ক্ষুধার রাত

রাত বেশি নয়। এই হবে, সাড়ে সাত আট। মামুলি সন্ধ্যা বলাও চলে। কলকাতার বাতাসে কাঁচের সীসের মতো শীতের প্রকোপ দাবড়ে বেরাচ্ছে। উত্তর কলকাতার এই মধ্যবিত্ত পাড়াগুলোতে হিমরাজের দাপট যেন আরও তীব্র। মাঝারি গড়নের এক কিশোর এই কনকনে সাঁঝে সরু রাস্তা মাড়িয়ে পথ চলছে। এমন ঠান্ডাতেও ঊর্ধ্বাঙ্গে পরা একটি পাতলা শার্ট। নিম্নাঙ্গে প্যাঁচানো মলিন ধুতি। শার্টের কলার আর ধুতির ভাঁজে জমছে শীতের কুয়াশা।

আচমকা আকাশ প্রকম্পিত করে একটি যুদ্ধবিমান চলে যায়। ভয়াল গর্জন। অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে তুললেও এমন ছবি কলকাতার রাতের এখন একটি স্বাভাবিক দৃশ্য। অদূরেই কটি ঝাঁপড়ি দোকান সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে। আঁধারের মিশমিশে আলোয় দেখে মনে হচ্ছিল, হরিহর আত্মা। এর মাঝে একজন মালিক দানেশ কাকা। মাথায় বিদীর্ণ টাক, টিকেলো নাক, শীর্ণ শরীরে মোড়ানো লাল আলওয়ান এত দূর থেকেও কেমন বিদ্রোহের দ্যুতি ছড়াচ্ছিল। দানেশ কাকা, ঝাঁপি নামাতে ব্যস্ত।

শীতে কাবু হয়ে নিভুনিভু আলোতে দোকানের টেবিলে রাখা একটি থালিতে কিছু জমা করা স্তুপ দেখা যায়। আনমনা কিশোর আনমনেই কেন যেন পায়ে পায়ে সেদিকে পৌঁছে যায়। সামনেই একটা ডোবার মতো কিছু। ওপারেই মধ্যবিত্ত পাড়া। ধুতি-পাঞ্জাবি পরা কিছু লোক ত্রস্ত পায়ে হেঁটে যেতে দেখা যায়। ব্যাগ হাতে কারও মুখে কিঞ্চিৎ সন্তুষ্টি, আবার কেউ বা মুখে অমাবস্যার আঁধার সেঁটে পথ মাপছে।

কিশোর থমকে দাঁড়ায়। এই প্রকাণ্ড শহরটা কেন যেন আচমকা বিরান শ্মশানভূমিতে পরিণত হয়। অসংখ্য শব পোড়া উৎকট গন্ধে বাতাস গুমোট হয়ে ওঠে। কিন্তু সেগুলো চোখে দেখা যায় না। আঁধারের কালি মেশানো কিছু ছায়ামূর্তির মতোই আবছা। তবে আর্তনাদ বড্ড তীব্র।

ভেজা মাটি, কয়লার ধোঁয়া, কেরোসিন, ঘোড়ার গাড়ির গন্ধ, নর্দমার উৎকট ঘ্রাণ, ভিজে কাঠ, গঙ্গার কাদামাটির মাদকতা কেমন এক ঘোরের বলয়ে ঘিরে নিয়েছে গোটা নগরীকে। দূর থেকে ট্রামের ঘণ্টা ভেসে আসে। সঙ্গে নিয়ে আসে ক্ষুধার তীব্র বার্তা। ওটার যান্ত্রিক উদরেও কি বুভুক্ষার আগুন জ্বলছে? নইলে অত তাড়া কেন? প্রশ্নটা ট্রামের শব্দের মতোই তীক্ষ গতিতে হারিয়ে যায়।

কিশোর কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ হাতড়ে নেয়। যদি কিছু মিলে যায় হঠাৎ। কেবল একটি পেন্সিল ও খাতা ছাড়া আঙুল স্পর্শ পায় না কিছুর। ঘোড়ার খুরের শব্দ কানের খুব কাছ ঘেঁষে চলে যায়। চমকায় না কিশোর। ইদানীং কিছুতে বোধ জাগে না তেমন।

ডোবার বুক চিঁড়ে ওঠা বাতাসে মিশছে মধ্যবিত্ত পাড়ার বাড়ির জানালা গলে আসা ডাল-ভাতের ঘ্রাণ। কাছেই কোনো মসজিদে আজান শোনা যায়, অদূরেই ধ্বনিত হয় মন্দিরের ঘণ্টা। বাড়ির জানালাগুলো কালো কাগজে বন্ধ করা। রাস্তার আলোটাও কেমন ভৌতিক।

কিশোর দোকানের সামনেই দাঁড়িয়ে নগ্ন পায়ে। খানিক পূর্বে পুলিশ টহল দিয়ে গেছে। কাদার গভীরে ওদের বুটের শব্দ ডেবে যেতে চায়।

– এই সময়ে বাইরে কী কর খোকা, বাড়ি যাও।

উর্দি-পরা দলের মাঝে একজন উপদেশ দিয়েছিল। অবশ্য সেটি যেন বলার জন্যই বলা।

গঙ্গার আদ্র বাতাস ঝাপটে পড়ছে মুখে। কিশোর মুখ হা করে নিঃশ্বাস নেয়। ভেজা বাতাস কিছু তৃষ্ণা নিবারণ যদি করে নেয়, এই আশায়।

দানেশ কাকু দোকানের শেষ আলোটাও নিভিয়ে দেবে ঠিক তখুনি তমসা ফুঁড়ে কোথা হতে একটি তৃতীয় অস্তিত্ব প্রকট হয়। একটা বাচ্চা ছেলে। ছয়-সাত বছর বয়স হবে বড়জোর। শীতে ঠকঠকিয়ে কাঁপছে। বিবস্ত্র শরীর। ধুতিটাও ছেঁড়া।

শিশুটি ছোট ছোট পায়ের চিহ্ন এঁকে দানেশ কাকুর সামনে দাঁড়ায়। বৃদ্ধ দানেশ থেমে যায় একটু। নিচু হয়ে বাচ্চাটির মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। নিষ্পাপ চোখের চাহনিতে কত কথাই ছন্দ খুঁজে নেয় সহজে। হাতে ইশারা এঁকে দানেশ আধাখানা টেনে নেওয়া ঝাঁপির ওপাশে চলে যায়।

ফিরে আসে একটা থালা হাতে। ওতে স্তুপ করা একটু ভাত, আধটুকরো আলু, অল্প একটু ডাল।

কিশোর দূর হতে দাঁড়িয়েই টের পায় ওর পেটের ভেতর কেমন পাক দিচ্ছে। বিবমিষা অনুভূত থাকে কেমন। শীর্ণকায় শিশু হাত বাড়িয়ে দেয়। দানেশ কাকা ম্লান হেসে থালাটা এগিয়ে দেয়। দিনশেষে এটাই যেন ছিল জয়ের শ্রেষ্ঠ হাসি।

শিশুটি থালায় নাক গুঁজে নিয়ে ফের অবলা চোখের দৃষ্টি নিক্ষেপ করে সম্মুখে। ট্রাম ছুটে আসছে দূর থেকে। এবার আওয়াজ যেন আরও তীব্র। ইস! পেটের তাড়না এতটাই তেজী হয়!

আচমকা এয়ার-রেইড সাইরেন বেজে ওঠে। ভূতুড়ে শহরের নিঃস্তব্ধতা খানখান হয়ে ভেঙে পড়ে। তবে সেই আলোড়ন যেন ওই শিশুটিকে ছুঁতে পারে না। কাদার প্যাকে মশার ঝাঁকের কুণ্ডলি স্পষ্ট এই সাঁঝের ছাঁচেও। ওদের গুনগুন ওই বোমারু প্লেনের ক্ষিপ্রতার চাইতেও তীক্ষ্ণ, ভয়াল।

শিশুটি কিছু বলতে চাইল বুঝি। ঠোঁট দুটোর কম্পনই টের পাওয়া গেল কেবল। ডোবার ওপারের আবাসন হতে ডাল-ভাতের বাঙালিয়ানা আমেজ বাতাসে হাওয়াই মিঠের মতো গলে মিশে যাচ্ছিল। মন চাইছে বুক ভরে শ্বাস নিতে, তাতে যদি অন্তত এই রাতের প্রয়োজনটা মিটে যায় কোনোমতে।

শিশুটি মাথা হেঁট করে চলে আসছে। হাতে থালি। তাতে দুর্গন্ধময় বাসি ভাত আর পচা ডাল। তবুও ওতে ভ্রূক্ষেপ নেই কোনো। গুটিগুটি পায়ে অনেকটাই চলে এসেছে ও। দানেশ কাকা ঝাঁপি টেনে নিয়েছে পুরোটাই। এলাকাটা পুরোটাই শুনশান। কেবল ছায়ামানবের মতো কিশোর আর ওই শিশুটি যেন বাস্তব, আর বাকিসব অপার্থিব, পরাবাস্তব কোনো কল্পনার আয়না।

বাচ্চাটি একদলা মুখে গুঁজে নেয়। খানিক মুখ বিকৃত হয়। ওয়াক করে একটি হেঁচকি ওঠে গলায়। কিশোর এগিয়ে এসে ওর ছোট্ট কাঁধে হাত রাখলে সজল নয়ন ফের কথা বলে।

– মুখে ভাত দেবার সময় বাতাসে উড়ে আসা ওই খাবারের ঘ্রাণ শুঁকে নাও। একবুক নিঃশ্বাস নেবে একটানে। এরপর খাবারটা খাবে। দেখবে খুব পারছ। বেশ লাগছে খেতে।

হালকা হাসে কিশোর। মাথা নাড়ায় শিশু। কী বুঝল ও কথাটার কে জানে? তারপর আলগোছে এগিয়ে যায় সামনে। মৃতপ্রায় দুটো নেড়ি কুকুর লেজ নেড়ে ওর পিছু নেয়। জীবন! ক্ষুধার তাড়নায় কেউ কারও অধিকার আদায়ে পিছু হটে না।

শীতের কলকাতা। হিমশীতল সন্ধ্যা ফুঁড়ে ম্লান আলো বিলোচ্ছে শশাঙ্ক। হলুদাভ ম্লান সে আভা। চরাচরের এই অভুক্ত বেদনা কি তার সৌন্দর্যেও দাগ লাগিয়ে নিয়েছে? তা নাহলে ওমন মাধুর্যে ওই পোড়া ঝলসানো আমেজ লাগল কী করে?

কিশোরের খেয়াল হলো তার পেটের ক্ষিদেটা কেমন মিইয়ে এসেছে। চাঁদের রূপই কি তবে এমন…

কিশোর আর ভাবে না। কেমন আলাদা এক তৃষ্ণা চেপেছে হঠাৎ। লাইটপোস্টের কিনারা ঘেঁসে বসে পড়ে ঝট করে। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ লুটিয়ে নেয় কদর্মাক্ত রাস্তায়। সেখানে যত্নে রাখা ছেঁড়া খাতা আর কলমটা তুলে নেয় হাতে।

মলিন কাগজের খাতা। পৃষ্ঠা প্রায় সব শেষ। কোনোমতে খুঁজেপেতে আধখানা সফেদ অংশ খুঁজে নেয় ও। আকাশে ঝলসানো চাঁদ, দূরের ওই অন্নপূর্ণার গন্ধ, আর শিশুর বোবা চাহনি সব যেন চোখের সামনে নেচে এক কঠিন শব্দজট খুলতে চাইছে।

কিশোর কলম ধরে খাতার ওপর। এরপর ধীরে চালাতে থাকে ওটা। প্রথমে কিছু মন্থর গতি, এরপর যেন এক দানবীয় সচলতা ভর করে ওতে। সেই সাঁঝে, সবার অলক্ষ্যে এক নেহাতই মামুলি কিশোর তাঁর ধূসর পাতায় জন্ম দেয় কয়েকটি পংক্তির বীজ। তখনও সে জানে না, এই ক্ষুধার্ত শহর, এই শিশুর মুখ, এই ঝলসানো চাঁদ একদিন তার কবিতার শরীরে কী ভয়ংকর অর্থ নিয়ে ফিরে আসবে।

যুবক লিখছে লিখেই চলেছে। ওর উর্বর মস্তিষ্কের জমিন ফুঁড়ে মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে অগণিত প্রশ্ন। অঙ্কুরিত কচি ভাবনা সব আকাশ ছুঁতে চায়। কিশোরকে বুঝি সেই আকাশ ছোঁবার নেশা পেয়ে বসেছে। মামুলি সস্তা কাগজে সে লিখছে পৃথিবীর সামনে ছুঁড়ে দেওয়া এক নিখুঁত কালজয়ী ধাঁধাঁর ছক।

আর বহুদিন পর, সেই ক্ষুধার্ত পৃথিবীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার কলমই যেন বলে উঠবে—

“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়
পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।”

সোনিয়া তাসনিম : কবি ও ঔপন্যাসিক

আরও পড়ুন