এই বইয়ের প্রতিটা গল্প পড়া শেষে আপনি মুচকি হাসবেন…

‘আলপিন’ ছিল আমার জানের জান। অথচ সে-ই আলপিন একদিন বন্ধ হয়ে গেল। কী কারণে? সে-কারণটা এখানে বলার সাহস আমার নাই। আলপিনের সবগুলো সংখ্যা (কয়েকটা বাদে) আমার কাছে আছে বাঁধাই (নীলক্ষেত থেকে) করা।

প্রশ্ন করতে পারেন, আলপিন কী?

উফ্, দৈনিক প্রথম আলোর সোমবারের বিদ্রুপ ম্যাগাজিন—আলপিন।
এরপর এলো ‘রস+আলো’। মোটামুটি। সে-ই রস+আলোতে লেখক শরিফুল ইসলাম ভূঁইয়ার সরস রচনা, মানে ছোট ছোট সমসাময়িক গল্পগুলো পড়তে বেশ মজাই লাগত। সেসব গল্প ও আরও কিছু গল্প নিয়ে আস্ত একটা বই হয়ে স্বপ্ন ‘৭১ প্রকাশন থেকে ২০২০ একুশে বইমেলায় বের হয়েছে লাভ স্টোরি তাজুল!

প্রথমেই বলে রাখি, আমি যদি পাঠক না হয়ে লেখক হতাম, তাহলে এ নামটা আমি বইয়ের নাম হিসেবে বাছাই করতাম না। লাভ স্টোরি তাজুল—এ নামটা আমার মোটেও পছন্দ হয়নি।
এত দারুণ দারুণ সব গল্প বইটাতে অথচ বইটার নাম কেমন সস্তা সস্তা লাগে আমার কাছে। বইটা হাতে নিয়ে ছুটে চলা বাসের ভেতর বসে পড়তে পড়তে যাবো তারও উপায় নেই। ঘরে বসেও একবার পড়তে নিয়েছি, সেসময় সুবাইতার আম্মুর টিপ্পুনি, ‘বুড়ো বয়সে লাভস্টোরি পড়ার শখ যায়নি দেখছি।’ পাশ থেকে মেয়েও কেমন জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চোখের পাতা ফেলে তাকায় তার বাপের দিকে।
ভারী মুশকিল হলো দেখছি!

আমার তখনই ইচ্ছে করছিলো, বইটার মলাট পাল্টে নতুন করে ছাপাই, আর বইটার নাম দেই—”যখন বৃষ্টি এল”।

কী? এ নামটা সুন্দর না?
অবশ্যই সুন্দর।

বইয়ের প্রচ্ছদও পাল্টে দিতে ইচ্ছে করছে। আমার শতভাগ ধারণা, এ দুটো কাজ করা গেলে বইটা আরও বেশি পাঠকের হাতে থাকত! হুম।

হেই প্রিয় বন্ধু ও পাঠক, বইয়ের নাম ও প্রচ্ছদ দেখে কি আপনি বই পড়েন?
যদি তাই হয়, তাহলে তো আমার এই লেখার প্রথম অংশটুকু পড়েই মনেমনে হয়ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন, যে, এ বইটা পড়বেন না। কারণ, বইয়ের নামটা আমার ভালো লাগেনি। না, ডিয়ার, এটা সত্যিকার কোনো পাঠকের সিদ্ধান্ত হতে পারে না।
এটা ভুল ভাবনা, ভুল জাজমেন্ট। ইংরেজিতে একটা কথা বলাই আছে— ডোন্ট জাজ এ বুক বাই ইটস কভার।
ঠিক তাই, প্রচ্ছদ দেখে কিংবা বইয়ের নাম দেখে একটা বইকে কখনও বিচার করবেন না।
এ ব্যাপারে আমার নিজেরও একটা মতামত আছে, যে, “বইয়ের নাম দেখে, প্রচ্ছদ দেখে, লেখকের নাম দেখে, লেখকের ছবি দেখে বই পড়বেন না; বই পড়বেন বইয়ের ভেতরের লেখা দেখে।” অন্যভাবেও বলতে পারি, “একটি বই ভালো না খারাপ তা বোঝার একমাত্র উপায় হলো—বইটি পড়া।”

বইটা নিয়ে এই হলো আমার প্রথম ও শেষ সমালোচনা বিষয়বস্তুু। এছাড়া আর কোনো অসঙ্গতি কিংবা খারাপ লাগার মতো কোনো জায়গা নেই বইটির ভেতর।

প্রথম পাতা থেকে পড়া শুরু করতে না করতেই হুট করে শেষ পাতায় চলে এসেছি টের পাইনি। ধুর, আরও কতক গল্প থাকলে মন্দ হতো না। পড়তে বেশ মজাই লাগছিল।
চলার পথে, হাঁটতে, বসতে কত যে রঙে-বেরঙের গল্প তৈরি হয়, সেসব ছোট ছোট মজার গল্প লেখক চট করে লিখে ফেলেছেন আমাদের জন্য। নয়ত আমরা সরস গল্প জানা, পড়া থেকে চিরকাল বঞ্চিত থাকতাম। আর এসব রঙ-বেরঙের গল্প ভালো না লেগে উপায় নেই। ভালো লাগবেই। ১০০% গ্যারান্টি দিচ্ছি আমি।

লেখকও আমাদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানিয়ে দিচ্ছেন, যে—
জীবন এক বহতা নদী। এ নদীতে ভাসে নানা রঙ্গরসের ভেলা। কোনোপা হাসির, কোনোটা্া বেদনার। কোনোটার রস মধুর, কোনোটারবা তেতো। তা ব্যঙময় এই বইয়ের ২০টি গল্পে। এই যেমন… অনলাইন শপিং ইদানিং বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এর মধ্যেও আছে ধাপ্পার গেরোতে আটকে যাওয়ার বিড়ম্বনা। সালেকিন ঘোড়া কিনে কী ধরাটাই না খেলো! তাই বলে ঘোড়া কি আর বসে থাকে? বাড়িতে যদি একটা বিটলা বিড়াল থাকে, আর থাকে সুহার মতো একটি মেয়ে, গোবেচারা তরুণের কী অবস্থা হয়, দেখুন। কাউকে বঁটি ধার দেবেন কি না, ভেবে দেখুন। এই বঁটিই চুপচাপ কত কী ঘটাল! গুমোট গরমে বৃষ্টি নামলে নগর জীবনে স্বস্তি আসে বটে, এর সঙ্গে দুর্ভোগও কম জোটে না। ‘যখন বৃষ্টি এল’ গল্পটা পড়ে দেখুন। ‘গাড়ি বিলাস’ এ গা ভাসাতে পুরোনো গাড়ি কিনবেন? দেখুন, কত কী ল্যাঠা জোটে। এরপরও আছে নিজের গাড়িতে যাওয়ার মজা।
আরও বলব? সবই বলে দিলে পড়ার আর বাকি থাকে কী? গল্পগুলো যে খারাপ লাগবে না—এটুকু নিশ্চয়তা দিতে পারি।

ঠিক তাই, এ বইয়ের ভেতরের গল্পগুলোয় একদমই মেদ নেই, একদম ঝরঝরে সুন্দর। এই কারণেও ক্রাউন সাইজের এই বইটা পড়তে ভালো লেগেছে। অবশ্য স্বপ্ন ‘৭১ প্রকাশনের বইয়ের মান নিয়ে আমার কোনও সন্দেহ নেই। একদম ঠিকঠাক। কেমন আদুরে আদুরে মোলায়েম প্রতিটা বই। ধন্যবাদ প্রিয় আবু সাঈদ ভাই। এভাবেই এগিয়ে যান রুচি ও সৌন্দর্যময়তার ভেতর দিয়ে।

সত্যি বলতে কী, এ বই নিয়ে বিস্তারিত রিভিউ লেখার কিছু নেই, আলোচনা-সমালোচনারও দরকার দেখি না।
এসব বই আনন্দ নিয়েই একবসায় পড়া শেষ করে ওঠা যায়। এ বই আপনাকে বিরক্ত করবে না, হতাশ করবে না। নিশ্চিত। বইয়ের প্রতিটা গল্প পড়া শেষে আপনি মুচকি হাসবেন…


বইয়ের নাম : লাভ স্টোরি তাজুল
লেখক : শরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া
ধরণ : রসগল্প
প্রকাশন : স্বপ্ন ‘৭১ প্রকাশন
প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০২০
মূল্য : ২৫০ টাকা
পৃষ্ঠা : ১১২

আরও পড়ুন