‘সাক্ষাতে যত কথা’ বইটি বাংলা সাহিত্যের একটি জীবন্ত আর্কাইভ

‘যাঁরা কিছু সৃষ্টি করেন তাঁরাই তো স্রষ্টা। স্রষ্টাদের পায়ের কাছে বসে তাঁদের মুখে জীবনের কিছু গল্প শোনার অভিপ্রায়ই এই বইয়ের মূল ভিত্তি।’

প্রশান্ত ভৌমিকের সাক্ষাতে যত কথা বইটি পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, এটি কেবল কিছু মানুষের কথোপকথনের সংকলন নয়, বরং বাংলা সাহিত্যের একটি জীবন্ত আর্কাইভ।

বইটির পাতা উল্টালে দেখা যায় লেখক অত্যন্ত যত্নের সাথে বিশজন গুণী মানুষের ভেতরের জগতটাকে পাঠকদের সামনে মেলে ধরেছেন।

এই বইয়ের প্রতিটি সাক্ষাৎকার পড়ার সময় সবচেয়ে বেশি যা আমাকে মুগ্ধ করেছে, তা হলো প্রতিটি মানুষের স্বতন্ত্র সত্তা।

আমরা বাইরে থেকে অনেক সময় সব কবি বা লেখককে একই কাতারে ফেলে বিচার করি, কিন্তু এই বইটিতে দেখা যায় তাঁদের জীবনদর্শন, চিন্তার গভীরতা এবং দেখার ভঙ্গি কতটা আলাদা।

একেকজন মানুষ যেন একেকটি স্বতন্ত্র দ্বীপের মতো, যাদের নিজস্ব সুর আর লড়াই আছে। প্রশান্ত ভৌমিক খুব সচেতনভাবে সেই পার্থক্যগুলো তাঁর লেখনীতে ফুটিয়ে তুলেছেন।

বইটি পড়ার সময় মনে হয়েছে, আমি সরাসরি সেই সব মানুষের পাশে বসে তাঁদের স্মৃতির ঝাঁপি খুলে দেখছি। সাহিত্যজীবনের চড়াই-উতরাই থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত জীবনের নানা ছোট ছোট গল্প, যা সচরাচর সাধারণ পাঠকদের অজানাই থেকে যায়, সেগুলো লেখক এখানে পরম মমতায় তুলে এনেছেন।

আমাদের প্রিয় লেখকদের যে অজানা গল্পগুলো আগে কখনো জানা হয়নি, সেগুলো পড়ার পর তাঁদের সৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। লেখক তাঁর ভূমিকায় যেমনটি বলেছেন—স্রষ্টাদের পায়ের কাছে বসে তাঁদের জীবনের গল্প শোনার যে অভিপ্রায়, তা এই বইটির প্রতিটি পৃষ্ঠায় সার্থক হয়েছে।

২০টি ভিন্ন জীবন মানেই ২০টি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি; আর সেই চিন্তার বৈচিত্র্যই বইটিকে একঘেয়েমি থেকে মুক্ত করে একটি গতিশীল রূপ দিয়েছে।

২০১৮ সাল থেকে শুরু করে ২০২৬ পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ের এই যে শ্রমসাধ্য সংকলন, তাতে প্রতিটি শব্দে ফুটে উঠেছে সৃজনশীলতার প্রতি লেখকের গভীর ভালোবাসা। কলকাতার সাহিত্যিকদের এই নিবিড় সান্নিধ্য এবং তাঁদের জীবন নিয়ে এমন সবিস্তার আয়োজন বাংলা সাহিত্যে অনন্য সংযোজন।

বইটির প্রতিটি কথা পড়ার পর মনে হয়, সাহিত্য কেবল কল্পনার জগত নয়, বরং তা রক্ত-মাংসের মানুষের গভীর চিন্তা আর অভিজ্ঞতার নির্যাস।

প্রতিটি সাক্ষাৎকারই যেন নতুন কোনো দর্শনের দরজা খুলে দেয় এবং আমাদের শিখিয়ে দেয় যে মানুষ আলাদা বলেই পৃথিবীটা এত বৈচিত্র্যময় ও সুন্দর। সব মিলিয়ে এই বইটি সংগ্রহে রাখার মতো একটি সম্পদ, যা বারবার পড়ার মতো অনুপ্রেরণা যোগায়।

আপনি যদি বাংলা সাহিত্য ভালোবাসেন এবং প্রিয় লেখকদের সৃজনশীলতার পেছনের কারিগরী বুঝতে চান, তবে এই বইটি আপনার সংগ্রহে থাকা উচিত। বিশেষ করে যারা লেখালেখি করতে চান, তাঁদের জন্য এটি অনুপ্রেরণার একটি বড় উৎস হতে পারে।

কলকাতার সাহিত্যিকদের বৈচিত্র্যময় জীবন নিয়ে এমন কাজ সত্যিই প্রশংসনীয়। বইটির বাঁধাই এবং ভেতরের অলংকরণও পড়ার অভিজ্ঞতাকে আরও সুন্দর করে তোলে।

আরও পড়ুন