ক্ষুধার রাজ্যে কবিতার অগ্নিশিশু জন্মশতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য

১৫ আগস্ট ১৯২৬। কলকাতার মাতুলালয়ে জন্ম নেন বাংলা কবিতার এক উজ্জ্বল অথচ ক্ষণজন্মা নাম, সুকান্ত ভট্টাচার্য । ১৩ মে ১৯৪৭-এ যক্ষ্মায় তাঁর জীবনাবসান ঘটে, স্বাধীন ভারতের জন্মের মাত্র কয়েক মাস আগে। ২০২৬ সালে তাঁর জন্মশতবর্ষ তাই শুধু ক্যালেন্ডারের একটি স্মরণ-অনুষ্ঠান নয়। এটি বাংলা সাহিত্যের সেই তরুণ কণ্ঠকে ফিরে দেখা, যিনি মাত্র একুশ বছরের জীবনে ক্ষুধা, শোষণ, যুদ্ধ, সাম্য, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর স্বপ্নকে কবিতার ভাষায় এক অনন্য তীব্রতা দিয়েছিলেন।

অন্য অনেকের মতো, কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে ছোটবেলায়। তার কবিতা ‘প্রার্থী’ আমাদের পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত ছিল। আমি বার বার পড়তাম—

‘হে সূর্য। শীতের সূর্য!
হিমশীতল সুদীর্ঘ রাত তোমার প্রতীক্ষায়
আমরা থাকি
যেমন প্রতীক্ষা করে থাকে কৃষকদের চঞ্চল চোখ,
ধানকাটার রােমাঞ্চকর দিনগুলির জন্যে।

হে সূর্য, তুমি তো জানো,
আমাদের গরম কাপড়ের কতাে অভাব!
সারারাত খড়কুটো জ্বালিয়ে,
এক টুকরো কাপড়ে কান ঢেকে,
কত কষ্টে আমরা শীত আটকাই।’

দক্ষিণ খুলনায় যেখানে আমি বেড়ে উঠি সেখানকার শীতকালের চিত্রটা এর থেকে আরও সুন্দর করে লেখা সম্ভব ছিল না। ’৭১ এর পর সদ্য স্বাধীন দেশে আমাদের গ্রামের প্রায় সবারই গরম কাপড়ের বড্ড অভাব ছিল। আমরা সকাল সন্ধ্যা সত্যি সত্যি খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোহাতাম। সন্ধ্যার দিকে মাঠ থেকে কৃষকেরা ফেরার সময় তারাও আমাদের সঙ্গে যোগ দিতো। আমরা সবাই এক হয়ে যেতাম।
সুকান্তের সঙ্গে এপার বাংলার যোগাযোগ অনেক পুরোনো। তার পৈতৃক নিবাস ছিল ফরিদপুর জেলার কোটালীপাড়ায়। তাঁর পিতা নিবারণচন্দ্র ভট্টাচার্য কলকাতায় বইয়ের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কলকাতার কমলা বিদ্যামন্দিরে তাঁর বাল্যশিক্ষা শুরু হয়, পরে তিনি বেলেঘাটা দেশবন্ধু হাইস্কুলে পড়েন। ১৯৪৫ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ নিলেও তিনি উত্তীর্ণ হতে পারেননি, এবং ছাত্র আন্দোলন ও বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ফলে তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পথ কার্যত থেমে যায়। সাহিত্যের প্রতি তাঁর আকর্ষণ কিন্তু আরও আগেই প্রকাশিত হয়েছিল—শৈশবেই ছড়া, গল্প, হাতে লেখা পত্রিকা, স্কুলের সাহিত্যচর্চা এবং বিপুল পাঠাভ্যাসের মধ্যে তাঁর কাব্যপ্রতিভার বীজ রোপিত হয়। সুভাষ মুখোপাধ্যায় পরে স্মরণ করেছেন, ‘অতি অল্প বয়সের সুকান্তের ছন্দদখল ও শব্দব্যবহারের পরিণতি তাঁকে বিস্মিত করেছিল।’

তবে একটি কথা আমাদের স্মরণ রাখা দরকার তা হলো সুকান্তকে বুঝতে হলে তাঁর সময়কে বুঝতে হবে । তাঁর কৈশোর ও যৌবন অতিক্রান্ত হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন, ১৯৪৩-এর বঙ্গদুর্ভিক্ষ, ঔপনিবেশিক শাসন, খাদ্যাভাব, কালোবাজারি, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং স্বাধীনতার উত্তাল রাজনীতির মধ্যে। এসব ইতিহাস সুকান্তের কবিতায় শুধু পটভূমি নয়—এটি তাঁর ভাষা, চিত্রকল্প ও নৈতিক ক্রোধের উৎস।

১৯৪৪ সালে সুকান্ত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক-শিল্পী সংঘের পক্ষে আকাল সংকলন সম্পাদনা করেন। কমিউনিস্ট পার্টির দৈনিক স্বাধীনতা-র ‘কিশোর সভা’ বিভাগ সম্পাদনার সঙ্গে তাঁর যুক্ততা তাঁর সাহিত্যচর্চাকে কেবল ব্যক্তিগত প্রতিভার জায়গায় রাখেনি; তাকে সামাজিক সংগঠন, কিশোর-যুব আন্দোলন এবং সাংস্কৃতিক রাজনীতির পরিসরে এনে দাঁড় করিয়েছে। তিনি কবিতা লিখতেন, কিন্তু তাঁর কবিতা ছিল সভা-মিছিল, রেশন-লাইন, শ্রমিকপাড়া, কৃষকের মাঠ, যুদ্ধের সাইরেন, দুর্ভিক্ষের মৃতদেহ এবং ভবিষ্যতের শিশুর সঙ্গে কথোপকথন।

তাঁর প্রধান কাব্যগ্রন্থ ও রচনাসম্ভারের মধ্যে রয়েছে ছাড়পত্র (১৯৪৭), পূর্বাভাস (১৯৫০), মিঠেকড়া (১৯৫১), অভিযান (১৯৫৩), ঘুম নেই (১৯৫৪), হরতাল (১৯৬২), গীতিগুচ্ছ (১৯৬৫) প্রভৃতি। সুকান্ত সমগ্র-এর সূচিতে দেখা যায়, ছাড়পত্র অংশে ‘আগামী’, ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’, ‘প্রার্থী’, ‘লেনিন’, ‘দেশলাই কাঠি’, ‘চট্টগ্রাম: ১৯৪৩’, ‘মধ্যবিত্ত ’৪২’, ‘মজুরদের ঝড়’, ‘রানার’, ‘কৃষকের গান’, ‘আঠারো বছর বয়স’, ‘হে মহাজীবন’—এমন বহু কবিতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তাঁর রচনার বিস্তার শুধু বিপ্লবী স্লোগানে সীমাবদ্ধ নয়; সেখানে আছে ছড়া, গান, নাট্যরূপ, পত্র, ব্যঙ্গ, শিশু-সাহিত্য, প্রতীকী কবিতা এবং গদ্যময় বাস্তবতার কাব্যভাষা।
সুকান্তের সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্যের কেন্দ্রে আছে সরাসরি উচ্চারণ, দৃঢ় ছন্দ, কথ্যতার শক্তি, প্রতীকের তীক্ষ্ণ ব্যবহার এবং মানুষের পক্ষে অবিচল অবস্থান। তাঁর বিখ্যাত পঙ্‌ক্তি—
‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়
পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’

বাংলা সাহিত্যে ক্ষুধার অভিজ্ঞতাকে কবি সুকান্ত যে নির্মম সংহতিতে ধরেছে, তা বিরল। এই পঙ্‌ক্তিতে চাঁদ আর রোমান্টিকতার প্রতীক নয়; ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে তা খাদ্যের দগ্ধ রূপ। এখানেই সুকান্ত রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কবিতার নতুন পথ নির্মাণ করেন—কবিতা আর কেবল সৌন্দর্যের আশ্রয় নয়, বরং সামাজিক সত্যের জবানবন্দি। তাঁর ছাড়পত্র কবিতায় নবজাতকের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে যাওয়ার অঙ্গীকার যেমন মানবিক ভবিষ্যতের ঘোষণা, তেমনি ‘বোধন’ ও ‘কৃষকের গান’-এ দুর্ভিক্ষ, লুট, খাদ্য-রাজনীতি ও কৃষকশ্রমের প্রশ্ন সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে রূপ নেয়।

সুকান্তের রাজনৈতিক কবিতায় মার্কসবাদী চেতনা, সাম্যবাদী স্বপ্ন, ফ্যাসিবাদবিরোধিতা, শ্রমিক-কৃষকের অধিকার এবং ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে ক্রোধ বারবার ফিরে আসে। কিন্তু তাঁকে শুধু দলীয় কবি বলা তাঁর কবিতাকে ছোট করে দেখা হবে। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মূল্যায়নে সুকান্ত রাজনীতির কাঁধে চড়ে ওঠেননি; বরং রাজনীতিকে নিজের অভিজ্ঞতা ও কবিমানসের অংশ করে নিয়েছিলেন। সাহিত্যে একাডেমি-সম্পর্কিত জীবনীগ্রন্থেও তাঁকে “people’s poet” বা গণমানুষের কবি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যাঁর কাব্যশক্তি যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও স্বাধীনতার উত্তাল সময়ে জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল। তাঁর কবিতায় গান্ধী ও লেনিন, দেশপ্রেম ও আন্তর্জাতিকতা, ক্ষুধা ও বিপ্লব—সব মিলেছে এক তরুণ কিন্তু আশ্চর্য পরিণত কাব্যস্বরে।

সুকান্তের সামাজিক প্রভাবের একটি বড় দিক হলো—তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার দরজা সাধারণ পাঠকের দিকে খুলে দিয়েছিলেন। সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, সুকান্ত এমন এক নতুন শক্তিকে ভাষা দিয়েছিলেন, যা তখন সমাজে মাথা তুলছিল; কবিতাবিমুখ পাঠকদেরও কবিতার রাজ্যে টেনে আনার কৃতিত্ব তাঁর। তাঁর কবিতা আবৃত্তিযোগ্য, মুখস্থযোগ্য, মিছিলের ভাষার সঙ্গে সংযুক্ত—কিন্তু তাতেই তার সাহিত্যিক মর্যাদা কমে না। বরং সুকান্ত দেখিয়েছেন, কবিতা শৈল্পিক হয়েও জনমুখী হতে পারে, রাজনৈতিক হয়েও মানবিক হতে পারে, প্রতিবাদী হয়েও কাব্যময় হতে পারে।
এই জন্মশতবর্ষে তাঁর বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা এখানেই। পৃথিবীর নানা প্রান্তে আজও ক্ষুধা, যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, শ্রমের অবমূল্যায়ন, বাজারের নিষ্ঠুরতা, বৈষম্য ও তরুণ প্রজন্মের অনিশ্চয়তা আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। ২০২৬ সালের জন্মশতবর্ষ-আলোচনাতেও উল্লেখ করা হয়েছে, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, শ্রেণিবৈষম্য ও পুঁজিবাদের প্রসার-প্রশ্নে সুকান্তের অবস্থান আজও অম্লান। তাঁর কবিতা আমাদের মনে করায়, ক্ষুধার রাজ্যে সৌন্দর্যের ভাষাও বদলে যায়; মানুষের মর্যাদা না থাকলে কাব্যের স্নিগ্ধতা যথেষ্ট নয়। এ কারণেই সুকান্ত কেবল অতীতের স্মরণীয় কবি নন—তিনি বর্তমানেরও বিবেক।

মাত্র একুশ বছরের জীবন। তবু সেই জীবন বাংলা সাহিত্যে এমন সম্ভাবনার দীপ্তি রেখে গেছে, যার অপূর্ণতাই এক ধরনের পূর্ণতা হয়ে আছে। সুভাষ মুখোপাধ্যায় স্মরণ করিয়েছিলেন—সুকান্তকে তাঁর বয়স, সময় ও অসমাপ্ত জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে বিচার করলে ভুল হবে; তিনি আজও যেন একুশেই স্থির, সম্ভাবনার অসীম প্রান্তে দাঁড়িয়ে। জন্মশতবর্ষে তাই সুকান্ত ভট্টাচার্যকে স্মরণ মানে শুধু একটি প্রতিকৃতিতে মালা দেওয়া নয়; বরং তাঁর অঙ্গীকারটিকে নতুন করে উচ্চারণ করা—এই পৃথিবীকে নবজাতকের জন্য বাসযোগ্য করে যাওয়ার অঙ্গীকার। তাঁর কবিতা আমাদের আজও ডাকে: অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, ক্ষুধার মুখ দেখতে, শ্রমের মর্যাদা বুঝতে এবং ভবিষ্যতের প্রতি দায় স্বীকার করতে। সুকান্তের শতবর্ষে এই দায়ই হোক আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি। এই জন্মশতবর্ষে তাকে জানাই সশ্রদ্ধ প্রণাম !!

ড. তপন সরকার: অর্থনীতিবিদ, শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন