মো. এমরান জাহান সম্পাদিত ‘পলাশীর যুদ্ধ: সত্যের অনুসন্ধানে’ ঐতিহাসিক গ্রন্থটি প্রকাশিত হলো

পলাশী যুদ্ধের ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্রে করে ২০২০ সালের ২০-২৩ জুন, চারদিন ব্যাপী অনলাইনে মুক্ত আসরের উদ্যোগে আয়োজন করে বাংলাদেশ ইতিহাস অলিম্পিয়াড ও বাংলাদেশ হেরিটেজ স্টাডি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন ‘প্রথম আর্ন্তজাতিক ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্মেলন’।

এই সম্মেলনে চারটি দেশ থেকে ১০ জন দেশ-বিদেশের গবেষকরা অংশ নেন। এই আন্তর্জাতিক ওয়েবিনারে নিত্য নতুন আলোচনায় বেশ প্রাণবন্ত করে রেখেছিল দর্শক ও শ্রোতাদের। জাতীয় পর্যায়ে বেশ আলোচিত হয় এই সেমিনার। এই সম্মেলনে নির্ধারিত প্রবন্ধ পাঠে অংশ নেন অধ্যাপক ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ, অধ্যাপক ড. গোলাম কিবরিয়া ভূঁইয়া, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান, অধ্যাপক ড. মো. এমরান জাহান, ইরানের ইয়াজিদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক কাজেম কাহদুয়ি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুমিত আল রশিদ, ভারতের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আশীষ কুমার দাস, মুর্শিদাবাদ থেকে অধ্যাপক ড. খয়রুল আনাম এবং লেখক ও শিল্পী সলিল চৌধুরী, যুক্তরাজ্য থেকে গবেষক প্রিয়জিৎ দেবসরকার।

সেই সম্মেলনে নির্ধারিত প্রবন্ধ পাঠের সঙ্গে পলাশীর ঐতিহাসিক ঘটনাকে আরও বিশ্লেষণ করে প্রকাশিত হলো পলাশীর যুদ্ধ: সত্যের অনুসন্ধানে ঐতিহাসিক গ্রন্থটি। বইটি সম্পাদনা করেন বাংলাদেশ ইতিহাস অলিম্পিয়াড জাতীয় কমিটির সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ড. মো. এমরান জাহান। ২৫৬ পৃষ্ঠার এই বইটি প্রকাশ করেছে স্বপ্ন’ ৭১ প্রকাশন।  বইটিতে লিখেছেন অধ্যাপক ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ, অধ্যাপক ড. গোলাম কিবরিয়া ভূঁইয়া, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান, অধ্যাপক ড. মো. এমরান জাহান, মুর্শিদাবাদ থেকে অধ্যাপক ড. খয়রুল আনাম এবং লেখক ও শিল্পী সলিল চৌধুরী, যুক্তরাজ্য থেকে গবেষক প্রিয়জিৎ দেবসরকার।

ড. মো. এমরান জাহান প্রসঙ্গকথা বলেন, ‘দিন যায় দিন আসে। ইতিহাস ঘটনাবলিও নিত্য নতুন উপাত্ত নিয়ে পুনর্বিন্যাসের আয়োজন চলে। বাঙালির ইতিহাসের বড় একটি ট্রাজেডির জায়গা হলো ১৭৫৭ সালের পলাশী যুদ্ধ। পলাশীর যুদ্ধ ও এর ফলাফল ছিল বাংলা জনপদের মানবগোষ্ঠীর ভাগ্য বিপর্যয়ের দীর্ঘ ইতিহাস। যুদ্ধটি ছিল একদিনের। কিন্তু নানামাত্রায় ছড়িয়ে ছিল দীর্ঘ ষড়যন্ত্র। এই যুদ্ধে শুধু একজন শাসকের পরিবর্তন হয়নি। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পালায় শুরু হয় উপনিবেশিক শাসন। শাসকগোষ্ঠীর ছত্রছায়ায় সব ক্ষেত্রে আসে পরিবর্তন। ইতিহাস পাল্টানোর মহাপরিকল্পনা চলে। এ পরিকল্পনা শুরু করা হয় দেশীয়দের হাত দিয়েই। নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে লম্পট ও চরিত্রহীন হিসেবে তুলে ধরে পলাশীর যুদ্ধ বৈধকরণ নিয়ে সাজানো হয় মিথ্যা ইতিহাস। শুরু হয় নানা বানোয়াট ও বিকৃত ইতিহাস রচনার পালা। এই ইতিহাস রচনা করেছে পলাশী যুদ্ধের ফলভোগী লেখক ও বুদ্ধিজীবীরা। এ নিয়ে নানা মিথের সৃষ্টি ও কলঙ্ক লেপন করা হয়েছে। ইংরেজ বেনিয়াদের তৈরি নগরী হয় কলকাতা। এখানে গড়ে ওঠে হলওয়েল মনুমেন্ট। অন্ধকুপ হত্যাকাণ্ডের স্মৃতিস্তম্ভ। বলা হয়, এটা নবাব সিরাজের দুষ্কর্মের প্রতীক। দিন যায় এভাবেই। গত শতকের চল্লিশের দশকে আরেক জাতীয়তাবাদী নেতা সুভাসচন্দ্র বসু বাঙালির জন্য কলঙ্কস্বরূপ এই স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙার আন্দোলন শুরু করেন। একইভাবে শুরু হয় সিরাজের ইতিহাস নিয়ে নতুন অনুসন্ধান। তার আগেই এগিয়ে আসেন অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়। রচনা করেন সিরাজউদ্দৌলা। দৃশ্যপট পাল্টে দেয়ার সুযোগ আসে। পলাশী যুদ্ধ এবং নবাব সিরাজকে নিয়ে নতুন করে চিন্তার করার সূত্রপাত ঘটে। পলাশীর পূর্বাপর ষড়যন্ত্র এবং নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রতি পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে এই দুই বাঙালির বিশেষ কৃতিত্ব স্বীকার করতে হয়। কিন্তু যে বানোয়াট ইতিহাস প্রচলিত হয়ে আছে, তা খণ্ডন করা এবং সে সময়ের রাজনীতি ও সমাজ, সামন্তগোষ্ঠীর প্রকৃতি, অভ্যন্তরীণ গৃহষড়যন্ত্র, পলাশী ষড়যন্ত্রে ইংরেজদের সুদূরপ্রসারী ভাবনা এবং তরুণ নবাবের দূরদর্শিতা ও দেশ প্রেম নিয়ে নতুন করে অনুসন্ধানের আরও গভীর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ইংরেজ কোম্পানির কথায় কথায় মিথ্যা ও ছলচাতরি এবং দেশীয় অমাত্যদের নবাব বিতাড়নের অশুভ পরিকল্পনা হয়েছে যথেষ্ট। নবাবের চরিত্র ও শাসন নিয়ে হয়েছে নানা অপপ্রচার। অথচ এ কথা ইংরেজ লেখকরাও স্বীকার করেছে যে, নবাব সিরাজউদ্দৌলার দেড় বছরের শাসনে কখনো তিনি মিথ্যার আশ্রয় নেয়নি। করেনি কখনো ছলচাতুরী। ইংরেজদের সঙ্গে নবাবের সন্ধি হয়েছে, কথা হয়েছে, আবার লোভী, বিবেকহীন ইংরেজরাই পরক্ষণে তা অবলিলায় ভঙ্গ করেছে।

হালে গবেষণায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এসেছে, গত হয়েছে সুবিধাভোগী পাত্রমিত্র। ফলে বাঙালি পাঠক মনে পলাশীর যুদ্ধ ও ভাগ্যহত তরুণ নবাবকে নিয়ে উত্সাহের কমতি নেই। নতুন কিছু অনুসন্ধানের খোঁজে আমরাও ভাবছিলাম। আমার নিজেরও ছিল ভীষণ আগ্রহ। কিশোর ও যৌবন বেলায় সিরাজউদ্দৌলা যাত্রাপালা, নাটক আর বাংলা সিনেমায় সিরাজউদ্দৌলাকে দেখে ভাগ্যহত নবাবের প্রতি আমারও কৌতুহল সৃষ্টি হয়। তারপর ইতিহাস বিষয়ে অধ্যয়ন করতে এসে সিরাজউদ্দৌলাকে ভিন্নভাবেই চিন্তা করি। কিন্তু একক কোন রচনা বা গ্রন্থ দিয়ে সেই সময়কালের রাজনীতি, নবাব সিরাজউদ্দৌলা আর পলাশীকে সঠিক ধারণা করা কঠিন। আমার কাছে তা-ই মনে হলো। সেই ভাবনা থেকেই বিশিষ্ট গবেষকদের নিয়ে এই বিশেষ বিষয়ের আয়োজন। তাই আমরা এই সেমিনারের নামকরণ দিয়েছি, পলাশীর যুদ্ধ: সত্যের অনুসন্ধানে।’

পলাশীর যুদ্ধ: সত্যের অনুসন্ধানে বইটি প্রকাশক আবু সাঈদ সুরুজ ও সম্পাদক ড. মো. এমরান জাহান।

বইটির প্রকাশক ও বাংলাদেশ ইতিহাস অলিম্পিয়াড জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ সুরুজ বলেন, পলাশীর যুদ্ধ: সত্যের অনুসন্ধানে একটি ঐতিহাসিক গ্রন্থ। বইটিতে পলাশীর যুদ্ধের উপর আটটি গুরুত্বপূর্ণ লেখা রয়েছেন। লেখাগুলো মধ্যে পলাশী যুদ্ধের সেই সময় কেমন ছিল, কী ভাবনা ছিল মানুষের মনে, ঐতিহাসিক পটভূমি, আর্থসামাজিক অবস্থা, পলাশীর ষড়যন্ত্র ও তৎকালীন বাংলার অভিজাত শ্রেণি, স্বাধীন নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদের স্থাপত্য এবং নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে যত অপপ্রচার ও বৈধকরণ প্রচেষ্টাসহ নানা বিষয় বিশ্লেষণ করে তুলে ধরা হয়। বইটি প্রাঞ্জল ভাষায় লিখিত। যেকেউ ইতিহাস অনুরাগী বইটি পড়ে সমৃদ্ধ হবে।

 বইটির প্রকাশের পর সাত লেখকের মধ্যে ভারতের মুর্শিদাবাদের চিত্রশিল্পী ও লেখক সলিল কুমার দাস বলেন,  ‘ বইটি প্রকাশের খবর জানতে পেরে খুব ভালো লাগছে। অন্ততঃ একটা দুঃসময়ে (কোভিড/লকডাউন) র ভয় কাটিয়ে সাংস্কৃতিক চেতনায় মানুষকে আপনারা (ইতিহাস অলিম্পিয়াড)  বরাভয় জুগিয়ে ছিলেন। তার স্মৃতি চিহ্ন সংগ্রহ করা একটা বড় পাওনা। সকলের মঙ্গল কামনা করি।

বইয়ের নাম: পলাশীর যুদ্ধ: সত্যের অনুসন্ধানে
সম্পাদনা : ড. মো. এমরান জাহান
প্রকাশনা : স্বপ্ন’ ৭১ প্রকাশন
প্রচ্ছদ : নিয়াজ চৌধুরী তুলি
প্রকাশকাল: ২৩ জুন ২০২৫
ধরন : সুলতানী ও নবাবী শাসনের ইতিহাস
পৃষ্টা : ২৫৬
মূল্য: ৬৫০ টাকা
বইটি পাওয়া যাবে কাঁটাবনের স্বপ্ন ‘৭১ অফিসে ও রকমারি ডটকমে
সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন  : +৮৮০১৭৩৭৩৭৩৮৬০।

আরও পড়ুন