হুমায়ুন কবিরের বহুমাত্রিক উপন্যাস কানফুল!

কী ভাই কথা কইতেছেন না যে, আমার কথায় বুঝি রাগ করলেন? আরে না। রাগ করি নাই, একটু ক্লান্ত, তাই। চা খাইয়া নিই তারপর কথা অইব, জাফর সাহেবের কথার উত্তরে জিন্নত আলী বলে। জাফর সাহেব বুঝতে পারেন জিন্নত আলী অন্যমনস্ক। কী যেন ভাবছে। হয়ত লোকটা কোনো অশান্তিতে আছে…. হ্যাঁ সুপ্রিয় পাঠক, অত্যন্ত জীবন ঘনিষ্ঠ এই কথোপকথনটি একটি উপন্যাসের শুরুর দিককার। সকালের সূর্য দেখে যেমন করে সারাদিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুমান করা যায়; তেমনি এই ক’টি চরণ থেকে আলোচ্য উপন্যাসটির একটি পথরেখা সহজেই অনুমান করা যায় বৈকি। বন্ধুরা, যে উপন্যাসটির কথা বলছি, তার নাম কানফুল। লিখেছেন কবি এবং কথাসাহিত্যিক আমার অত্যন্ত প্রিয়জন হুমায়ুন কবির৷
হুমায়ুন কবির একজন সুলেখক। দীর্ঘদিন যাবত একাধারে লিখছেন সাহিত্যের প্রায় সব শাখায়। যা তাকে নিঃসন্দেহে সাহিত্যে একটি নিজস্ব ধারা সৃষ্টিতে সাহায্য করেছে। ছাত্রাবস্থায় তাঁর লেখালেখির হাতেখড়ি। অবশ্য মাঝে দীর্ঘদিনের একটা বিরতি ছিল। তবু্ও উপন্যাস, গল্পগ্রন্থ এবং কবিতাসহ তাঁর মোট প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা নয়টি।
কানফুল নামটি শুনলে যে কারো মনে হতেই পারে গাঁয়ের কোনো কুলবধুর নিষ্পাপ মুখচ্ছবি। সদ্য বাপের বাড়ির মায়া ত্যাগ করা একজন কিশোরী অথবা সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ যুবতীর অদম্য স্বপ্ন। যে হয়ত শশুর বাড়ি কী তাও ভালো করে বুঝেও না। এসব প্রেক্ষাপটে কানফুল উপন্যাসটি হাতে নেওয়ার সময় ভেবেছিলাম হয়ত একটি সামাজিক উপন্যাস পড়তে যাচ্ছি। শরৎচন্দ্রের উপন্যাস পড়তে পড়তে বড় হওয়া এই আমার কাছে সামাজিক উপন্যাস এখনো আফ্রিকানদের বিস্কুট খাওয়ার মতোই লোভনীয় কিছু একটা। কিন্তু বইটি পড়তে পড়তে একটা সময় মনে হল, আমি সামাজিক উপন্যাসের গণ্ডি পেরিয়ে গেছি অথবা পেরিয়ে যাচ্ছি। অতঃপর একটা সময় মনে হল, আমি কোনো নাগরিক উপন্যাস পড়ছি। অবশ্য শেষ পর্যন্ত আমার এই ধারণাও ধোপে টিকল না। তাহলে শেষমেশ যে প্রশ্নটা বড় হয়ে দাঁড়ায় তা হল, কানফুল কী ধরনের উপন্যাস? এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে যদিও আমার ভেতরে কিছুটা দ্বিধা, কিছুটা দ্বন্দ্ব কাজ করেছে; তবুও কানফুলকে একটি কমপ্লিট বহুমাত্রিক উপন্যাস বলা যেতেই পারে।
এখন প্রশ্ন হল, আমার মতো কেউ একজন বললেই কি কানফুল বহুমাত্রিক উপন্যাস হয়ে যাবে? আমি গভীর ভাবে বিশ্বাস করি, কখনও নয়। তাহলে আসুন, কানফুল বহুমাত্রিক উপন্যাস কিনা এই বিষয়টি জানা এবং বোঝার জন্য কানফুলের ভেতরে অন্তত কিছুটা ডুব দেয়া যাক। উপন্যাসটির প্রেক্ষাপট মূলত একটি গ্রামীণ পরিবার কেন্দ্রিক। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় যে পরিবারটি একটা সময় শহরে পাড়ি জমায়। অবশ্য তারও আগে জিন্নত আলীর পরিবার গ্রামেই থাকতো। কিন্তু এভাবে একা একা আর কতদিন? তাই পরিবারের সবাইকে শহরে নিয়ে আসে। দক্ষিণ শাহজাহানপুরের রেলগেইট সংলগ্ন এলাকায় বাসা ভাড়া নেন। আর সেই পরিবারের কেন্দ্রীয় চরিত্রে আছেন জিন্নত আলী এবং তার স্ত্রী সাহিদা। সেই সাথে এই দম্পতির তিন সন্তান। দুই ছেলে অপু, নবু এবং মেয়ে চায়না। ছেলেদের মধ্যে অপু বড় এবং নবু ছোট। কিন্তু শহরে এসেও তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরে না। বরং ছেলে দুটি বখাটে ছেলেদের সাথে মিশে নিজেরাও বখাটের খাতায় নাম লেখায়। একদিন জিন্নত আলী বাজার সদাই করে বাসায় ঢুকে দেখে তার স্ত্রী সাহিদার খুব মন খারাপ। জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে? স্ত্রী জবাব দেয়, নবুরে মাইরা ফালাইছে শহীদ সাবের হোলায়। জিন্নত আলী জানতে চায়, কেন মারছে। সাহিদা জবাব দেয়, তা কেমনে জানি। মাইনষের হাতে আমগো মাইর খাওন ছাড়া কঁয়ালে আর ভালা কিছু নাই। কিল্লাই আই ঢাকা আইলাম। ও আল্লারে আঁর নবুরে শেষ কইরা দিছে।
তখন জিন্নত আলী বউরে ধমক দেন…, এখান থেকেই উপন্যাসটির প্রকৃত ক্লাইমেক্সের শুরু। এরপর পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা জুড়ে অসংখ্য ক্লাইমেক্সে ভরপুর পুরো উপন্যাসের শরীর। জিন্নত আলী একটা কনস্ট্রাকশন ফার্মে সুপারভাইজারের চাকুরি নেয়। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস তার পিছু ছাড়ে না। এক পর্যায়ে তার সেই চাকুরি চলে যায়। কিন্তু জিন্নত আলী থেমে থাকে না। নতুন উদ্যমে আশায় বুক বাঁধে। নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে স্বপ্ন পূরণ নামক আরেকটি কোম্পানিতে চাকুরি পায়। তবে ভাগ্যের চাকা সেখানেও ঘুরে না। চাকুরি করে ঠিকই ; কিন্তু বেতন ভাতা ঠিক মত পায় না। এই পর্যায়ে জিন্নত আলী আরও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। বাড়িভাড়া বকেয়া পড়তে থাকে। প্রতিদিনই দেনা বাড়তে থাকে। দেনার দায়ে একটার পরে একটা বাড়ি ছাড়তে হয়। সংসারের নিতান্ত প্রয়োজনীয় সামগ্রীর মায়া ত্যাগ করে সেগুলো বন্ধক রাখতে হয়। শখের খাট, পালংক থেকে শুরু করে টেলিভিশন পর্যন্ত বিকিয়ে দিতে হয় বাড়িওয়ালার হাতে। একটা পর্যায়ে দেওয়ার মতোন আর তেমন কিছুই বাকি থাকে না। বাকি থাকে কেবল এক জোড়া কানফুল । উন্মত্ত যৌবনে প্রিয়তমা স্ত্রীকে উপহার দেওয়া স্মৃতি স্মারক। যেখানে একজন স্ত্রীর নারী জীবনের সমস্ত সম্পদ কানফুলের বেশে লুকায়িত থাকে৷ সেই পরম আরাধ্য কানফুল কি শেষ পর্যন্ত হাত ছাড়া হয়ে যাবে…? ঠিক তাই। দেনায় দেনায় জর্জরিত জিন্নত আলী এক পর্যায়ে বাড়িওয়ালার কাছে সেই কানফুলও বন্ধক রাখতে বাধ্য হয়।ঠিক এই পর্যায়ে এসে উপন্যাসটি একটা ভিন্ন মাত্রা পায়। বলা যায়, সামাজিক থেকে নাগরিক; অত:প র নাগরিক থেকে বহুমাত্রিক। মায়ের কানফুল বন্ধক দেওয়ার খবর জিন্নত আলীর দুই ছেলে অপু এবং নবু কোনোমতেই মেনে নিতে পারে না। যে ছেলেরা একটা সময় বাবার সংসারের তীব্র অভাব অনটন সহ্য করতে না পেরে চলে গিয়েছিল… সেই তারাই মায়ের কানফুলের টানে আবার ফিরে আসে। কিন্তু ফিরে এসেই বা কি লাভ? তারাও যে কপর্দকহীন! কিন্তু মায়ের প্রতি এবং মায়ের কানফুলের প্রতি ঐকান্তিক ভালোবাসার কাছে সবকিছু পরাজিত হয়। বড় ছেলে অপু নিজের একটা কিডনি বিক্রি করে বাড়িওয়ার নিকট থেকে সেই কানফুল ফিরিয়ে আনে। ঘটনার এইঘনঘটা সবাইকে হতবুদ্ধি করে দেয়। নাগরিক জীবনের নোংরা রুপ-টা তাদের সবার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে জ্বলতে থাকে। তারা বুঝতে পারে; শহরের মানুষগুলো ইট, পাথরের সাথে থাকতে থাকতে নিজেরাও ইট পাথরের মতন কঠিন হয়ে গেছে। তারা সিদ্ধান্ত নেয়, যে শহরের মানুষের হৃদয়ে কোনো দয়া-মায়া নেই, একরত্তি ভালোবাসা নেই… সেই শহরে তারা আর থাকবে না। তারচেয়ে বরং তাদের ফেলা গ্রাম এবং গ্রামের মানুষগুলো ঢের ভালো। এই পর্যায়ে তাদের অনুভূতি দাঁড়ায় – যারা সামান্য টাকার জন্য ভাড়াটিয়া কে অপমান করে, জিনিসপত্র রেখে দেয়, পাঁচ হাজার টাকা ভাড়ার জন্য ত্রিশ হাজার টাকার কানফুল রেখে দেয়, আত্মসাৎ করে তারাই ছোটলোক।… এমন পিশাচ রাক্ষসের শহরে আমরা আর থাকব না।
উপন্যাসটির কানফুল নামকরণ যথার্থ এবং মানানসই। আমার কাছে মনে হয়েছে এই কানফুলকে ঘিরেই উপন্যাসের অন্তর্নিহিত ভাব স্বমহিমায় এবং সগৌরবে আবর্তিত হয়েছে। নারী জীবনের সার্থকতা বিবাহ এবং মাতৃত্বের প্রতীক এই কানফুলের মর্যাদা রক্ষা করার মাধ্যমে জিন্নত আলীর এবং তার পরিবারের বাকি সদস্যদের কাছে শহুরে জীবনের অসারতা এবং মেকি চাকচিক্যের খোলস উন্মোচিত হয়েছে। মূলত এরই ফলশ্রুতিতে উপন্যাসটি চরম পরিণতি লাভ করেছে। এখানেই শেষ নয়, আরও অনেকগুলো চরিত্র বড় গল্পের প্রয়োজনে লেখক অত্যন্ত সার্থকতার সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন। তবে কাহিনি নির্ভর উপন্যাসটিতে কিছুটা পারিপার্শ্বিকতা এবং ফিলোসোফি নির্ভরতা থাকলে আরও অনেক ভালো হতে পারতো বলে আমার বিশ্বাস।
১১২ পৃষ্ঠার উপন্যাসটির প্রচ্ছদ ভাবনা দারুণ! প্রচ্ছদ শিল্পী নিয়াজ চৌধুরী তুলি। প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২৫। প্রকাশনায়: স্বপ্ন ৭১ প্রকাশন। বইটি ছাপা, বাঁধাই, কাগজ, মেকআপ, গেটআপ, চমৎকার হয়েছে। মোট কথা, কথাসাহিত্যিের একজন পাঠক হিসাবে কানফুল আমার অসম্ভব ভালো লেগেছে। আমি বইটির ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা কামনা করছি।
বইটি স্বপ্ন ‘৭১ ছাড়াও পাওয়া যাবে রকমারি, বইচারিতা এবং উদার আকাশ (ভারত)।
জসীম উদ্দীন মুহম্মদ : কবি, কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও সহযোগী অধ্যাপক, সরকারি আনন্দ মোহন কলেজ, ময়মনসিংহ।
বইয়ের নাম : কানফুল
লেখক : হুমায়ুন কবির
প্রচ্ছদ : নিয়াজ চৌধুরী তুলি
প্রকাশনী: স্বপ্ন ‘৭১ প্রকাশন
পৃষ্টা : ১১২
মূল্য : ২৮০ টাকা
