কবিতার জীবন এবং জীবনের কবিতা 

উন্নত গদ্য ভাষায় শিল্প রূপ, শিল্পের কারিকুরি, শব্দ প্রয়োগের কৌশল, পুনঃ পুনঃ ব্যবহারের জীর্ণতা থেকে বেরিয়ে শব্দবন্ধে মুন্সিয়ানা লেখাটিকে পাঠকের গ্রহণযোগত্য অর্জন করতে সাহায্য করে ও সফল হয়ে ওঠে। অন্য একটি সত্য পাশাপাশি রয়েছে, যা তৈমুর খানের গদ্যে লক্ষ করা যায়। ভারী ভারী শব্দের আবেদন পুষ্ট শিল্পিত উৎকর্ষ ছেড়ে তৈমুর খান মর্মমূলের সত্য বিতরণে যে ভাষা ব্যবহার করেছেন তা পাঠকের পাঠের আগ্রহ বাড়িয়ে তুলেছে। তৈমুর এর বাক্য গঠন সহজ ও সরলতার ভিতর নিবিড় মগ্নতা, গভীর অন্বেষণের দিশা দেখায়। মুগ্ধতা থাকে। মেদহীন বেনদাবিমুগ্ধ অশ্রুপাত‌ও ঘটে পাঠকের অতি গোপনে। কবি তৈমুর খানকে চেনা জানার তৃষ্ণা বেড়ে যায়।

এই কবিতাজীবন (২০২৩) তাঁর অনিবার্য যাপন একদমে পড়ে ফেলা যায়। এখানেই কবির গদ্য লেখার সাফল্য।

তৈমুর নির্ভিক সত্য কথা বলে। তাঁর ঘাসকাটা জীবন থেকে ভিন রাজ্যে মজুরিখাটা, বস্তি জীবনের  গল্প  ইত্যাদি পেরিয়ে শিক্ষকতার চাকরির সত্য বচন উঠে এসেছে এই কবিতাজীবনে

‘বিশ্বাস’ এমন একটা শব্দ যার স্থায়িত্বহীনতা প্রতিটি মানুষের পরিচিত। শব্দটি কাচের মতো ঠুনকো। সহজেই ভাঙে, মানুষকেও ভেতরে ভেতরে ভেঙে দেয়। অনেকেই এই ভেঙে যাওয়া মেনে নিতে না পেরে চরম বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। অথচ এই বিশ্বাসের ওপর সকলেই আস্থাশীল। কোন মোহ থেকে আস্থা জন্মায়, কারণগুলো নিয়ে দ্বিধা রয়েছে। একথা ঠিক যে, সম্পর্ক নামক শব্দের অতি আবেগ প্রশ্রয় ভূমিকা বিশ্বাসের দরজাগুলো খুলে দেয়। আবেগময়তা বিশ্বাসের শিকড়গুলোর বিস্তারে সহযোগী হয়ে ওঠে। মূল্যবোধের নূতন উপলব্ধির প্রকাশ ঘটে। কবি তৈমুর খানকে দেখা যায় আবেগতরঙ্গে। আবেগ উল্লসিত ধ্বনির‌ও পরিবর্তন ঘটে, মূল্যবোধের রূপ বদলে যায়। বিশ্বাস সম্পর্ক ফিকে হয়ে আসে। বয়স বাড়ে। সম্পর্ক মূল্যবোধ বিশ্বাস সবকিছুই বদল হয়। তৈমুর খান নিয়মিত শব্দ চয়নে ক্লান্তি বোধ করে। ঐশ্বরিক এই চিন্তনে তাঁর নিজস্ব সত্তা জাগ্রত হয়। এই কবিতাজীবন-এ তাঁকে ভিন্ন রূপে দেখতে পাই।

আবার একথাও নিশ্চিত করে বলা যায়,বিশ্বাস সম্পর্কের মূল্যায়ন যেভাবেই হোক না কেন, কবি তৈমুর খান এই সম্পর্ক, বিশ্বাসের ওপর আস্থা রেখেই তাঁর কবিতা জীবন, জীবনের কবিতার ঘরবাড়ি বানিয়েছেন। তাঁর ইমারতের ভিতখানি মজবুত কংক্রিটের উপর প্রতিষ্ঠিত। 

আমরা তৈমুর ‌এর শিশুবেলা দেখি তা নড়বড়ে কদর্য আদর প্রশ্রয়, ক্ষুধাকাতরতায় এক অন্তর্মুখী নিরীহ রক্তমাংসের বালক, যে শুধু নির্যাতনের অংশীদার হয়ে এসেছে পৃথিবীতে। দারিদ্র্য, ক্ষুধা, তাচ্ছিল্য, অবহেলা ,অপমান তাঁর নিত্য সঙ্গী। অন্ধকার তাঁর পায়ে পায়ে সমান গতিতে হেঁটে যায়। শিশু তৈমুর, কিশোর তৈমুর, যুবক তৈমুর এগিয়ে চলে আলোর সন্ধানে। এইসব নির্যাতনের কষ্ট,যন্ত্রণা তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। কবিতা আধার হয়ে তাকে প্রশ্রয় দিতে থাকে। দৃষ্টির অন্তরালে আলোর প্লাবনে অনাবিল কাব্যরসে নির্মল বিচরণভূমি তৈরি করে তাঁকে প্লাবিত করে। কবি তৈমুর বেদনার অলিন্দে আরামকেদারায় বসে কবিতাজীবন উপভোগ করে। কবিতার প্রিয় অক্ষরগুলো, ভালোবাসার শব্দগুলো এক আলোকোজ্জ্বল গদ্যের জাদুখেলায় মেতে ওঠে। কবির গদ্য শিল্পিত হয়ে পাঠকের ভাবনার কপাট খুলে দেয়—

‘তার নিঃশ্বাস এসে আমার নিঃশ্বাসে মিশে যায়।তার বুকের উর্বরতা আমাকে ডাক দেয়। আমি তখন শব্দকৃষক হয়ে উঠি।’

তৈমুর এর গদ্যে পদ্য ঝরে পড়ে—

‘প্রত্যেকেরই নিজস্ব কৃষ্ণ আছে, কৃষ্ণের অন্বেষণ আছে, কৃষ্ণের সাধনা আছে। আমাদের সতেরো বছরের জীবনে তারই যেন সূচনা হল। তাই চেয়ে দেখতে লাগলাম চারিদিকেই এক মুগ্ধ বিস্ময়ে। বয়ঃসন্ধির সেই দ্বান্দ্বিক মুহূর্ত আমাদের জীবনকে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন করে তুলল। চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল সারাদিনের শ্রেণিকক্ষে দেখা উজ্জ্বল ফর্সা মুখগুলি। অর্ধস্ফুট গোলাপির পাপড়ির মতো ঠোঁট, নেশাগ্রস্ত ঘোরলাগা চোখের ভাষা, সদ্য মৃণালের রোম ওঠা বাহু এবং মুকুলিত স্তনবৃন্ত স্বপ্নের মধ্যে প্রবেশ করতে লাগল। এক ভিন্নতর ভাষা এসে গেল কবিতায়। কবিতা যেন হৃদয়কে উদ্বেল করে দিল। মনকে অস্থির করে তুলল। প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষাকে ঘনীভূত করতে লাগল দিন দিন। পড়ার থেকে লেখার দিকেই বেশি মনোযোগী হতে লাগলাম।’

আরও লিখেছেন—

‘নেমেছে পরির দল শ্রেণিকক্ষ জুড়ে
রঙিন ডানায় ফুলে ফুলে প্রজাপতি ওড়ে
মন ছুঁতে চাই পরিদের
মনে মনে যাই কাছাকাছি
আজ শুধু ভালোবাসা দিতেই এসেছি’

‘একদিকে রোমান্টিক হাতছানি, অপরদিকে চরম দারিদ্র্যের কঠোর কঠিন পথ।’

কবিতার ভাষা, গদ্যের ভাষা প্রেমের যুগলবন্দি হয়ে উঠল।

 তাঁর আঙুলের মৃদু স্পর্শে মোবাইলের নোটপ্যাডে লিপিগুলো ঝরনা হয়ে ঝরে পড়ে পাথর পাহাড়ের বুক চিরে মাটির সমতলে।পথহারা পিপাসার্ত প্রাণ ভরে পান করে তৃষ্ণার জল। শরীর মন ভিজে, ভাবনার প্রশ্ন সাগরে ডুব দেয়।

কবি তৈমুর নির্ভিক নির্দিষ্ট লক্ষ্যে অবিচল, ভেতরের শপথ নিজের কাছে অঙ্গীকার লিপি হয়ে চাগিয়ে দেয় তাঁকে।

‘জীবন যদি হয় নির্বেদ নীরক্ত মৃত্যুর পরিভাষা তবে কি বেঁচে থাকব না? পথ হাঁটব না? ভালোবাসবো না? অবশ্যই বেঁচে থাকব,পথ‌ও হাঁটব। আঁধার নির্জন সন্ধ্যায় নিজেকে তছনছ করে রক্তাক্ত হব। আলো চাইব সমষ্টির।’ সেই অন্তর্গত তাগিদ দেখতে পাবো বইয়ের প্রচ্ছদে।

এ জীবন তৈমুরের, এ শপথ তৈমুরের, এ অঙ্গীকার কবি ও গদ্যকার তৈমুর খানের।

চড়াই উতরাই ব্যর্থতা গ্লানি প্রেম ভালোবাসা প্রতিবাদ বিদ্রোহ, নিয়মিত সমাজের মানুষের অবজ্ঞা তাচ্ছিল্য সব মিলিয়ে তাঁর এই কবিতাজীবন। তাঁর দীর্ঘশ্বাসগুলো, তাঁর আর্তধ্বনিগুলো , যাপনের ছেঁড়া ছেঁড়া উপলব্ধি, তাঁর জীবন প্রজ্ঞা  ভিন্নতর এক আলোকোজ্জ্বল গরিমায় প্রতিষ্ঠিত। আর কবি অনবরত ফিরে ফিরে আসে মহান শূন্যতার নিবিড়ে। নত হয়ে নৈঃশব্দ্যের দীপ্তিময় আলোক বিচ্ছুরণ দুচোখ ভরে দেখতে।

এই কবিতাজীবন পুস্তকটির অন্দরমহলে ২৭টি শিরোনামের গদ্য-পদ্যের সম্ভার। কবির জীবনচক্রে কবিতার সহবাস এক অনবদ্য জীবন-ইতিহাস। পড়তে পড়তে পাঠক কবিতার মধ্যে ঢুকে যেতে পারে সহজেই। অনুমান করতে পারে  তাঁর পায়ের ক্ষমতা—

‘কোথায় পা রাখি’ এই আর্তনাদের ভিতর এখন দেখতে পাই সীমাহীন এক সবুজ সমতল, যেখানে মহা বিক্রমে  কবিকে হেঁটে যেতে।

এই কবিতাজীবন
তৈমুর খান
প্রচ্ছদ: অর্পণ
বার্ণিক প্রকাশন
চিন্তামণিপুর, কৈয়ড়,
পূর্ব বর্ধমান ৭১৩ ৪২৩
মূল্য ৩০০ টাকা।  

আরও পড়ুন