বারুখ স্পিনোজার দর্শন: তত্ত্ব ও সমালোচনা

১.
পশ্চিমা দর্শনের ইতিহাসে বারুখ স্পিনোজা (১৬৩২–১৬৭৭ খ্রিষ্টাব্দ) এমন একজন দার্শনিক, যাঁর চিন্তা একই সঙ্গে গভীর, মৌলিক, যুক্তিনিষ্ঠ এবং দীর্ঘকাল ধরে বিতর্কের বিষয়। সপ্তদশ শতাব্দীর ইউরোপে যখন বৈজ্ঞানিক বিপ্লব, ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিকাশ পরস্পরের সঙ্গে জটিলভাবে জড়িয়ে নতুন বৌদ্ধিক পরিবেশ সৃষ্টি করছিল, তখন স্পিনোজা সেই পরিবর্তনশীল সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিন্তক হিসেবে আবির্ভূত হন। তাঁর দর্শনের বিশেষত্ব হলো—তিনি বাস্তবতাকে বিচ্ছিন্ন সত্তার সমষ্টি হিসেবে নয়, বরং একটি অবিভাজ্য, অপরিহার্য এবং সর্বব্যাপী ঐক্য হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। ঈশ্বর, প্রকৃতি, মানুষ, মন, দেহ, স্বাধীনতা, নৈতিকতা এবং জ্ঞানের মতো দর্শনের মৌলিক বিষয়গুলোকে তিনি এমনভাবে পুনর্ব্যাখ্যা করেছিলেন, যা তাঁর সমসাময়িকদের কাছে ছিল অত্যন্ত বিস্ময়কর, অনেকের কাছে বিপজ্জনক, আবার পরবর্তী শতাব্দীর বহু দার্শনিকের কাছে গভীর অনুপ্রেরণার উৎস।
স্পিনোজার জন্ম ১৬৩২ সালের ২৪ নভেম্বর নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে। তাঁর পরিবার ছিল পর্তুগাল থেকে আগত মারানো বা ধর্মান্তরিত ইহুদিদের বংশধর। মধ্যযুগের শেষভাগ এবং আধুনিক যুগের সূচনালগ্নে স্পেন ও পর্তুগালে ইহুদিদের ওপর ধর্মীয় নিপীড়ন ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠে। বহু ইহুদি বাধ্য হয়ে প্রকাশ্যে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করলেও গোপনে নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় রক্ষা করতেন। এই জনগোষ্ঠীকেই সাধারণভাবে ‘মারানো’ বলা হতো। পরবর্তীকালে তাঁদের একটি বড় অংশ তুলনামূলকভাবে ধর্মীয় সহনশীলতার জন্য পরিচিত নেদারল্যান্ডসে আশ্রয় গ্রহণ করেন। স্পিনোজার পরিবারও সেই অভিবাসী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে শৈশব থেকেই তিনি এমন একটি পরিবেশে বেড়ে ওঠেন, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়, স্বাধীন চিন্তা এবং সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্ন একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত ছিল।
তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা হয় ইহুদি ধর্মীয় বিদ্যালয়ে। সেখানে তিনি হিব্রু ভাষা, তোরাহ, তালমুদ এবং মধ্যযুগীয় ইহুদি দর্শনের বিভিন্ন ধারা অধ্যয়ন করেন। বিশেষভাবে মাইমোনিডিসের দর্শন তাঁর চিন্তার ওপর প্রাথমিক প্রভাব বিস্তার করেছিল। কিন্তু কৈশোর অতিক্রম করার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর আগ্রহ ধর্মীয় ব্যাখ্যার সীমা ছাড়িয়ে দর্শন, গণিত, যুক্তিবিদ্যা এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের দিকে প্রসারিত হয়। লাতিন ভাষা শেখার মাধ্যমে তিনি ইউরোপীয় মানবতাবাদী সাহিত্য, প্রাচীন গ্রিক দর্শন এবং সমকালীন বৈজ্ঞানিক চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হন। এই সময়েই তিনি রেনে দেকার্ত, এরিস্টটল, স্টোইক দার্শনিকগণ, টমাস হবস এবং অন্যান্য চিন্তাবিদদের রচনা অধ্যয়ন করেন। ক্রমে তাঁর মধ্যে এমন একটি স্বাধীন দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ ঘটে, যা প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে আর সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
ঈশ্বর, ভবিষ্যদ্বাণী, ধর্মগ্রন্থের ব্যাখ্যা, আত্মার প্রকৃতি এবং মানুষের অমরত্ব সম্পর্কে তাঁর ক্রমবিকশিত মতামত আমস্টারডামের ইহুদি সম্প্রদায়ের নেতাদের গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ১৬৫৬ সালে তাঁকে কঠোর ধর্মীয় আদেশের মাধ্যমে সমাজ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এই বহিষ্কার কেবল ধর্মীয় শাস্তিই ছিল না; সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক দিক থেকেও এটি ছিল অত্যন্ত কঠোর সিদ্ধান্ত। পরিবার ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তবে এই ঘটনাকে অনেক গবেষক তাঁর বৌদ্ধিক স্বাধীনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় বলে মনে করেন। কারণ এর পর থেকেই তিনি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় কর্তৃত্বের অধীনে না থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজের দর্শন নির্মাণে আত্মনিয়োগ করেন।
জীবিকার জন্য তিনি লেন্স ঘষার কাজ গ্রহণ করেন। সে সময় দূরবীন ও অণুবীক্ষণ যন্ত্রের উন্নয়নে উৎকৃষ্ট মানের লেন্স নির্মাণ ছিল একটি বিশেষ দক্ষতার কাজ। স্পিনোজা এই পেশায় অসাধারণ নিপুণতা অর্জন করেছিলেন। বিজ্ঞানীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগও ছিল, এবং আলোকবিজ্ঞানের ব্যবহারিক দিক সম্পর্কে তাঁর যথেষ্ট জ্ঞান ছিল বলে ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়। তবে দীর্ঘদিন কাচের সূক্ষ্ম গুঁড়োর সংস্পর্শে থাকার ফলে তাঁর ফুসফুসে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছিল বলে অনেক গবেষক মনে করেন। শেষ পর্যন্ত যক্ষ্মাজনিত অসুস্থতায় ১৬৭৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মাত্র চুয়াল্লিশ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
স্পিনোজার জীবন ছিল অত্যন্ত সংযমী, নিরহংকার এবং প্রায় নিঃসঙ্গ। তিনি কখনো রাজনৈতিক ক্ষমতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পদ কিংবা রাজদরবারের পৃষ্ঠপোষকতা লাভের চেষ্টা করেননি। এমনকি জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যাপনার প্রস্তাব পাওয়ার পরও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণ করলে স্বাধীনভাবে দর্শনচর্চা করার সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে। সত্যের অনুসন্ধান তাঁর কাছে ব্যক্তিগত খ্যাতি বা সামাজিক মর্যাদার চেয়ে অধিক মূল্যবান ছিল। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁর সমগ্র জীবনকে একটি বিরল দার্শনিক সততার উদাহরণে পরিণত করেছে।
পরবর্তীকালে গেয়র্গ ভিলহেল্ম ফ্রিডরিখ হেগেল তাঁর লেখা ও বক্তৃতায় স্পিনোজার জীবন ও দর্শনের এই সম্পর্ককে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। দর্শনের ইতিহাসবিষয়ক তাঁর বক্তৃতায় তিনি মন্তব্য করেন যে স্পিনোজার ব্যক্তিগত জীবন যেন তাঁর দর্শনেরই বাস্তব প্রতিফলন। হেগেলের মতে, স্পিনোজার দর্শনে সমস্ত সীমিত ও ব্যক্তিগত সত্তা শেষ পর্যন্ত একটি অসীম ঐক্যের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়; সেই অর্থে তাঁর জীবনাবসানও যেন ব্যক্তিগত অস্তিত্ব থেকে সার্বজনীন অস্তিত্বে প্রত্যাবর্তনের একটি প্রতীকী রূপ। যদিও এই মন্তব্য দার্শনিক ব্যাখ্যার অংশ, তবু এটি স্পিনোজার দর্শনের ঐতিহাসিক গ্রহণযোগ্যতা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর জীবদ্দশায় স্পিনোজার দর্শন ব্যাপকভাবে ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়েছিল। তাঁর সমসাময়িক অনেক ধর্মতাত্ত্বিক ও দার্শনিক মনে করেছিলেন, তিনি ঈশ্বরকে অস্বীকার করছেন। ফলে তাঁকে নাস্তিক, ধর্মবিরোধী এবং সমাজের জন্য বিপজ্জনক চিন্তাবিদ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। কিন্তু বাস্তবে স্পিনোজা কখনো ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার করেননি। বরং তিনি এমন এক ঈশ্বর-ধারণা উপস্থাপন করেছিলেন, যা প্রচলিত ধর্মীয় ঈশ্বর-ধারণার তুলনায় অনেক বেশি সর্বব্যাপী, দার্শনিক এবং অধিবিদ্যাগত। তাঁর সমস্যা ছিল ব্যক্তিগত ঈশ্বরের ধারণার সঙ্গে, ঈশ্বরের ধারণার সঙ্গে নয়। তিনি মনে করতেন, মানুষ সাধারণত ঈশ্বরকে নিজের মতো করে কল্পনা করে—ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন, রাগ-অনুরাগসম্পন্ন, পুরস্কারদানকারী কিংবা শাস্তিদানকারী এক অতিমানবীয় ব্যক্তি হিসেবে। অথচ প্রকৃত দর্শনের কাজ হলো এই মানবসদৃশ কল্পনাকে অতিক্রম করে বাস্তবতার গভীরতম ভিত্তিকে বোঝা।
এই কারণেই তাঁর দর্শন পরবর্তীকালে “সর্বেশ্বরবাদ” নিয়ে বিস্তৃত বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। সর্বেশ্বরবাদ এমন একটি মতবাদ, যেখানে ঈশ্বর ও প্রকৃতিকে দুটি পৃথক বাস্তবতা হিসেবে নয়, বরং একই অসীম বাস্তবতার দুটি নাম হিসেবে দেখা হয়। স্পিনোজা নিজে অবশ্য সর্বেশ্বরবাদ শব্দটি ব্যবহার করেননি। তবু তাঁর দর্শনের মৌলিক বক্তব্য—“ঈশ্বর অথবা প্রকৃতি”—এই ধারণার সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত যে পরবর্তী শতাব্দীতে তাঁকে সর্বেশ্বরবাদের প্রধান দার্শনিক প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষত অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে জার্মানিতে তথাকথিত “সর্বেশ্বরবাদ বিতর্ক” স্পিনোজার দর্শনকে নতুনভাবে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। ফ্রিডরিখ ইয়াকোবি, মোজেস মেন্ডেলসন, লেসিং, পরে হেগেল, শেলিং এবং আরও বহু দার্শনিক স্পিনোজার চিন্তাকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করেন।
এই পুনর্মূল্যায়নের ফলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে স্পিনোজা কেবল ধর্মতত্ত্বের সমালোচক নন; তিনি আধুনিক দর্শনের অন্যতম মৌলিক নির্মাতা। জার্মান ভাববাদ, রোমান্টিক দর্শন, আধুনিক নীতিশাস্ত্র, রাজনৈতিক দর্শন এবং এমনকি সমকালীন মনোবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের কিছু আলোচনাতেও তাঁর চিন্তার প্রতিধ্বনি লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে মন ও দেহের সম্পর্ক, আবেগের প্রকৃতি, স্বাধীনতার অর্থ এবং মানুষের সামাজিক অস্তিত্ব সম্পর্কে তাঁর বিশ্লেষণ আজও বিস্ময়করভাবে প্রাসঙ্গিক।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয় যে আধুনিক ইউরোপীয় দর্শনের মূলধারায় দীর্ঘ সময় ধরে রেনে দেকার্ত, জন লক, ডেভিড হিউম বা ইমানুয়েল কান্টের তুলনায় স্পিনোজার প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। এর একটি কারণ ছিল তাঁর দর্শনের জটিলতা; আরেকটি কারণ ছিল ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিতর্কের সঙ্গে তাঁর নামের দীর্ঘস্থায়ী সংযোগ। বিংশ শতাব্দীতে এসে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। বিশেষ করে এডউইন কার্লির নির্ভরযোগ্য ইংরেজি অনুবাদ, সমসাময়িক ব্যাখ্যাকারদের বিশ্লেষণ এবং নতুন গবেষণার ফলে স্পিনোজার রচনাগুলি ইংরেজিভাষী জগতে ব্যাপকভাবে পরিচিত হয়। একই সঙ্গে জিল দ্যল্যুজ, আন্তোনিও নেগ্রি এবং আরও বহু আধুনিক দার্শনিক স্পিনোজাকে নতুনভাবে পাঠ করতে শুরু করেন। তাঁদের মতে, স্পিনোজার দর্শন কেবল সপ্তদশ শতাব্দীর একটি ঐতিহাসিক দর্শন নয়; বরং আধুনিক স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, ব্যক্তি, সমাজ, আবেগ এবং ক্ষমতার প্রশ্ন বোঝার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই নতুন আগ্রহের অন্যতম কারণ হলো স্পিনোজার মন-দেহ সম্পর্কবিষয়ক অভিনব ব্যাখ্যা। পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে বহু শতাব্দী ধরে মন ও দেহকে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু স্পিনোজা এই দ্বৈত বিভাজনকে মৌলিকভাবে পুনর্বিবেচনা করেন। তাঁর মতে, মানুষের মন কোনো বিচ্ছিন্ন আত্মা নয় এবং দেহও কেবল জড় পদার্থ নয়। উভয়ই একই অসীম বাস্তবতার দুটি ভিন্ন প্রকাশমাত্র। ফলে মানসিক এবং শারীরিক ঘটনাকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী বা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র জগৎ হিসেবে না দেখে, একই বাস্তবতার দুটি সমান্তরাল অভিব্যক্তি হিসেবে বোঝা উচিত। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তীকালে মন-দেহ সমস্যার আলোচনায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে এবং সমকালীন দর্শনেও এর গুরুত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
স্পিনোজার দর্শনের প্রকৃত তাৎপর্য বোঝার জন্য তাঁর রচনাগুলোর বিকাশধারাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর চিন্তা কোনো একদিনে সম্পূর্ণ রূপে গঠিত হয়নি; বরং দীর্ঘ অধ্যয়ন, গভীর আত্মসমালোচনা এবং পূর্ববর্তী দার্শনিক ঐতিহ্যের সৃজনশীল পুনর্ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে। সেই বিকাশধারাই পরবর্তীকালে তাঁর মহাগ্রন্থ এথিক্স-এ পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে, যা আধুনিক দর্শনের ইতিহাসে অন্যতম মৌলিক এবং সর্বাধিক আলোচিত গ্রন্থ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

২.

স্পিনোজার দর্শনের পূর্ণাঙ্গ রূপ বোঝার জন্য তাঁর রচনাসমূহকে কেবল পৃথক পৃথক গ্রন্থ হিসেবে পড়লেই যথেষ্ট নয়; বরং তাঁর চিন্তার ক্রমবিকাশের ধারাটি অনুসরণ করা প্রয়োজন। কারণ তাঁর দর্শন কোনো আকস্মিক উদ্ভাবনের ফল নয়। দীর্ঘ অধ্যয়ন, কঠোর যুক্তিবিশ্লেষণ, আত্মসমালোচনা এবং পূর্ববর্তী দার্শনিক ঐতিহ্যের গভীর পুনর্ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে তাঁর চিন্তা ধীরে ধীরে এমন এক পরিণত অবস্থায় পৌঁছায়, যার সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটে এথিক্স গ্রন্থে। তাঁর প্রাথমিক রচনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পরবর্তী সময়ে যে মৌলিক ধারণাগুলো তাঁকে বিশ্বদর্শনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নির্মাতায় পরিণত করেছিল, সেগুলোর অধিকাংশই সেখানে বীজরূপে উপস্থিত ছিল। ফলে এথিক্স কোনো বিচ্ছিন্ন গ্রন্থ নয়; বরং তাঁর সমগ্র বৌদ্ধিক যাত্রার পরিণত ও সুসংহত ফল।

তাঁর প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ রচনাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ট্রিটাইজ অন দ্য এমেন্ডেশন অব দ্য ইনটেলেক্ট। এটি একটি অসমাপ্ত গ্রন্থ। মৃত্যুর পর ১৬৭৭ সালে তাঁর অন্যান্য অপ্রকাশিত রচনার সঙ্গে এটি প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থে স্পিনোজা মানুষের জ্ঞানের প্রকৃতি, সত্য অনুসন্ধানের পদ্ধতি এবং বুদ্ধির সীমা ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁর প্রধান প্রশ্ন ছিল—মানুষ কীভাবে এমন জ্ঞান অর্জন করতে পারে, যা সন্দেহাতীত, স্থায়ী এবং সর্বজনীন? দৈনন্দিন জীবনে মানুষ অসংখ্য বিশ্বাস, মতামত ও অভ্যাসের ওপর নির্ভর করে চললেও সেগুলোর অধিকাংশই পরিবর্তনশীল এবং অনিশ্চিত। তাই প্রকৃত দর্শনের কাজ হলো এমন এক জ্ঞানপদ্ধতি নির্মাণ করা, যা মানুষের মনকে বিভ্রান্তি, কুসংস্কার ও অজ্ঞতা থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হবে।

এই গ্রন্থে স্পিনোজা জ্ঞানকে কেবল তথ্যের সঞ্চয় হিসেবে দেখেননি; বরং তিনি জ্ঞানকে মানুষের অস্তিত্বের রূপান্তরের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তাঁর মতে, সত্যিকার জ্ঞান মানুষের চিন্তার ধরনকে বদলে দেয়। যে ব্যক্তি জগতের কারণ ও নিয়ম বুঝতে পারে, সে কেবল বেশি তথ্য জানে না; বরং সে নিজেকেও নতুনভাবে বুঝতে শেখে। এই ধারণাই পরবর্তীকালে এথিক্স-এর নীতিশাস্ত্রের ভিত্তি হয়ে ওঠে, যেখানে জ্ঞানকে মানুষের স্বাধীনতা ও আনন্দের প্রধান উৎস হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

আরেকটি প্রাথমিক রচনা হলো শর্ট ট্রিটাইজ অন গড, ম্যান অ্যান্ড হিজ ওয়েলবিয়িং। এই গ্রন্থটি তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়নি; উনিশ শতকে পাণ্ডুলিপি আবিষ্কৃত হওয়ার পর এটি প্রকাশিত হয়। যদিও এটি তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত, তবুও স্পিনোজার দর্শনের বিকাশ বোঝার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। এখানে ঈশ্বর, মানুষ, প্রকৃতি, আবেগ, নৈতিকতা এবং মুক্তির যে আলোচনা পাওয়া যায়, তা পরবর্তীকালের এথিক্স-এর সুস্পষ্ট পূর্বাভাস বহন করে। অনেক গবেষক যথার্থই বলেন, এই গ্রন্থ যেন এথিক্স-এর একটি প্রাথমিক খসড়া, যেখানে পরবর্তী সময়ে পূর্ণতা লাভ করা প্রায় সব মৌলিক ধারণার বীজ উপস্থিত রয়েছে।

এই সময়ের আরেকটি উল্লেখযোগ্য রচনা মেটাফিজিক্যাল থটস। এটি মূলত দেকার্তের দর্শন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রচিত হলেও এর মধ্যে স্পিনোজার নিজস্ব অবস্থানেরও ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এখানে তিনি মধ্যযুগীয় অধিবিদ্যার বিভিন্ন প্রশ্ন—যেমন সত্তা, কারণ, সম্ভাবনা, অপরিহার্যতা, ঈশ্বরের প্রকৃতি এবং অস্তিত্বের মৌলিক কাঠামো—নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁর ব্যাখ্যা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে তিনি দেকার্তের দর্শনকে গভীরভাবে আত্মস্থ করেছিলেন, কিন্তু কখনোই অন্ধ অনুসারী ছিলেন না। বরং তিনি দেকার্তের ধারণাগুলোর অন্তর্নিহিত যৌক্তিক পরিণতি অনুসরণ করতে গিয়ে এমন সব সিদ্ধান্তে পৌঁছান, যা দেকার্ত নিজেও গ্রহণ করেননি।

১৬৭০ সালে প্রকাশিত ট্র্যাকটাটাস থিওলজিকো-পলিটিকাস বা ধর্মতাত্ত্বিক-রাজনৈতিক প্রবন্ধ স্পিনোজার বৌদ্ধিক সাহসের এক অনন্য দলিল। এই গ্রন্থে তিনি ধর্মীয় গ্রন্থের ব্যাখ্যা, নবুয়ত, অলৌকিক ঘটনা, ধর্মীয় কর্তৃত্ব, রাষ্ট্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রকৃতি নিয়ে যুগান্তকারী আলোচনা করেন। তাঁর মতে, ধর্মগ্রন্থকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ভাষাগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে বোঝা উচিত; একে অন্ধ বিশ্বাসের ভিত্তি বানানো উচিত নয়। তিনি যুক্তি দেন যে ধর্মের উদ্দেশ্য মানুষের নৈতিক উন্নতি, বৈজ্ঞানিক সত্য প্রতিষ্ঠা নয়। এই বক্তব্য সে সময়ের ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের কাছে ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। ফলস্বরূপ গ্রন্থটি প্রকাশের পর প্রবল সমালোচনা শুরু হয় এবং বহু দেশে এটি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। এই প্রতিক্রিয়ার কারণেই স্পিনোজা তাঁর প্রধান রচনা এথিক্স জীবদ্দশায় প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে তাঁর দর্শন তখনকার সামাজিক ও ধর্মীয় পরিবেশে সহজে গ্রহণযোগ্য হবে না।

স্পিনোজার মৃত্যুর পর তাঁর বন্ধুদের উদ্যোগে ১৬৭৭ সালে এথিক্স প্রকাশিত হয়। এটি কেবল তাঁর শ্রেষ্ঠ গ্রন্থই নয়, বরং সমগ্র পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে সবচেয়ে মৌলিক ও ব্যতিক্রমী দার্শনিক রচনাগুলোর একটি। এর বিশেষত্ব কেবল বিষয়বস্তুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর উপস্থাপনার পদ্ধতিও সম্পূর্ণ অভিনব। স্পিনোজা এই গ্রন্থ রচনা করেন ইউক্লিডীয় জ্যামিতির আদলে। অর্থাৎ সংজ্ঞা, স্বতঃসিদ্ধ, প্রতিজ্ঞা, প্রমাণ, উপপাদ্য, ফলিত সিদ্ধান্ত এবং ব্যাখ্যার ধারাবাহিক বিন্যাসে তিনি তাঁর সমগ্র দর্শন নির্মাণ করেন।

প্রথম দর্শনে এই পদ্ধতি অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হতে পারে। নীতিশাস্ত্র বা মানুষের জীবন নিয়ে লেখা একটি গ্রন্থ কেন গণিতের ভাষায় রচিত হবে? এর উত্তর স্পিনোজার জ্ঞানতত্ত্বে নিহিত। তিনি বিশ্বাস করতেন, যদি বাস্তবতা সত্যিই যুক্তিসংগত হয়, তবে দর্শনের কাজও হবে সেই যুক্তিসংগত কাঠামোকে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করা। গণিতে যেমন একটি উপপাদ্য পূর্ববর্তী সংজ্ঞা ও স্বতঃসিদ্ধ থেকে অপরিহার্যভাবে অনুসৃত হয়, তেমনি সমগ্র বাস্তবতাও নির্দিষ্ট কারণ ও নিয়ম অনুসারে গঠিত। তাই দর্শনকেও একই ধরনের কঠোর যৌক্তিক বিন্যাস অনুসরণ করা উচিত।

তবে আধুনিক গবেষকেরা দেখিয়েছেন যে এথিক্স-এর জ্যামিতিক পদ্ধতি কেবল বাহ্যিক রচনাশৈলী নয়; এটি স্পিনোজার বিশ্বদৃষ্টিরই প্রকাশ। তাঁর মতে, জগতে কোনো ঘটনাই আকস্মিক নয়। প্রতিটি ঘটনা একটি নির্দিষ্ট কারণের ফল এবং আবার পরবর্তী ঘটনার কারণ। বাস্তবতার এই অবিচ্ছিন্ন কারণ-সম্পর্কই তাঁর দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু। ফলে এথিক্স-এর রচনাশৈলী ও বিষয়বস্তুর মধ্যে গভীর সামঞ্জস্য বিদ্যমান।

অনেক আধুনিক ভাষ্যকার, বিশেষ করে জিল দ্যল্যুজ এবং আন্তোনিও নেগ্রি, মনে করেন এথিক্স কেবল একটি অধিবিদ্যাগত গ্রন্থ নয়। এর অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক তাৎপর্যও অত্যন্ত গভীর। তাঁদের মতে, স্পিনোজা যখন এই গ্রন্থ লিখছিলেন, তখন নেদারল্যান্ডসে ধর্মীয় দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক সংঘাত এবং রাষ্ট্রক্ষমতার প্রশ্ন নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছিল। মানুষের স্বাধীনতা, সমষ্টিগত শক্তি, রাজনৈতিক কর্তৃত্ব এবং সামাজিক সহযোগিতা সম্পর্কে তাঁর চিন্তা এথিক্স-এর নৈতিক ও অধিবিদ্যাগত আলোচনার মধ্যেও সূক্ষ্মভাবে উপস্থিত রয়েছে। অর্থাৎ, মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে তাঁর বিশ্লেষণ একই সঙ্গে ব্যক্তি ও সমাজ—উভয়কেই বোঝার একটি দার্শনিক ভিত্তি নির্মাণ করে।

এথিক্স পাঁচটি প্রধান অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশে ঈশ্বর বা একক সত্তার প্রকৃতি, দ্বিতীয় অংশে মন ও দেহ, তৃতীয় অংশে আবেগের উৎপত্তি, চতুর্থ অংশে মানবদাসত্ব বা আবেগের অধীন জীবন এবং পঞ্চম অংশে স্বাধীনতা, জ্ঞান ও আনন্দময় জীবনের আলোচনা রয়েছে। এই বিন্যাস থেকে স্পষ্ট যে স্পিনোজার কাছে নীতিশাস্ত্র কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। মানুষ কীভাবে জীবনযাপন করবে, সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে আগে জানতে হবে বাস্তবতার প্রকৃতি কী, মানুষের অবস্থান কোথায় এবং জ্ঞান কীভাবে সম্ভব।

এই কারণেই স্পিনোজার দর্শনে অধিবিদ্যা ও নীতিশাস্ত্রকে আলাদা করা যায় না। প্রচলিতভাবে অধিবিদ্যা বাস্তবতার মৌলিক প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করে এবং নীতিশাস্ত্র মানুষের কর্তব্য বা নৈতিক আচরণ নিয়ে আলোচনা করে। কিন্তু স্পিনোজার মতে, মানুষের নৈতিক জীবন বাস্তবতার প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। মানুষ যদি বাস্তবতার প্রকৃত স্বরূপ না বোঝে, তবে সে নিজের প্রকৃত স্বরূপও বুঝতে পারবে না। আর নিজের প্রকৃতি না বুঝলে নৈতিক জীবনও অসম্ভব। তাই তাঁর নীতিশাস্ত্র শুরু হয় ঈশ্বর ও সত্তার বিশ্লেষণ দিয়ে, কোনো নৈতিক বিধান দিয়ে নয়।

এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে তাঁর সমসাময়িক অধিকাংশ দার্শনিক থেকে পৃথক করেছে। তিনি নৈতিকতাকে বাহ্যিক আদেশ, ধর্মীয় বিধি কিংবা সামাজিক প্রথার ওপর প্রতিষ্ঠিত করেননি; বরং বাস্তবতার অন্তর্নিহিত কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। মানুষের জন্য কী ভালো এবং কী মন্দ—এই প্রশ্নের উত্তরও তিনি মানুষের প্রকৃতি, ক্ষমতা এবং অস্তিত্বের মৌলিক নিয়ম বিশ্লেষণ করেই নির্ধারণ করেন। এই কারণেই এথিক্স একই সঙ্গে অধিবিদ্যা, জ্ঞানতত্ত্ব, মনোবিজ্ঞান, নীতিশাস্ত্র এবং রাজনৈতিক দর্শনের এক বিরল সমন্বয়।

এই সমগ্র দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—বাস্তবতার প্রকৃত ভিত্তি কী? আমরা যে অসংখ্য মানুষ, বস্তু, প্রাণী, ঘটনা এবং পরিবর্তন দেখি, সেগুলোর পেছনে কি একাধিক স্বাধীন সত্তা রয়েছে, নাকি সমগ্র অস্তিত্বের ভিত্তি একটিই? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই স্পিনোজা দেকার্তের দর্শনের সঙ্গে মৌলিক বিতর্কে প্রবেশ করেন। এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর বিখ্যাত একক সত্তার দর্শন, যা পরবর্তী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

৩.

স্পিনোজার দর্শনের প্রকৃত মৌলিকত্ব উপলব্ধি করতে হলে প্রথমেই তাঁর সঙ্গে রেনে দেকার্তের দার্শনিক সম্পর্কটি বোঝা প্রয়োজন। কারণ স্পিনোজা এমন কোনো দার্শনিক নন, যিনি সম্পূর্ণ নতুন ভিত্তি থেকে তাঁর চিন্তাজগৎ নির্মাণ করেছিলেন। বরং তিনি তাঁর পূর্বসূরি দেকার্তের দর্শনকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন, তার অন্তর্নিহিত শক্তি ও সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ করেন এবং সেই দর্শনের মধ্যেই নিহিত কিছু যৌক্তিক সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে এক সম্পূর্ণ নতুন দার্শনিক জগৎ নির্মাণ করেন। এ কারণেই স্পিনোজার দর্শনকে অনেক সময় দেকার্তীয় দর্শনের ধারাবাহিকতা যেমন বলা হয়, তেমনি তাকে দেকার্তীয় দর্শনের সবচেয়ে মৌলিক রূপান্তরও বলা হয়।

সপ্তদশ শতাব্দীর ইউরোপীয় দর্শনে দেকার্ত একটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করেছিলেন। তিনি জ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে অন্ধ ঐতিহ্য, ধর্মীয় কর্তৃত্ব কিংবা প্রচলিত বিশ্বাসকে গ্রহণ না করে যুক্তিকে সর্বোচ্চ মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি—“আমি চিন্তা করি, অতএব আমি আছি”—আধুনিক দর্শনের সূচনাবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হয়। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন যে সন্দেহ করা গেলেও সন্দেহকারী সত্তার অস্তিত্ব অস্বীকার করা যায় না। এই আত্মসচেতন চিন্তাশীল সত্তাকেই তিনি নিশ্চিত জ্ঞানের প্রথম ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেন।

দেকার্তের দর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল বাস্তবতাকে দুটি মৌলিক সত্তায় বিভক্ত করা। তাঁর মতে, সমগ্র জগতে মূলত তিন ধরনের সত্তা বিদ্যমান। প্রথমত ঈশ্বর, যিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং সম্পূর্ণ স্বাধীন। দ্বিতীয়ত চিন্তাশীল সত্তা, অর্থাৎ মন। তৃতীয়ত প্রসারসম্পন্ন বা স্থান-অধিকারী সত্তা, অর্থাৎ বস্তুজগৎ। মানুষের ক্ষেত্রে মন এবং দেহ এই দুই ভিন্ন সত্তার সমন্বয়ে ব্যক্তির অস্তিত্ব গঠিত হয়।

দেকার্তের ভাষায় মনের মৌলিক ধর্ম হলো চিন্তা, আর দেহের মৌলিক ধর্ম হলো প্রসার বা স্থান দখল করা। মন চিন্তা করতে পারে কিন্তু স্থান দখল করে না; অন্যদিকে দেহ স্থান দখল করে কিন্তু চিন্তা করতে পারে না। এই দুই সত্তা প্রকৃতিগতভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দেখা দেয়—যদি মন ও দেহ সম্পূর্ণ পৃথক প্রকৃতির হয়, তাহলে তারা পরস্পরের ওপর কীভাবে প্রভাব বিস্তার করে?

এই প্রশ্নই পরবর্তীকালে আধুনিক দর্শনের অন্যতম জটিল সমস্যা হিসেবে পরিচিত হয়—মন–দেহ সমস্যা। দেকার্ত মনে করতেন, মানুষের ইচ্ছা দেহকে পরিচালিত করতে পারে এবং দেহের পরিবর্তনও মনের অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করতে পারে। কিন্তু দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির সত্তার মধ্যে এই কার্যকারণ সম্পর্ক কীভাবে সম্ভব, সে বিষয়ে তাঁর ব্যাখ্যা পুরোপুরি সন্তোষজনক ছিল না। তিনি অনুমান করেছিলেন যে মস্তিষ্কের পিনিয়াল গ্রন্থির মাধ্যমে এই সম্পর্ক স্থাপিত হয়। কিন্তু এই ব্যাখ্যা মূল সমস্যার সমাধান করতে পারেনি; বরং নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল।

স্পিনোজা দেকার্তের এই সমস্যাটিকেই দর্শনের একটি মৌলিক অসংগতি হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁর মতে, যদি মন এবং দেহ সত্যিই দুটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র সত্তা হয়, তাহলে তাদের মধ্যে কোনো প্রকৃত কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। আবার যদি তারা বাস্তবে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে তাদের সম্পূর্ণ পৃথক সত্তা হিসেবে বিবেচনা করাও যুক্তিসঙ্গত নয়।

এই বিশ্লেষণ থেকেই স্পিনোজা তাঁর বিখ্যাত একত্ববাদী অবস্থানে পৌঁছান। তিনি যুক্তি দেন, বাস্তবে স্বাধীন সত্তা একাধিক হতে পারে না। কারণ দুটি সত্তা যদি সত্যিই স্বাধীন হয়, তাহলে একটির অস্তিত্ব অন্যটির ওপর কোনোভাবেই নির্ভর করবে না। কিন্তু আমরা যে জগৎ দেখি, সেখানে সবকিছুই পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে বিদ্যমান। প্রকৃতির প্রতিটি ঘটনা অন্য ঘটনার সঙ্গে কারণগতভাবে যুক্ত। ফলে সমগ্র বাস্তবতার ভিত্তিতে বিচ্ছিন্ন বহু সত্তার পরিবর্তে একটি একক মৌলিক সত্তা স্বীকার করাই অধিক যুক্তিসঙ্গত।

এই যুক্তি বোঝার জন্য স্পিনোজার “সত্তা” ধারণার সংজ্ঞাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এথিক্স গ্রন্থের শুরুতেই তিনি বলেন—সত্তা হলো এমন কিছু, যা নিজের মধ্যে বিদ্যমান এবং নিজের মাধ্যমেই উপলব্ধ হয়। অর্থাৎ কোনো কিছুকে বোঝার জন্য যদি অন্য কিছুর ধারণার প্রয়োজন হয়, তবে সেটি প্রকৃত অর্থে সত্তা নয়। প্রকৃত সত্তা অবশ্যই স্বনির্ভর হবে; তার অস্তিত্ব এবং ধারণা—উভয়ই নিজের মধ্যেই সম্পূর্ণ হবে।

এই সংজ্ঞা আপাতদৃষ্টিতে বিমূর্ত মনে হলেও স্পিনোজার সমগ্র দর্শনের ভিত্তি এখানেই নিহিত। তিনি দেখাতে চান, যদি কোনো সত্তা সত্যিই স্বাধীন হয়, তবে তার অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করার জন্য অন্য কোনো সত্তার সাহায্য নেওয়া যাবে না। সে নিজেই নিজের কারণ হবে। লাতিন ভাষায় তিনি এই ধারণাকে কাউসা সুই (causa sui) নামে অভিহিত করেন, যার অর্থ—“নিজেই নিজের কারণ”।

অবশ্য এখানে “নিজেই নিজের কারণ” কথাটির অর্থ সময়গত নয়। এর অর্থ এই নয় যে কোনো এক সময়ে সত্তাটি নিজেকে সৃষ্টি করেছে। বরং এর অর্থ হলো—তার অস্তিত্বের ব্যাখ্যা তার নিজের প্রকৃতির মধ্যেই নিহিত। অর্থাৎ সে অন্য কোনো সত্তার ওপর নির্ভরশীল নয়। তার অস্তিত্ব কোনো বাইরের কারণের ফল নয়; বরং তার প্রকৃতির মধ্যেই অস্তিত্ব অপরিহার্যভাবে অন্তর্ভুক্ত।

এই ধারণা স্পিনোজার ঈশ্বর-চিন্তার ভিত্তিও নির্মাণ করে। তাঁর মতে, যদি এমন একটি সত্তা থাকে যার অস্তিত্বের জন্য অন্য কিছুর প্রয়োজন হয়, তাহলে সে আর চূড়ান্ত বাস্তবতা হতে পারে না। কারণ তখন প্রশ্ন উঠবে—যার ওপর সে নির্ভর করছে, সেই সত্তার ব্যাখ্যা কী? এভাবে প্রশ্ন করতে করতে শেষ পর্যন্ত এমন একটি সত্তায় পৌঁছাতেই হবে, যার অস্তিত্বের জন্য আর কোনো অতিরিক্ত ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। সেই একমাত্র স্বনির্ভর, স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং অপরিহার্য সত্তাই হলো প্রকৃত অর্থে ঈশ্বর।

এখানেই স্পিনোজা প্রচলিত ধর্মতাত্ত্বিক ধারণা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে অগ্রসর হন। অধিকাংশ ধর্মতত্ত্বে ঈশ্বরকে জগতের স্রষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়—অর্থাৎ ঈশ্বর একদিকে, আর তাঁর সৃষ্ট বিশ্ব অন্যদিকে। কিন্তু স্পিনোজা এই দ্বৈত বিভাজনকে অস্বীকার করেন। তাঁর মতে, যদি ঈশ্বর সত্যিই অসীম ও স্বয়ংসম্পূর্ণ হন, তাহলে তাঁর বাইরে এমন কোনো স্বাধীন বাস্তবতা থাকতে পারে না, যাকে তিনি বাইরে থেকে সৃষ্টি করবেন। অসীমের বাইরে আর কিছু থাকতে পারে না। ফলে ঈশ্বর এবং সমগ্র অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন দুটি বাস্তবতা হিসেবে কল্পনা করাই যৌক্তিকভাবে অসংগত।

এই যুক্তির ফলেই স্পিনোজা এমন এক বিপ্লবাত্মক সিদ্ধান্তে পৌঁছান, যা তাঁর সমগ্র দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু—বাস্তবতার ভিত্তিতে কেবল একটিই সত্তা বিদ্যমান। এই একমাত্র সত্তা অসীম, স্বনির্ভর, অপরিহার্য এবং চিরন্তন। জগতে আমরা যত বৈচিত্র্য, পরিবর্তন এবং বহুত্ব দেখি, সেগুলো এই একক সত্তারই বিভিন্ন প্রকাশমাত্র। ফলে বাস্তবতার গভীরে কোনো দ্বৈততা নেই; আছে এক অবিভাজ্য ঐক্য।

এই একক সত্তার প্রকৃতি ব্যাখ্যা করতেই স্পিনোজা পরবর্তী ধাপে “গুণ” (Attributes) এবং “রূপ” বা “প্রকাশ” (Modes)-এর ধারণা প্রবর্তন করেন। এই ধারণাগুলোর মাধ্যমেই তিনি দেখাতে চেষ্টা করেন, কীভাবে একটিমাত্র অসীম সত্তা থেকে অসংখ্য সীমিত বস্তু, মানুষ এবং ঘটনা প্রকাশিত হয়, অথচ সেই একত্ব কখনো নষ্ট হয় না।

৪.

স্পিনোজার মতে, বাস্তবতার মূলভিত্তিতে যদি একটিমাত্র অসীম সত্তা বিদ্যমান থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়—আমরা যে অসংখ্য বৈচিত্র্যময় বস্তু, মানুষ, প্রাণী, চিন্তা, অনুভূতি এবং প্রাকৃতিক ঘটনাকে প্রত্যক্ষ করি, সেগুলোর স্থান কোথায়? যদি সবকিছুর ভিত্তি এক হয়, তবে এই বহুত্বের ব্যাখ্যা কী? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্যই তিনি তাঁর দর্শনের দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা উপস্থাপন করেন—গুণ (Attributes) এবং রূপ বা প্রকাশ (Modes)। এই দুটি ধারণা না বুঝলে স্পিনোজার একত্ববাদ, ঈশ্বর-ধারণা কিংবা মন–দেহ সম্পর্কের ব্যাখ্যা কোনোভাবেই পূর্ণাঙ্গভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।

স্পিনোজা এথিক্স-এ গুণকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এমনভাবে যে, বুদ্ধি কোনো সত্তার যে মৌলিক বৈশিষ্ট্যকে তার সারসত্তা হিসেবে উপলব্ধি করে, সেটিই সেই সত্তার গুণ। সহজ ভাষায় বলা যায়, গুণ হলো সেই মৌলিক দিক, যার মাধ্যমে একক সত্তা নিজেকে প্রকাশ করে। তবে এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। স্পিনোজার মতে, গুণ সত্তার বাইরে থেকে আরোপিত কোনো বৈশিষ্ট্য নয়; বরং সত্তার অস্তিত্বের অন্তর্নিহিত রূপ। অর্থাৎ গুণ এবং সত্তা পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। আমরা যে দৃষ্টিকোণ থেকে একক সত্তাকে বুঝি, সেই দৃষ্টিকোণই তার একটি গুণকে প্রকাশ করে।

স্পিনোজার মতে, একমাত্র অসীম সত্তার অসীম সংখ্যক গুণ রয়েছে। অর্থাৎ বাস্তবতা অসীম উপায়ে নিজেকে প্রকাশ করে। কিন্তু মানুষের জ্ঞান সীমাবদ্ধ। ফলে আমরা সেই অসীম গুণের মধ্যে মাত্র দুটি গুণকে প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম—চিন্তা (Thought) এবং প্রসার (Extension)। চিন্তার অধীনে আমরা মন, ধারণা, জ্ঞান, অনুভূতি, ইচ্ছা এবং মানসিক ঘটনাকে বুঝি। প্রসারের অধীনে আমরা বস্তু, দেহ, গতি, স্থিতি এবং সমগ্র ভৌত জগতকে উপলব্ধি করি।

এই বক্তব্যের একটি গভীর তাৎপর্য রয়েছে। স্পিনোজা বলছেন না যে বাস্তবতায় কেবল চিন্তা ও বস্তুই বিদ্যমান। বরং তিনি বলছেন, মানুষের জ্ঞান এতটাই সীমিত যে আমরা অসীম বাস্তবতার মাত্র দুটি প্রকাশরূপ উপলব্ধি করতে পারি। অসীম সত্তার আরও অসংখ্য গুণ রয়েছে, কিন্তু সেগুলো মানববুদ্ধির নাগালের বাইরে। এই দৃষ্টিভঙ্গি স্পিনোজার দর্শনকে একই সঙ্গে বিনয়ী এবং মহাজাগতিক করে তোলে। মানুষ বাস্তবতার কেন্দ্র নয়; বরং অসীম বাস্তবতার একটি সীমিত অংশমাত্র।

এরপর আসে “রূপ” বা “প্রকাশ”-এর ধারণা। স্পিনোজার ভাষায়, রূপ হলো সত্তার বিশেষ অবস্থা বা নির্দিষ্ট প্রকাশ। অর্থাৎ যে একক সত্তা অসীম গুণের মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করে, সেই প্রকাশের নির্দিষ্ট ও সীমিত রূপই হলো ব্যক্তি, বস্তু বা ঘটনা। আমরা প্রত্যেকে, আমাদের দেহ, আমাদের মন, একটি বৃক্ষ, একটি নদী, একটি নক্ষত্র কিংবা সমগ্র পৃথিবী—সবই সেই একক সত্তার বিভিন্ন রূপমাত্র।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বোঝা দরকার। সত্তা নিজে অসীম, অপরিবর্তনীয় এবং স্বনির্ভর। কিন্তু রূপগুলো সীমিত, পরিবর্তনশীল এবং পরস্পরের সঙ্গে কারণগতভাবে সম্পর্কযুক্ত। একটি বৃক্ষ জন্মায়, বেড়ে ওঠে এবং একসময় বিলুপ্ত হয়। একটি মানুষের জীবনও তেমনি জন্ম, বিকাশ ও মৃত্যুর মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে। কিন্তু যে অসীম বাস্তবতার প্রকাশ হিসেবে এই পরিবর্তন ঘটে, সেই বাস্তবতা নিজে কখনো নষ্ট হয় না। পরিবর্তন ঘটে প্রকাশে, ভিত্তিতে নয়।

এই ব্যাখ্যার মাধ্যমে স্পিনোজা একদিকে বহুত্বকে স্বীকার করছেন, অন্যদিকে সেই বহুত্বকে একটি গভীর ঐক্যের মধ্যে স্থাপন করছেন। ফলে তাঁর দর্শনে ব্যক্তি ও সমগ্রের মধ্যে কোনো মৌলিক বিরোধ নেই। প্রতিটি ব্যক্তি বাস্তব, কিন্তু তার বাস্তবতা স্বতন্ত্র ও সম্পূর্ণ স্বাধীন নয়; বরং বৃহত্তর অসীম বাস্তবতার ওপর নির্ভরশীল।

এই প্রসঙ্গেই স্পিনোজার সবচেয়ে বিখ্যাত এবং সবচেয়ে বিতর্কিত সূত্রটি আসে—“দেউস সিভে নাতুরা” (Deus sive Natura)—অর্থাৎ “ঈশ্বর অথবা প্রকৃতি”। এই সংক্ষিপ্ত বাক্যটি পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে অসাধারণ গুরুত্ব বহন করে। অনেকেই প্রথম দর্শনে এর অর্থ করেন—ঈশ্বরই প্রকৃতি, অথবা প্রকৃতিই ঈশ্বর। কিন্তু স্পিনোজার বক্তব্য এর চেয়েও সূক্ষ্ম এবং গভীর।

তিনি প্রকৃতিকে কেবল দৃশ্যমান বস্তুজগত হিসেবে বোঝাননি। তাঁর কাছে প্রকৃতি বলতে সমগ্র বাস্তবতাকেই বোঝায়—যা আছে, যা ঘটে, যা চিন্তা করা যায় এবং যা অস্তিত্বশীল। ফলে “ঈশ্বর অথবা প্রকৃতি” বলতে তিনি এমন একটি অসীম বাস্তবতার কথা বলেছেন, যার বাইরে আর কিছু নেই। ঈশ্বর জগতের বাইরে অবস্থান করে তাকে পরিচালনা করেন না; বরং সমগ্র জগতই তাঁর অপরিহার্য প্রকাশ।

স্পিনোজা এখানে প্রকৃতিরও দুটি দিকের মধ্যে পার্থক্য করেন। তিনি একদিকে বলেন সৃষ্টিশীল প্রকৃতি (Natura Naturans), অন্যদিকে সৃষ্ট প্রকৃতি (Natura Naturata)। প্রথমটি দ্বারা তিনি বোঝান সেই অসীম, সক্রিয়, স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তাকে, যিনি নিজের প্রকৃতির অপরিহার্যতার দ্বারা বিদ্যমান। দ্বিতীয়টি দ্বারা বোঝান সেই অসংখ্য সীমিত বস্তু ও ঘটনা, যা ওই অসীম সত্তার প্রকাশ হিসেবে বিদ্যমান।

এই পার্থক্য অত্যন্ত সূক্ষ্ম হলেও তা স্পিনোজার দর্শনের কেন্দ্রীয় ভিত্তি। তিনি বলতে চান, ঈশ্বর এবং জগতকে আলাদা করা যায় না; আবার ঈশ্বরকে কেবল দৃশ্যমান বস্তুজগতের সমষ্টি বললেও ভুল হবে। অসীম সত্তা এবং তার প্রকাশ—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে, কিন্তু বিচ্ছেদ নেই। যেমন সমুদ্র এবং তার ঢেউকে সম্পূর্ণ আলাদা করা যায় না। প্রতিটি ঢেউ বাস্তব, কিন্তু কোনো ঢেউই সমুদ্র থেকে স্বাধীন নয়। ঢেউ জন্মায়, পরিবর্তিত হয় এবং মিলিয়ে যায়; কিন্তু সমুদ্র তার অস্তিত্ব বজায় রাখে। স্পিনোজার কাছে ব্যক্তি ও অসীম বাস্তবতার সম্পর্কও অনেকটা তেমন।

এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাঁর সমসাময়িকদের অনেকেই তাঁকে ভুল বুঝেছিলেন। তাঁদের ধারণা ছিল, স্পিনোজা ঈশ্বরকে প্রকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছেন এবং এর ফলে ঈশ্বরের অতীন্দ্রিয় মহিমা অস্বীকার করেছেন। কিন্তু স্পিনোজার বক্তব্য ছিল ঠিক বিপরীত। তিনি মনে করতেন, ঈশ্বরকে মানুষের মতো একজন রাজা, বিচারক বা পরিকল্পনাকারী হিসেবে কল্পনা করাই ঈশ্বরের অসীমতাকে সীমাবদ্ধ করে। প্রকৃত অসীম সত্তাকে মানবীয় বৈশিষ্ট্যের মধ্যে আবদ্ধ করা যায় না।

এই কারণেই তিনি ঈশ্বরের মানবসদৃশ গুণাবলির কঠোর সমালোচনা করেন। প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাসে ঈশ্বরকে অনেক সময় ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে কল্পনা করা হয়, যিনি কখনো রাগ করেন, কখনো সন্তুষ্ট হন, কখনো পুরস্কার দেন, আবার কখনো শাস্তি প্রদান করেন। স্পিনোজার মতে, এসব ধারণা মানুষের নিজের মনস্তত্ত্বের প্রতিফলন মাত্র। মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা ও আবেগকে ঈশ্বরের ওপর আরোপ করে তাঁকে মানবসদৃশ করে তোলে।

স্পিনোজা যুক্তি দেন, যদি ঈশ্বর সত্যিই কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য পূরণের জন্য কাজ করেন, তাহলে ধরে নিতে হবে যে তাঁর এমন কিছু অর্জন করার প্রয়োজন ছিল, যা আগে ছিল না। কিন্তু পরিপূর্ণ সত্তার কোনো অভাব থাকতে পারে না। ফলে ঈশ্বর উদ্দেশ্যসাধনের জন্য কাজ করেন—এই ধারণাই যুক্তিগতভাবে অসংগত।

তাঁর মতে, ঈশ্বরের অস্তিত্ব, কার্য এবং প্রকাশ—সবকিছুই তাঁর স্বভাবের অপরিহার্য ফল। যেমন ত্রিভুজের সংজ্ঞা থেকেই তার তিন কোণের সমষ্টি দুই সমকোণ হবে—এই সত্যটি অপরিহার্যভাবে অনুসৃত হয়, তেমনি ঈশ্বরের প্রকৃতি থেকেও সমগ্র বাস্তবতা অপরিহার্যভাবে অনুসৃত হয়। এখানে কোনো ইচ্ছাকৃত নির্বাচন, খেয়াল বা আকস্মিকতার স্থান নেই।

এই দৃষ্টিভঙ্গির ফলে ঈশ্বর আর বাইরের কোনো স্রষ্টা নন; বরং তিনি অস্তিত্বের অন্তর্নিহিত ভিত্তি। ফলে প্রকৃতিকে বোঝা মানেই ঈশ্বরের কার্যকে বোঝা, আর ঈশ্বরকে বোঝা মানেই বাস্তবতার মৌলিক কাঠামোকে উপলব্ধি করা। এখান থেকেই স্পিনোজার দর্শন ধীরে ধীরে মন, দেহ এবং মানুষের অবস্থান সম্পর্কে এক সম্পূর্ণ নতুন ব্যাখ্যার দিকে অগ্রসর হয়, যা পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে একটি মৌলিক মোড় সৃষ্টি করেছিল।

মাসুদুল হক : প্রাবন্ধিক, কবি ও শিক্ষক

গ্রন্থপঞ্জি:

১.Curley, Edwin. The Collected Works of Spinoza, Volume I. Translated and Edited by Edwin Curley, Princeton University Press, 1985.

২.Curley, Edwin. Spinoza’s Metaphysics: An Essay in Interpretation. Harvard University Press, 1969.

৩.Deleuze, Gilles. Spinoza and Us. Translated by Robert Hurley, Zone Books, 1988.

৪.Deleuze, Gilles. Expressionism in Philosophy: Spinoza. Translated by Martin Joughin, Zone Books, 1990.

৫.Garrett, Don, editor. The Cambridge Companion to Spinoza. Cambridge University Press, 1996.

৬.Hegel, Georg Wilhelm Friedrich. Lectures on the History of Philosophy. Translated by Elizabeth Sanderson Haldane and Frances H. Simson, University of Nebraska Press, 1995.

৭.Israel, Jonathan. Radical Enlightenment: Philosophy and the Making of Modernity, 1650–1750. Oxford University Press, 2001.

৮.Kashap, S. Paul. Spinoza and Moral Freedom. State University of New York Press, 1987.

৯.Matheron, Alexandre. Individu et communauté chez Spinoza. Les Éditions de Minuit, 1969.

১০.Melamed, Yitzhak Y. Spinoza’s Metaphysics: Substance and Thought. Oxford University Press, 2013.

১১.Nadler, Steven. Spinoza: A Life. 2nd ed., Cambridge University Press, 2018.

১২.Nadler, Steven. Spinoza: A Very Short Introduction. Oxford University Press, 2001.

১৩.Negri, Antonio. The Savage Anomaly: The Power of Spinoza’s Metaphysics and Politics. Translated by Michael Hardt, University of Minnesota Press, 1991.

১৪.Spinoza, Baruch. Ethics. Translated by Edwin Curley, Penguin Classics, 1996.

১৫.Spinoza, Baruch. A Theologico-Political Treatise. Translated by Samuel Shirley, Hackett Publishing Company, 1998.

১৬.Spinoza, Baruch. Political Treatise. Translated by Samuel Shirley, Hackett Publishing Company, 2000.

১৭.Spinoza, Baruch. Treatise on the Emendation of the Intellect. Translated by Edwin Curley, Princeton University Press, 1985.

১৮.Stewart, Matthew. The Courtier and the Heretic: Leibniz, Spinoza, and the Fate of God in the Modern World. W. W. Norton & Company, 2006.

১৯.Wolfson, Harry Austryn. The Philosophy of Spinoza: Unfolding the Latent Processes of His Reasoning. 2 vols., Harvard University Press, 1934.

২০.Yovel, Yirmiyahu. Spinoza and Other Heretics. Princeton University Press, 1989.

আরও পড়ুন