বইপড়া, হারিয়ে যাওয়া এক অভ্যাস

বই মানুষের সবচেয়ে নীরব অথচ বিশ্বস্ত সঙ্গী। একটি ভালো বই শুধু জ্ঞান দেয় না; মানুষের চিন্তাকে প্রসারিত করে, কল্পনাকে সমৃদ্ধ করে, জীবনকে দেখার নতুন চোখ তৈরি করে। শৈশবে বইয়ের সঙ্গে যে পরিচয়, তা ধীরে ধীরে মানুষের মনন, রুচি ও ব্যক্তিত্ব গঠনের অংশ হয়ে ওঠে। অথচ ব্যস্ত জীবনের নানা আয়োজন আর প্রযুক্তির বিস্তারে বই পড়ার অভ্যাস দিন দিন যেন হারিয়ে যাচ্ছে। পাঠ্যবইয়ের বাইরে বই পড়ার আগ্রহ কমছে, অবসর সময় দখল করে নিচ্ছে নানা ধরনের বিনোদন।
তবু বইয়ের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি। বরং একজন সচেতন, মানবিক ও জ্ঞাননির্ভর মানুষ এবং একটি উন্নত সমাজ গড়ে তুলতে বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই। পরিবার থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ থেকে রাষ্ট্র, সব জায়গা থেকেই তাই বই পড়ার প্রতি আগ্রহ তৈরি করা প্রয়োজন।
বই পড়ার অভ্যাস, বই কেনা ও সংগ্রহ, শিশুদের বইয়ের প্রতি আগ্রহী করে তোলা এবং আমাদের সমাজে পাঠাভ্যাসের বর্তমান চিত্র—এসব নিয়েই এই লেখা।
শৈশবের বই, বড় হওয়ার সঙ্গে দূরত্ব
শৈশবেই মা-বাবা সন্তানদের হাতে বই তুলে দেন। তারপর থেকেই বইয়ের সঙ্গে তাদের পরিচয় বাড়তে থাকে। দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা অনুসরণ করে প্রতিটি মানুষের বই পড়ার কাল শুরু হয়। মানুষ বই পড়বে আনন্দের জন্য, নিজেকে বিকশিত করার লক্ষ্যে, এটাই হওয়া উচিত। কিন্তু এই মহৎ উদ্দেশ্যের পথে সবাইকে হাঁটতে দেখা যায় না। নানা বাধ্যবাধকতার কারণে বাংলাদেশের মানুষ বই পড়াকে আনন্দের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করতে পারেনি। একেবারেই যে পারেনি, তা নয়; তবে সেই সংখ্যা এতটাই সীমিত যে তাকে বইপড়ুয়া সমাজের প্রতিনিধি বলা কঠিন। এর পেছনে আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থারও বড় ভূমিকা রয়েছে।
শৈশব থেকে শুরু করে প্রায় পঁচিশ বছর বয়স পর্যন্ত মানুষের সঙ্গে বইয়ের সম্পর্ক বেশ নিবিড় থাকে, ইচ্ছায় হোক কিংবা অনিচ্ছায়। পড়াশোনার পাঠ চুকাতেই এই দীর্ঘ সময় কেটে যায়। তারপর অনেকেই যেন বইয়ের পাঠও চুকিয়ে ফেলতে চান। কর্মব্যস্ত জীবনের ফাঁকে অল্প কিছু মানুষই বইপড়া অব্যাহত রাখেন। ফলে শৈশবের সেই সখ্য একসময় দূরত্বে, কখনো কখনো বৈরিতায় রূপ নেয়।
বৈরিতার কথাটি বলছি এই কারণে যে, আমাদের দেশে অনেকেই বই পড়েন পরীক্ষায় পাস করার জন্য, কিংবা কয়েকটি সার্টিফিকেট অর্জনের জন্য। যদি পাস-ফেল কিংবা সার্টিফিকেটের বাধ্যবাধকতা না থাকত, তাহলে বোধহয় অনেকেই বই ছুঁয়েও দেখতেন কি না, সন্দেহ। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতাউর রহমান তাঁর এক বইয়ে লিখেছিলেন, ‘বাংলাদেশের ছেলেরা বই পড়ে চাকরি পাওয়ার জন্য আর মেয়েরা বিয়ে করার জন্য। তা না হলে তারা বই ছুঁয়েও দেখত না।’
অনেককাল আগে প্রমথ চৌধুরী ‘বইপড়া’ নিয়ে বাঙালি জাতিকে জ্ঞানগর্ভ কথা বলেছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই বইপড়ার আহ্বান আজও পুরোপুরি সফল হয়েছে বলা যায় না। বরং ব্যঙ্গ করে বলা যায়, প্রমথ চৌধুরীর সৌভাগ্যই বলতে হবে, বহুকাল আগেই বইপড়া যেন জাদুঘরে শোভা পাওয়ার মতো একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে!
বই কি আনন্দের, নাকি ভয়ের?
এ দেশের স্কুল-কলেজে যে কটি বই পড়ানো হয়, তাতে কি সত্যিই মানুষ বই পড়ার প্রতি আকৃষ্ট হয়, নাকি বইয়ের প্রতি বিতৃষ্ণাই বাড়ে? স্কুল-কলেজে খুব কম মানুষই বই পড়াকে আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করে। বরং অনেকেই বইকে ভয়ের চোখে দেখে। ফলে পাঠ্যবইয়ের বাইরে বইয়ের জগতে প্রবেশের আগ্রহও আর তৈরি হয় না।
আমরা বইকে সাদরে গ্রহণ না করার ফলে অন্য দেশের সঙ্গে আমাদের ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। আমরা পড়ি না, তাই জানি না। আর জানি না বলেই অন্যের কাছ থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞান ধার করতে হয়।
তবু কারও কারও কাছে বই অনেক কিছুর চেয়েও দামি। চোখের সামনে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা পড়ে থাকলেও হয়তো সে দিকে তাকাবে না, অথচ একটি প্রিয় বই পড়ার জন্য সবকিছু ভুলে যেতে পারে। দুপুরের খাবারের পর বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়ে বুকের ওপর একটি প্রিয় বই রেখে কত মানুষ যে বইয়ের পাতায় ডুবে যান! চোখের পাতায় ঘুম এসে ভর করলেও ভালো বইয়ের টানে ঘুমের ডাক উপেক্ষিত হয়।
স্কুলের বেঞ্চিতে শিক্ষকের চোখ ফাঁকি দিয়ে গল্পের বই পড়েনি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। আর একুশের বইমেলায় আজও বইপ্রেমীদের ভিড় দেখা যায়। এটুকুই আশার কথা, মানুষ এখনো বই কেনার জন্য মেলায় আসে, বই কেনে, বই পড়ে।
বইপড়া নিয়ে বিখ্যাতদের উক্তি
স্পিনোজা বলেন—ভালো খাদ্যবস্তু পেট ভরে, কিন্তু ভালো বই মানুষের আত্মাকে পরিতৃপ্ত করে।
দেকার্তে বলেন—ভালো বই পড়া মানে গত শতাব্দীর সেরা মানুষদের সঙ্গে কথা বলা।
নেপোলিয়ন বলেন—অন্তত ষাট হাজার বই সঙ্গে না থাকলে জীবন অচল।
জন মেকলে বলেন—প্রচুর বই নিয়ে গরিব হয়ে চিলেকোঠায় বসবাস করব, তবু এমন রাজা হতে চাই না, যে বই পড়তে ভালোবাসে না।
নরম্যান মেইলার বলেন—আমি চাই, বই পাঠরত অবস্থায় যেন আমার মৃত্যু হয়।
বইপড়া শুরু হোক শৈশবেই
বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হলে শুরু করতে হবে শৈশবেই। এ ক্ষেত্রে মা-বাবাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। শৈশবেই যেহেতু প্রতিটি সন্তান বইয়ের সঙ্গে পরিচিত হয়, তাই পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি অন্য বই পড়তেও তাদের উৎসাহ দেওয়া জরুরি।
বই পড়াকে ভীতিকর না করে আনন্দময় করে তুলতে পারলেই বই পড়ার আসল উদ্দেশ্য সফল হবে। বইয়ের মাধ্যমে কোমলমতি শিশুদের সামনে খুলে যাবে পৃথিবীর বিচিত্র দুয়ার। তারা বিশ্ব, ইতিহাস ও প্রকৃতি থেকে শিখতে পারবে। বিকশিত হবে তাদের মনন; জন্ম নেবে নতুন নতুন ভাবনা। কোনো কিছু জানার, বোঝার এবং আবিষ্কার করার আনন্দ তাদের আরও বেশি বইয়ের কাছে টেনে নেবে।
যত বেশি পড়বে, তত বেশি জানবে। আর জানার মধ্য দিয়ে মানুষ হিসেবে নিজেকে উন্নত করবে। মানুষ উন্নত হলে জাতি উন্নত হয়, আর জাতি উন্নত হলে দেশও এগিয়ে যায়। সুতরাং শিশুদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে প্রতিটি পরিবারের মা-বাবাকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
বই কেনা
বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না, অথচ আজকাল অনেকেই বই কিনতে চান না। হাতের কাছে বই থাকলেও পড়ার প্রতি আগ্রহ দেখা যায় না। বই কেনার জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখেন এমন মানুষের সংখ্যাও খুব বেশি নয়। ভালো মানের বই কেনা কিংবা পড়ার প্রতিও অনেকের আগ্রহ কম।
গ্রাম থেকে শহর, বইয়ের দোকানে নানা ধরনের লেখকের বই দেখা যায়। বাজারে হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, কাসেম বিন আবুবকর প্রমুখ লেখকের বইয়েরও চাহিদা রয়েছে। বাজারে বইয়ের চাহিদা যেমনই হোক, একজন প্রকাশক একটি বই প্রকাশের আগে অনেক কিছু ভেবে নেন। তাঁকে ভাবতে হয় পুঁজি ফেরতের বিষয়টিও। হুমায়ূন আহমেদের বই কেনার জন্য পাঠকদের যেমন লাইনে দাঁড়াতে দেখা যায়, তেমন সুযোগ তো সব প্রকাশকের হয় না। তাই একটি ভালো মানের বই প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিতে একজন প্রকাশককে অনেকবার ভাবতে হয়।
দিনে দিনে বইয়ের দামও সাধারণ পাঠকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। অনেক পাঠক চাইলেও নতুন বই কিনতে পারেন না। আবার কেউ কেউ বই কেনার চেয়ে সেই টাকা অন্য কোনো বিনোদনের পেছনে ব্যয় করাকেই বেশি গুরুত্ব দেন।
বইয়ের ফেরিওয়ালা
অনেক বইপড়ুয়া আছেন, যারা নিজেরা বই পড়ার পাশাপাশি অন্যকেও বই পড়তে উৎসাহ দেন। নিজের টাকায় বই কিনে অন্যকে পড়তে দেন নিঃস্বার্থভাবে। তেমনই একজন মানুষ রাজশাহীর পলান সরকার। বাংলাদেশের মানুষের কাছে তিনি ইতিমধ্যে একজন অনন্য মানুষ হিসেবে পরিচিত।
প্রায় একুশ বছর ধরে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বাউশা গ্রামের পলান সরকার বিনা পয়সায় বই বিলিয়ে আসছেন আশপাশের দশটি গ্রামে। নিজের পয়সায় বই কিনে তিনি সেগুলো পৌঁছে দেন মানুষের বাড়ি বাড়ি। পড়া শেষ হলে পুরোনো বই ফেরত নিয়ে দিয়ে আসেন নতুন বই। নব্বই বছর বয়সেও তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে বই বিতরণের এই কাজ চালিয়ে গেছেন। বাঘা উপজেলার বারোটি গ্রামের প্রায় পাঁচ হাজার পাঠকের কাছে তাঁর বই পৌঁছেছে।
পলান সরকার নিজের সামর্থ্য দিয়ে রাজশাহীর কয়েকটি গ্রামকে বইয়ের আলোয় আলোকিত করেছেন। এ ছাড়া আরও একজন মানুষ পুরো বাংলাদেশের মানুষের জন্য বইয়ের ফেরিওয়ালার ভূমিকা পালন করছেন। তিনি আমাদের সকলের পরিচিত আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ‘আলোকিত মানুষ চাই’ স্লোগানকে সামনে রেখে সারাদেশে বইপড়া আন্দোলনের অগ্রযাত্রী হিসেবে তিনি প্রায় তিন দশক ধরে কাজ করে যাচ্ছেন।
আন্দোলনের নাম ‘বইপড়া’
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে বইপড়া কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার চেষ্টা করে আসছে। অল্প পরিসরে হলেও বিভিন্ন স্কুল-কলেজে বিভিন্ন দিবস বা উৎসবকে কেন্দ্র করে বইপড়া কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। তবে এই চর্চা নিয়মিত নয়; বইপড়ার আসল উদ্দেশ্যও সবসময় সেখানে পরিলক্ষিত হয় না। সেকারণে বলা যায়, দেশের বইপড়া আন্দোলনে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ‘আলোকিত মানুষ চাই’ কর্মসূচি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি নিয়ে জেলায় জেলায় ঘুরে বেড়ায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের গাড়িগুলো। মানুষ নামমাত্র টাকায় সদস্য হয়ে প্রতি সপ্তাহে বই বাসায় নিয়ে পড়তে পারে। স্কুল-কলেজেও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বইপড়াকে কেন্দ্র করে প্রতিযোগিতার আয়োজন করে ছাত্রছাত্রীদের বইয়ের প্রতি আগ্রহী করে আসছে বছরের পর বছর।
বই সংগ্রহ অথবা ই-বুক
সারাজীবনে একটি বই পড়েই দায় সারা যায় না। বই পড়াকে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করতে হয়। শুধু পড়লেই হবে না, বই সংগ্রহের অভ্যাসও গড়ে তুলতে হবে। বই সংগ্রহের নানা উপায় আছে। নিজে বই কিনে সংগ্রহ করার পাশাপাশি অন্যকেও বই উপহার দেওয়া যায়।
বর্তমানে বই কিনে পড়ার প্রতি অনেকেরই আগ্রহ কমে গেছে। কেউ কেউ বলেন, টাকা দিয়ে বই কিনে পড়ার দরকার কী? ঘরে বসেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে যেকোনো বই ডাউনলোড করে পড়া যায়। সত্যিই ইন্টারনেট থেকে অসংখ্য বই সংগ্রহ করা সম্ভব। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কতজন কম্পিউটার বা মোবাইলের পর্দায় বসে সেই বইগুলো শেষ পর্যন্ত পড়ে শেষ করেন?
ডিজিটাল সংগ্রহে অমুক বই, তমুক বই জমতে থাকে; কিন্তু পড়া আর হয়ে ওঠে না। যদি কিছু টাকা দিয়ে বাজার থেকে পছন্দের একটি বই কিনে আনা হয়, তখন নিজের মনই বলে, এত টাকা দিয়ে বইটা কিনলাম, দেখি তো বইটিতে কী লেখা আছে! এমনি করেই একসময় বইটি পড়া হয়ে যায়।
ই-বুকের সুবিধা আছে, কিন্তু হাতে নেওয়া কাগজের বইয়ের যে আলাদা আনন্দ, তা কি সত্যিই অন্য কোনো মাধ্যমে পাওয়া যায়?
বইয়ে নয়, ফেসবুকাসক্ত প্রজন্ম
বর্তমান প্রজন্মের অনেকেরই বই কিনে পড়ার প্রতি আগ্রহ নেই। তারা ব্যস্ত ইন্টারনেট আর ফেসবুক নিয়ে। সময় পেলেই ঢুঁ মারে ইন্টারনেটের দুনিয়ায়, সময় কাটায় ফেসবুকে। তাদের অনেকেরই ধারণা, বই পড়ে সময় নষ্ট না করে ফেসবুকে থাকাই ভালো।
ঢাকার একটি নামকরা স্কুল ও কলেজের কয়েকজন ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে বই এবং বইপড়া নিয়ে কথা বলে জানা যায়, তারা পাঠ্যবইয়ের বাইরে আর কোনো বই পড়ার সময় ও সুযোগ পায় না। অনেকের মনের ভেতর সে আগ্রহও তৈরি হয় না। ফলে পাঠ্যবইয়ের বাইরের বইয়ের সঙ্গে তাদের পরিচয় সীমিত। দু-একজন লেখকের নাম ও তাঁদের গুটিকয়েকটি বইয়ের বাইরে অনেকেই আর কোনো লেখকের নাম বলতে পারেনি।
তাই বলা যায়, বর্তমান প্রজন্মের একটি বড় অংশ বইয়ের চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই বেশি সময় কাটাচ্ছে।
বয়স্কদের স্মৃতি চাঙ্গা করতে বইপড়া
দীর্ঘ কর্মব্যস্ত জীবনের পর অবসরজীবনে কী করা যায়, তা নিয়ে অনেকেই চিন্তায় পড়ে যান। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, বেশি করে পড়ুন। এতে সময় ভালো কাটবে, পাশাপাশি স্মৃতিশক্তির জন্যও উপকারী হতে পারে।
বই পড়ার জন্য প্রয়োজন ভালো দৃষ্টিশক্তি এবং মনোযোগ। অথচ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ দুটিতেই নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবু বই পড়া ছেড়ে না দেওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
বয়স্কদের চিকিৎসা ও বার্ধক্যবিদ্যাবিষয়ক জার্মান প্রতিষ্ঠানের প্রধান ড. মানফ্রেড গোগোল বলেন, ‘বই পড়ার সময় স্নায়ুতন্ত্র উদ্দীপিত হওয়ায় মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলোর মধ্যে নতুন সংযোগকারী উপাদান তৈরি করে।’
তবে বছরে মাত্র একটি বই পড়লেই যথেষ্ট নয়। গোগোলের পরামর্শ, যে বিষয়ে আগ্রহ রয়েছে, সে বিষয়ের বই বেছে নেওয়াই ভালো। মোটা উপন্যাস পড়তে যদি অনেক সময় লাগে, তাহলে ছোট উপন্যাস কিংবা ছোট গল্পের সংকলন পড়া যেতে পারে। অবশ্য বই পড়তে গিয়ে চোখে কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
পড়ার বিষয় যাহোক, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, যা পড়বেন, তা নিয়ে অন্যদের সঙ্গে আলোচনা করুন। বিশেষ করে যেসব বয়স্ক মানুষ একাকিত্বে ভোগেন, তাঁদেরও বইপড়ুয়াদের দলে যুক্ত হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
কী পড়ার কথা, কী পড়ছি?
একে তো ইদানীং মানুষ বই পড়ার জন্য সময় করে উঠতে পারে না, তার ওপর অবসরটুকুও নানা ধরনের বিনোদনে ব্যয় করে। এর মধ্যে কিছুসংখ্যক স্কুল-কলেজের ছেলে-মেয়ে থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার মানুষ অবাঞ্ছিত বই পড়ার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। পত্রিকার আড়ালে চড়া মূল্য দিয়ে কিনে নিচ্ছে নিম্নমানের নানা বই। বই না বলে এগুলোকে চটি বই বলাই শ্রেয়।
এসব বই পড়ার ফলে চারিত্রিক অবক্ষয়ের পাশাপাশি সামাজিক পরিবেশও নানা ধরনের হুমকির মুখে পড়ছে। মানসিক বিকারের শিকার হয়ে অনেকেই নানা অপকর্মের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, এমন আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, স্কুলপড়ুয়ারাই এসব অবাঞ্ছিত বইয়ের অন্যতম ক্রেতা। স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে তারা এসব বই কিনে ব্যাগে ভরে নিয়ে যায়। তারপর ক্লাসরুমে বসে কিংবা স্কুল ছুটির পর বাসায় ফিরে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে এসব ‘ভুল বই’ পড়ে।
ঢাকা শহরের বিভিন্ন পত্রিকার স্টল থেকে শুরু করে ফুটপাতেও এসব বই অবাধে বিক্রি হচ্ছে। এমনই এক বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব বইয়ের বিক্রি বেশ ভালো। কম পুঁজিতে বেশি লাভ। নিম্নমানের কাগজে ছাপা একটি বই ষাট-সত্তর টাকা বা তারও বেশি দামে বিক্রি হয়। ক্রেতারাও খুব একটা দরদাম করেন না; বিক্রেতা যে দাম চান, অনেকেই সেই দামেই কিনে নেন।
কোথা থেকে আসে এসব বই? বিক্রেতার উত্তরও বেশ ঘোলাটে। শুধু জানেন, প্রতিদিন না হলেও প্রতি সপ্তাহে ভোরবেলা পত্রিকার এজেন্টের কাছে একজন লোক এসব বই দিয়ে যায়। গরিবের বেশে আসা সেই লোকটিই নাকি কোটি কোটি টাকার মালিক!
এসব বই বিক্রি করা উচিত কি না, সে প্রশ্নে দোকানদারের কাছে লাভের হিসাবই মুখ্য। তিনি তো আর কাউকে জোর করে বই বিক্রি করছেন না। এই হলো আমাদের বইপড়ার গোপন এক চিত্র। প্রশ্ন হলো—এ ধরনের অবাঞ্ছিত বই পড়ে আমরা কতটুকু উন্নত হতে পারব?
একটি ঘর, একটি পাঠশালা
প্রতিটি ঘর থেকেই বইপড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। বই পড়ার মাধ্যমেই মানুষের জ্ঞান, মনন ও মানবিকতা বিকশিত হয়; আর সচেতন মানুষই পারে একটি উন্নত জাতি গড়ে তুলতে।
সেকারণে প্রতিটি ঘরকে একটি ছোট্ট পাঠশালায় পরিণত করা দরকার। একটি বই, একটি পাঠক, একটি পরিবার, এভাবেই তৈরি হতে পারে একটি পাঠপ্রিয় সমাজ।
বই শুধু সময় কাটানোর সঙ্গী নয়; বই মানুষকে নিজের ভেতরটা চিনতে শেখায়, পৃথিবীকে নতুন করে দেখতে শেখায়। তাই আসুন, শিশুর হাতে বই তুলে দিই, নিজের জন্য বই কিনি, প্রিয়জনকে বই উপহার দিই, আর বইকে ফিরিয়ে আনি আমাদের প্রতিদিনের জীবনে।
একটি ঘর, একটি পাঠশালা—একটি পাঠশীল সমাজের স্বপ্ন।
মাসুম বিল্লাহ : ইনসাইট কন্ট্রিবিউটর, বইচারিতা
