কমলকুমার মজুমদার ও ‘অন্তর্জলী যাত্রা’ : বাংলা উপন্যাসের এক অনতিক্রম্য শিখর

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু লেখক আছেন, যাঁদের প্রকৃত পরিচয় তাঁদের রচনার সংখ্যায় নয়, রচনার গভীরতায়। তাঁরা পাঠকের ভিড় তৈরি করেন না; বরং অল্প কয়েকজন মনোযোগী পাঠকের ভেতরে দীর্ঘস্থায়ী আলোড়ন সৃষ্টি করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের গুরুত্ব কমে না, বরং বাড়তে থাকে। কমলকুমার মজুমদার (১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯১৪—৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯) সেই বিরল সাহিত্যিকদের একজন। বাংলা কথাসাহিত্যের বিস্তৃত পরিসরে তিনি যেন এক নির্জন দ্বীপ—প্রচলিত ধারার বাইরে, নিজের নির্মিত এক স্বতন্ত্র শিল্পভুবনে অবিচল।
কমলকুমার মজুমদার বাংলা সাহিত্যের অন্যতম মৌলিক কথাশিল্পী। বাংলা গদ্যের ভাষা, নন্দনতত্ত্ব এবং শিল্পভাবনাকে তিনি এক স্বতন্ত্র উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। সাহিত্য, চিত্রকলা, পাশ্চাত্য ও ভারতীয় শিল্পভাবনা, পুরাণ, ইতিহাস এবং সংগীত—বহুমাত্রিক সংস্কৃতিচর্চার মধ্যেই গড়ে ওঠে তাঁর মানসজগৎ। জীবনের প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্যের চেয়ে তিনি শিল্পের স্বাধীনতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ফলে জনপ্রিয়তার সহজ পথ কখনো তাঁকে আকর্ষণ করেনি। সাহিত্যকে তিনি পেশা হিসেবে নয়, এক গভীর শিল্পসাধনা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। সেই সাধনার ফলেই বাংলা ভাষা পেয়েছে এমন এক কথাশিল্পী, যাঁর গদ্য আজও বিস্ময় জাগায়।
কমলকুমারের সাহিত্যজীবনকে এক কথায় সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। তিনি গল্প লিখেছেন, উপন্যাস লিখেছেন, নাটক, প্রবন্ধ ও শিশুতোষ সাহিত্যও রচনা করেছেন। কিন্তু কোনও নির্দিষ্ট সাহিত্যরীতির মধ্যে তিনি নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর প্রতিটি রচনায় ভাষা যেন নতুনভাবে জন্ম নেয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিল্পের নিজস্ব ব্যাকরণ আছে; সেই ব্যাকরণকে প্রচলিত নিয়মের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয় না। তাই তাঁর গদ্য কখনো সরল বর্ণনামূলক নয়, কখনো কাব্যিক, কখনো চিত্রধর্মী, কখনো দর্শনের গভীর অন্বেষণে নিমগ্ন। তাঁর বাক্য যেন কেবল পড়ার জন্য নয়, অনুভব করার জন্য।
বাংলা সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্র জাতীয় চেতনার ভাষা নির্মাণ করেছেন, রবীন্দ্রনাথ মানুষের আত্মিক মুক্তির, শরৎচন্দ্র সামাজিক আবেগের, বিভূতিভূষণ প্রকৃতি ও মানবজীবনের, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাস্তবতার কঠিন মনস্তত্ত্বের। কমলকুমার এই ধারার কারও পুনরাবৃত্তি নন। তিনি যেন বাংলা গদ্যের অন্তর্লোকে এক নতুন ভূখণ্ড আবিষ্কার করেছিলেন, যেখানে কাহিনির চেয়ে বড় হয়ে ওঠে তার অন্তর্নিহিত ব্যঞ্জনা, ঘটনার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে নীরবতা, আর চরিত্রের চেয়ে গভীর হয়ে ওঠে মানুষের অস্তিত্বগত সংকট।
তাঁর সাহিত্য পাঠকের কাছে সহজে আত্মসমর্পণ করে না। প্রথম পাঠে অনেক সময় তাঁর ভাষা দুরূহ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু সেই দুরূহতা কৃত্রিম নয়; তা জীবনের জটিলতাকে ধারণ করার একটি শিল্পপদ্ধতি। কমলকুমার কখনো বিশ্বাস করতেন না যে মানুষের গভীরতম অনুভূতি সবসময় সরল ভাষায় ধরা সম্ভব। তাই তাঁর গদ্যে রয়েছে ইঙ্গিত, প্রতীক, স্তরবিন্যাস এবং নীরবতার বিস্তৃত ব্যবহার। পাঠককে সেখানে কেবল পাঠক হয়ে থাকলে চলে না; তাঁকে রচনার সহযাত্রী হতে হয়। এই কারণেই কমলকুমারের সাহিত্য একবার পড়ে শেষ হয় না। সময়ের ব্যবধানে, অভিজ্ঞতার আলোয়, বারবার ফিরে এসে পড়তে হয়। প্রতিবারই নতুন অর্থ উন্মোচিত হয়।

জীবদ্দশায় তাঁর সাহিত্য সীমিত পাঠকমহলের মধ্যেই আবদ্ধ ছিল। এর অন্যতম কারণ, তিনি জনপ্রিয়তার জন্য নিজের শিল্পকে কখনো সরলীকরণ করেননি। সাহিত্যবাজারের চাহিদার সঙ্গে আপস করার বদলে তিনি নিজের নন্দনচেতনার প্রতি অবিচল থেকেছেন। কিন্তু ইতিহাসের একটি নিজস্ব বিচারশক্তি আছে। যে সাহিত্য তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তায় সাড়া জাগায়, তার সবই সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকে না; আবার যে সাহিত্য প্রথমে অল্প পাঠকের সম্পদ ছিল, সময় তাকে বৃহত্তর মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করে। কমলকুমার মজুমদারের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। আজ বাংলা সাহিত্যের গবেষণা, সমালোচনা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে তাঁর গুরুত্ব ক্রমশ বেড়েছে। তাঁকে বাংলা আধুনিক কথাসাহিত্যের অন্যতম মৌলিক শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে অন্তর্জলী যাত্রা, অন্তরাত্মা, নিম অন্নপূর্ণা, মতিলাল পাদরী প্রভৃতি বিশেষভাবে আলোচিত। তবে এই তালিকার মধ্যেও অন্তর্জলী যাত্রা এক স্বতন্ত্র উচ্চতায় অবস্থান করে। কারণ এই ক্ষুদ্রায়তন উপন্যাসে কমলকুমারের শিল্পভাবনা যেন সবচেয়ে সংহত ও পরিণত রূপে প্রকাশিত হয়েছে। এখানে তাঁর ভাষা সংযত অথচ তীক্ষ্ণ, প্রতীক গভীর অথচ স্বাভাবিক, আর মানবিক বোধ এতটাই নিবিড় যে উপন্যাসটি পড়া শেষ হলেও তার অভিঘাত দীর্ঘদিন পাঠকের মধ্যে রয়ে যায়।
অন্তর্জলী যাত্রা বাংলা সাহিত্যে কেবল একটি সফল উপন্যাস নয়; এটি এক বিরল শিল্প-অভিজ্ঞতা। এখানে মৃত্যু কোনো সমাপ্তি নয়, বরং মানুষের প্রকৃত পরিচয় উদ্ঘাটনের একটি মুহূর্ত। ধর্ম এখানে কেবল বিশ্বাসের বিষয় নয়, সমাজের নির্মাণও বটে। নদী কেবল প্রকৃতি নয়, সময়ের প্রতীক। আর নীরবতা কেবল শব্দের অনুপস্থিতি নয়, শিল্পের গভীরতম ভাষা। এইসব কারণেই উপন্যাসটি বাংলা কথাসাহিত্যের প্রচলিত কাঠামো অতিক্রম করে এক অনন্য নন্দনতাত্ত্বিক উচ্চতায় পৌঁছেছে।
প্রশ্ন উঠতে পারে—আজ, একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে, কেন আবার অন্তর্জলী যাত্রা পড়ব? কারণ বড় সাহিত্য কখনো কেবল তার সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। মানুষের ভয়, বিশ্বাস, ক্ষমতা, ভালোবাসা, নিঃসঙ্গতা এবং মৃত্যুচেতনা—এসবের কোনো কালসীমা নেই। সমাজের রূপ পাল্টায়, প্রথার ভাষা বদলে যায়, কিন্তু মানুষের অন্তর্গত সংকট একই থেকে যায়। সেই কারণেই কমলকুমারের এই উপন্যাস আজও আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে, প্রশ্ন করতে শেখায় এবং নিজের বিবেকের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু উপন্যাস আছে, যাদের নিয়ে আলোচনা মানেই কেবল সাহিত্য আলোচনা নয়; মানুষের সভ্যতা, নৈতিকতা এবং শিল্পবোধেরও আলোচনা। অন্তর্জলী যাত্রা সেই বিরল রচনাগুলোর অন্যতম। কমলকুমার মজুমদারের সমগ্র সাহিত্যসাধনা যেন এসে মিলেছে এই একটি উপন্যাসে। তাই অন্তর্জলী যাত্রাকে বোঝা মানে শুধু একটি কাহিনি বোঝা নয়; একজন শিল্পীর গভীরতম জীবনদর্শনকে বোঝা।
অন্তর্জলী যাত্রা কোনো সাহিত্য পুরস্কারের মাধ্যমে অমর হয়ে ওঠেনি; তার শিল্পশক্তিই তাকে বাংলা উপন্যাসের ক্লাসিকের মর্যাদা দিয়েছে। অনেক সময় পুরস্কার একটি বইকে সাময়িক আলোয় আনে, কিন্তু খুব কম বই-ই পুরস্কার ছাড়াই সময়কে জয় করে। কমলকুমারের অন্তর্জলী যাত্রা সেই বিরল ব্যতিক্রমগুলোর একটি।
উপন্যাসের কাহিনি সংক্ষেপে এই— উনিশ শতকের বাংলার গ্রামীণ সমাজ। কুলীন ব্রাহ্মণ্য প্রথা, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সামাজিক অনুশাসন তখন মানুষের ব্যক্তিজীবনকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। এই পটভূমিতেই রচিত অন্তর্জলী যাত্রা। উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ সীতারাম। জীবনের শেষ প্রহরে তাঁকে গঙ্গার তীরে এনে রাখা হয়েছে। বিশ্বাস, গঙ্গার সান্নিধ্যে মৃত্যু ঘটলে আত্মার মুক্তি লাভ সহজতর হবে। চারদিকে অপেক্ষার এক অদ্ভুত পরিবেশ—মানুষ অপেক্ষা করছে, প্রকৃতি অপেক্ষা করছে, যেন সময়ও থমকে আছে।
এই সময়েই কুলরক্ষার সামাজিক বিশ্বাসে সীতারামের সঙ্গে বিবাহ দেওয়া হয় দরিদ্র ব্রাহ্মণকন্যা যশোবতীর। সদ্য কৈশোর পেরোনো একটি মেয়ের কাছে এই বিবাহ দাম্পত্যজীবনের সূচনা নয়; বরং অজানা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়া। সমাজের নিয়ম, ধর্মীয় আচার এবং পারিবারিক বাধ্যবাধকতার কাছে তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা স্বপ্নের কোনও মূল্য নেই। সে নীরবে সবকিছু মেনে নেয়, কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেই ধরা পড়ে এক গভীর মানবিক আর্তি।
এই নির্মম সামাজিক বাস্তবতার বিপরীতে উপন্যাসে বিশেষ গুরুত্ব পায় ডোম বৈজুর চরিত্র। সমাজের বর্ণবিন্যাসে তিনি প্রান্তিক হলেও মানবিকতার দিক থেকে তিনিই যেন সবচেয়ে বড় মানুষ। তাঁর উপস্থিতি উপন্যাসে এক ভিন্ন আলো এনে দেয়। উচ্চবর্ণের সামাজিক অহংকারের বিপরীতে বৈজুর সহজ মানবিকতা পাঠককে নতুন করে ভাবতে শেখায়—মানুষের প্রকৃত পরিচয় কি জন্মে, না তার আচরণে?
উপন্যাসে ঘটনাবহুল নাটকীয়তা নেই। আছে মৃত্যুর দীর্ঘ প্রতীক্ষা, গঙ্গার নীরব প্রবাহ, প্রকৃতির গভীর উপস্থিতি এবং কয়েকটি মানুষের অন্তর্গত টানাপোড়েন। কাহিনির গতি ধীর, কিন্তু তার অন্তর্লীন আবেগ অত্যন্ত তীব্র। শেষ পর্যন্ত অন্তর্জলী যাত্রা কেবল একটি মৃত্যুপথযাত্রার বিবরণ হয়ে থাকে না; এটি হয়ে ওঠে মানুষ, সমাজ, ধর্ম, জাতিভেদ, নারীর অবস্থান এবং মানবিক মর্যাদাকে ঘিরে এক গভীর শিল্পসম্মত অনুসন্ধান। এই কারণেই উপন্যাসটি পড়া শেষ হলেও তার প্রশ্ন পাঠকের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।
বাংলা সাহিত্যের বহু স্মরণীয় উপন্যাসই একটি বিশেষ সময়কে ধারণ করেছে। কিন্তু সময়কে ধারণ করা আর সময়কে অতিক্রম করা—এই দুইয়ের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। যে সাহিত্য কেবল তার যুগের দলিল হয়ে থাকে, তার মূল্য ইতিহাসে সীমাবদ্ধ। কিন্তু যে সাহিত্য ইতিহাসের আড়ালে মানুষের চিরন্তন অভিজ্ঞতাকে আবিষ্কার করে, সে-ই হয়ে ওঠে কালজয়ী। অন্তর্জলী যাত্রা সেই দ্বিতীয় শ্রেণির উপন্যাস। এর পটভূমি উনিশ শতকের বাংলা হলেও এর প্রশ্ন একবিংশ শতাব্দীর মানুষকেও সমানভাবে আলোড়িত করে। কারণ কমলকুমার মজুমদারের আগ্রহ কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর অনুসন্ধান মানুষের অন্তর্জীবন, বিশ্বাস, ভয় এবং মৃত্যুচেতনার গভীরে।
উপন্যাসটির কেন্দ্রে রয়েছে বাংলার এক প্রায় বিস্মৃত সামাজিক প্রথা—মৃত্যুপথযাত্রী মানুষকে গঙ্গাতীরে এনে শেষ সময়ের অপেক্ষায় রাখা। সেই সময়ে সমাজের একাংশে বিশ্বাস ছিল, গঙ্গার সান্নিধ্যে মৃত্যুবরণ করলে আত্মার মুক্তি সহজতর হবে। এই বিশ্বাস থেকেই জন্ম নিয়েছিল অন্তর্জলী যাত্রা-র মতো এক নির্মম সামাজিক আচার। ইতিহাসের বিচারে এটি একটি প্রথা; কিন্তু কমলকুমারের হাতে এসে সেটি হয়ে ওঠে মানুষের বিবেকের প্রশ্ন। তিনি প্রথার বিবরণ দেন না, প্রথার ভেতরে আটকে পড়া মানুষকে দেখান। আর সেই দেখানোর মধ্যেই শিল্পের শক্তি।
উপন্যাসটির কাহিনি আশ্চর্যরকম সংক্ষিপ্ত। চরিত্রও খুব বেশি নয়। কিন্তু বড় সাহিত্য কখনো চরিত্রের সংখ্যা বা ঘটনার বিস্তারে নির্ভর করে না। বরং কত কম উপাদানে কত বৃহৎ মানবিক অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করা যায়, সেটাই তার সার্থকতা। অন্তর্জলী যাত্রা এই অর্থে সংযমের এক অনুপম নিদর্শন। এখানে একটি নদীতীর, এক মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধ, যশোবতী এবং কিছু নীরব মানুষ—এই সামান্য উপাদান দিয়েই লেখক নির্মাণ করেছেন এক বিশাল নৈতিক ও দার্শনিক পরিসর।
এই উপন্যাসে মৃত্যু উপস্থিত, কিন্তু মৃত্যুই মুখ্য নয়। মুখ্য হলো মৃত্যুর অপেক্ষা। কারণ মৃত্যু একটি মুহূর্ত; অথচ সেই মুহূর্তের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময়টি অনেক দীর্ঘ। মানুষ সেই অপেক্ষার মধ্যেই নিজের জীবনের সঙ্গে সবচেয়ে গভীরভাবে পরিচিত হয়। জীবনের সমস্ত অহংকার, সমস্ত সামাজিক পরিচয়, সমস্ত ক্ষমতা তখন একে একে অর্থহীন হয়ে পড়ে। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে মানুষ আর ব্রাহ্মণ বা শূদ্র থাকে না, ধনী বা দরিদ্র থাকে না; সে কেবল একজন মানুষ। এই মানবিক সত্যকে কমলকুমার এমন সংযমের সঙ্গে প্রকাশ করেছেন যে, উপন্যাসটি কোনো দার্শনিক ভাষণ না হয়েও গভীর দর্শনের স্তরে পৌঁছে যায়।
উপন্যাসটির অন্যতম শক্তি তার আখ্যানরীতি। কমলকুমার কখনো দ্রুত কাহিনি এগিয়ে নিয়ে যেতে চান না। তিনি জানেন, মানুষের ভেতরের সময় বাইরের ঘড়ির সময়ের মতো নয়। তাই তাঁর বর্ণনায় গতি ধীর, কখনো ধ্যানমগ্ন। একটি বিকেলের আলো, গঙ্গার জলের ঢেউ, বাতাসের নিঃশব্দ স্পর্শ কিংবা একটি মুখের ক্ষণিক পরিবর্তন—এসবই তাঁর কাছে কাহিনির অপরিহার্য অংশ। ফলে পাঠক ঘটনাকে অনুসরণ করেন না; বরং একটি আবহের মধ্যে প্রবেশ করেন। এই আবহই অন্তর্জলী যাত্রা-র প্রকৃত শিল্পভূমি।
কমলকুমারের বড় কৃতিত্ব এই যে, তিনি কোনো চরিত্রকে সম্পূর্ণ সাদা বা কালো রঙে আঁকেন না। তাঁর উপন্যাসে কেউ একমাত্রিক নয়। সমাজ যেমন নির্মম, তেমনি সেই সমাজের মানুষও নিজেদের বিশ্বাসের বন্দী। তারা নিষ্ঠুর, আবার অসহায়ও। এই দ্বৈততা বোঝার মধ্যেই লেখকের মানবিকতা। তিনি বিচারকের আসনে বসেন না; তিনি মানুষের ভেতরের জটিলতাকে বুঝতে চান। ফলে উপন্যাসটি নৈতিক প্রচারপত্রে পরিণত হয় না; হয়ে ওঠে গভীর মানব-অভিজ্ঞতার শিল্পরূপ।
বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় কিশোরী নববধূ যশোবতীর চরিত্রকে। যশোবতী বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম স্মরণীয় নারীচরিত্র। তিনি শুধু এক কিশোরী নববধূ নন; তিনি একটি নিষ্ঠুর সামাজিক ব্যবস্থার নীরব শিকার, আবার একই সঙ্গে মানবিক মর্যাদার এক উজ্জ্বল প্রতীক। তাঁর নীরব উপস্থিতিই উপন্যাসের সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষ্য। বাংলা কথাসাহিত্যে এত সংযত অথচ এত মর্মস্পর্শী চরিত্র খুব বেশি নেই। তাঁর জীবনের সিদ্ধান্ত তিনি নিজে নেননি; সমাজ নিয়েছে। তাঁর ভবিষ্যৎ তাঁর হাতে নেই; ধর্মীয় প্রথা সেটি নির্ধারণ করেছে। অথচ লেখক তাঁকে করুণার বস্তু বানাননি। তাঁর নীরব উপস্থিতির মধ্যেই এক অসীম মর্যাদা রয়েছে। তিনি যেন একটি মেয়ে নন, একটি যুগের প্রতিনিধি—যেখানে নারী ব্যক্তিসত্তা নয়, সামাজিক নিয়মের বাহক। কমলকুমারের কলমে সেই নীরবতাই হয়ে ওঠে প্রতিবাদের সবচেয়ে গভীর ভাষা।
ধর্ম এই উপন্যাসের আর-একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর। তবে এখানে ধর্ম কোনো আক্রমণের লক্ষ্য নয়। কমলকুমার ধর্মীয় বিশ্বাসকে উপহাস করেননি; তিনি প্রশ্ন তুলেছেন সেই বিশ্বাসের সামাজিক ব্যবহার নিয়ে। যখন ধর্ম মানুষের আত্মিক মুক্তির পথ না হয়ে মানুষের ওপর আরোপিত এক কঠোর নিয়মে পরিণত হয়, তখন তার মধ্যেই জন্ম নেয় অমানবিকতা। অন্তর্জলী যাত্রা সেই অমানবিকতার মুখোমুখি দাঁড় করায় পাঠককে। কিন্তু লেখক কোথাও উচ্চকণ্ঠ নন। তাঁর প্রতিবাদ নীরব, সংযত, অথচ গভীরভাবে কার্যকর।
এই কারণেই অন্তর্জলী যাত্রা কেবল একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস নয়। এটি মানুষের বিশ্বাস ও বিবেকের সংঘাতের উপন্যাস। ইতিহাস এখানে পটভূমি, মানুষই মূল বিষয়। আর মানুষের সেই অন্তর্গত যাত্রাকেই কমলকুমার এমন শিল্পরূপ দিয়েছেন, যা বাংলা উপন্যাসে প্রায় অদ্বিতীয়।
এই উপন্যাস পড়তে পড়তে একসময় উপলব্ধি হয়, লেখক আসলে মৃত্যুর কথা লিখছেন না; তিনি লিখছেন মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা জীবনের কথা। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েই মানুষ প্রথম উপলব্ধি করে জীবনের মূল্য। সেই উপলব্ধিই অন্তর্জলী যাত্রা-কে একটি সামাজিক উপন্যাসের সীমা অতিক্রম করে অস্তিত্ববাদী শিল্পের স্তরে উন্নীত করেছে।
সাহিত্যে এমন কিছু রচনা আছে, যাদের প্রকৃত শক্তি কাহিনিতে নয়, ভাষায়। আবার এমনও কিছু রচনা আছে, যাদের ভাষার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে নীরবতা। অন্তর্জলী যাত্রা এই দুইয়েরই এক অনন্য সমন্বয়। কমলকুমার মজুমদারের ভাষা কখনো সরাসরি পাঠকের কাছে নিজেকে উন্মুক্ত করে না; বরং ধীরে ধীরে, স্তর অতিক্রম করে তার অন্তর্গত অর্থ প্রকাশ করে। তাই এই উপন্যাস পড়তে গিয়ে কেবল ঘটনাক্রম অনুসরণ করলেই হয় না, শব্দের ফাঁকে ফাঁকে যে নীরবতা জমে থাকে, তাকেও শুনতে হয়। সেই নীরবতাই এই উপন্যাসের প্রকৃত ব্যাকরণ।
কমলকুমারের গদ্যের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তার কাব্যধর্মিতা। কিন্তু এই কাব্যধর্মিতা অলংকারনির্ভর নয়। তাঁর বাক্য কখনো দীর্ঘ, কখনো সংক্ষিপ্ত; কখনো যেন একটি তুলির আঁচড়, কখনো আবার নদীর স্রোতের মতো ধীর ও প্রবহমান। দৃশ্য, শব্দ, গন্ধ, আলো-আঁধার—সবকিছু মিলিয়ে তিনি এমন এক ভাষা নির্মাণ করেন, যেখানে বাস্তবতা ও অনুভূতি একাকার হয়ে যায়। ফলে পাঠক শুধু একটি দৃশ্য দেখেন না; দৃশ্যটির ভেতরে প্রবেশ করেন। বাংলা গদ্যে এমন সংবেদনশীল ভাষার নির্মাণ বিরল।
এই ভাষার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে প্রতীক। অন্তর্জলী যাত্রা-য় কোনো প্রতীকই কৃত্রিম নয়; প্রতিটি কাহিনির শরীরের সঙ্গে মিশে গেছে। গঙ্গা তার সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ। ভারতীয় সংস্কৃতিতে গঙ্গা পবিত্রতা, মুক্তি ও অনন্ত প্রবাহের প্রতীক। কিন্তু কমলকুমারের উপন্যাসে গঙ্গা একই সঙ্গে জীবন ও মৃত্যুর সীমারেখা। তার জলে যেমন মুক্তির বিশ্বাস, তেমনি মানুষের নির্মিত নিষ্ঠুর প্রথারও সাক্ষ্য। নদী এখানে নীরব। সে বিচার করে না, প্রতিবাদও করে না; শুধু বয়ে যায়। অথচ সেই নীরব প্রবাহের মধ্যেই মানুষের সভ্যতার বহু প্রশ্ন প্রতিফলিত হয়। গঙ্গা যেন উপন্যাসের এক নীরব চরিত্র।
প্রকৃতিও এই উপন্যাসে কেবল পটভূমি নয়। আকাশের রং, বাতাসের গতি, নদীর ঢেউ, সন্ধ্যার আলো—সবই মানুষের মানসিক অবস্থার সঙ্গে এক অদৃশ্য সম্পর্ক তৈরি করে। প্রকৃতি যেন চরিত্রগুলোর অব্যক্ত অনুভূতির ভাষা হয়ে ওঠে। বাংলা উপন্যাসে প্রকৃতিকে এভাবে আখ্যানের অন্তর্গত অংশে পরিণত করার ক্ষমতা খুব কম লেখকেরই ছিল। এই দিক থেকে কমলকুমারের শিল্পচেতনা তাঁকে তাঁর সমসাময়িকদের থেকে স্বতন্ত্র করে।
নারীচরিত্রের নির্মাণও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কিশোরী নববধূ যশোবতী উপন্যাসের সবচেয়ে করুণ চরিত্র হলেও তিনি করুণার প্রতীক নন। তাঁর উপস্থিতি নিঃশব্দ, কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক গভীর প্রশ্ন—একটি সমাজ কি কোনও মানুষের জীবনকে শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় আচার বা সামাজিক নিয়মের অংশে পরিণত করতে পারে? লেখক এই প্রশ্নের উত্তর দেন না; পাঠকের বিবেকের ওপর ছেড়ে দেন। এই সংযমই বড় শিল্পের লক্ষণ। কারণ মহান সাহিত্য উত্তর দেয় না, প্রশ্ন করতে শেখায়।
উপন্যাসে ধর্মের উপস্থিতি প্রবল, কিন্তু ধর্মীয় প্রচার নেই। লেখক বিশ্বাসকে অস্বীকার করেন না; অস্বীকার করেন বিশ্বাসের নামে অমানবিকতাকে। তাঁর দৃষ্টিতে মানুষের মর্যাদা কোনও প্রথার চেয়ে বড়। এই মানবতাবাদ কখনও স্লোগানে পরিণত হয় না; চরিত্রের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই তা প্রকাশিত হয়। ফলে পাঠক কোনও মতবাদের মুখোমুখি হন না, বরং নিজের বিবেকের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়েন।
কমলকুমারের আখ্যানের আর-একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সংযম। তিনি কোথাও আবেগকে উচ্ছ্বসিত হতে দেন না। মৃত্যু আছে, বেদনা আছে, অসহায়তা আছে—কিন্তু কোথাও কৃত্রিম নাটকীয়তা নেই। এই সংযমই উপন্যাসের আবেগকে আরও গভীর করে তোলে। পাঠকের চোখে জল আনার জন্য লেখক কোনও বিশেষ কৌশল ব্যবহার করেন না; বরং এমন এক শিল্পসত্য নির্মাণ করেন, যা পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী অনুরণন সৃষ্টি করে।

কমলকুমার মজুমদারের উপন্যাসের শিল্পভাবনা ও কাহিনিকে অবলম্বন করে গৌতম ঘোষ ১৯৮৭ সালে অন্তর্জলী যাত্রা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। চলচ্চিত্রটি মূল রচনার মানবিক বোধকে অক্ষুণ্ণ রাখলেও চলচ্চিত্রমাধ্যমের প্রয়োজন অনুযায়ী কাহিনি ও চরিত্র-নির্মাণে কিছু সৃজনশীল পরিবর্তন আনা হয়। চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও প্রশংসিত হয় এবং উপন্যাসের আবহ, নীরবতা ও দৃশ্যভাষাকে চলচ্চিত্রের নিজস্ব ভাষায় রূপ দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে সমাদৃত হয়। উপন্যাসের প্রধান চরিত্রগুলোকে পর্দায় জীবন্ত করে তুলেছিলেন একঝাঁক শক্তিশালী অভিনেতা। মৃত্যুপথযাত্রী কুলীন ব্রাহ্মণ সীতারাম চরিত্রে অভিনয় করেন প্রমোদ গঙ্গোপাধ্যায়। কিশোরী নববধূ যশোবতী চরিত্রে ছিলেন শম্পা ঘোষ। যশোবতীর পিতার ভূমিকায় অভিনয় করেন বসন্ত চৌধুরী। ডোম বৈজু চরিত্রে একেবারেই ব্যতিক্রমী অভিনয় করেন হিন্দি চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেতা শত্রুঘ্ন সিনহা। জ্যোতিষীর ভূমিকায় ছিলেন রবি ঘোষ, আর বৈদ্যের চরিত্রে অভিনয় করেন মোহন আগাশে।
চলচ্চিত্রটি শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও সমাদৃত হয়। ১৯৮৮ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে এটি শ্রেষ্ঠ বাংলা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র (Best Feature Film in Bengali) সম্মানে ভূষিত হয়। একই বছরে ছবিটি কান চলচ্চিত্র উৎসবের Un Certain Regard বিভাগে প্রদর্শিত হয় এবং তাশখন্দ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘গ্রাঁ প্রি (গোল্ডেন সেমুর্গ)’ পুরস্কার অর্জন করে। এই স্বীকৃতিগুলো প্রমাণ করে, কমলকুমারের উপন্যাসের মানবিক আবেদন ও গৌতম ঘোষের চলচ্চিত্রভাষা আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছেও সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হয়েছিল।
তবে এটিও সত্য, কমলকুমারের গদ্যের যে অন্তর্লয়, প্রতীকের বহুস্তরতা এবং ভাষার সূক্ষ্ম ব্যঞ্জনা, তা সম্পূর্ণভাবে পর্দায় স্থানান্তর করা সম্ভব নয়। ফলে চলচ্চিত্রটি একটি উল্লেখযোগ্য শিল্পকর্ম হলেও উপন্যাসের পাঠ-অভিজ্ঞতার বিকল্প হয়ে ওঠে না। বরং চলচ্চিত্র দেখার পর মূল উপন্যাসে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই আরও তীব্র হয়।
এই কারণেই অন্তর্জলী যাত্রা কেবল একটি উপন্যাস নয়; এটি বাংলা ভাষার নন্দনতত্ত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ পাঠ। এখানে ভাষা কাহিনিকে বহন করে না, ভাষাই কাহিনি হয়ে ওঠে। নীরবতা শব্দের চেয়ে বেশি কথা বলে। প্রতীক বাস্তবতার চেয়ে গভীর সত্য প্রকাশ করে। আর মানুষের ক্ষুদ্র জীবনের ভেতর দিয়ে উন্মোচিত হয় সভ্যতার বৃহত্তর প্রশ্ন।
কমলকুমার মজুমদারের শিল্পের এই গভীরতাই তাঁকে বাংলা কথাসাহিত্যে এক অনন্য আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। অন্তর্জলী যাত্রা পড়া শেষ হলে মনে থাকে না শুধু তার কাহিনি; মনে থাকে তার আবহ, তার ভাষা, তার নীরবতা এবং মানুষের প্রতি তার গভীর আস্থা। সেখানেই এই উপন্যাসের প্রকৃত মহিমা।
কোনো সাহিত্যকর্মের প্রকৃত মূল্য তার প্রকাশের মুহূর্তে নির্ধারিত হয় না। সময়ই তার সবচেয়ে কঠোর বিচারক। বহু জনপ্রিয় গ্রন্থ কয়েক দশকের মধ্যেই বিস্মৃত হয়েছে, আবার এমন অনেক রচনা আছে, যেগুলি প্রথম প্রকাশের সময় সীমিত পাঠকমহলের সম্পদ হলেও পরবর্তী কালে সাহিত্য-ইতিহাসের অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে। অন্তর্জলী যাত্রা সেই দ্বিতীয় শ্রেণির রচনা। প্রকাশের পরপরই এটি বিপুল পাঠকপ্রিয়তা পায়নি; কিন্তু যত সময় অতিক্রান্ত হয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে এর শিল্পমূল্য। আজ বাংলা উপন্যাসের শ্রেষ্ঠ রচনাগুলোর তালিকা তৈরি হলে অন্তর্জলী যাত্রা-র নাম অনিবার্যভাবেই উচ্চারিত হয়।
এই উপন্যাসের স্থায়িত্বের কারণ তার বিষয় নয়, তার দৃষ্টিভঙ্গি। মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্যে বহু রচনা আছে, সামাজিক কুসংস্কার নিয়েও অসংখ্য উপন্যাস লেখা হয়েছে। কিন্তু কমলকুমারের স্বাতন্ত্র্য এই যে, তিনি কোনো সামাজিক সমস্যার সরল সমাধান খুঁজতে চাননি। তিনি মানুষের অন্তর্জগৎকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। তাঁর কাছে সাহিত্য কোনো আদালত নয়, যেখানে রায় ঘোষণা করা হবে; সাহিত্য এমন এক পরিসর, যেখানে মানুষ নিজের বিবেকের সঙ্গে মুখোমুখি হয়। এই কারণেই অন্তর্জলী যাত্রা পড়ার পর পাঠকের মনে উত্তর অপেক্ষা প্রশ্নই বেশি জন্ম নেয়। আর সেই প্রশ্নের আয়ু দীর্ঘ।
বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে এই রচনার আর-একটি বড় অবদান তার ভাষা। কমলকুমার দেখিয়েছিলেন, গদ্যও কবিতার মতো ঘন, বহুস্তরবিশিষ্ট এবং প্রতীকসমৃদ্ধ হতে পারে। তিনি ভাষাকে কখনো কেবল তথ্য পরিবেশনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেননি; ভাষাই তাঁর কাছে ছিল শিল্পের প্রধান উপকরণ। পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্যের বহু লেখক ভাষার এই সম্ভাবনা সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হয়েছেন। প্রত্যক্ষ অনুকরণ হয়তো কম হয়েছে, কিন্তু তাঁর শিল্পচেতনার অভিঘাত বাংলা কথাসাহিত্যের ভেতরে নীরবে কাজ করেছে।
এই উপন্যাসের আর-একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর মানবতাবাদ। কমলকুমার কোনো মতবাদের লেখক নন। তিনি কোনও রাজনৈতিক বা ধর্মীয় অবস্থানকে সাহিত্যিক ঘোষণাপত্রে পরিণত করেননি। তাঁর পক্ষপাত একটাই—মানুষ। তাই তাঁর উপন্যাসে ধর্ম আছে, কিন্তু ধর্মান্ধতা নেই; সমাজ আছে, কিন্তু সমাজের অন্ধ আনুগত্য নেই; মৃত্যু আছে, কিন্তু মৃত্যুর রোমান্টিকীকরণ নেই। আছে কেবল মানুষের মর্যাদার প্রতি গভীর আস্থা। এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই অন্তর্জলী যাত্রা-কে সময়ের সীমানা অতিক্রম করতে সাহায্য করেছে।
আজকের সমাজে হয়তো অন্তর্জলী যাত্রার মতো প্রথা আর নেই। কিন্তু মানুষকে সামাজিক নিয়ম, ধর্মীয় ব্যাখ্যা, ক্ষমতার কাঠামো কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করার প্রবণতা কি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়েছে? দুর্ভাগ্যজনকভাবে নয়। প্রথার ভাষা বদলেছে, প্রযুক্তির রূপ বদলেছে, কিন্তু মানুষের স্বাধীন সত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা রয়ে গেছে। এই কারণেই উপন্যাসটি আজও আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিক। এটি অতীতের একটি প্রথার গল্প নয়; প্রতিটি যুগে মানুষের স্বাধীনতা ও মানবিকতার ওপর আরোপিত অদৃশ্য চাপের গল্প।
আরও একটি বিষয় এই উপন্যাসকে অনন্য করে তোলে। কমলকুমার পাঠকের ওপর কোনো আবেগ চাপিয়ে দেন না। তিনি জানেন, সাহিত্য যত কম নির্দেশ দেয়, তত বেশি ভাবতে শেখায়। তাঁর সংযমই তাঁর শক্তি। তিনি পাঠকের হাত ধরে পথ দেখান না; বরং এমন এক দরজার সামনে দাঁড় করিয়ে দেন, যার ওপারে প্রবেশ করতে হলে প্রত্যেককেই নিজের অভিজ্ঞতা, বোধ এবং বিবেক নিয়ে এগোতে হয়। তাই অন্তর্জলী যাত্রা প্রত্যেক পাঠকের কাছে এক নয়। বয়স, অভিজ্ঞতা ও জীবনদর্শনের সঙ্গে সঙ্গে এই উপন্যাসের অর্থও নতুনভাবে উন্মোচিত হয়। এটিই কালজয়ী সাহিত্যের লক্ষণ।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে পথের পাঁচালী, পদ্মানদীর মাঝি, পুতুলনাচের ইতিকথা, তিতাস একটি নদীর নাম কিংবা হাঁসুলী বাঁকের উপকথা যেমন নিজ নিজ স্বাতন্ত্র্যে অমর, তেমনি অন্তর্জলী যাত্রাও তার নিজস্ব শিল্পভাষা ও নন্দনতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের জন্য এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত। এটি কারও উত্তরসূরি নয়, কারও অনুকরণও নয়; এটি সম্পূর্ণ কমলকুমারীয় এক শিল্পজগৎ, যার তুলনা শেষ পর্যন্ত তার নিজের সঙ্গেই।
কমলকুমার মজুমদারের সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রায়ই বলা হয়, তিনি ‘লেখকের লেখক’। কথাটির মধ্যে কিছু সত্য আছে, কারণ তাঁর সাহিত্য সহজ পাঠের নয়। কিন্তু এই পরিচয়ই তাঁর সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। তিনি শুধু লেখকদের লেখক নন; তিনি সেইসব পাঠকের লেখক, যারা সাহিত্যের কাছে কেবল গল্প নয়, শিল্পের গভীর অভিজ্ঞতা প্রত্যাশা করেন। তাঁর রচনার সঙ্গে ধৈর্য নিয়ে বসতে হয়, বারবার ফিরে আসতে হয়। সেই পরিশ্রমের প্রতিদানও অসাধারণ। কারণ তাঁর সাহিত্য আমাদের কেবল নতুন একটি কাহিনি দেয় না; নতুনভাবে দেখার চোখ দেয়।
অন্তর্জলী যাত্রা শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর উপন্যাস নয়; এটি জীবনের উপন্যাস। এটি কোনও ধর্মীয় প্রথার বিবরণ নয়; মানুষের বিবেকের অনুসন্ধান। এটি অতীতের ইতিহাস নয়; বর্তমানেরও আয়না। এই উপন্যাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সভ্যতার অগ্রগতি কেবল প্রযুক্তি বা অর্থনীতির অগ্রগতিতে নয়, মানুষের প্রতি মানুষের আচরণে। যে সমাজ মানুষের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ মূল্য দেয়, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে সভ্য।
বাংলা ভাষার শক্তি, তার নন্দনচেতনা এবং মানবিক গভীরতার যে কয়েকটি সর্বোচ্চ নিদর্শন আমাদের হাতে রয়েছে, অন্তর্জলী যাত্রা নিঃসন্দেহে তাদের অন্যতম। কমলকুমার মজুমদার প্রমাণ করেছিলেন, আয়তনে ছোট হয়েও একটি উপন্যাস ভাবনার বিস্তারে মহাকাব্যের সমান হয়ে উঠতে পারে। সেই কারণেই এই রচনা কেবল বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন নয়; এটি এক অনতিক্রম্য শিখর।
সময় বদলাবে, পাঠকের রুচি বদলাবে, সাহিত্যের ভাষাও বদলাবে। তবু কিছু বই থাকবে, যেগুলোর কাছে প্রতিটি প্রজন্মকে নতুন করে ফিরে আসতে হবে। কারণ তারা উত্তর দেয় না, প্রশ্ন করতে শেখায়; তারা চোখে জল আনে না, বিবেককে জাগিয়ে তোলে; তারা কেবল পড়া শেষ হয় না, পাঠকের ভেতরে দীর্ঘকাল ধরে বেঁচে থাকে।
কমলকুমার মজুমদারের অন্তর্জলী যাত্রা সেই বিরল গ্রন্থগুলোরই একটি—বাংলা ভাষার শিল্পসামর্থ্যের এক উজ্জ্বল সাক্ষ্য, মানুষের বিবেকের এক দীর্ঘ প্রতিধ্বনি এবং সময়কে অতিক্রম করে বেঁচে থাকা এক অমর সাহিত্যকীর্তি।
দীপক সাহা : গল্পকার, প্রাবন্ধিক, শিক্ষক
