নবীনচন্দ্রের ‘পলাশীর যুদ্ধ’ ব্রিটিশ সরকারের রোষানলে পড়েছিল

২৩ জুন ১৭৫৭, বাংলার নদীয়ার পলাশীর বৃষ্টিস্নাত লক্ষবাগ আম্রকানন। মুখোমুখি দেশি-বিদেশি দুটি যুযুধান পক্ষ। একদিকে নবাব সিরাজউদ্দৌল্লার বাহিনী, অন্যদিকে লর্ড ক্লাইভের নেতৃত্বে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্রিটিশ বাহিনী। নবাব বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার আর ক্লাইভের ৩ হাজার। এই অসম লড়াইয়ের পটভূমিকাতেও নবাব সেনাপতি মীরজাফরের নেতৃত্বাধীন প্রায় ৪৫ হাজার সৈন্যের নীরব দর্শক হয়ে থাকা এবং অন্য ষড়যন্ত্রকারীদের অস্বাভাবিক আচরণে মাত্র ৭ জন ইউরোপীয় ও ১৬ জন দেশীয় সৈন্যের প্রাণের বিনিময়ে তথাকথিত যুদ্ধে ক্লাইভের জয় হয়। এই যুদ্ধ ‘পলাশীর যুদ্ধ’ নামে ইতিহাসে খ্যাত।
পলাশীর প্রান্তরে ২৩ জুনের এই যুদ্ধনাটক কিন্তু পরবর্তীকালে এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। উপমহাদেশের ইতিহাসকে আমূল পাল্টে দেয়। প্রায় দুই শতাব্দী কালব্যাপী ইংরেজ এ দেশে রাজত্ব কায়েম করে। ‘পলাশীর যুদ্ধ’কে কেন্দ্র করে বিভিন্নজন অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার মধ্যে ইতিহাস যেমন আছে, তেমন কাব্য, নাটক, উপন্যাস ইত্যাদিও আছে। পলাশী যুদ্ধের ৩০ বছর পর ১৭৮৬-৮৭ সালে লিখিত হয় রিয়াজ-উস-সালাতিন, লেখক গোলাম হুসেন সলীম। আর্থিক দিক থেকে দুর্বল অযোধ্যার মানুষ, অবাঙালি গোলাম হুসেন সলীম জর্জ উডনির কর্মচারী ছিলেন এবং তাঁর প্রেরণায় গ্রন্থটি রচনা করেন। সলীমের চেয়ে বয়সে বড় সাইয়েদ গোলাম হোসেন এরই কাছাকাছি সময়ে লেখেন সিয়ার-উল-মুতাখখিরিন। সাইয়েদ গোলাম হোসেন নবাব আলীবর্দীর আত্মীয় এবং সম্ভ্রান্ত ওমরাহ হিসেবে প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন। দুটি গ্রন্থই অতিশয়োক্তি এবং চাটুকারিতায় ভরা। ব্রিটিশ শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় সিরাজকে কালিমালিপ্ত করার প্রয়াসমাত্র। বিদেশি ঐতিহাসিক বেভারিজ, ব্লকম্যান, স্টুয়ার্ড প্রমুখ তাঁদের প্রশংসা করার সঙ্গে সঙ্গে তথ্য-উপাত্ত হিসেবে ব্যবহার করেছেন। আসলে সিরাজের চরিত্র হনন বা তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করাও ছিল ষড়যন্ত্রের একটি অঙ্গ।
অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় (১৮৬১-১৯৩০) এ কারণেই হয়তো বলেছেন, ‘বাঙ্গালার ইতিহাস নাই। যাহা কিছু বাঙ্গালার ইতিহাস নামে পরিচিত, তাহার অধিকাংশই বাঙ্গালীর লেখনী প্রসূত নহে। যাহাবা বাঙ্গালীর লেখনী প্রসূত, তাহাও বিদেশীয় লেখকবর্গের চর্ব্বিতচর্ব্বণ মাত্র।’ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় নিজে লিখেছেন নাটক সিরাজউদ্দৌল্লা (১৮৯৮)। এটি ইতিহাস নয়। এতে লেখকের নিজস্ব বিলাস, কল্পনা, বিশ্লেষণ বহুলাংশেই ঐতিহাসিক সত্যের পরোয়া না করেই লিখিত হয়েছে। এ ছাড়া তিনি যুদ্ধের প্রাক্-পটভূমি ‘অন্ধকূপ হত্যা মিথ্যাচার’ নিয়ে ১৯১৬ সালে কলকাতা এশিয়াটিক সোসাইটিতে বক্তৃতা করেছেন। তিনি মীরকাসিম গ্রন্থে পলাশী যুদ্ধের ষড়যন্ত্রের বিবরণ দিয়েছেন।

পলাশী প্রান্তরে সিরাজের আবক্ষ ভাস্কর্য। ছবি: সংগৃহীত
গিরিশ ঘোষের সিরাজউদ্দৌল্লা এবং আরও পরে শচীন্দ্রনাথ সেনের লেখা সিরাজউদ্দৌল্লা নাটকে সিরাজ ও পলাশীর যুদ্ধ সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গির কিছু পার্থক্য আসে, যা বাঙালি মনের ভাবাবেগ ভিন্ন দিকে মোড় নিতে দেখা যায়। বিশেষ করে ১৮৬০ সালের নীলবিদ্রোহের পরে দেশাত্মবোধের বাতাবরণ ধীরে ধীরে ফল্গুধারার মতো বইতে শুরু করে। সিরাজ ক্রমে স্বাধীনতার কণ্ঠস্বর তথা দেশপ্রেমের প্রতীকী নায়ক হয়ে ওঠেন। তপনমোহন চট্টোপাধ্যায় লিখিত পলাশীর যুদ্ধ বা পলাশীর পর বক্সার পুরোপুরি ইতিহাসগ্রন্থ নয়। এগুলো জাতীয়তাবাদের পরিপ্রেক্ষিতে লেখা, তথ্যের চেয়ে ভাবাবেগই প্রাধান্য পেয়েছে বেশি; বরং পরবর্তীকালে লেখা রজত রায়ের পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ গ্রন্থে (১৯৯৪) বা সুশীল চৌধুরীর লেখা পলাশির অজানা কাহিনীতে ইতিহাস বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
পলাশীর যুদ্ধকে ঘিরে বহু সাহিত্যিক তাঁদের লেখায় নানাভাবে পলাশীকে এনেছেন। দীনবন্ধু মিত্র (১৮৩০-১৮৭৩) তাঁর সুরধুনী কাব্যে সরাসরি যুদ্ধ বা ষড়যন্ত্রের কাহিনি বলেননি। সুরধুনী কাব্যগ্রন্থের সপ্তম সর্গে তিনি গঙ্গার চলনপথে পলাশীর প্রান্তরে এসে পৌঁছালে কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের নাম উল্লেখ না করেও প্রচ্ছন্নভাবে ইতিহাসের পরিণতিকে স্মরণ করেছেন—‘চপল চরণে গঙ্গা চলিতে,/ পলাশীর মাঠে এল দেখিতে দেখিতে।…কোথা গেল আধিপত্য শাসন ভীষণ,/ কোথা গেল মণিময় শিখি সিংহাসন!/ রাজ্যচ্যুত তারা সব শোকাতুর মন,/ লুটেছে ভাণ্ডার খণ্ড সজীব রতন;/ উঠে গেছে দেখ ক্ষণভঙ্গুর প্রতাপ,/ বৃথায় রোদন আর বৃথা পরিতাপ;/ মোগলের রাজলক্ষ্মী পরিচয় সার,/ এই মাঠে হারায়েছি মুকুট আমার।’ জয়দীপ দে পলাশী যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লিখেছেন কাসিদ নামে একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস (২০২০)।
পলাশী যুদ্ধ নিয়ে অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ উপহার দিয়েছেন কবি নবীনচন্দ্র সেন (১৮৪৭-১৯০৯)। মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩) এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১)। এর মধ্যবর্তীকালীন সময়ে বাংলা কাব্যসাহিত্যের জগতে নবীনচন্দ্র ছিলেন অবিসংবাদী বলিষ্ঠ কবি। তাঁর ১২টি কাব্যগ্রন্থের মধ্যে পলাশীর যুদ্ধ ১৮৭৫ সালে প্রকাশিত হয়। সাধারণভাবে দেখা যায় ঊনবিংশ শতাব্দীর কবিদের আখ্যায়িকা কাব্যগ্রন্থে প্রাচীনকালের ইতিহাস বা পৌরাণিক কাহিনিনির্ভরতা। সে ক্ষেত্রে নবীনচন্দ্র মাত্র ১১৮ বছর আগের একটি ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে কাব্যটি রচনা করেছেন। তখনো ব্রিটিশ রাজত্ব চলছে, কাজেই একে সমসাময়িক কালের কাব্যগ্রন্থ বলা চলে। নবীনচন্দ্রের কাব্যে স্বদেশপ্রেমের উদ্দীপনা ধরা পড়ে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪) নবীনচন্দ্রকে ‘তেজস্বিনী, জ্বালাময়ী এবং অগ্নিতুল্য’ বলে উল্লেখ করে তাঁকে ‘বাংলার বায়রন’ নামে অভিহিত করেছেন। সেই সঙ্গে নবীনচন্দ্রের পলাশীর যুদ্ধ বাংলা সাহিত্যভান্ডারের একটি বহুমূল্য রত্ন হিসেবে ঘোষণা করেছেন। বাংলা সাহিত্যর ইতিহাসকার অসিত বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিমত, ‘রবীন্দ্রনাথের পূর্বে যদি কারও কবিতায় যথার্থ পাশ্চাত্য ধরনের লিরিকের স্বাদ পাওয়া যায়, তবে তার কিছুটা নবীনচন্দ্রের মধ্যেই পাওয়া যাবে।’

নবীনচন্দ্র সেনের পলাশীর যুদ্ধ প্রকাশিত হওয়ার পর বঙ্গদর্শন, আর্যদর্শন ও বান্ধব পত্রিকা গ্রন্থটির কাব্যালোচনা প্রকাশ করে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বঙ্গদর্শন পত্রিকায় এই কাব্যগ্রন্থ পর্যালোচনায় লিখেছেন, ‘কাব্যে উপাখ্যান এবং নাটকের ভাগ অতি অল্প। গীতি অতি প্রবল। নবীনবাবুর বর্ণনা এবং গীতিতে একপ্রকার মননসিদ্ধ, সেই জন্য পলাশীর যুদ্ধ মনোহর হইয়াছে।’ নবীনচন্দ্র দেশপ্রেমিক নবজাগরণের কবি হিসেবে পরিচিতি এবং জনপ্রিয়তা পান। তবে ইংরেজ ঐতিহাসিকদের সিরাজকে নিয়ে বিরূপ প্রচারের প্রভাব অবচেতনভাবে হয়তো নবীনচন্দ্রের মধ্যে পড়েছিল। তাই বোধ হয় তিনি পলাশীর যুদ্ধ কাব্যে সিরাজকে প্রধান চরিত্রের মর্যাদা দিতে সাবলীল নন। পাঁচটি সর্গে গ্রথিত কাব্যে প্রতিটি সর্গে একটি চরিত্রকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। দেশাত্মবোধের উদাত্ত বাণী তথা দেশপ্রেমের ভক্তি বা শক্তির ভাষ্য মূলত মোহনলাল ও রাণী ভবানীর কণ্ঠে প্রস্ফুটিত হয়েছে। জাতীয়তাবোধের উন্মেষের প্রারম্ভিক যুগের ঐতিহাসিক মর্যাদাপ্রাপ্ত এই কাব্য কিন্তু জনমানসে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। ‘বণিকের মানদণ্ড রাজদণ্ড’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার সূত্রপাতের ঘটনা যে ‘পলাশী যুদ্ধ’ দিয়ে, ইংরেজরা তার গুরুত্ব খুব ভালো জানত। তাই ১৮৭৫ সালে পলাশীর যুদ্ধ মহাকাব্য প্রকাশিত হলে নবীনচন্দ্র সেনকে ব্রিটিশ সরকারের রোষানলে পড়তে হয়। কাব্যের মোড়কে স্বাদেশিকতাবোধের প্রচার তাঁদের পছন্দ হয়নি। ১৮৬৯ সাল থেকে নবীনচন্দ্র ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে দক্ষ প্রশাসক হিসেবে বাংলা ও উড়িষ্যা বিভিন্ন জেলায় কাজ করেছেন। ১৮৯৫-৯৬ সালে নদীয়ার রাণাঘাট মহকুমায় কর্মরত অবস্থায় পলাশীর প্রাঙ্গণ পরিভ্রমণ করেন। তার আগে ১৮৮৩ সালে ইংরেজ সরকার পলাশীর যুদ্ধস্থলে গ্রানাইট পাথরের একটি ছোট বিজয়স্তম্ভ প্রতিষ্ঠা করেছিল। ১৯০৯ সালে লর্ড কার্জন সেটি ভেঙে ফেলে একটি বড় মনুমেন্ট স্থাপন করেন, যা বর্তমান রয়েছে। ২০০৭ সালে পলাশী যুদ্ধের আড়াই শ বছরে মনুমেন্টের সামনে ‘সিরাজউদ্দৌল্লা’র একটি মর্মরমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অন্যদিকে, পলাশী রণাঙ্গনের উত্তর দিকে ফরিদতলায় মীর মদনের সমাধিটি চিহ্নিত করে যথাযোগ্য মর্যাদায় ইংরেজ সরকার বাঁধিয়ে দিয়েছিল, তা এখন ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বক্ষণ বিভাগ দ্বারা সংরক্ষিত আছে। ব্রিটিশ সরকার পলাশী যুদ্ধস্থল থেকে গুলিবিদ্ধ আমগাছের গুঁড়ি ব্রিটেনে নিয়ে গেছে মিউজিয়ামে সংরক্ষণের জন্য।
পলাশী যুদ্ধের বেশ কয়েক বছর পরে পলাশী রণাঙ্গনের দক্ষিণ প্রান্তে গঙ্গার শাখানদী পাগলাচণ্ডীর ধারে ‘ওগলভি’ পদবিধারী একজন ব্রিটিশ কবি ফুলবাগিচাসহ দ্বিতল গৃহ নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন। প্রায় জনশূন্য নির্জন স্থানে অবস্থিত তাঁর বাড়ির নাম দেন ‘দ্য পলাশী হাউস’। পলাশী যুদ্ধের পর স্থানীয় মানুষ এলাকা ছেড়ে আরও পূর্ব দিকে প্রায় কুড়ি কিলোমিটার দূরে জলাঙ্গী নদী তীরে ‘পলাশীপাড়া’ নাম দিয়ে নতুন জনপদ গড়ে সেখানে উঠে চলে যাওয়ায় এলাকা জনশূন্য হয়ে গিয়েছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ‘ওগলভি’ মারা গেলে এখানেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। সেই কবি ‘পলাশী যুদ্ধ’ নিয়ে কোনো লেখা লিখে ছিলেন কি না, তার হদিস পাওয়া যায় না। হস্তান্তর হয়ে গেলেও তাঁর বাড়ি ‘দ্য পলাশী হাউস’ ও সমাধি অটুট আছে। পলাশী যুদ্ধের স্মৃতিও আমাদের মনে বেঁচে আছে। সেই স্মৃতিই আমাদের ‘পলাশী যুদ্ধ’ নিয়ে চর্চা, নতুন গবেষণায় প্রাণিত করে চলেছে।
সঞ্জিত দত্ত : লেখক ও গবেষক
