সাতোশি ইয়াগিশাওয়ার ‘মরিসাকি বইঘরের দিনগুলি’

সময়টা এই দশকের শুরুর দিকের ঢাকা শহর। তখনও দুনিয়াজুড়ে ইন্টারনেট, ফেসবুক, ইন্সটাগ্রামের রাজত্ব শুরু হয় নাই। মানুষের হাতে তখনও বিষন্ন হওয়ার মতো সময় প্রচুর সময় বাকি থাকে। একা মানুষেরা তখন স্ক্রিনের দিকে না তাকিয়ে মাটিতে কি যেন খুঁজতে খুঁজতে হাটে। পাশের মানুষের সঙ্গে ধাক্কা খেলে চোখ তুলে একে অপরের দিকে তাকায়। তারপর কেউ কিছু না বলে যে যার রাস্তায় চলে যায়।
এমন এক বিষন্ন বিকালে নীলক্ষেতের পুরাতন বইয়ের দোকানগুলোর মাঝ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। ঘণ্টা খানেক আগে বৃষ্টি হইছে। চারপাশে ভেজা মাটির নরোম গন্ধ। বইয়ের দোকানদারেরা আবার রাস্তার পাশে বই সাজানো শুরু করেছে। পাশের বিরিয়ানির দোকানদারেরা লাল কাপড়ে ঢাকা ডেগচির উপর ঢাকনা দিয়ে আঘাত করে ঝনঝন শব্দে কাস্টমারদের ডাকতেছে, ‘তেহারি, কাচ্চি, মোরগ পোলাও গরম গরম।’ মাটির সোঁদা গন্ধ, পুরাতন বইয়ের স্যাঁতসেঁতে ভেজা ঘ্রাণ আর ঢাকনার ঝনঝন শব্দে চারপাশে এক ধোয়াটে পরাবাস্তব পরিবেশ তৈরি হয়েছে। পেটে খাবার নাই, পকেটে নাই পয়সা, নাই জীবনের কোন উদ্দেশ্য। এরমাঝেই চায়ের তেষ্টায় দুপাশে সারি সারি বই দেখতে দেখতে এগিয়ে যাচ্ছি। হঠাৎ চোখ চলে গেল একটা পুরাতন বইয়ের দিকে। ফুটপাতে হাটু মুড়ে বসে পড়া শুরু করলাম। একটু পরে হাতে নিলাম আরেকটা বই। এভাবে একের পর এক বই ঘাঁটাঘাঁটি করতে লাগলাম আর মনে হতে লাগল যদি এখানেই থেকে যেতে পারতাম সবসময়ের জন্য। দিনভর বই বিক্রি করতাম আর পড়তাম আর এভাবেই হাজার হাজার বইয়ের মাঝে কেটে যেত এক জীবন। এ হচ্ছে এক আধা কাল্পনিক, আধা বাস্তব জীবন যা দেখা যায়, অনুভব করা যায় কিন্তু যাপন করা যায় না। কারণ যে বই বিক্রি করে তার পড়ার ইচ্ছা বা ফুসরত কোনটাই নাই। আর যে বই পড়ে তার নাই বইয়ের সঙ্গে সারা দিন থেকে যাওয়ার সুযোগ।
কিন্তু জাপানের টোকিওর জিমবোচোর পুরাতন বইয়ের মার্কেটে এই আধা কাল্পনিক ও আধা বাস্তব জীবনই বাস্তবতার অনেক কাছাকাছি এসে মিশে গেছে। এই পুরাতন বইয়ের মার্কেটের এক পুরাতন বইয়ের দোকান হলো ‘মরিসাকি বইঘর।’ পৈত্রিকসূত্রে মারিসাকি বইঘরের মালিক সাতোরু মামা। উপন্যাসের প্রোটাগনিস্ট তাকাকো তার জীবনের এক হতাশাজনক সময়ে এখানে চলে আসে মামার কাছে। তখন তাকাকোর মাত্রই তার প্রেমিকের সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়েছে। হতাশায় ছেড়ে দিয়েছে তার পুরাতন চাকরি। যে ফ্ল্যাটে থাকত তার মালিকের সঙ্গেও চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। জীবন যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন, টোকিওতে থাকার কোনো জায়গা নাই তখনই মামা তাকে বলে, চলে আয়।
এই সাতোরু মামা এক অদ্ভুত মানুষ। ভুলোমনা, একগুয়ে, উচ্চবিলাসহীন, সহজসরল, রাগী আবার নরম মনের এই মানুষটি পছন্দ করে বই পড়তে। সে একাধারে বই বিক্রি করে আবার বই পড়তে ভালোবাসে। মরিসাকি বইঘরের বইগুলোকে সে সন্তানের মতো পরম মমতায় আগলে রাখে। একেকটা দূর্লভ পুরাতন বই খুঁজতে সে মাইলের পর মাইল সাইকেল চালিয়ে যায়। এই বই পাগল সাতোরু মামা আর তার ভাগ্নি তাকাকোর জীবনের এক আপাতদৃষ্টে সাধারণ কিন্তু অদ্ভুত সময়ের গল্প এই ‘মরিসাকি বইঘর।’
জিমবোচোতে যেও তাকাকো অবাক হয়ে দেখে তার থাকার জায়গা হয়েছে ‘মরিসাকি বইঘরে’র ই দোতলায় যেখানে অতিরিক্ত বইগুলো স্তুপ করে রাখা হয়। শুরুতে স্বাভাবিক ভাবেই তার মন খারাপ হয়। কিন্তু অতি দ্রুতই সে বইয়ের স্তুপ গুছিয়ে নিজের থাকার জন্য এক চিলতে জায়গা তৈরি করে নেয়। মরিসাকি বই ঘরে কাজ শুরু করে তাকাকো। দিনের বেলা মামা দোকানে আসার আগ পর্যন্ত সে দোকান সামলায়। মামা আসার পর চলে যায় দোতলায় নিজের রুমে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকতে। এভাবেই এক সময় সে বই পড়া শুরু করে। বই পড়ার পশাপাশি পরিচয় হয় ‘মরিসাকি বই ঘরের’ নিয়মিত কাস্টমারদের সঙ্গে। সাবু নামের বেশি কথা বলা টেকো ভদ্রলোক, প্রতিদিন মলিন জামা পরে কাগজের ব্যাগ হাতে আসা আরেক ভদ্রলোক যে অনেক টাকার বই কেনে প্রতিবার। এমন সব অদ্ভুত মানুষদের আনাগোনা মরিসাকি বই ঘরে। সাতোরু মামা ভাষায় যাদের সাথে সম্পর্কের বিষয়টা এই ব্যবসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। এই উপন্যাসের আরেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র সাতোরু মামার স্ত্রী মোমোকো মামি। মোমোকো মামি একদিন হঠাৎ করে মামাকে ছেড়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছিলেন। ঠিক তেমনি আবার হঠাৎ করে ফিরে এলেন জিমবাচোতে। এসেই কাঁধে তুলে নিলেন ‘মরিসাকি বই ঘরের’ দায়িত্ব। মোমোকো মামি আসার পর তাকাকোর উপলব্ধি হয় শুধু সাতোরু মামা না, মোমোকো মামিও এই মরিসাকি বই ঘরের এক স্তম্ভ। মোমোকো মামির কাছে সতোরু মামা যেনো এক ভুলোমনা তরুণ যাকে তিনি এখনো দেখে শুনে রেখেছেন।
কিন্তু জীবনের নির্মম বাস্তবতায় একদিন মরিসাকি বই ঘরের উপরে কালো অন্ধকার নেমে আসে। মোমোকো মামি সাতোরু মামা থেকে ধীরে ধীরে দুরে সরে যায়। বিপন্ন বিদ্ধস্ত সাতোরু মামা নিজেকে গুটিয়ে নেন। সাময়িক ভাবে বন্ধ হয়ে যায় ‘মরিসাকি বই ঘর।’ এই সাময়িক বন্ধ কতদিনের কেউ জানে না। দেখতে দেখতে এক মাস হয়ে যায়। নিয়মিত খদ্দেররা প্রায়ই বন্ধ ‘মরিসাকি বই ঘরের’ সামনে থেকে ঘুরে যায়। প্রতিবারই দেখতে পায় বন্ধ ‘মরিসাকি বই ঘর।’ ওরা মনে মনে সাতোরু মামার জন্য দোয়া করে আর আশা করে একদিন মরিসাকি বইঘর খুলবে।
আসলেই মরিসাকি বইঘর আর কোনোদিন খুলবে এমন কোনো লক্ষণ আর দেখা যায় না। তারপরও তাকাকো মাঝেমধ্যে গিয়ে পেছনের দরজা খুলে মরিসাকি বইঘরে ঢুকে। এমনই একদিন বইয়ের তাক পরিষ্কার করতে যেয়ে তাকাকো খুঁজে পায় এক রহস্যময় নোটখাতা। যে নোটা খাতায় সাতোরু মামার জন্য মোমোকো মামির নিজের হাতে লেখা একটা চিঠি আছে। সেই চিঠিই আবার নতুন করে জীবনে বেঁচে থাকার প্রেরণা দেয় সাতোরু মামাকে। সেই চিঠির ফলেই আবারও নতুন করে জেগে উঠে জিমবাচোর চিরচেনা ‘মরিসাকি বইঘর।’ যে বইঘর টোকিওর বই প্রেমিদের কাছে নিছক বইঘরের চেয়েও বেশি কিছু। এমন কিছু যা বাদ দিলে মানুষ হয়ে যায় রক্তমাংস সর্ব্বস্ব এক যান্ত্রিক শরীর।
