নাটোরের বনলতা সেনের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার আগে অবশ্যই এই বইটা পড়ে নিতে ভুল করবেন না

উৎসর্গ পাতা কেমন হয়? পাঠকমাত্র সে ধারণা রাখেন।
তারপরও আমি গুড মর্নিং, পাপা িউপন্যাসের উৎসর্গ পাতাটা তিন পাতা করেছি। প্রকাশক মহোদয় নাক কুচকে, চশমার বাট ঠিক করতে-করতে খানিকটা বিরক্তি প্রকাশ করেছিলেন—উৎসর্গ পাতা এত বড় হয় নাকি? পাত্তা দিইনি। কিছু কিছু নিয়ম না মানলে ক্ষতি হয়না। তারপরও মনেমনে ভেবেছি, যাক, আমি না হয় ভিন্ন পথেই হাঁটলাম।
নাহ, আমার আগে আরও একজন দেখি এহেনও কর্মটি সেরে রেখেছেন! গণিত, বিজ্ঞান ও উদ্যোক্তাবিষয়ক লেখক মুনির হাসান তাঁর গল্পের বই এতদিন কোথায় ছিলে? এর উৎসর্গ পাতাটা ৭ পৃষ্ঠা লম্বা করেছেন!
ভাবা যায়?
মানা যায়?
যায়, খুব যায়।
বইটা হাতে বইয়ের প্রথম ও ব্যাকফ্ল্যাপ পড়ে নিলাম। এটা পড়তেও আমার খুব ভালো লাগে। আগ্রহ নিয়ে পড়ি। তবে লেখক পরিচিত আমাকে তেমন টানে না। লেখক সম্পর্কে জেনে আমার কাজ কী? তাঁর ছবিটবি নিয়েও মাথা ব্যথা নেই। পাঠক আমি, ওসবে আমার কাজ কী? লেখক ত আমার জন্য আস্ত একটা বই-ই লিখেছেন! আমার কাজ হলো সে বইটা মন দিয়ে পড়া, পড়ে শেষ করা। তাই করি বরং…
৭ পৃষ্ঠার উৎসর্গ পাতা কোনো একটা গল্পের চেয়েও কম নয়, লেখক তাঁর প্রয়াত দাদিজানকে নিয়ে পরমযত্নে লিখেছেন স্মৃতিগাঁথা। আমার বিশ্বাস, রাউজানের ফিল্ড মার্শাল নছিমা খাতুন এই উৎসর্গ পাতার দীর্ঘ লেখাটা পড়ে মুচকি মুচকি হাসছেন আর মনেমনে বলছেন,
“ছি! ছি! মুনিররা, হামমান তুই কিগরগুইচস? শরমে আঁই আর ন বাচির।”
লেখকের উচিত, দাদির জন্য এক কপি বই কুরিয়ার করে পাঠানো। বইটা হাতে পেলে সে দারুণ খুশি হবেন। সুন্দরবন কুরিয়ারের দিলেই ওরা বইটা পাঠিয়ে দেবে।
বইয়ে ৭টা গল্প আছে (কিন্তু লেখক বলছেন, গল্পগুলো আদৌ গল্প বলা যাবে কিনা তা হলফ করে বলা মুশকিল)! হুম, সন্দেহ থাকা ভালো, পরিতৃপ্তি এসে গেলে এরকম অন্যরকম ৭টা গল্প আমাদের আর পড়া হতো না।
আসলেই গল্পগুলো চেনা ফরম্যাটে লেখা নয়। একদমই লেখক নতুন এক রঙেঢঙে গল্পগুলো তৈরি করেছেন। এটাই সবচে ভালোলাগার বিষয় আমার কাছে। সবসময় আমি বা আমরা যে ধাঁচে গল্প পড়ে বা লিখে অভ্যস্ত এই বইয়ের গল্পগুলো তেমন নয়।
সঙ্গতকারণেই গল্পগুলোর নাম এখানে ফাঁস করতে হচ্ছে আমাকে, তাহলে পাঠক একটু ধারণা পাবেন—
- ফিউচার অ্যাটাক
- চড়
- ভূতেরা কি এলিয়েন
- অবশেষে পোস্টমাস্টার
- ইনভয়েস
- এলিমেন্টারি, মাই ডিয়ার ওয়াটসন
- এতদিন কোথায় ছিলে?
বিশ্বের সেরা গোয়েন্দা শার্লক হোমস এর সঙ্গে কিংবা নাটোরের বনলতা সেনের সঙ্গে লেখকের দেখা হওয়ার অভিজ্ঞতাটা কেমন হতে পারে, একবার চিন্তা করে দেখুন তো? লেখক কত সহজে এই দুটি কাজ করে বসে আছে তা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না।
লেখক শার্লক হোমসেরর বাসায় ছুটে গেল। দরজায় কোনো কলিং বেল নেই। কড়ার ওপরে লেখা আছে কড়া বাজানোর জন্য। কড়া বাজাতেই ওপর থেকে কে যেন বলল, ইয়েস, মি. মুনির। দরজা খোলা আছে। ওপরে চলে আসুন।
তারপর?
- ‘এলিমেন্টারি, মাই ডিয়ার ওয়াটসন’ গল্পটা পুরো পড়লেই আপনিও গোয়েন্দা হয়ে উঠবেন। পড়ার নিমন্ত্রণ।
সেই যে, সেদিন জীবনদা ট্রামের নিচে জীবন দিলেন, তার আগের দিন লেখককে গড়ের মাঠে বসে বাদাম চিবুতে চিবুতে বলেছিলেন—মুনির, সময় করে একবার নাটোরে যেও। তাঁর সঙ্গে দেখা করো। বলবে মৃত্যুর সময় আমি তার ছবি ধারণ করেই মরেছি। কারণ, সে ছাড়া কেউ আমাকে দুদন্ড শান্তি দিতে পারেনি।
তখন লেখক মুনির সাহেব হাসতে হাসতে বলেছিলেন—সে আমি বলব নে। কিন্তু আপনিই-বা এত তাড়াতাড়ি মরবেন কেন?
পরদিন কবি জীবনবাবু মরে গেলেন। লেখক মনেমনে খুব কষ্ট পেলেন। তাই কবির শেষ ইচ্ছেটা পূরণ করতেই নাটোরে ছুটে এসেছেন! বনলতার খোঁজে। লেখককে দেখে বনলতা সেন সুরেলা কণ্ঠে জানতে চাইলেন, এতদিন কোথায় ছিলে?
তারপর?
তারপর লেখক আমাদের জানাচ্ছেন—ছোটবেলায় আমি দুইবার প্রেমে পড়েছিলাম। প্রথমবার মহাভারত পড়ার সময় উর্বশীর। দ্বিতীয়বার ইলিয়াড পড়ার সময় গ্রিক দেবী আফ্রোদিতির। আমি বুঝলাম আমার সামনে যিনি দাঁড়ানো তিনি ঐ দুজনের চেয়েও সুন্দর। বাঙালি নারী। শাড়ি পরেছেন। সাদার মধ্যে কালো কাজ করা, তবে সেটি একুশে ফেব্রুয়ারি সবাই যা পরে সেরকম নয়।
হে পাঠক, নাটোরের বনলতা সেন এর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার আগে অবশ্যই এই বইটা পড়ে নিতে ভুল করবেন না।
অনেক অনেক গল্প আছে, যে গল্পগুলো পড়া শেষ করে আমরা পাঠক মনেমনে বলে উঠতাম—তারপর?
তারপর আর কী?
লেখক যে এরপর আর কিছু লিখেননি।
তখন আমরা নিজেদের মতো করে সেসব গল্পের সমাপ্তি টানতাম। লেখকও তেমনি কৈফিয়ত দিচ্ছেন যে, যে গল্পগুলো ছোটবেলাতে পড়ার পর আমাদের মনে হয়েছে এগুলো শেষ হয়নি সেগুলো আমি শেষ করবো। সেভাবনা থেকেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পটা লেখক নিজের মতো করে গল্পটার একটা পরিণতি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
দারুণ চেষ্টা। পড়ার সময় ঠিক রবিবাবুর ফিল পেলাম।
এরপর ‘ফিউচার অ্যাটাক’ গল্পে জানা যায় যে, দেশের বিভিন্ন জেলার প্রাইমারি ও জুনিয়র ক্যাটাগরির মেধাবী শিক্ষার্থীরা উধাও হয়ে যাচ্ছে। ঘটনাক্রমে রহস্য উদঘাটন করতে গিয়ে সাংবাদিক জাহিরা এমন এক সত্যের মুখোমুখি হলো, যা কিনা কেউ বিশ্বাস করবে না।
অন্যদিকে রোবটিক্সের প্রথম সূত্রকে মেনে শহরের মেয়র রোবট কিনা সেটা পরীক্ষায় নেমেছে শহরবাসী। তারা কীভাবে এ সমস্যার সমাধান করবে?
গণিত-বিজ্ঞান-উদ্যোগের বাইরে লেখকের অন্যরকম ৭টি লেখা নিয়ে এই বই। সবমিলিয়ে একটা অন্যরকম চেষ্টা বলতে পারি। আমার কাছে এই অন্যরকম চেষ্টাটাই সবচে ভালো লেগেছে। নয়ত একটা গড়পরতা বই হিসেবে চিহ্নিত হতো।
আর হ্যাঁ, বইটা কেবল বইদের বই নয়, কিশোরপাঠকদের কাছেও সমানভাবে বইটা উপভোগ্য হবে বলে মনে করছি।
বইয়ের নাম : এতদিন কোথায় ছিলে?
লেখক : মুনির হাসান
ধরণ : গল্পগ্রন্থ
প্রচ্ছদ : নিয়াজ চৌধুরী তুলি
প্রকাশন : স্বপ্ন ‘৭১ প্রকাশন
প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০২৪ খ্রি.
মূল্য : ২০০ টাকা।
বইটি পাওয়া যাবে কাঁটাবনের স্বপ্ন ‘৭১ অফিসে ও রকমারি ডটকমে।
সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন : +৮৮০১৭৩৭৩৭৩৮৬০।
