আমার কাছে দেশ মানে এক লোকের পাশে অন্য লোক

দেশ মানে শুধুই কাঁটাতারে ঘেরা একফালি ভূখণ্ড, একটি পতাকা, একটি জাতীয় সঙ্গীত, একটি সংবিধান নয়। একটি দেশ হচ্ছে তার মানুষ–তার জনগণ। আসলে মানুষ দিয়েই তো আমরা সেই দেশটাকে চিনি। ধনসম্পদ–ইমারত–অট্টালিকা নয়, চূড়ান্ত বিচারে মানুষের সঙ্গে মানুষের সৌহার্দ্য, মানুষে মানুষে সখ্য, মানুষের সঙ্গে মানুষের বন্ধন – সবচেয়ে বড় সম্পদ। অথচ ধর্মের কথা বলে, জাতের কথা বলে আমরা যখন মানুষে মানুষে বিভাজনের দেওয়াল তৈরি করি; তখন ওই মানবিক বন্ধনটাও নষ্ট হয়ে যায়। আমরা বলি দেশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দেশ নষ্ট হয় না; নষ্ট হয় দেশের মানুষ। একইভাবে, দেশের উন্নয়ন মানে তো মানুষেরই উন্নয়ন, মানুষের জন্য উন্নয়ন, মানুষের দ্বারা উন্নয়ন। সব মানুষের সক্ষমতা বাড়লে, সুযোগের সৃষ্টি হলে, সমতা নিশ্চিতকরণ করলে তবেই না বলতে পারি, দেশ এগোচ্ছে। দেশ নিয়ে এত গৌরচন্দ্রিকার কারণ সম্প্রতি হাতে এসেছে একটি বই। বইটি লিখেছেন গোলাম রাশিদ।
ইতিপূর্বে তাঁর গল্পের বই ‘দুই কাঁধের ফেরেশতা’ পাঠক মহলে বেশ সাড়া ফেলেছিল। লিটল ম্যাগাজিন ‘অয়োময়’ সম্পাদনার জন্য পেয়েছিলেন পুরস্কারও। সম্প্রতি বেরিয়েছে তাঁর প্রথম নিবন্ধের বই ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি’। দু’মলাটে বন্দি ২৫৬ পাতার এই বইতে রয়েছে ৫০টি নির্বাচিত নিবন্ধ। নিবন্ধগুলি পূর্বে দৈনিক পুবের কলম, আরেকরকম, চার নম্বর প্লাটফর্ম, এবং সংস্কৃতি, উদার আকাশ, দ্য ওয়াল প্রভৃতি পত্রিকা-ওয়েবজিনে প্রকাশিত ও প্রশংসিত হয়েছিল। ভেবে অবাক হই, সমাজ, সাহিত্য, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিল্পকলা কোনও কিছুই লেখকের নজর এড়ায়নি। বিচিত্র বিষয়ের সমাহার হলেও, নিবন্ধগুলি পরস্পর অন্বিত। লেখাগুলির একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে মানবতাবাদ, বহুত্ববাদ, গণতন্ত্র, মত প্রকাশের স্বাধীনতার কথা; ধ্বনিত হয়েছে সাধারণ মানুষের ওপর জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী স্বর। শুরুতেই লেখক স্পষ্ট করে বলেছেন, বিরুদ্ধ মতকে যখন দেশদ্রোহিতার তকমা দেওয়া হচ্ছে বা ইতিহাসকে ব্যবহার করা হচ্ছে ঘৃণা ও বিদ্বেষের বাতাবরণ তৈরির জন্য, তখন সংবেদনশীল মানুষ তার বিরুদ্ধে সোচ্চার না হয়ে বসে থাকতে পারে না। এই লেখাগুলি তেমনই, কি-বোর্ডের সাহায্যে প্রতিবাদ। সত্যিই তো লেখকের কলমই তাঁর অস্ত্র, লেখনী দিয়েই তো তাঁর প্রতিবাদ।
বহুত্ববাদের কথা বলতে গেলে, প্রথমেই বলতে হয় ইতিহাসগতভাবেই ভারতীয় সমাজ চিরকালই বহুত্ববাদী। সম্রাট অশোক থেকে আকবর এবং ১৯৪৭-এর পরও সেই ধারা সচল থেকেছে। সংঘাত যে হয়নি এমন নয়, তবে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের স্বরটিই বারেবারে ধ্বনিত হয়েছে। ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের দীর্ঘদিন পাশাপাশি অবস্থান – উভয়ের সংস্কৃতিকেই পুষ্ট করেছে, ঋদ্ধ করেছে, সম্পূর্ণতা দিয়েছে। শিবাজীর সেনাপতি দৌলত খান হতে কিংবা আওরঙ্গজেবের প্রধান সেনাপতি বিজয় সিংহ হতে বেগ পেতে হয়নি। সবকিছু ছাড়িয়ে শাসকের কাছে প্রাধান্য পেয়েছে যোগ্যতা। তাইতো আকবরের রাজসভায় তানসেন, বীরবল, মানসিংহ সম্মানের সঙ্গে কাজ করেছেন, তাঁদের কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। ভাবুন তো, গৌড়ের সুলতান রুকুনউদ্দিন বরবক শাহ্ আর্থিক সাহায্য না করলে আমরা কি মালাধর বসুর হাত থেকে পেতাম শ্রীকৃষ্ণবিজয়ের মত চমৎকার কাব্য! কিংবা, গিরিশচন্দ্র ঘোষ কুরআনের অনুবাদ না করলে, আরবি না জানা মানুষরা কি বঞ্চিত হতাম না! ‘সকলের তরে সকলে আমরা’র উদাহরণের তালিকা বেশ দীর্ঘ। অথচ কেন্দ্রে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই হিন্দু-মুসলিম বিদ্বেষ ক্রমেই বাড়ছে, এতে যে শাসকের প্রচ্ছন্ন মদত রয়েছে সে বিষয়টি জলের মতো স্বচ্ছ। এই ঘৃণার বাতাবরণে একে অপরের মধ্যে ভুলবোঝাবুঝির পাহাড় তৈরি হচ্ছে, বাড়ছে দূরত্ব। এতে করে ভোট বৈতরণী পার হলেও, দেশের অগ্রগতি, সম্প্রীতির ছবি নষ্ট হচ্ছে সেকথা কে বোঝাবে! ঘৃণা ছড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে গান, সিরিয়াল, সিনেমার মতো জনপ্রিয় মাধ্যমগুলিও পিছিয়ে থাকছে না। লেখক আফশোস করে বলেছেন, সিনেমায় দেখানো হচ্ছে মুসলিমরা সবসময় নামাজের টুপি পরে থাকে, কথায় কথায় ইনশাআল্লাহ বলে, সবাই দাড়ি রাখে, চোখে সূরমা লাগায়, শুধুই পাঞ্জাবি পরে, সন্ত্রাসবাদী কাজকর্মে যুক্ত থাকে। অথচ এসবের বাইরে মুসলমানদের যে বৃহৎ অংশ, তাদের নিয়ে তো গল্প লেখা হয় না, সিনেমা হয় না, উপন্যাস হয় না। অথচ চাইলেই এই মাধ্যমগুলোকে কাজে লাগিয়ে গণ পরিসরে ভালোবাসার বার্তা দেওয়া যেতে পারত। পশ্চিমী মিডিয়া মারফত ইসলামোফোবিয়া ছড়ানোর বিরুদ্ধেও তিনি সোচ্চার রয়েছেন। কিভাবে এর মোকাবেলা করা সম্ভব, সে রূপরেখাও তিনি দিয়েছন।
লেখক নিজে সাংবাদিক। ভারতীয় সাংবাদপত্রের দৈন্যদশা তাঁর মনকে ভারাক্রান্ত করেছে। সৎ সাংবাদিকদের কথা বলতে গিয়ে রামনাথ গোয়েঙ্কা, বরুণ সেনগুপ্ত, গৌরকিশোর ঘোষের উত্তরসূরি হিসেবে গৌরি লঙ্কেশ, শান্তনু ভৌমিকদের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। মিডিয়ার স্বাধীনতার সংকট যে আসলে বাক্ স্বাধীনতার সংকট সেকথাও তিনি স্পষ্ট করেছেন। অথচ যাঁদের কাজ ক্ষমতাশালীদের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করা, তাঁরাই আজ পদলেহনে ব্যস্ত। বিরুদ্ধ কন্ঠ রোধ করা হোক বা ঘৃণা ছড়ানো হোক, সবেতেই সংবাদমাধ্যম এগিয়ে। তাইতো বিশ্ব প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে (২০২৩) ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান দাঁড়িয়েছে ১৬১। রিপোর্টে বলা হচ্ছে, ভারতের সংবাদমাধ্যম ‘রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট’, ‘সাংবাদিকরা হামলার শিকার হন’, ‘বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সঙ্কটাপন্ন’। ইতিহাস গবেষক হিসেবে লেখক প্রাচ্যের রোম সমরখন্দ, সোহরাওয়ার্দী পরিবারের গৌরবময় ইতিহাসের অনুসন্ধান করেছেন। এসেছে ৫২-র ভাষা আন্দোলন ও ভাষা শহীদদের কথাও। বাংলা ভাগের পরবর্তী হিংসা-হানাহানি-ক্ষত দেখে তাঁর মনে হয়েছে, হয়তো বাংলা ভাগ না হলেই ভালো হত। অবিভক্ত স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন দেখা সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, শরৎচন্দ্র বসুকে শ্রদ্ধা জানাতে ভোলেননি তিনি। এরই সঙ্গে গ্রন্থে স্থান পেয়েছে কয়েকজন বিশিষ্ট মানুষের জীবনকাহিনী। এর মধ্যে হিকি সাহেবের কথা যেমন আছে, তেমনি ফুটে উঠেছে সৈয়দ আহমেদ খান, কাজি নজরুল ইসলাম, রোকেয়া, ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দী, আবদুর রাকিব, অমর্ত্য সেনের জীবনের নানা দিক।
আর আছে ভাবনায় ঘা দেওয়া কিছু ঘটনার উল্লেখ। এই যেমন বিয়ের অযৌক্তিক খরচ প্রসঙ্গে লেখক লিখেছেন – বর্তমান সময়ে বিয়ের অনুষ্ঠান যেন মর্যাদার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিয়েতে কে কত বেশি জমকালো আয়োজন করতে পারে, কত বেশি অর্থ খরচ করতে পারে চারিদিকে তার প্রতিযোগিতা চলছে। কিন্তু এর প্রয়োজন আসলে কতটা? সাহারা কর্তা সুব্রত রায়ের ছেলের বিয়েতে ৫৫২ কোটি, ব্যবসায়ী লক্ষ্মী মিত্তালের কন্যার বিয়েতে ৩৫০ কোটি টাকা খরচের বহর সহজেই ভাইরাল হয়। উল্টোদিকে এমন কিছু উদাহরণও আছে যা আশা জোগায়। মহারাষ্ট্রের অমরাবতীর বাসিন্দা অভয় ও প্রীতি-র কথাই ধরা যাক। তাঁরা নামমাত্র আয়োজনে বিয়ের কর্তব্য সেরেছিলেন। নিজেদের বিয়ের বাজে খরচ বাঁচিয়ে, যেসব কৃষক পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী অভাবের তাড়নায় আত্মহত্যা করেছেন, সেরকম ১০ টি পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে দিয়েছিলেন। পাশাপাশি অমরাবতীর পাঁচটি লাইব্রেরীতে মোট ৫২ হাজার টাকার বইও দান করেছিলেন। একইসঙ্গে বিয়েতে আমন্ত্রিতদের সমজাতীয় সমাজসেবায় উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে সমাজের কিছু নামকরা ব্যক্তিত্বকে দিয়ে অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্যের ব্যবস্থা করেছিলেন। আবার মধ্যপ্রদেশের বুরহানপুরের তানজিম খুদ্দাম-এ মিল্লাতের মহসিন উম্মেদির মত মানুষরা, যাঁরা বিয়ের অপ্রয়োজনীয় অনুষ্ঠানকে শুধু বাতিল করেননি; বিয়ের আগে যৌতুকের নামে পণের বিরুদ্ধে লাগাতার প্রচার করেছেন। শিশুশ্রমের মতো অমানবিক দিকটিও লেখকের দৃষ্টি এড়ায়নি। শিশুশ্রমবিরোধী আইন থাকলেও, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, গৃহনির্মাণ, রেশম শিল্প, ডায়মন্ড কাটিং, কয়লা খনি এমনকি চায়ের দোকানগুলোতে পর্যন্ত শিশুরা কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। লেখকের ভাষায় – আপনি সচেতন নাগরিক, সমাজের অনাচার অবিচারের বিরুদ্ধে। অথচ আপনার বাড়ির কাজের মেয়েটি দিনের পর দিন স্কুলে না গিয়ে আপনার বাড়িতে খেটে মরছে। আপনি সেমিনারে গিয়ে শিশু দিবস নিয়ে বক্তৃতা দিয়ে হাততালি কুড়োচ্ছেন, কৈলাস সত্যার্থী নোবেল পেলে হাঁফ ছেড়ে বলছেন ঘরে একটা নোবেল এল। কিন্তু কখনো আপনার পাশের বাড়ির মন্টুর ‘বচপন’-এর খেয়াল রাখছেন না। ঘন যুক্তিপূর্ণ অথচ সাবলীল গদ্যে লেখা নিবন্ধগুলি পাঠককে আকৃষ্ট করবে, ভাবাবে, ভালোবাসতে শেখাবে, প্ররোচিত করবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে পা মেলাতে।
এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি
গোলাম রাশিদ
প্রকাশক: পরিচয় প্রকাশনী
মূল্য: ৩২০ টাকা।
