পাঠকের জন্য আবু ইসহাক এর ‘সূর্য-দীঘল বাড়ী’ অবশ্যপাঠ্য

আবু ইসহাকের কালজয়ী উপন্যাস সূর্য-দীঘল বাড়ী। বইটি শেষ করার পর মনে হলো, কিছু বই শুধু পড়া শেষ হয় না, পাঠকের ভেতরে তাদের কিছু দৃশ্য, কিছু মানুষ, কিছু আর্তনাদ দীর্ঘদিন থেকে যায়। সূর্য-দীঘল বাড়ী তেমনই একটি উপন্যাস।
১৯৫৫ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে গ্রামীণ জীবন, দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র্য, কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি, পুরুষতন্ত্র এবং ক্ষমতাবানদের শোষণকে এমন নির্মোহ বাস্তবতায় তুলে ধরেছে যে, বইটি পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়েছে; এ শুধু একটি সময়ের গল্প নয়; মানুষের অসহায়তা, বেঁচে থাকার সংগ্রাম এবং সামাজিক অন্যায়ের গল্প অনেক সময় যুগ পেরিয়েও একই রকম থেকে যায়।
সূর্য-দীঘল বাড়ী বলতে বোঝায় এমন একটি বাড়ি, যার অবস্থান পূর্ব-পশ্চিমমুখী, ফলে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত বাড়িটিতে তীব্র রোদ পড়ে। গ্রামবাংলার লোকবিশ্বাসে এমন বাড়িকে অনেক সময় অশুভ বা অভিশপ্ত মনে করা হতো। বিশ্বাস ছিল, সেখানে যারা বাস করে তারা রোগ-শোক, দুর্ভাগ্য কিংবা অকালমৃত্যুর শিকার হয়।
এই ভয়, কুসংস্কার আর সামাজিক অন্ধবিশ্বাসের মাঝেই জয়গুন ও শফির পরিবার এসে আশ্রয় নেয় সেই পরিত্যক্ত ভিটেতে। তাদের কাছে বাড়িটি কোনো অলৌকিকতার জায়গা নয়, এটি বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়। মাথার ওপর একটি ছাউনি, সন্তানদের নিয়ে দু’বেলা বেঁচে থাকা, এই সামান্য চাওয়াটুকুই তাদের কাছে সবচেয়ে বড় সত্য।
সূর্য-দীঘল বাড়ীর সবচেয়ে শক্তিশালী অনুভূতিগুলোর একটি হলো ক্ষুধা। যে ক্ষুধা মানুষকে ভেঙে দেয়, আবার সেই ক্ষুধাই তাকে অসম্ভব শক্ত করে তোলে। জয়গুনের জীবন মূলত এক মুঠো ভাতের জন্য নিরন্তর যুদ্ধ।
দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতায় শহরে আশ্রয় নেওয়া, খাবারের জন্য মানুষের দরজায় দাঁড়ানো, একটুখানি অন্নের জন্য অপমান সহ্য করা—এই অভিজ্ঞতাগুলো উপন্যাসে এমনভাবে এসেছে যে পাঠক শুধু ঘটনাগুলো পড়েন না, যেন সেই ক্ষুধার ভেতর ঢুকে পড়েন। শহরের একদিকে চালের গুদাম, খাবারের প্রাচুর্য, মানুষের জাঁকজমক; আর অন্যদিকে ক্ষুধার্ত মানুষের জীবন, এই বৈপরীত্য বইটির অন্যতম নির্মম সত্য।
সুকান্ত ভট্টাচার্যের সেই পঙ্ক্তি মনে পড়ে—
“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।”
সূর্য-দীঘল বাড়ী যেন এই অনুভূতিকেই একটি দীর্ঘ, জীবন্ত উপাখ্যানে রূপ দিয়েছে। এই উপন্যাসের প্রাণ জয়গুন। তিনি শুধু একজন দরিদ্র নারী নন; তিনি প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা এক অনমনীয় চরিত্র। স্বামীর অত্যাচার, সংসারের অনিশ্চয়তা, সন্তানদের ক্ষুধা, সমাজের চোখরাঙানি, পুরুষতান্ত্রিক বিধিনিষেধ, সবকিছুর বিরুদ্ধে তাকে একাই লড়তে হয়। পেটের ক্ষুধা যখন তীব্র, তখন ‘নারী বাইরে গিয়ে কাজ করবে না’—এই সামাজিক বিধিনিষেধের কোনো অর্থ তার কাছে থাকে না। সন্তানদের বাঁচাতে তাকে বেরোতেই হয়, কাজ করতেই হয়, রোজগার করতেই হয়। আর সেখানেই সমাজের তথাকথিত নৈতিকতার পাহারাদাররা তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়।
জয়গুনের শক্তি এখানেই, সে সমাজের কাছে মাথা নোয়ায় না, আবার নিজের বাস্তবতাকেও অস্বীকার করে না। তার কাছে বেঁচে থাকা কোনো বিমূর্ত দর্শন নয়; বেঁচে থাকা মানে সন্তানদের মুখে একমুঠো ভাত তুলে দেওয়া।
গদু প্রধান চরিত্রটির মধ্য দিয়ে লেখক গ্রামীণ ক্ষমতার কাঠামো, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এবং ব্যক্তিস্বার্থের নির্মম রূপটি দেখিয়েছেন। সমাজের মোড়ল হিসেবে তার হাতে ক্ষমতা আছে; সেই ক্ষমতাকে সে ব্যবহার করে নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে।
জয়গুনের মতো এক অসহায় নারীর জীবনযাপন, তার বাইরে গিয়ে কাজ করা, নিজের সিদ্ধান্তে চলা, এসব তার চোখে অপরাধ। কিন্তু এই আপত্তির আড়ালে যে ব্যক্তিগত লালসা, কর্তৃত্বের বাসনা এবং নারীকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার মানসিকতা কাজ করে, উপন্যাস সেটিও পাঠকের সামনে স্পষ্ট করে দেয়।
এই উপন্যাসে ধর্মকে হেয় করা হয়নি; বরং ধর্মের নামে মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অপব্যাখ্যা, গোঁড়ামি ও কুসংস্কারকে প্রশ্ন করা হয়েছে। সমাজের প্রভাবশালী মানুষ যখন ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে নিজের স্বার্থ হাসিল করে, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দরিদ্র ও অসহায় মানুষ।
জয়গুনের জীবন সেই বাস্তবতাকেই সামনে আনে। তার জন্য জীবন রক্ষা করাই প্রথম সত্য। ক্ষুধার্ত সন্তানকে বাঁচানোর জন্য তাকে যদি সমাজের প্রচলিত বিধিনিষেধ অমান্য করতে হয়, সে তা-ই করে। কারণ তার কাছে ধর্মের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে মানুষের জীবন, সন্তানের জীবন, বেঁচে থাকার অধিকার।
আবু ইসহাকের ভাষা সহজ, কিন্তু তার ভেতরের অভিঘাত গভীর। তিনি অতি জটিল ভাষার আশ্রয় না নিয়েও গ্রামীণ জীবনের নির্মম বাস্তবতা, মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং পরিবেশকে অত্যন্ত জীবন্ত করে তুলেছেন। চরিত্রগুলো কাগজে আটকে থাকে না; তারা যেন আমাদের চোখের সামনে হেঁটে বেড়ায়।
উপন্যাসের দৃশ্যপটও বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। উঠোন, বাড়ি, গাছপালা, কাদা, বৃষ্টি, ক্ষুধার্ত মানুষ, গ্রামের পথ, মানুষের কথাবার্তা, সবকিছু এত নিখুঁতভাবে উঠে এসেছে যে পাঠকের মনে হয়, তিনি দূর থেকে গল্প পড়ছেন না; বরং সেই সমাজেরই একজন মানুষ হয়ে উঠেছেন। এই কারণেই সূর্য-দীঘল বাড়ী শুধু একটি কাহিনি নয়, একটি সময়ের সামাজিক দলিলও। উপন্যাসটির পটভূমিতে রয়েছে ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ এবং দেশভাগ-পূর্ব ও পরবর্তী অস্থির সময়। সেই সময়ের গ্রামীণ মুসলিম সমাজে দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা, সামাজিক কড়াকড়ি, নারী-নির্যাতন ও কুসংস্কার মানুষের জীবনকে কতটা কঠিন করে তুলেছিল, তার একটি শক্তিশালী চিত্র এই উপন্যাসে পাওয়া যায়।
নারীর চলাফেরায় নিষেধ, কাজের ক্ষেত্রে বাধা, সামাজিক সম্মান হারানোর ভয়, সবকিছুকে অতিক্রম করে জয়গুনের পথচলা তাই ব্যক্তিগত সংগ্রামের পাশাপাশি একটি বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতারও প্রতীক।
সূর্য-দীঘল বাড়ী অবলম্বনে ১৯৭৯ সালে নির্মিত চলচ্চিত্রটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসেও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। শেখ নিয়ামত আলী ও মসিহউদ্দিন শাকেরের নির্মাণে ছবিটি দর্শক ও সমালোচকের প্রশংসা অর্জন করে। ডলি আনোয়ার, রওশন জামিল, এ টি এম শামসুজ্জামানসহ শিল্পীদের অভিনয় ছবিটিকে আরও শক্তিশালী করে।
মূল উপন্যাসকে চলচ্চিত্রে রূপান্তরের সময় কিছু ঘটনা ও সংলাপে পরিবর্তন এসেছে, এটাই স্বাভাবিক। তবু চলচ্চিত্রটি উপন্যাসের মূল সুর, দারিদ্র্য, ক্ষুধা, সামাজিক নিপীড়ন এবং মানুষের বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষাকে শক্তভাবে ধারণ করতে পেরেছে। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ও জাতীয় পুরস্কারে ছবিটির সাফল্যও তার গুরুত্বকে আরও প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আবু ইসহাক বাংলা কথাসাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। ১৯২৬ সালে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার শিবঙ্গল গ্রামে তাঁর জন্ম। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি সরকারি ও কূটনৈতিক দায়িত্বেও কাজ করেছেন। তাঁর সাহিত্যকর্মে গ্রামীণ সমাজ, শ্রমজীবী মানুষ, দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ, দারিদ্র্য এবং সামাজিক বৈষম্যের জীবনঘনিষ্ঠ ছবি উঠে এসেছে।
সূর্য-দীঘল বাড়ী ছাড়াও তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে ‘পলিদ্বীপ’, ‘হারেম’, ‘মহাপতঙ্গ’, ‘জাল’ প্রভৃতি। বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদকসহ বিভিন্ন সম্মাননা লাভ করেন।
সূর্য-দীঘল বাড়ী পড়ে আমার সবচেয়ে বড় উপলব্ধি, মানুষকে সবচেয়ে বেশি দুর্বল করে শুধু দারিদ্র্য নয়; দারিদ্র্যের সঙ্গে যুক্ত সামাজিক অবজ্ঞা, কুসংস্কার, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অন্যায়ও তাকে ধীরে ধীরে পিষে ফেলে। আর সেই জায়গাতেই জয়গুন আলাদা।
সে ভাঙে, কিন্তু শেষ হয়ে যায় না। সে ভয় পায়, কিন্তু ভয়কে নিজের জীবনের নিয়ন্তা হতে দেয় না। সে সমাজের চোখরাঙানি দেখে, কিন্তু সন্তানদের ক্ষুধার চেয়ে সেই চোখরাঙানিকে বড় মনে করে না। তাই জয়গুন শুধু একটি উপন্যাসের চরিত্র নয়; তিনি বেঁচে থাকার এক অনমনীয় ইচ্ছার প্রতীক।
কিছু বই শেষ করে আমরা উঠে যাই। কিছু বই শেষ করার পরও তাদের মানুষগুলো আমাদের সঙ্গে হাঁটতে থাকে। ‘সূর্য-দীঘল বাড়ী’ আমার কাছে তেমনই একটি বই।
যারা বাংলা সাহিত্যের শক্তিশালী, জীবনঘনিষ্ঠ ও সমাজবাস্তবতামূলক উপন্যাস পড়তে চান, তাদের জন্য ‘সূর্য-দীঘল বাড়ী’ অবশ্যপাঠ্য। কারণ এই বই আমাদের শুধু একটি গল্প শোনায় না; আমাদের সমাজের আয়নাটাও সামনে ধরে।
আর হ্যাঁ, আবু ইসহাক আমার খুব প্রিয় একজন লেখক; তাঁর ‘সূর্য-দীঘল বাড়ী’ আমার প্রিয় উপন্যাসগুলোর একটি, আর এই উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘সূর্য-দীঘল বাড়ী’ আমার খুব প্রিয় সিনেমাও।
প্রকাশনায়: নসাস, নওরোজ সাহিত্য সম্ভার’-র পক্ষে ইফতেখার রসুল জর্জ, ৪৬ বাংলাবাজার ঢাকা ১১০০ বাংলাদেশ
প্রথম মুদ্রণ: ১৯৫৫ ইং বাংলা ১৩৬২
একবিংশ সংস্করণ: এপ্রিল ২০১০ বাংলা ১৪১৭
প্রচ্ছদ: আব্দুর রউফ
মূল্য: আশি টাকা মাত্র।
