‘সত্যের মতো বদমাশ’ আমার কাছে তেমনই একটি গল্প—ছোট, অদ্ভুত, অস্বস্তিকর এবং শেষ হওয়ার পরও যার অন্ধকারটা অনেকক্ষণ সঙ্গে থাকে

আবদুল মান্নান সৈয়দের সত্যের মতো বদমাশ গল্পটি পড়তে পড়তে প্রথমে মনে হয়, একটি মা ও তার ছোট ছেলের মেলায় ঘুরতে যাওয়ার খুব সাধারণ গল্প পড়ছি। চারদিকে আলো, বেলুন, খেলনা, নাগরদোলা, পুতুল, পশুশালা যা একটি শিশুর আনন্দ পাওয়ার মতোই সবকিছু সেখানে আছে। কিন্তু গল্প যত এগোয়, সেই মেলার চেহারাটাই যেন ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে। আনন্দের জায়গাটি হয়ে ওঠে ভয়, প্রতারণা, নিয়ন্ত্রণ আর নিষ্ঠুরতার এক অদ্ভুত জগৎ।

গল্পটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় চরিত্র নিঃসন্দেহে ছোট্ট ছেলেটি। সে পৃথিবীকে এখনও বড়দের মতো স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শেখেনি। তাই যে বিষয়গুলো বড়দের কাছে স্বাভাবিক, সেগুলোই তার চোখে অস্বাভাবিক ও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। ছায়াকে সে ভয় পায়, কারণ সে জানে না ছায়া কী। নাগরদোলাকে ভয় পায়, কারণ সেখানে মানুষকে জোর করে উঠিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা সে দেখতে পায়। আর টিয়েপাখির ‘সোজা পথে চলো’ কথাটিও তার কাছে ভালো কোনো নীতিবাক্য নয়; বরং এমন একটি কথা, যার ভেতরে সে অদ্ভুত জবরদস্তির গন্ধ পায়।

ছোট্ট ছেলেটির এই সরল প্রশ্নগুলোই গল্পের সবচেয়ে গভীর জায়গাগুলোর একটি। সে বড়দের শেখানো পৃথিবীকে প্রশ্ন করে। ‘ভদ্রলোক’ কাকে বলে? এই প্রশ্নের উত্তরে তার মা-ও যখন পরিষ্কার করে কিছু বলতে পারেন না, তখন বোঝা যায়, গল্পের পৃথিবীতে ভালো-মন্দের প্রচলিত সংজ্ঞাগুলো কতটা ভঙ্গুর। দামি জামাকাপড় পরলেই কেউ ভদ্রলোক হয়ে যায়, অথচ সে আড়ালে কী করছে, সেটি যেন গুরুত্বপূর্ণ নয়। শিশুর চোখে এই দ্বিচারিতা ধরা পড়ে খুব সহজেই।

আবদুল মান্নান সৈয়দ। ছবি: সংগৃহীত

আমার কাছে গল্পটির সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক টিয়েপাখি। একটি পাখি কথা বলতে শিখেছে, বাইরে থেকে দেখলে এটি আনন্দের বা বিস্ময়ের ব্যাপার। কিন্তু শিশুটি উল্টো প্রশ্ন করে: যে পাখিকে কথা বলতে শেখানো হয়েছে, সে কি আর পাখি থাকে? এই প্রশ্নটি শুধু পাখিকে নিয়ে নয়; বরং নিজের স্বাভাবিক সত্তা হারিয়ে অন্যের শেখানো কথা বলতে বাধ্য হওয়া মানুষদের নিয়েও যেন একটি ইঙ্গিত। ‘সোজা পথে চলো’, কথাটি যত সরল, গল্পের ভেতরে তার অর্থ ততই জটিল ও ভয়ংকর।

গল্পে ছায়ার উপস্থিতিও খুব তাৎপর্যপূর্ণ। মা ছেলেকে বোঝান, মানুষ অন্ধকার থেকে আসে বলেই তার সঙ্গে ছায়া থাকে এবং ছায়াকে ফিরিয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু গল্প যত এগোয়, মনে হয় ছায়া শুধু মানুষের শরীরের সঙ্গে থাকা আলো-অন্ধকারের স্বাভাবিক খেলা নয়; বরং মানুষের চারপাশে থাকা এমন কিছু অদৃশ্য ভয়, যা থেকে পালানো যায় না। শেষ পর্যন্ত সেই ছায়াই যেন বাস্তব মানুষের রূপ নেয়, চারজন লোক তাকে ঘিরে ধরে।

গল্পটির শেষ অংশটি পড়ার সময় আমার সবচেয়ে বেশি অস্বস্তি হয়েছে। মা হঠাৎ হারিয়ে যায়। শিশুটি তাকে খুঁজে বেড়ায়, আর তখন চারজন লোক তাকে ঘিরে ধরে। তাদের কথাবার্তায় যে নিষ্ঠুরতা, সেটি শিশুটির সরলতার সঙ্গে এমন তীব্র বৈপরীত্য তৈরি করে যে শেষ দৃশ্যটি খুব সহজে ভুলে যাওয়ার মতো নয়। বিশেষ করে শেষ বাক্যের দৃশ্যটি, চারজন লোক শিশুটিকে কাঁধে করে নিয়ে যাচ্ছে, যেন কবরের খাটিয়ার চারটি পায়া, গল্পের শুরুতে দেখা মেলার সমস্ত আলোকে এক মুহূর্তে অন্ধকার করে দেয়।

এই গল্পের ভয়টা সরাসরি কোনো ভূতের ভয় নয়। বরং ভয়টা আসে মানুষকে নিয়ে। যে চারজন লোক প্রথমে নাগরদোলা ঠেলে, পরে শিশুটিকে ঘিরে ধরে, তাদের উপস্থিতি যেন পুরো মেলারই একটি অন্ধকার মুখ। শিশুটি বারবার যাদের ‘বদমাশ’ বলে চিনতে চায়, বড়দের পৃথিবী তাদের অনেক সময় স্বাভাবিক মানুষ হিসেবেই মেনে নেয়। এখানেই গল্পটির শিরোনাম ‘সত্যের মতো বদমাশ’ আমার কাছে খুব অর্থবহ হয়ে ওঠে। সত্যকে যেমন সহজে চেনা যায় না, তেমনি বদমাশকেও সবসময় তার চেহারা দেখে চেনা যায় না। বরং কখনো কখনো সে ভদ্রলোকের পোশাক পরে, কখনো অভিভাবকের মতো কথা বলে, কখনো বিনোদনের আয়োজন করে, আবার কখনো ভালো কথা বলার জন্য পাখিকেও প্রশিক্ষণ দেয়।

গল্পটি পড়ার সময় বারবার মনে হয়েছে, শিশুটিই এখানে সবচেয়ে বেশি ‘স্বাভাবিক’ মানুষ। সে ভয় পেলে ভয় পায়, সন্দেহ হলে প্রশ্ন করে, অন্যায় দেখলে ‘বদমাশ’ বলে। কিন্তু বড়রা অনেক কিছু দেখেও সেগুলোকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়। তাই গল্পের শিশুটি শুধু একটি শিশু নয়; সে যেন এমন এক নির্মল দৃষ্টির প্রতীক, যে এখনও পৃথিবীর মিথ্যাগুলোকে সত্য বলে গ্রহণ করতে শেখেনি।

গল্পটির ভাষাতেও একটা অদ্ভুত স্বপ্নময়তা আছে। মেলার দৃশ্যগুলো খুব রঙিন, কিন্তু সেই রঙের ভেতরেই ধীরে ধীরে বিষণ্ণতা ঢুকে পড়ে। শুরুতে যে বেলুন, খেলনা, নাগরদোলা ও পাখি আনন্দের উপকরণ বলে মনে হয়, শেষ পর্যন্ত সেগুলোর মধ্যেই ভয় ও বিপদের ইঙ্গিত খুঁজে পাওয়া যায়। এই পরিবর্তনটিই গল্পটিকে আমার কাছে সবচেয়ে স্মরণীয় করেছে।

সবশেষে, ‘সত্যের মতো বদমাশ’ এমন একটি গল্প, যার অর্থ একবার পড়ে পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না। গল্পটি শেষ হওয়ার পরও শিশুটির প্রশ্নগুলো মাথায় থেকে যায়, ছায়া কী, ভদ্রলোক কাকে বলে, কথা বলতে শেখানো পাখি কি এখনও পাখি, আর মানুষকে কি সত্যিই নিজের ইচ্ছার বাইরে কোথাও নিয়ে যাওয়া যায়? সবচেয়ে বড় কথা, মেলার এত আলো, এত মানুষ, এত আনন্দের মধ্যেও একটি শিশু কেন এত ভয় পাচ্ছিল?

সম্ভবত সেই ভয়টাই গল্পটির আসল বিষয়। কারণ মেলাটি শেষ পর্যন্ত মেলা থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে এমন এক পৃথিবীর প্রতিচ্ছবি, যেখানে সবকিছু স্বাভাবিক দেখালেও তার আড়ালে অন্য কিছু ঘটে চলেছে।
অনেকদিন পর কোনো গল্পের কথা মনে পড়লে যদি মনে হয়, ‘এটার শেষটা আমি এখনও ভুলিনি’, তাহলে বুঝতে হয় গল্পটি পাঠকের ভেতরে কোথাও সত্যিই জায়গা করে নিয়েছে।
‘সত্যের মতো বদমাশ’ আমার কাছে তেমনই একটি গল্প—ছোট, অদ্ভুত, অস্বস্তিকর, এবং শেষ হওয়ার পরও যার অন্ধকারটা অনেকক্ষণ সঙ্গে থাকে।

বছরের হিসাব করলে প্রায় এক দশক আগের কথা। ২০১৫ সালের দিকে এক কবির কাছ থেকে বইটি নিয়ে পড়েছিলাম। এক বসাতেই ‘সত্যের মতো বদমাশ’ পড়ে ফেলেছিলাম, আর পরদিনই বইটি তাঁকে ফেরত দিয়ে দিয়েছিলাম। তারপর আর বইটি কেনা হয়নি, কাছে রাখাও হয়নি। আশ্চর্যের ব্যাপার, এত বছর পরেও গল্পটির কিছু দৃশ্য, শিশুটির ভয় আর সেই শেষ দৃশ্যটি মনে রয়ে গেছে। আজ আবার গল্পটি পড়তে গিয়ে মনে হলো, কিছু বই পড়া শেষ হলেই তাদের প্রয়োজন শেষ হয়ে যায় না; বরং সময় পেরোলে তাদের কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। এখন মনে হচ্ছে, ‘সত্যের মতো বদমাশ’ বইটি নিজের সংগ্রহে রাখা দরকার। শুধু পড়ার জন্য নয়, মাঝেমধ্যে খুলে আবার সেই অদ্ভুত মেলার ভেতর ঢুকে পড়ার জন্য।

আর আজ আবদুল মান্নান সৈয়দের জন্মদিন। জন্মদিনে তাঁকে শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা। তাঁর গল্পের সেই নিরীক্ষাধর্মী স্বর, অস্বস্তিকর প্রশ্ন আর প্রচলিত বাস্তবতার আড়ালে অন্য এক বাস্তবতা দেখার ক্ষমতা বাংলা সাহিত্যে নিঃসন্দেহে আলাদা জায়গা তৈরি করেছে। একজন পাঠক হিসেবে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা, এমন একটি গল্প লেখার জন্য, যা পড়ার বহু বছর পরেও মেলার ভিড়, শিশুটির ভয়, টিয়েপাখির কণ্ঠ আর চারজন লোকের ছায়া মনে থেকে যায়।

আরও পড়ুন