আতাউর রহমানের ‘বোধ’ ও বোধন

বোধ চকিতে পাওয়া উপলব্ধি’ একটি ছোটো কিন্তু পাঠকের মনে গভীর প্রভাব ফেলা একটি বই। লেখক আতাউর রহমান এই বইতে মানুষের চিন্তা শক্তিকে জীবনের নিয়ন্ত্রক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন এবং মানুষের উপলব্ধি, বোধ বা বোধোদয়ের কার্যকারণ ও ফলাফল মানুষের জীবনে কতটা প্রতিভাত হয় তা-ই তুলে ধরেছেন বইটিতে।

বইয়ের ‘কথা সামান্যই’ শিরোনামে নাতিদীর্ঘ ভূমিকায় তিনি লিখেছেন,

“…এমন তো প্রায়ই হয় যে, একটা কোনো প্রসঙ্গ বা ঘটনা মাথায় ঘুরছে, সেই ধারাবাহিকতায় হঠাৎ একটি উপলব্ধি আমাদের মনে মস্তিষ্কে উঁকি দেয়। ভেতর থেকে কেউ একজন বলে ওঠে-ঠিক! এটাই সত্য! একটা ‘প্রাণের আরাম মনের আনন্দ আত্মার শান্তি’ অনুভূত হয় সে মুহূর্তে। কমবেশি সবারই হয় বোধকরি এমনটা।

এই সব বোধ আসে, আবার হারিয়েও যায়। কিছু মনে থাকে, অধিকাংশই ভুলে যাই। কদিন পর মনে হয়, কী যেন ছিল কথাটা!

বাইশ বছর আগে (২০২৩) একদিন আচমকা মনে হলো, লিখে রাখি না কেন এই সব অনুভাবনা। অতঃপর শুরু। গেলো ২৩ বছর ধরে দিন-তারিখ উল্লেখ করে লিখে রাখছিলাম কথাগুলো-কখনো গুরুগম্ভীর ভাষায়, কখনো-বা বিদ্রুপাত্মক শব্দে-বাক্যে।

বছর দশেক ধরে গুটিকয় শুভার্থীকে এর কিছু শেয়ার করি হোয়াটসঅ্যাপে-আমার সুজন-সুহৃদ থেকে শুরু করে সত্তরোর্ধ বর্ষীয়ান শিক্ষকও আছেন সেই তালিকায়। উৎসাহ যোগাতে কি স্নেহবশে জানি না, তারা একরকম প্রশ্রয়ই দেন।

মাঝেমধ্যে ডায়েরি খুলে পড়ি। ভালো লাগে। প্রকাশের ইচ্ছে ছিল না তা নয়, তবে সেটা নিশ্চিতই আরো পরে। হঠাৎ, জানি না কেন, এই সপ্তাহ দুয়েক আগের এক নিরিবিলি দিনে অজস্র সবুজের মাঝে দাঁড়িয়ে মনে হলো, এ-বছরই প্রকাশ হোক বইটা। তাতে নিজেরও কিছু সুবিধা হয় পড়তে।

তারপর বেশ দ্রুততায়, নির্বাচিত পাঁচ শতাধিক ‘বোধ’ নিয়ে গোছানো হলো খসড়া পাণ্ডুলিপি। দরকারি সংযোজন-বিয়োজন আর বিস্তর কাটাছেঁড়া শেষে প্রকাশ-উপযোগী হয়ে উঠল-বোধ চকিতে পাওয়া উপলব্ধি

তবে কথা হলো-যা প্রকাশ করতে পেরেছি, তার চেয়ে বেশি পারি নি! সব কি বলা যায়? নাকি বলা সঙ্গত। যা বলতে পারি নি, সে সব আমারই থাক্।…” এখানে বলা না-বলা বিষয়ে ‘বোধ’ থেকে একটি উদ্ধৃতি উল্লেখ প্রাসঙ্গিক-

                “বলা গল্পের চেয়ে জীবনের না-বলা গল্প আর বলতে না-পারা গল্পের সংখ্যা অনেক বেশি।”

লেখকের বইটিতে ৫২০টি আত্ম-উপলব্ধি খুবই সহজ ভাষায় লিখিত । উক্তি বা বচনের মতো করে উপস্থাপিত বিষয়গুলোর বক্তব্য অত্যন্ত শক্তিশালী ও বাস্তব জীবনে প্রয়োগযোগ্য। 

            মন ও বিবেককে জাগিয়ে জীবনের সকল ইতিবাচক-নেতিবাচক পরিস্থিতিতে মানিয়ে চলার জন্য এই ৫২০টি মূল্যবান ‘বোধ’-এর চর্চা বা অনুশীলন ব্যক্তি, পরিবার এবং পেশাগত জীবনে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। বাস্তব জীবনে ইতিবাচক চিন্তা মানুষকে উন্নতির পথে নিয়ে যায়, মানুষ সুখী হয়; অন্যদিকে নেতিবাচক ভাবনা জীবনে হতাশা ডেকে আনে আর জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ-এই বইটি আত্মোন্নয়ন করতে ইচ্ছুক পাঠকদের জন্য এক মূল্যবান দিকনির্দেশনা। বইটি শুধু উৎসাহদায়ক উক্তিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি বাস্তবভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি ও পরিকল্পনার মাইলফলক। মৌলিক মূল্যবোধ ও চরিত্রকে শক্তিশালী করে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের ভিত্তি গড়ে তুলতে মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের গুরুত্ব দেয় এই ‘বোধ’ বা উপলব্ধিগুলো।

            বইটি পাঠকের মনে গভীর ভাবনার জন্ম দেবে এবং নিজের জীবনের দিকে নতুন দৃষ্টিতে তাকাতে শেখাবে। বলা চলে, বইটি আত্মবিশ্লেষণের এমন একটি হাতিয়ার যা লক্ষ্যভিত্তিকভাবে ব্যবহার করতে উদ্বুদ্ধ করবে। মানুষ যা ভাবে, তা-ই সে হয়ে ওঠে। চিন্তা বা উপলব্ধি তার চরিত্র, ভাগ্য এবং কর্মজীবনের ভিত্তি-এটাই ‘বোধ’-এর অন্তর্নিহিত কথন।

 পেশায় চিকিৎসক, সুলেখক আতাউর রহমানের এই উক্তি/বোধগুলো যুগোপযোগী ও সর্বজনীন। এগুলো আধুনিক জীবনেও দারুণভাবে কার্যকর।  চিন্তাশীল এই লেখক প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনশীলতা এবং সমাজে মানুষের মৌলিক চরিত্র, মূল্যবোধ ও সম্পর্কের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরেছেন বলেই মনে হয়েছে। সময় পরিবর্তিত হলেও বইটির দৃষ্টিভঙ্গি যেন চিরন্তন প্রাসঙ্গিকতাকে ধারণ করেছে।

            কৌতূহলী পাঠকদের জন্য নিচে লেখকের কয়েকটি বোধ/উপলব্ধি/উক্তি উল্লেখ করা হলো :

  • নির্বোধের কথার উত্তরে নীরবতাই শোভন প্রতিবাদ। তার আচরণের বিপরীতে এই-ই মোক্ষম ‘মগজাস্ত্র’!
  • পূর্ণ হতে চাইলে দরকার আগে শূন্য হওয়া।
  • জ্ঞান দম্ভনাশী। দম্ভ জ্ঞানধ্বংসী।
  • আলস্য বরং ভালো, অকাজ করার চাইতে।
  • দুর্ভাষী লোকটার মতো দুর্ভাগা আর কে!
  • সত্য ঠিক মায়ের মতো, তার কাছে ফিরে আসতেই হয়।
  • কথা কম। বিপদ কম। শান্তি অটুট।
  • ‘দেয়ালেরও কান আছে’-ওই কানটা একটু শোনেও বেশি।
  • এক দুয়ার বুজে গেলে খুলে যায় হাজার দুয়ার।
  • সমালোচনা-মুখে সবাই চায়, অন্তরে কেউই নয়।
  • নিজের কোনো পথ নেই, লোকটা সবার ডাকে সাড়া দিয়ে সবার পথে চলে। চূড়ান্তে কোথাও পৌঁছানো হয় না তার।
  • সবদিন সবাইকে ভালো লাগে না।
  • লেখা হচ্ছে লেখকের ভাবনার অনুবাদ।
  • ধর্মীয় উগ্রবাদ নিজেই একটা ধর্ম। প্রচলিত সব ধর্মের মৌলচেতনার বিরুদ্ধে তার অবস্থান। ঘৃণা তার পরাক্রমশালী অস্ত্র।
  • হাতে যার কাজ কম, অনুযোগ-অভিযোগ তারই সবচেয়ে বেশি।
  • সুবিধা যে বেশি নিয়েছে, ভোগাবেও সে-ই বেশি।
  • প্রেমে নয়, মানুষ চেনা যায় বিচ্ছেদে।
  • সুখ! যে পেতে জানে না, সে দিতেও জানে না।
  • প্রস্তুতি ছাড়া সাফল্য আসে না। এলেও থাকে না। থাকলেও ভোগায়।
  • আমিত্ব শেষপর্যন্ত আমাকেই ছোট করে।
  • যেখানে যা হচ্ছে, যেভাবে যা চলছে, কে জানে-সেটাই হয়তো সবচাইতে ভালো।

সুন্দর, সমৃদ্ধ এই বইটি প্রকাশের জন্য স্বপ্ন ’৭১ ধন্যবাদার্হ। মনোরম ও রুচিসম্মত বইয়ের জামা (প্রচ্ছদ) ডিজাইন করেছেন কাজী আব্দুল্লাহ আল নোমান। ‘বোধ’-কঙ্কালের (পৃষ্ঠা) ১০৪টি।  বইটির চমৎকার শরীরকাঠামো (বাঁধাই) রয়েছে। বইটির সাইজ ও ওজন হাতে নিয়ে পড়ার জন্য আরামদায়ক। মূল্য মাত্র ২০০ টাকা যা পাঠকের পকেটকে স্বস্তি দেবে।

‘বোধ’ পাঠক সমাদৃত হয়ে লেখক ও প্রকাশককে আনন্দে আপ্লুত করুক, এই প্রত্যাশা।

মুহাইমীন আরিফ : শিক্ষক (অধ্যক্ষ)

বইয়ের নাম: বোধ
লেখক : আতাউর রহমান
প্রকাশনী : স্বপ্ন ‘৭১ প্রকাশন
প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০২৫
পৃষ্ঠা: ১০৪
মূল্য: ২০০ টাকা
প্রাপ্তী স্থান: কাঁটাবন (ঢাকা) স্বপ্ন ‘৭১, পাঠক সমাবেশ, বাতিঘর ( বাংলামোটর)

আরও পড়ুন