরই জীবনে এমন কিছু বই থাকা দরকার, যেগুলোতে আমরা বারবার ফিরে যেতে পারি। বয়স বদলাবে, জীবন বদলাবে, বইটির সঙ্গে আমাদের সম্পর্কও বদলাবে—কিন্তু বইটি তার জায়গায় থেকে যাবে। ‘আমাদের খনজনপুর’ আমার কাছে তেমনই একটি বই।
বই কিনুন। ভালো বই কিনুন। পড়ুন। আর এমন বই পড়ুন, যা শেষ করার পরও অনেকদিন আপনার ভেতরে থেকে যায়।
হয়তো কোনো এক সন্ধ্যায় আপনি বইটি বন্ধ করে চুপ করে বসে থাকবেন।
হয়তো হঠাৎ মনে হবে, আহা, আমিও তো একদিন এমন একটি খনজনপুরে থাকতাম!
উপন্যাস: আমাদের খনজনপুর
লেখক: মঈনুল আহসান সাবের
প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০০৪
তৃতীয় মুদ্রণ: সেপ্টেম্বর ২০১৮
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ
প্রকাশক: দিব্যপ্রকাশ
মূল্য: ১৫০ টাকা
মাসুম বিল্লাহ: গল্পকার
