পলাশীর যুদ্ধ ও সত্যের অনুসন্ধানে

১৭৫৭-র পলাশির যুদ্ধ শুধু বাংলার বা দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে নয়, সমগ্র বিশ্বের ইতিহাসে এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। সেই রক্তস্নাত প্রভাতে স্বাধীনতার পতন বা যুদ্ধের অভিঘাত ইতিহাসের চলমান গতিধারাকে আমূল বদলে দেয়। যে প্রভাব ভারতবর্ষের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বরাজনীতির অন্তঃপুর পর্যন্ত স্পর্শ করেছিল। সিরাজউদ্দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্বশাসনের পরিবর্তে শুরু হয় ঔপনিবেশিক শাসনের এক নতুন অধ্যায়। উপমহাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির ওপর তার দীর্ঘমেয়াদি ছায়া যে আজও বিদ্যমান তা নতুন কথা নয়।
ইতিহাসকে শুধু ঘটনা হিসেবে মেনে নিলে সমাজ তার নিজস্ব বাঁক হারিয়ে (প্রকৃত সত্য) ফেরার সম্ভাবনা প্রবল। পলাশির দ্বি-সার্ধশতবর্ষ পরেও একটা জাতি তার যখন অতীত অস্তিত্বকে নিবিড়ভাবে যখন প্রত্যক্ষ করতে চায় না সমস্যাটা সেখানেই। পলাশিকে কি সত্যিই একটা নতুন সূর্যোদয়ের সীমারেখা হিসেবে গন্য করা সমীচীন! যদুনাথ সরকারের এই মন্তব্য তবে অষ্টাদশ শতকের (বাংলার) গৌরবকে ম্লান করার জন্য সত্যিই কি যথেষ্ট ছিল? এসব প্রশ্ন নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে ঐতিহাসিক মহলে আলোচনার বিস্তর সুযোগ আছে।
পলাশী নিয়ে একদিকে যেমন প্রচুর গবেষণা ও লেখালেখি হয়েছে তেমনি নানা বিতর্কের ঘূর্ণিপাকে ঘটনার মূল দৃষ্টিভঙ্গি যুগে যুগে পথ হারিয়েছে। এর দায় ঐতিহাসিকরা অস্বীকার করতে পারেন না। পলাশি অনিবার্য ছিল কিনা কিমবা তার পতনে দায় কার কত টুকু – সবসময় ঐতিহাসিকদের কলমে অগ্রাধিকার পেয়েও যৌক্তিক বিশ্লেষণে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ প্রভাব থেকে তাঁরা মুক্ত হতে পারেননি বলেই ঘুরেফিরে-নবাব সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দোষ- ত্রুটি, অপরিণত , ভীতু কিমবা দেশীয় অভিজাত, অমাত্যাদের ষড়যন্ত্রের ভূমিকা ‘প্রতিষ্ঠিত সত্য’ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
অলিখিতভাবে একটা কথা প্রায় সকলের জানা যে, বাংলায় ঔপনিবেশিক আগ্রসানের বৈধতা দিতে তৎকালীন সময় থেকে আজ পর্যন্ত ইংরেজ ঐতিহাসিক ও তাঁদের অনুগামীদের প্রচেষ্টার কোন অভাব নেই। তাছাড়াও ঐতিহাসিক থেকে সাধারণ ইতিহাসপ্রেমীদের মধ্যে যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে লিখতে আগ্রহী হলেও তাঁরা দেখেন না বা দেখতে চান না পলাশি হল পরিণতি সামরিক আগ্রাসন বা ষড়যন্ত্রের একটি সুন্দর প্রসারী ভয়ঙ্কর ফলাফল।এস সি হিল,ম্যালিসন, রবার্ট ওরম থেকে শুরু করে ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার, রমেশচন্দ্র মজুমদার, আধুনিক ঐতিহাসিক ক্রিস বেইলি, পিটার জে মার্শাল, রজত কান্ত রায়, শেখর বন্দ্যোপাধ্যায় পলাশি নিয়ে কমবেশি এক পথের পথিক।ফলে পলাশি নিয়ে তৈরি হয়েছে একটা ‘কোলাবোরেশন থিসিস’ যেখানে পলাশির বিপর্যয়ের জন্য অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রকে স্বীকার করেও শাসক হিসেবে সিরাজউদ্দৌলাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে।
এছাড়াও বাংলা সাহিত্য, নাটক, গল্পে সিরাজউদৌলাকে নিয়ে নানা কুৎসা, মিথ্যাচারের পাহাড় নির্মিত হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে এই ন্যারেটিভ কিভাবে একটা সমাজে যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। ইতিহাসের সত্যা-সত্য নির্ণয়ের দায়িত্ব থাকে সর্বকালের ঐতিহাসিকদের। একটা বিষয় খুব মন্থর হলেও পলাশি কেন্দ্রিক মূলধারার ইতিহাস চর্চাকে চ্যালেঞ্জ করে নানা অনালোচিত তথ্য ও যুক্তির অবতারণা ঘটেছে প্রায় একশো বছর আগেই। আজ সেই আলো আকাশ ভেদ করেছে শুধু সুশীল চৌধুরীর মতো বিরল প্রতিভাবান ঐতিহাসিকের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গীর অক্লান্ত গবেষনায়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অভিসন্ধিমূলক সামরিক আগ্রাসনকে তিনি অকাট্য তথ্য ও যুক্তির আলোকে প্রায় নিরঙ্কুশ ভাবে প্রমাণ করেছেন যে পলাশির ঘটনা ছিল ইংরেজদের পূর্ব পরিকল্পিত ফাঁদ। দেশীয় ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব ঘটনার পরম্পরা মাত্র। তিনি সিরাজের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে ইতিহাসসম্মতভাবে বেপাত্তা করে শাসক হিসেবে তাঁর সর্বভৌম অধিকারের প্রশ্নটি জোরালোভাবে তুলে ধরেন। সুশীল চৌধুরী মতামত খুব স্পষ্ট। তিনি বলেছেন, “ইংরেজদের বিরুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলার তিনটি নির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল এবং আমাদের কাছে যেসব তথ্যপ্রমাণ আছে তা থেকে স্পষ্ট যে এগুলি খুবই ন্যায়সঙ্গত। এগুলিকে ইংরেজদের আক্রমণ করার জন্য ‘শুধু মিথ্যা ওজর’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।” (সিরাজউদ্দৌলার এক চিঠিতে(১ জুন ১৭৫৬) তিনটি অভিযোগ স্পষ্ট করেছেন তিনি)
অভিযোগ তিনটি ছিল- ১. ফোর্ট উইলিয়াম কেল্লার সংস্কার ও এটাকে দুর্ভেদ্য এবং সুসংহত করার প্রচেষ্টা। ২. দস্তকের বা বিনাশুল্কে বাণিজ্য করার অনুমতি পত্রের যথেচ্ছ অপব্যবহার। ৩. নবাবের অপরাধী প্রজাদের কলকাতায় আশ্রয় দান।
সিরাজের কথা হলো, ‘তিনটে মুখ্য কারণে আমি আমার রাজ্য থেকে ইংরেজদের বহিষ্কার করতে চাই।’ (পলাশির অজানা কাহিনী, সুশীল চৌধুরী, ২০০৪, পৃ ৪৬)
তিনি দু’দশকের বেশি ইউরোপের বিভিন্ন আর্কাইভসে, বিশেষ করে ব্রিটিশ লাইব্রেরির ইন্ডিয়া অফিস রেকর্ডসে (India Of-fice Records, British Library, London) রক্ষিত কোম্পানির নথিপত্র ও ‘প্রাইভেট পেপাসর’ এবং হল্যান্ডের রাজকীয় আর্কাইভসে (Algemeen Rijk-sarchief, The Hague) সংরক্ষতি ডাচ কোম্পানীর দলিল-দস্তাবেজ ও কাগজপত্রে (যেগুলো পলাশীর প্রেক্ষিতে আগে কেউই দেখেন নি বা ব্যবহার করেন নি) যে সব নতুন তথ্যের সন্ধান করে তার পাশাপাশি আগের জানা তথ্য ও সমসাময়িক ফারসী ইতিহাস ও বাংলা সাহিত্যের পুনর্বিচার করে বক্তব্য খণ্ডন করেছেন।
নিরপেক্ষভাবে সিরাজকে নিয়ে প্রথমকলম ধরেন অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়। পরে নিখিল নাথ রায়, সুশীল চৌধুরী। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঐতিহাসিক না হয়েও তাঁর ইতিহাস সম্মত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে সিরাজউদ্দৌলাকে যথার্থ মূল্যায়ন করেছেন। তিনি লিখেছেন, “সিরাজদ্দৌলা যদিচ উন্নত চরিত্র মহান ব্যক্তি ছিলেন না তথাপি এই দ্বন্দ্বের হীনতা মিথ্যাচার প্রতারণার উপরে তাঁহার সাহস সরলতা বীর্য ও ক্ষমা রাজোচিত মহত্বে উজ্জ্বল হইয়া ফুটিয়াছে।” (দ্র. ইতিহাস: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পৃ. ১২৩-২৪, ১৩৬৮) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বর্ণিত বাক্যটিতে প্রমাণ হতে বাকী রইল না যে, নবাবের যুদ্ধটি ছিল ইংরেজদের হীন ষড়যন্ত্র মিথ্যাচারিতা এবং প্রতারণার বিপক্ষে একটি সঠিক সংগ্রাম। তাই এতোদিন পরেও পলাশির যুদ্ধ ও সিরাজউদ্দৌলার বৃহত্তর ইতিহাসের পটভূমিকায় সংস্থাপিত করে প্রকৃত জাতীয় ইতিহাস নির্ণয় করার প্রয়োজনীয়তা আছে।
সাম্প্রতিক কালে (২৩ শে জুন ২০২৫) ঢাকা থেকে প্রকাশিত ড. মো. এমরান জাহান সম্পাদিত স্বপ্ন’৭১ ‘ ‘পলাশীর যুদ্ধ : সত্যের অনুসন্ধানে’ গ্রন্থটি তারই একটি ধারাবাহিকতার অংশ। বাংলাদেশ ইতিহাস অলিম্পিয়াড এর উদ্যোগে আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারের শিরোনামকে কাজে লাগিয়ে এই চর্চার যাত্রা শুরু হয়েছিল করোনা অতিমারীর সময়ে। চারটি দেশ থেকে মোট দশ জন স্কলার আলোচনায় অংশগ্রহণ করলেও সাত জনের পাঠ করা প্রবন্ধের সংকলনে দু’মলাটের রূপ পেয়েছে গ্রন্থটি। তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজনও অধ্যাপক ইতিহাসবিদ হিসেবে সুনামের অধিকারী। পলাশীর যুদ্ধের ঐতিহাসিক পটভূমি, সমকালীন আর্থ- সামাজিক অবস্থা, পলাশীর ষড়যন্ত্র ও তৎকালীন বাংলার অভিজাত শ্রেণি, সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও পলাশীর যুদ্ধের বৈধকরনের প্রচেষ্টা নবাব সিরাজউদ্দৌলার পত্রাবলীর আলোকে তাঁর শাসননীতি, নবাবী আমলের স্থাপত্য বিষয় বিষয়সূচিতে স্থান পেয়েছি। লব্ধ ঐতিহাসিক হয়েও সবার রচনার মান সমান বলা যায় না। পলাশির যুদ্ধের অন্তর্লীন ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ কারণ অনুসন্ধান, চরিত্র, এবং প্রভাবকে নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন নির্বাচিত গবেষকদের অনেকেই যা শুধু সাধারণ ইতিহাস প্রেমী নয়, ঐতিহাসিকদেরও চিন্তার খোরাক যোগাতে পারে।
গ্রন্থে প্রথাগত ইতিহাসচর্চার বাইরে গিয়ে অধ্যাপক খাইরুল অনাম প্রাথমিক দলিল, যেমন কোম্পানির চিঠিপত্র, সমসাময়িক ইউরোপীয় ভ্রমণকারীর বিবরণ এবং বাংলা পারিবারিক নথি ব্যবহার করার নমুনা রেখেছেন। তাঁর বিশ্লেষণ কেবল যুদ্ধে “কী ঘটেছিল” তাতে সীমাবদ্ধ না থেকে; বরং “কেন ঘটেছিল” এবং “কীভাবে তা ব্যাখ্যা করা উচিত” এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজেছেন যৌক্তিকভাবে।তাঁর তথ্যনির্ভর ও দলিলসমৃদ্ধ উপস্থাপন গ্রন্থটিকে একটি গম্ভীর গবেষণামূলক গ্রন্থের মর্যাদা দিয়েছে।
গ্রন্থটির ভাষা সহজ অথচ পরিমিত, যা সাধারণ পাঠক থেকে গবেষক— উভয়কেই আকর্ষণ করে। সম্পাদক এমরান জাহান একটি প্রবন্ধে ঐতিহাসিক পলাশি যুদ্ধের ঘটনাকে গল্পের মতো বর্ণনা করেছেন, ফলে পঠনীয়তা বজায় থাকলেও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ইতিহাস সম্মত হয়ে ওঠেনি। তাছাড়া তাঁর দুটি দীর্ঘ প্রবন্ধের অন্যটিতে সিরাজের বিরুদ্ধে আনা অনৈতিহাসিক প্রচার ও মিথ্যাচারকে খণ্ডন করেছেন ঠিকই, কিন্তু তথ্যসূত্রের যথার্থতা না থাকা একটা গবেষণার অপূর্ণতা মানতেই হবে। দু ‘একটি প্রবন্ধে সেমিনারের বক্তব্যকে হুবহু তুলে ধরা হয়েছে। এগুলো পরিমার্জন করে আরও সমৃদ্ধ আকার দেওয়া যেত। অধ্যাপক একেএম শাহনাওয়াজ প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের বিশেষজ্ঞ তিনি। তাই হয়তো পলাশির যুদ্ধে হয়ত কিছু বিভ্রান্তিকর তথ্যের উপস্থাপন করেছেন যা ইতিহাস সম্মত নয়। যেমন তিনি লিখেছেন, “যুদ্ধ দেখতে যত সংখ্যক মানুষ আম্রকাননের চারিদিকে সমবেত হন তারা একটি করে ঢিল ছুঁড়লে ইংরেজরা পরাজিত হয়ে যেত ” ( পৃষ্ঠা ৮৬ ) কিংবা যুদ্ধে ইংরেজদের কোন পূর্ব পরিকল্পনা ছিল না, বরং সময়ের সুযোগ তারা গ্রহণ করে। (পৃষ্ঠা ৯০)মনেহয় তাঁর সেমিনারের আলোচিত অংশ সরাসরি তুলে ধরা হয়েছে।যদিও গ্রন্থটি গভীর ও বিশ্লেষণধর্মী, তবুও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও গ্রন্থটির সার্বিক মূল্য অসন্দিগ্ধ— এটি পাঠককে নতুন করে ইতিহাস ভাবতে শেখায়।গ্রন্থটি ইতিহাসপ্রেমী, গবেষক ও সাধারণ পাঠক— সকলের জন্যই এক মূল্যবান সম্পদ, কারণ এটি ইতিহাস নয়, সত্য অন্বেষণের এক সাহসী প্রয়াস।শিল্পী সলিল দাস বাংলার নবাবি আমলের স্থাপত্য শৈলী যে বিশেষ একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তাঁর নিখুঁত গবেষণাধর্মী বিবরণ থেকে পাওয়া যায়। গ্রন্থটির মর্যাদা বাড়িয়েছেন মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান খান। তিনি,’পলাশীর ষড়যন্ত্র ও তৎকালীন বাংলার অভিজাত শ্রেণী’কে যথার্থ ভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। সব দিক থেকে বিচার করলে সংকলিত গ্রন্থ হলেও পাঠককে নতুন চিন্তার খোরাক যোগাবে।
বইয়ের নাম: পলাশীর যুদ্ধ: সত্যের অনুসন্ধানে
সম্পাদনা : ড. মো. এমরান জাহান
প্রকাশনা : স্বপ্ন ’ ৭১ প্রকাশন
ভারতের একমাত্র পরিবেশক : উদার আকাশ।
প্রচ্ছদ : নিয়াজ চৌধুরী তুলি
প্রকাশকাল: ২৩ জুন ২০২৫
ধরন : সুলতানী ও নবাবী শাসনের ইতিহাস
পৃষ্টা : ২৫৬
মূল্য: ৬৫০ টাকা
