রাইমঙ্গল: বাদাবনের আঁচলঘেঁষা সন্তানদের কাহিনি

বাদাবন তথা সুন্দরবনের লোকজীবন এবং বাস্তুতন্ত্রের চমৎকার এক কাহিনি চিত্রায়ণ রাইমঙ্গল। প্রেম-বিচ্ছেদ, জন্ম-মৃত্যু, সংঘাত-সংস্রবে বেঁচে থাকার সংগ্রামের এই জটিল আখ্যানের কেন্দ্রবিন্দু ‘রাই’।

রায়মঙ্গল নদীর পাড়ে লহুখালী গ্রামের লোকালয় থেকে বেশ দূরের এক প্রান্তে সোনামণি বেওয়ার আশ্রয়ে তার অস্তিত্ববাদী লড়াই। সেই লড়াইয়ের চারপাশে আছে দারিদ্র্য আর কুসংস্কারে মোড়া প্রান্তিক জনজীবন এবং সে জীবনকে ঘিরে বেড়ে ওঠা অপরাধপ্রবণতার হালচাল।

রাইমঙ্গল-এ স্পষ্ট মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যের প্রভাব। নিখোঁজ মঈনের সঙ্গে রাইয়ের প্রেমের আখ্যান রাধা-কৃষ্ণের পৌরাণিক প্রেমকাহিনির সঙ্গে তুল্য। আয়ান ঘোষ রাধার পতি আর জটিলা-কুটিলা তার শাশুড়ি ও ননদ। রাইমঙ্গল-এ এসেছে-
হাবড়া গৌরাঙ্গকে রাইয়ের মনে হয় আয়ান ঘোষ আর নবীনাকে জটিলা কুটিলাদের কেউ। কানুর বাঁশি যেন তাকে ডাকছে, আর রাই ঘর থেকে বের হতে পারছে না।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে দেখা যায় মামি আর ভাগনের মধ্যে প্রেমের নিষিদ্ধ সম্পর্ক। রাইমঙ্গল-এ দেখা যায় ভিন্ন ধর্মের দুই নর-নারীর মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক, যা গ্রাম্য সমাজের বিবেচনায় গর্হিত অপরাধ।
হিন্দুধর্মীয় বিয়েতে বিচ্ছেদ সম্ভব নয়—এ মর্মেও নারী কলঙ্কের ভাগী হয় রাইমঙ্গল-এর কাহিনিতে। এ সবকিছুকে তুচ্ছজ্ঞান করেই রাই আর মঈনের প্রেম চলেছে।

মনসামঙ্গলের বেহুলা রাইমঙ্গল-এ ফিরে এসেছে বনবেহুলা হয়ে। রাইয়ের এই ধ্রুব অস্তিত্ব আখ্যানের নামকরণেও তার মঙ্গলবার্তা ঘোষণা করছে। গভীর লেখা আমাদের ভাবনায় ফেলতে পারে। রাইমঙ্গল মঙ্গলকাব্যের মধ্যযুগের নারীর কঠিন সব বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দেয়।
লেখক নারীর সহজাত ঈর্ষার মনোবৃত্তি রাইয়ের চরিত্রে ফুটিয়ে তুলেছেন দুভাবে। প্রথমত, সোনামণি বেওয়ার প্রতি, দ্বিতীয়ত মঈনের কল্পিত অর্ধাঙ্গী বাঘিনীর প্রতি।

বাঘবিধবা সোনামণির জীবনে অভাব নিরাপত্তার, রাইয়ের জীবনে অভাব প্রেমের। সোনামণি স্বপ্ন দেখতে পারে, রাই তা-ও পারে না। কারণ মঈনের প্রত্যাবর্তন অনিশ্চিত। প্রেম, আদরের অভাব রাইয়ের তাই পূরণ হয় না। ঈর্ষা আসে সেখান থেকেই।

আবার মঈন মেচি বাঘের সঙ্গে সংসার পেতেছে-এমন খবর লোকমুখে রাষ্ট্র হলে রাই বিচলিত হয়। সেখানেও তার ঈর্ষা। রাইয়ের সংলাপেই এ ঈর্ষা স্পষ্ট—

আচ্ছা বুবু কও তো, সেই মেচিডা কি আমার চেয়ে সুন্দর! সে কি আমার চেয়ে লোকডারে বেশি ভালোবাসিছে?

আবার ঈর্ষার শেষে একটা আশঙ্কার সুর রাইয়ের কথায়। নারীর এ আশঙ্কার উৎসমুখ খাঁটি প্রেম।
প্রেমের মাহাত্ম্য সমানভাবে প্রকাশিত হয়েছে সোনামণি বেওয়া ও কাশেম ডাকাতের রসায়নে। একজন শীর্ষ সন্ত্রাসীও প্রেমের ভুবনে এক নিষ্পাপ নিষ্কলুষ সত্তা।

যে সোনামণিকে অপয়ার অপবাদ দিয়ে গ্রামছাড়া করতে উদ্যত সকলে, সেই সোনামণিকেই ভালোবেসেছে দুর্ধর্ষ ডাকাত কাশেম। এক মানুষের মধ্যে দুই সত্তার বসত যে থাকতে পারে, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ কাশেমের চরিত্র। অথচ সোনামণির নিরাপদ আশ্রয় কাশেম। অর্থেরও, প্রেমেরও। সে জন্যই সোনামণির সংলাপে সে অন্য রকম—
আমি জানি তোর মনে কী ভাবনা চলতিছে। তোগের কাছে কাশেম ডাকাইত, খুনি, আমার কাছে সে অন্য কিছু।

রাইমঙ্গল-এর সমাজ পুরুষতান্ত্রিক প্রান্তিক সমাজ। তাই রাই আর সোনামণি সে সমাজের নিগৃহীতদের দলে। একজন পরকীয়ার বলি হয়ে, অন্যজন বাঘবিধবার অপবাদ মাথায়।

রাইয়ের বালিকাজীবনের কথা যতটুকু জানা যায়, ততটুকুও পুরুষতন্ত্রের জাঁতাকলে পিষ্ট। যে সমাজে নারী নিজের জীবনসঙ্গী পছন্দ-অপছন্দের মতামত দেওয়ার অধিকার রাখে না, সে সমাজ জাঁতাকল বটে।

গৌরাঙ্গ চরিত্রটি দিয়ে সুন্দরবনে চোরাচালানের অন্ধকার বাস্তবতা তুলে এনেছেন লেখক। করতে চেষ্টা করেছেন ক্ষমতাবানের ইশারায় ঘটে চলা একাধিক অনিয়মের সুলুকসন্ধান। গৌরাঙ্গ ও সুবেশ চরিত্র দুটির বিশেষ জরুরি ভূমিকা পশুর চামড়া, হাড় এবং মোম-মধুর বেআইনি ব্যবসার মুখোশ উন্মোচনে। সমান্তরালে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কালো দিকও নির্দেশ করে দেয় রাইমঙ্গল।
গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রসমূহের (যেমন রাই, সোনামণি, সুবেশ, নবীনা) পরিণতিবিচারে তত্ত্বীয় আলোচনার সুযোগ আছে আরও। রাই ও সোনামণি—যারা কখনো অস্তিত্বের সংকটে পড়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেয়নি, প্রবল অস্তিত্ববাদের ধারক তারা।

আবার সুবেশ ও নবীনার পতনের জন্য কর্মফলকে দায়ী করা যায়। নিয়তিচেতনার কথা বললেও এ ক্ষেত্রে ভুল হয় না।

পুরাণ ও লোকবিশ্বাসের এক কাব্যিক আয়োজন রাইমঙ্গল। বনবিবি, গাজী পীর, রাজা দক্ষিণ রায়, শাহ জংলীর মতো দেবতার সমাবেশ লক্ষণীয়।

২০০৭ সালে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে সংঘটিত দুর্যোগ সিডরের ভয়াবহতা তুলে আনতে গিয়ে লেখক যেভাবে তথ্য-উপাত্ত তুলে এনেছেন, তা প্রশংসার দাবিদার। তবে এ ব্যাপারটি একটি সম্ভাব্য দারুণ উপন্যাসের অপমৃত্যু ঘটিয়েছে।

আরও পড়ুন