শরৎচন্দ্রের ‘শেষ প্রশ্ন’: এক অসাধারণ লেখনী

“শেষ প্রশ্ন” শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এর সর্বশেষ উপন্যাস, প্রকাশিত হয় ১৯৩১ সালে। এটি প্রকাশের পর ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয় রক্ষণশীল সমালোচকদের মধ্যে, এ যেন সমাজ ও রক্ষণশীল জাতির প্রতি এক চপেটাঘাত।

শরৎচন্দ্র বাংলা সাহিত্যের একটা বড় অংশ দখল করে নিয়েছেন তার অসাধারণ লেখনীতে।
“শেষ প্রশ্ন” উপন্যাস এর মাধ্যমে তিনি যেন সমাজের প্রতি একটা প্রশ্ন রেখেই গেল। এটি শরৎচন্দ্রের শেষ উপন্যাস হওয়ায় অন্যান্য উপন্যাসের তুলনায় ততটা জনপ্রিয়তা পায়নি। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত মতামত যদি নেওয়া হয় তাহলে বলব “শেষ প্রশ্ন” শরৎ এর অন্যতম একটি আধুনিক চিন্তা ধারার ও রুচিশীল লেখা। তিনি সমাজের বিভিন্ন কুসংস্কার ও প্রথা ভাঙতে সর্বদা সোচ্চার ছিলেন। তা না হলে ওই সময়ে বসে তিনি এরকম একটা উপন্যাস লিখে যেতে পারত না। গৃহদাহ উপন্যাসে ও তার কিছুটা প্রভাব দেখা যায়। তার উপন্যাসে প্রেমকে তিনি সবার উপরে স্থান দিয়েছেন। তার কাছে ভালোবাসার সংজ্ঞা ছিল অন্যরকম, বিচ্ছেদের সংজ্ঞা ছিল সবার চেয়ে আলাদা, সেই বিচ্ছেদও মধুর ও ভালোবাসাময়। বিচ্ছেদকেও তিনি ভালোবাসার পূর্ণতা থেকে অধিক শক্তিশালী করে ফুটিয়ে তুলেছেন তার উপন্যাসের চরিত্রের মধ্য দিয়ে। এই আধুনিক কালে এসেও কি আমরা তার মত করে চিন্তা করতে পারি?

শেষ প্রশ্নের ‘কমল’

এ উপন্যাসের ‘কমল’ যে কতটা শক্তিশালী ও সাহসী নারী চরিত্র তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কমল ছিলো অন্যান্য চরিত্রের চেয়ে একটু ব্যতিক্রমী চরিত্র। নিজ জীবনের নিয়ন্ত্রিতা সে, দারিদ্রতা, সম্পর্কে ভাঙন, কোনো কিছুই তাকে আহত করতে পারে নি। এই সময়ে হয়তো আমরা অনেকেই ‘কমল’ হয়ে উঠতে পেরেছি বা হয়ে উঠার চেষ্টা করছি কিন্তু সেই সময়ে সেটা এতটাও সহজ ছিলো না। ধর্ম ও সমাজ এর বাইরে গিয়ে নিজের যে একটা স্বতন্ত্র চিন্তা ও মনোজগত ‘’কমল” সৃষ্টি করেছে তা আসলেই পাঠককে নাড়া দিয়েছে।

‘কমল’ চরিত্রের মাধ্যমে শরৎচন্দ্র একটি সাহসী, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং যেকোনো সত্যকে সহজভাবে গ্রহণ করার ক্ষমতা দেখিয়েছেন। যখন শিবনাথ কমলের সঙ্গে শৈবমতের বিয়ে ভুলে গিয়ে মনোরমার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিল এবং কমলকে মিথ্যা বলে আশুবাবুর গৃহে অবস্থান করছিলেন, তখনও কমল বলেছিলো:

“দুঃখ যে পাইনি তা বলিনে কিন্তু তাকেই জীবনের শেষ সত্য বলে মেনেও নিইনি। শিবনাথের যা দেবার ছিল তিনি দিয়েছেন, আমার পাবার যা ছিল তা পেয়েছি। আনন্দের সেই ছোট ছোট ক্ষণগুলো মনের মধ্যে আমার মণি মাণিক্যের মত সঞ্চিত হয়ে আছে। নিষ্ফল চিত্তদাহে পুড়িয়ে তাদের ছাই করেও ফেলিনি, শুকনো ঝর্ণার নিচে গিয়ে ভিখে দাও বলে শূন্য দুই হাত পেতে দাঁড়িয়েও থাকিনি। তার ভালোবাসার আয়ু যখন ফুরলো তাকে শান্তমনেই বিদায় দিলাম। আক্ষেপ ও অভিযোগের ধোঁয়ায় আকাশ কালো করে তুলতে আমার প্রবৃত্তিই হলোনা।”

কি সুন্দর বোধোদয় তাই না! আমরা কজন এভাবে ভাবতে পারি?

কমল যে কতটা আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ছিল তা বোঝা যায় যখন অজিত তাকে বিয়ে করতে চাইলেও সে প্রত্যাখ্যান করে বলে যে,

“আমি আপনাকে শক্ত বাঁধনে বাধতে চাই না অজিতবাবু, আপনি মুক্ত থাকুন। কখনো যদি আপনার মোহ কেটে যায় তবে যেন সহজেই প্রস্থান করতে পারেন। বরং আমার প্রতি আপনার যে দুর্বলতা সেইটা দিয়ে ই আপনি আমাকে বেধে রাখেন।”

এভাবেই শরৎচন্দ্র কমল চরিত্র কে অনন্য ও অসাধারণ করে তুলেছেন। পাঠকের হৃদয়ে ‘কমল’ হয়ে উঠার একটা ইচ্ছার বীজ বপন করে গেলেন।

আরও পড়ুন