‘ইউক্লিডের আঙুলে বৃত্তের চাঁদ’ বইটির পাতায় পাতায় নীরবতার ফুল ও তার নির্যাস ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে যেন

হাইকু কোনো কবিতা নয়, কোনো সাহিত্যও নয়; হাত দিয়ে দেখানো এক পথনির্দেশ, আধখোলা এক দরজা, পরিচ্ছন্ন আয়না একটি… নীরব ভাষা এক, কারণ একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলেই অঙ্গলি নির্দেশ করে, কেন-কোথায়-কীভাবে ব্যাখ্যা করে না কিছুই।
— R.H. Blyth
( Haiku, vol. 1, Eastern Culture, Tokyo : Haikuseido Press, 1949)
হাইকু, ক্ষুদ্রতম কবিতাবিশেষ। জাপানি। মনের ভেতর থেকে উৎসরিত অবিরাম চিন্তার এক স্ফুরণ এই হাইকু, যা কবিতার মাধ্যমে স্ফুরিত এক মুহূর্তকাব্য। এক ধ্যানসমগ্র। নৈঃশব্দ্য, নিসর্গ হাইকুর অন্বিষ্ট উপাদান। এ যেন বিশেষ সময়ের নীরবতার ফুল ও তার নির্যাস।
হাইকু, জীবন ও প্রকৃতির অণুপ্রকাশ। এই কবিতায় নিহিত থাকে কল্পরাজ্যের বিশালতা। এখানে বিষয়ের প্রধান্য মুখ্য। হাইকুতে গাম্ভীর্য ও পরিমিতবোধ অপরিহার্য। একে আঁটোসাঁটো পরিশীলিত করার উদ্দেশ্যে পরিত্যাজ্য হয়েছে অনাবশ্যক শব্দ অনাবশ্যক পরিসরও। হাইকু মূলত একটি চিত্রকল্প বা দৃশ্যকল্প বা মুহূর্তের স্ন্যাপশট।
হাইকু শব্দটিকে ‘হাই’ ও ‘কু’ এই দুই অংশে ভাঙলে হাই মানে খেলা আর কু মানে শব্দ/কথা অর্থ দুটি পাওয়া যায়।
জনপ্রিয় হাইকু লেখক মুহাইমীন আরিফ-এর হাইকুগুচ্ছ ইউক্লিডের আঙুলে বৃত্তের চাঁদ নামক চমৎকার বইটির পাতা থেকে কয়েকটি হাইকু তুলে দিলাম—
৩.
কে কাকে দেয়
প্রজাপতি ও ফুল
সুখের দোল
৭.
ফুলে শিশির
বেনিআসহকলা
কাচের ফুল
৩৪.
মাঘসকাল
ঘাস-শিশিরে ধোয়া
দিনের চোখ
৩৫.
নরম রোদ
শীতকাতুরে মাছ
জল-উঠোনে
৫৮.
হলুদ রোদ
পাতাপাখা সবুজ
ছায়ায় প্রাণ
৬৩.
কাঠুরে ঘড়ি
চিরে যায় সময়
অনাদিকাল
মাত্র কয়েকটা হাইকুগুচ্ছ পাঠকের জন্য এখানে তুলে দিলাম, দেখুন, পড়ুন, ভাবুন, কল্পনা করুন…
অল্প ক’টা শব্দে কবি কী কী দৃশ্যকল্প আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন! আমার আশ্চর্য লাগে, সূত্র মেনে কেমন করে লেখেন হাইকু? এটা সবার পক্ষে লেখা সম্ভব না। এটা বেশ বুঝতে পারছি। আমার তো মনে হয়, চাইলেই গল্প লেখা যায়, উপন্যাস লেখা যায়, এমন কী কবিতাও লেখা যায়, আজকাল অনেকেই লিখছেন দেখতে পাই! কিন্তু হাইকু, না, এটা সবার কম্ম নয় হে!
হাইকু ও লেখক মুহাইসীন আরিফেরর হাইকু সম্পর্কে আরেকটু তথ্য জানানো অত্যন্ত আবশ্যক মনে করছি—
হাইকু (Haiku) হলো একটি জাপানি কাব্যধারা যা স্বল্প কথায় গভীর ভাব প্রকাশ করে। পাঠকদের কৌতূহল থাকতে পারে বিবেচনায় হাইকু লেখার কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম ও গঠন নিচে তা তুলে ধরা হলো:
হাইকুতে মোট তিনটি পঙ্ক্তি থাকে।
প্রথম পঙ্ক্তি: ৫ মাত্রা
দ্বিতীয় পঙ্ক্তি: ৭ মাত্রা
তৃতীয় পঙ্ক্তি: ৫ মাত্রা
মোট: ১৭ মাত্রা (৫-৭-৫ ছন্দ)
প্রকৃতি, ঋতু, সময়, জীবন ও অনুভূতির ক্ষণিকতা হাইকুর সাধারণ বিষয়।
অনেক হাইকুতে একটি ঋতু-সংক্রান্ত শব্দ থাকে, যাকে “কিগো” (kigo) বলে।
সরল ভাষা ব্যবহার করে গভীর ভাব প্রকাশই হাইকুর বৈশিষ্ট্য।
এখানে চিত্রময়তা এবং অনুভবযোগ্য দৃশ্যপট তুলে ধরা হয়।
অনেক সময় দুটি ভাব বা চিত্রের মধ্যে একটি ক্ষণিক ‘বিরতি’ বা ‘বিপরিততা’ থাকে, যাকে ‘কিরেজি ( Kireji) বলে।
মুহাইমীন আরিফের হাইকুগুলো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রাকৃতিক ও মানবিক বিষয়ে রচিত হয়েছে। হাইকু কাঠামো অনুসরণ করে গদ্যাকারে মাত্রাবৃত্ত ও অক্ষরবৃত্ত ছন্দে প্রকৃত হাইকু লিখতে মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন। যদিও পদ্যাকারে অন্ত্যমিল রেখেও অনেকে হাইকু লিখে থাকেন। তা-ও পাঠকের কাছে সমাদৃত।
হাইকুর যে ভাবগভীরতা ও গাম্ভীর্য রয়েছে, তা লেখক মুহাইমীন আরিফের হাইকুতে মান্যতা পেয়েছে।
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে বাংলা হাইকুকবি হিসেবে তিনি অগ্রগণ্য।
কবিতার প্রাণ আছে। হাইকু কবিতারও। জাপানি হাইকুর প্রাণ তার দর্শনে। বিস্ময়করভাবে দার্শনিক ভাবনার স্ফুরণ ঘটে হাইকুর তিন পঙ্ক্তির আঁটোসাঁটো বাঁধনে। প্রতিটি হাইকুর রয়েছে সৌন্দর্য। সেই মৌলিক সৌন্দর্য হাইকুকে করছে মহিমান্বিত। একটি সার্থক হাইকু, হাইকুকবি ও পাঠক দুজনকেই দর্শন ও ভাবের জগতে আচ্ছন্ন করে ফেলতে পারে। এর ক্ষমতা রয়েছে এক আবহ সৃষ্টি করার।
বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য হাইকুগুচ্ছ ইউক্লিডের আঙুলে বৃত্তের চাঁদ কবি মুহাইমীন আরিফের এক বিস্ময়ভরা চিন্তা ও ভাবের প্রকাশ। পাঠকরা এর রসাস্বাদন করবেন প্রতিটি হাইকুর প্রতিটি পঙ্ক্তিতে, পাঠক হিসেবে এটা জোর দিয়ে বলতে পারি।
এই বইটিতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কবি, প্রাবন্ধিক প্রদীপ চক্রবর্তীর অভিমত প্রকাশ করেছেন। তার বয়ানে জানতে পারি, পৃথিবীর সবচে সংক্ষিপ্ত কাব্যরূপ ‘হাইকু’। কবি, গদ্যকার, বাচিক-শিল্পী সব্যসাচী হাজরা এবং অভিষেক রায়, সম্পাদক, কোয়ান, হাইকুগুচ্ছ নিয়ে অভিমত প্রকাশ করেছেন, যা কি না বইটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
পাঠক, পাঠ করুন। হাইকুকার হয়ে ভ্রমণ করুন বৃত্তের চাঁদে।
বইয়ের নাম : ইউক্লিডের আঙুলে বৃত্তের চাঁদ
লেখক : মুহাইমীন আরিফ
ধরণ : হাইকুগুচ্ছ
প্রচ্ছদ : নিয়াজ চৌধুরী তুলি
প্রকাশন : স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশন
প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০২২ খ্রি.
মূল্য : ১৬০ টাকা।
