পড়ার টেবিল থেকে

২০২২ শেষ হয়ে গেল। কালের নিয়মে এটি একটি বছর হলেও আমার কাছে ৩৬৫টি দিন। প্রশ্ন উঠতে পারে, এ আবার কেমন কথা! তাহলে খুলে বলি, চেষ্টা করি প্রতিদিন একটি করে বই পড়ার। এবং পড়া শেষে ছোট্ট করে নিজের ভাষায় পাঠপ্রতিক্রিয়া লিখে রাখার। এটা আসলে এক অসম্ভব চেষ্টা। কিন্তু ভালোবাসার কাছে কিছুই যে বাধা নয়, সেটা নিজেকে দিয়েই বুঝি। এই বছরের ৩৬৫ দিনে আমি ছোট-বড় মিলিয়ে পড়েছি ৩০০টির অধিক বই। সব বই পড়ে কি আপ্লুত? প্রশ্নই ওঠে না। বেশ কিছু বই পড়ে বিরক্ত হয়েছি। আবার বেশ কিছু বই রয়ে গেছে মনের গভীরে। আজ বছরের শেষ দিনে ফিরে তাকিয়ে এই বছরে পড়া ভালোলাগার দশটি বই বাছাই করতে বসলাম। (বি. দ্র. দশের মধ্যে কোনো ক্রমিক নেই। বইয়ের নামের ইংরেজি আদ্যাক্ষর অনুযায়ী সাজানো হয়েছে নামগুলো।)

সমরেশ মজুমদারের নবকুমার সিরিজের দ্বিতীয় উপন্যাস ‘ক্যালকাটায় নবকুমার’। এতে দেখা যায়, গ্রামের নবকুমার কলকাতার আচরণ কিছুটা রপ্ত করেছে। সিনেমা রিলিজের দিনেই তার মা মারা যান। খুব সুন্দরভাবে সমরেশ মজুমদার নবকুমার চরিত্রটিকে তৈরি করেছেন। বেশ ভালো লাগে পড়তে। নবকুমারকে খুব কাছের লোক বলে মনে হয়। সমরেশ মজুমদারের গদ্য নিয়ে তো বলার কিছু নেই।

সাইফুল ইসলাম জুয়েলের ছোটদের জন্য লেখা বই আগে পড়লেও বড়দের জন্য লেখা উপন্যাস এই প্রথম পড়লাম। ‘চাঁদনী’ নামের এই বইটি পড়তে আমাকে তাড়া দেন শ্রদ্ধেয় স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায়।  এক প্রকার তাঁর চাপাচাপিতেই বইটি পড়লাম এবং মুগ্ধ হলাম। অসাধারণ বই। চাঁদনী আর আদানের প্রেমের গল্প। কাল্পনিক এক রাজ্যের সন্ধানে আদিবাসী ছেলে বেরিয়ে পড়ে। জমজমাট কাহিনী। লেখক সম্পূর্ণ ব্যাপারটিকে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। পাহাড়, নদী, রূপকথা সব মিলিয়ে বেশ ভালো কাটলো এই বই পাঠের সময়টা৷ ফলে লেখকের অন্যান্য বই পড়ার ব্যাপারে আগ্রহ বেড়ে গেল।

মনজিৎ গাইনের লেখা তরতর করে পড়া যায়। ‘ছোবল’ নামক স্পোর্টস থ্রিলারটি পড়তে গিয়ে সেটা আবার উপলব্ধি করলাম। সিমকি নামের একটি মেয়ের গল্প। সে ক্রিকেট ভালোবাসে। কিন্তু তার এলাকায় মেয়েদের ক্রিকেট খেলা নিষিদ্ধ। এই টানাপোড়েন খাপ পঞ্চায়েতের লোকদের সঙ্গে। তাদের কারণে সিমকি একে একে হারায় তার বন্ধুকে, বাবাকে। প্রতিবাদী হয়ে ওঠে সে। বন্ধু নিশার সাহায্যে সে শেষ করে শত্রুদের৷ একটু নাটকীয় হলেও উপন্যাসটি পড়তে পড়তে গায়ের রক্ত টগবগ করে ওঠে।

মনজিৎ গাইনের লেখা তরতর করে পড়া যায়। ‘ছোবল’ নামক স্পোর্টস থ্রিলারটি পড়তে গিয়ে সেটা আবার উপলব্ধি করলাম। সিমকি নামের একটি মেয়ের গল্প। সে ক্রিকেট ভালোবাসে। কিন্তু তার এলাকায় মেয়েদের ক্রিকেট খেলা নিষিদ্ধ। এই টানাপোড়েন খাপ পঞ্চায়েতের লোকদের সঙ্গে। তাদের কারণে সিমকি একে একে হারায় তার বন্ধুকে, বাবাকে। প্রতিবাদী হয়ে ওঠে সে। বন্ধু নিশার সাহায্যে সে শেষ করে শত্রুদের৷ একটু নাটকীয় হলেও উপন্যাসটি পড়তে পড়তে গায়ের রক্ত টগবগ করে ওঠে।

রাজা ভট্টাচার্যের কিশোর উপন্যাস ‘চন্দ্রদ্বীপের গুপ্তধন’। অসাধারণ লাগলো পড়তে। ভারত, বাংলাদেশ হয়ে কাহিনীর বিস্তার থাইল্যান্ড পর্যন্ত। উপন্যাসের শেষটা খুব ভালো। গুপ্তধন শুধু টাকা বা সম্পত্তিতে নয়, আত্মীয় খুঁজে পাওয়াতেও হয়। রাজা ভট্টাচার্যের লেখা মিষ্টি৷ এই উপন্যাসে আরেকবার উপলব্ধি করলাম সেটা। ১৪২৯ এর শারদীয় শুকতারায় প্রকাশিত এই উপন্যাসটি আমার কাছে মনে হয়েছে এই বছরের পুজো সংখ্যায় পড়া সেরা উপন্যাস। 

ইকবাল খন্দকারের সাইকো থ্রিলার ‘একজন গুপ্তঘাতক’। এক লোকের লেখক পরিচয়ে পরিচিত হবার শখ। কিন্তু লেখার ক্ষমতা নেই। তাই সে তরুণ মেধাবী লেখকদের কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে লেখা কিনে নেয়। পরবর্তীতে সেসব লেখকদের খুনও করেন তিনি। লেখক দারুণভাবে টেনে নিয়ে গেছেন কাহিনী। ইকবাল খন্দকারের বর্ণনা এই উপন্যাসে নির্মেদ। পড়তে ভালো লাগে।

লুৎফর হাসানের ২১টি ছোটগল্পের সংকলন ‘জোনাকির নিজস্ব অন্ধকার’। সব সময় বিশ্বাস করি, লুৎফর হাসানের কাব্যিক মিষ্টি ভাষার তুলনা তিনি নিজেই। সবগুলো গল্পই মন ছুঁয়ে যায়। তার মধ্যেও সবচেয়ে ভালো লেগেছে ‘প্রত্যাবর্তন’ আর ‘জোনাকির নিজস্ব অন্ধকার’ গল্পদু্’টি। আমার মনে হয়, আমাদের ছোটগল্পে লুৎফর হাসান এক শক্তিশালী নাম হতে পারেন। এই বই সেই কথার স্বপক্ষে এক শক্তিশালী প্রমাণ।

ভূত-প্রেত আমার পছন্দের ধারা না হলেও সৌমিক দে রচিত কালীগুণীন সিরিজ সবসময়েই আমার পছন্দের তালিকার ওপরের দিকেই থাকে। ‘কালীগুণীনের মরণপাঞ্জা’ বইটি চারটি উপন্যাসিকার সংকলন। বেশ ভালো লেগেছে প্রত্যেকটি উপন্যাসিকাই। বিভিন্ন সমস্যাকে কালীগুণীন যেভাবে সমাধান করেন, তাতে করে তাঁকে সুপারম্যান টাইপের মনে না হয়ে রক্ত-মাংসের মানুষই মনে হয়। এই সিরিজের পরের বইয়ের জন্য অপেক্ষায় থাকব।

সমরেশ মজুমদারের ‘কলিকাল’ নারাণপুর গ্রামের কাহিনী। হরিহর, ছবি রাণী, সবিতা রাণীসহ সব মিলিয়ে দীর্ঘ এই উপন্যাসটি পড়ে বেশ ভালো লাগলো। দুর্দান্ত বর্ণনা, কাহিনী সব মিলিয়ে সমরেশের তুলনা কেবল তিনিই।

সমরেশ মজুমদারের ‘কলিকাল’ নারাণপুর গ্রামের কাহিনী। হরিহর, ছবি রাণী, সবিতা রাণীসহ সব মিলিয়ে দীর্ঘ এই উপন্যাসটি পড়ে বেশ ভালো লাগলো। দুর্দান্ত বর্ণনা, কাহিনী সব মিলিয়ে সমরেশের তুলনা কেবল তিনিই।

অংশুমান করের লেখার ভক্ত আমি। তাঁর যেকোনো লেখাই আমার কাছে বিশেষ কিছু। তবে ‘পারিজাতে প্রহরে প্রহরে’ উপন্যাসটির নাম আমি করব বিশেষভাবে পরিবেশনার কারণে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং তাঁর স্ত্রী স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়ের মধ্যে সংলাপ এগিয়েছে পুরো উপন্যাসে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আত্মজৈবনিক বিভিন্ন লেখা এবং সাক্ষাৎকার থেকে সংগ্রহ করেছেন এই উপন্যাসের উপাদান। কুর্নিশ জানাতেই হয় লেখকের এই প্রচেষ্টাকে।

সাদাত হোসাইনের বৃহৎ উপন্যাস ‘স্মৃতিগন্ধা’। এটি আসলে এই সিরিজের প্রথম উপন্যাস। পারুর পরিবার ভুবনডাঙ্গা থেকে কলকাতা যাওয়ার পথে পারু ট্রেন থেকে নেমে পড়ে। প্রতিহিংসার জগতে পারু আর ভিন্নধর্মাবলম্বী ফরিদের ভালোবাসার মূল্য কোথায়? আমার মতে, এটি সাদাত হোসাইনের একটি মাস্টারপিস উপন্যাস৷ উপন্যাসের শেষে প্রশ্ন থেকে যায়, পারু কোথায়? আমি বইটি পড়া শেষে ভাবতে বসলাম, জীবন এমন কেন? 

আর এই উপন্যাসের সেই লাইনদুটো আরেকবার জপে নিলাম-

“জানি যাচ্ছি ফেলে সন্ধ্যা

সাথে তোমাকেও স্মৃতিগন্ধা।”

আমার ভালো লাগার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই আর কারো ভালো লাগা মিলবে না। কিন্তু নিজের পছন্দের লেখাগুলো নিয়ে কথা বলার অন্য রকম এক মজা আছে। এই লেখা তৈরি করতে গিয়ে আবার সেই মজাটা পেলাম।

আরও পড়ুন