‘বৃদ্ধাশ্রম হয়ে ওঠা কফি হাউসটি’ তরতর করে পড়ে যাওয়ার মতো বই নয়!

যে বইয়ের পাতায়-পাতায় মোহগ্রস্ততা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, তারপরও কখনো কখনো পাঠকের মনে হবে— ধূর ছাই, এসব কী লিখেছেন! যত্তসব আজগুবি, অস্বাভাবিক, ভৌতিক কাহিনিতে আবর্ত গল্পগুলো। বইয়ের চরিত্রগুলোর মতো নিজের ভেতরও পাগল-পাগল অনুভূতি হবে। চরিত্রগুলো সঙ্গে হারিয়ে যাবেন দূর কোনো দেশে, অন্য কোনো জগতে। যে জগতের এক মানুষ মিজান।

‘মিজানের ইঁদুর-বিড়াল গল্প’-এ মিজান প্রথমে একটি মেঠো ইঁদুর পালে, এরপর সে একটা বিড়ালও পালতে শুরু করে। যে মিজান বই ভালোবাসত এখন সে-ই নতমুখে ঘাড় নেড়ে বুঝিয়ে দেয়— না, সে বই পছন্দ করে না। এক যুবকের এক-জীবনের গল্প। সচরাচর ছোটগল্পে এমন খুঁটিনাটি থাকে না, কিন্তু লেখক অলাত এহ্‌সান গল্পবলায় তাড়াহুড়োর মধ্যে দিয়ে যাননি বলেই মিজানের গোটা একটা জীবনের ছবি আমরা দেখতে পেলাম। লেখক যেন নিমগ্ন দর্শকের চোখে মিজানের জীবনের উত্থান-পতনের ছবি এঁকেছেন। মিজানের ইঁদুর-বিড়ালের মৃত্যু আপনাকেও ছুঁয়ে যাবে। গল্পকথকের ভাষ্যমতে— মিজানের ইঁদুর-বিড়ালের হত্যাকারীদের ধারণা এতেই মিজানের ‘মঙ্গল’ নিহিত। আসলে কী তাই?

‘মুশার মা আমাদের আত্মীয় হতেন’ বইয়ের দ্বিতীয় গল্প। নিঃসঙ্গ এক প্রৌড়ার জীবনে গল্প। মুশার মা গ্রামের একা যে বাড়িটাতে থাকেন, সেই বাড়িটা নিয়েও নানারকমের গল্প চালু হয়ে গেছে যার বেশির ভাগই ভৌতিক আর অলৌকিকতায় ভরা। বাইরে থেকে ছোট-বড় সবার চোখেই বাড়িটি ‘ভূতের বাড়ি’ বলে মনে হবে। মুশার মা’কেও ভূত বলে মনে করে সবাই, আর এই মনে করাই স্বাভাবিক। এভাবেই গল্পের শুরু। এরপর গল্পে ঢুকে পড়ে একটি গাছের ছেও (খাণ্ড), উজানে ভেসে এসে যে ছেও মুশার মায়ের গোটা জীবন জুড়ে রয়ে গেল। মানুষ বিশ্বাস করতে ভালোবাসে, ভালোবাসে কুসংস্কারকে। তেমনি এই গল্পে একটি গাছের ছেও মানুষের মনে কুসংস্কার হিসেবে জায়গা করে নিয়েছিল। কেন নিয়েছিল? সেকি স্বস্তির আশ্রয় পেতে? তাহলে মুশার মায়ের পরিণতি কী হয়েছিল?

তৃতীয় গল্প ‘কয়েকটি কাঠগোলাপ’। অল্প কথায় একটা মানুষকে তুলে এনেছেন লেখক। প্রতিটি অনুচ্ছেদ শুরু হয়েছে কথকের একটি স্বীকারোক্তি দিয়ে। আসুন সেই বাক্যে মানুষটাকে অল্প কয়েকটা কথায় জেনে নিই—
আমি একজন কদাকার চেহারার মানুষ।
আমি গ্রামান্তরিত মানুষ।
আমি নিরেট মাথার মানুষ।
আমি থোবড়ানো ডিব্বার মতো মানুষ।
আমি আঁধারের মতো মানুষ।
আমি অস্বচ্ছ ছাপা ছবির মতো মানুষ।
আমি নিশি রাঙানো নতমুখ মানুষ।
আমি নিতান্তই কামলাখাটা মানুষ।
আমি ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষ।
আমি একজন সৌভাগ্যবান মানুষ।

…এই ‘আমি’ আমরা অনেকেই। এটাই বইয়ের সবচেয়ে ভালোলাগার গল্প আমার কাছে। এই ভালোলাগার ব্যাপারটা ঠিক বলে-কয়ে, বুঝিয়ে-সুঝিয়ে, লিখে-টিখে বোঝানোর সাধ্য আমার নাই। ছোট্ট একটা গল্প, কিন্তু ভালোলাগার রেশ থেকে যায় বহুক্ষণ, কিংবা বহু বছর। অদ্ভুত সুন্দর গল্প। বাকিসব গল্প ভুলে গেলেও এই গল্প চিরকাল মাথার ভেতর রয়ে যাবে। লেখককে তাই ধন্যবাদ। বইয়ে পরের গল্পগুলোর নাম এমন—
(৪) নাজিমউদ্দিন রোডের পাশে অপেক্ষমান ছেলেটি,
(৫) পুরানো ছবিতে মুক্তিযুদ্ধের রহস্য,
(৬) একটি প্রতিশ্রুত ঝড়ের পূর্বাভাস,
(৭) ষষ্ঠ দরজার ওপাশে,
(৮) অভাবনীয় সুমিত ও তার কবিতার চিহ্ন আবিষ্কার,
(৯) বৃদ্ধাশ্রম হয়ে ওঠা কফি হাউসটি,
(১০) কতিপয় চরিত্র

আচ্ছা, একটা ব্যাপার খেয়াল করেছেন— গল্পগুলোর নাম কেমন একটা লম্বাটে, কিন্তু দারুণ সুন্দর! নামগুলো খানিকক্ষণ পরপর কানে বেজে ওঠে। সাধারণত আমরা চেষ্টা করি গল্পের নামগুলো যেন এক বা দুই শব্দে রাখতে; কিন্তু অলাত এহ্‌সান সচেতনভাবেই তাঁর গল্পের নাম এমন কাব্যিক ঢঙে রেখেছেন— কেমন রহস্যে ভরা, কেমন কুয়াশার চাদরে মোড়ানো। নামগুলো নিয়ে ভাবতে গেলে বোধের অতলে তলিয়ে যেতে হয়।

‘কয়েকটি কাঠগোলাপ’-এর পর ‘কতিপয় চরিত্র’ আমার ভালোলাগার কয়েকটি অণুগল্প, একটি শিরোনামের ভেতর। উপশিরোনামের একেকটা অণুগল্প নয়, যেন বারুদ। লেখককে বলি, এ রকম আরও শ’খানেক অণুগল্প লিখে মলাটবন্দি করবেন। আমার ভালো লাগবে।

বাকিগল্পগুলো নিয়ে বলতে গেলে লেখার কলেবর বেড়ে যাবে। আপাত সেই ঝক্কিতে যেতে চাই না। ছোটগল্প নিয়ে কিছু বলা মানে গল্প ফাঁস করে দেওয়া, সেটা অন্যায়। একটা ছোটগল্প পড়তে কতটুকু সময়-ই-বা লাগে? তার চেয়ে বরং চট করে বইয়ের একেকটা গল্প পড়ে ফেলাই বুদ্ধিমানের কাজ।
লেখক অলাত এহ্‌সানের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘অনভ্যাসের দিনে’ প্রকাশের সাত বছর পর ২০২৫ সালে বইমেলায় বেরিয়েছে ‘বৃদ্ধাশ্রম হয়ে ওঠা কফি হাউসটি’। দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থটি পড়ে আবারও আমার এই উপলব্ধি যে— প্রতিটি লেখক-ই তাঁর গল্প বলেন, একজন আরেকজনের হয়ে বা আরেকজনের মতো গল্প লেখেন না। এই বইয়ের গল্পগুলো অলাত এহ্‌সানেরই লেখার কথা, হয়েছেও তাই। যেমন এই আমি-আপনি বা অন্যকেউ এই গল্পগুলো লিখেনি, লিখবেও না কখনও। কিন্তু আমরা অনুভূতি তাড়িত হই, ভালোবাসায় জারিত হই। এখানেই লেখক অলাত এহ্‌সানের চূড়ান্ত স্বার্থকতা, সফলতাও বটে।
আস্ত বইটা পড়ার পর এও বুঝলাম, বাংলাসাহিত্যের গল্পের উঠোনে লেখক অলাত এহ্‌সান তাঁর ছাপ রাখতে এসেছেন, তাঁর ঢঙে গল্প বলতে এসেছেন; নিয়ম, প্রথা, ছকটক মেনে নয়, চিরচেনা ভঙ্গিতেও নয়, তিনি নিজের মতো করে স্বাধীনভাবে গল্প বলতে চেয়েছেন, পেরেছেনও। আর এই নিজস্বতার কারণেই অলাত এহ্‌সান কখনও হারিয়ে যাবেন না, এগিয়ে যাবেন আপন ছন্দে— এমন ভরসা তৈরি হয়।

তারপরও ব্যক্তিগত কিছু খটোমটোর কথা বলতে চাই। আমার মতে (একজন পাঠকের মতে), ছোটগল্প ছোট হলেই ভালো; গল্প বেশি বেশি ডালপালা মেলতে থাকলে খেই হারিয়ে যায়— এটা একান্তই আমার মতামত। ছোটগল্প কোনো কেসস্টাডি নয়, নিরেট গল্প; আর গল্পই হোক। পাঠক গল্প বা লেখা পড়তে আরাম পাচ্ছেন বা পাচ্ছেন না— এটা পাঠক যেমন ভাবে বা টের পায়; তেমনি এই ব্যাপারটা লেখকও ভাবেন, ভাববেন, বুঝবেন, বুঝতে হয়।

লেখা বা গল্প লেখা ঠিক কোনো একটা খাবার রান্না করার মতো, ফুল দিয়ে মালা গাঁথার মতো, ইট-বালি-সিমেন্ট দিয়ে রাজমিস্ত্রির দেয়াল নির্মাণের মতো। যেমন রান্নার উপকরণ সব ঠিকঠাক, কিন্তু খাবারে স্বাদ হয়নি, তেমন ঘটে গল্প লেখার ব্যাপারেও। লেখায় স্বাদ আনার দায়িত্বটা লেখকেরই। এই ব্যাপারে লেখকের পূর্ণ মনোযোগ প্রত্যাশা করছি। লেখায় আরো স্বাদ চাই, মায়া চাই। কেননা পাঠকরা এই স্বাদটাই খুঁজে ফেরেন।

শেষমেশ অন্যরকম একটা বই, অন্যরকম সব গল্প পড়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য অলাত এহ্‌সানকে ধন্যবাদ। ভালোবাসাও। পাঠকের প্রতি আহ্বান থাকবে— অন্যরকম একটি বইয়ের পাতায় ডুব দেওয়ার জন্য; নয়তো এই চমৎকার বইটি পড়া থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবেন, যেটা করা মোটেও বুদ্ধিমান পাঠকের কাজ নয়।

বই হোক আত্মার আত্মীয়।

বই : বৃদ্ধাশ্রম হয়ে ওঠা কফি হাউসটি
লেখক : অলাত এহ্‌সান
প্রচ্ছদ : পরাগ ওয়াহিদ
প্রকাশন : জ্ঞানকোষ প্রকাশনী
প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০২৫
পৃষ্ঠা : ১৬৮
মূল্য : ৪০০ টাকা

আরও পড়ুন