স্মৃতির সরণি: মানবজীবনের শেকড় ও শিল্প-সাহিত্যের প্রাণরস

একজন মানুষ সারা জীবন বেঁচে থাকে তার অতীতকে স্মরণ করে। সেই মানুষটির অতীত উজ্জ্বল হোক বা অনুজ্জ্বল হোক, গৌরব থাকুক কিংবা অপমান থাকুক, আনন্দ থাকুক কিংবা যন্ত্রনা থাকুক, পাওয়া থাকুক কিংবা না পাওয়া থাকুক সবকিছুকেই সে সঙ্গে নিয়ে সারা জীবন বেঁচে থাকে। এটাই তার সমস্ত জীবনের স্মৃতির সরণি। মানুষ কখনোই এই স্মৃতির সরণিকে ত্যাগ করতে পারে না। যখন তখন সে তার এই নিরিবিলি সরণিতে গিয়ে উপস্থিত হয়। ভবিষ্যতের পথ অন্বেষণ করতে গিয়েও তাকে এই সরণি থেকেই যাত্রা করতে হয়। ভবিষ্যৎ সে দেখতে পায় না, বর্তমান তার কাছে সন্দেহ প্রবণ, কিন্তু অতীত তার কাছে অভিজ্ঞতার বিশাল পাঠশালা। সেখানে কখনো সে শিক্ষক, কখনো সে ছাত্র। তার পরামর্শ ও শিক্ষার যেন শেষ নেই।
এই স্মৃতির সরণি বা অতীতচারিতা মানব জীবনের এক গভীর ও অনিবার্য সত্য। মানুষ তার বর্তমানের মণিকোঠায় দাঁড়িয়ে যতই এগিয়ে যাক না কেন, ফেলে আসা দিনগুলোর শেকড় তার মনোজগতে গভীরভাবে প্রোথিত থাকে। এই অতীত কেবল স্মৃতির রোমন্থন নয়, বরং এটি মানুষের অস্তিত্বের চালিকাশক্তি। যে কথা আমরা আগেই স্মরণ করলাম।
স্মৃতির স্মরণি মানুষের জীবনে যে বহুমুখী প্রভাব ফেলে, তার কিছু রূপ আমরা অন্বেষণ করতে পারি :
অনুভূতির বহুমাত্রিকতা
অতীত মানেই কেবল আনন্দ বা সুখের রোমন্থন নয়। স্মৃতির সরণিতে হাঁটার অর্থ হলো জীবনের নানা রঙের মুখোমুখি হওয়া। এর মধ্যে যেমন থাকে প্রথম প্রেমের শিহরন ও কোমলতা, তেমনি থাকে কঠোর সংগ্রাম, বেদনাবিধুর বিরহ এবং জীবনের নানা ক্ষেত্রে ব্যর্থতা বা পরাজয়ের গ্লানি। এই মিশ্র অনুভূতিগুলোই মানুষকে সংবেদনশীল করে তোলে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনে ফেলে আসা স্মৃতি এবং প্রিয়জন হারানোর বেদনা বারবার তাঁর সৃষ্টিতে ফিরে এসেছে। তাঁর অনেক গানে ও কবিতায় অতীত এক মধুর ও দীর্ঘশ্বাসে ঘেরা সুর হয়ে বেজে ওঠে। বিশেষ করে ‘স্মৃতি’ বা স্মৃতিচারণমূলক প্রাবন্ধিক ও কাব্যিক রচনায় তাঁর এই রূপটি স্পষ্ট।
যেমন, রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন গানে (যেমন: “পুরানো সেই দিনগুলোর কথা কি ভুলতে পারা যায়”—যা মূলত রবার্ট বার্নসের স্কটিশ লোকগানের ভাবানুবাদে তৈরি) স্মৃতির রোমন্থনই মূল সুর। এছাড়া তাঁর আত্মস্মৃতিকামূলক গ্রন্থ ‘জীবনস্মৃতি’ (১৯১২) বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য দলিল, যেখানে তাঁর শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতির সরণি নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে। যেমন—
”বৎসরের পর বৎসর চলিয়াছে, সুপ্রভাত ও অন্ধকার রাত্রি আপন পালা বদল করিতেছে, কিন্তু সেই ঘরের কোণটিতে আমার শৈশবের সমস্ত দিনগুলি যেন তুলির টানে আঁকা ছবিটির মতো স্থির হয়ে রয়েছে।” (জীবনস্মৃতি)
সৃজনশীলতার উৎস
স্মৃতির এই বিচিত্র ভাণ্ডারই কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীদের প্রধান রসদ। কবি যখন একাকী বসে অতীতের কোনো হারানো মুহূর্তকে স্মরণ করেন, তখন তা পঙক্তি হয়ে খাতায় নেমে আসে। ঔপন্যাসিক তার স্মৃতির পথ ধরেই ফুটিয়ে তোলেন মানুষের জীবনের না বলা কথা। একইভাবে, একজন চিত্রশিল্পী বা সুরকার তার ফেলে আসা দিনের সুখ-দুঃখ, বিরহ ও সংগ্রামের রূপ দেন ক্যানভাসে কিংবা সুরে। স্মৃতির আলোড়ন না থাকলে শিল্প জন্ম নিতে পারত না। যেমন—
“হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন।”
আধুনিক বাংলা কবিতার নির্জনতম কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতায় স্মৃতির সরণি এক অদ্ভুত মায়াবী ও কালহীন মাত্রা লাভ করেছে। হাজার বছরের পথ চলা এবং ক্লান্ত প্রাণের শান্তি খোঁজার ব্যাকুলতা তাঁর কবিতাকে অমর করেছে।
১৯৪২ সালে প্রকাশিত এবং পরবর্তীতে ১৯৫২ সালে একই নামের কাব্যগ্রন্থে সংকলিত ‘বনলতা সেন’ কবিতাটি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, যা স্মৃতির গভীরে হারিয়ে যাওয়া কোনো এক আদিম বিস্ময় ও শান্তির প্রতীক।

আত্মউপলব্ধি ও পরিপক্বতা
পরাজয় ও সংগ্রামের স্মৃতি মানুষকে ভেতর থেকে শক্ত করে। অতيةর ভুল বা ব্যর্থতাগুলো মানুষের জীবনে শিক্ষক হিসেবে কাজ করে। স্মৃতির সরণি বেয়ে মানুষ অতীতে ফিরে গিয়ে নিজের ভুলত্রুটি সংশোধন করার সুযোগ পায় এবং বর্তমানকে আরও সুন্দরভাবে সাজাতে শেখে।
স্মৃতির রোমন্থন এবং ফেলে আসা দিনগুলোর জন্য এক তীব্র হাহাকার শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় এক ভিন্ন মাত্রায় প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর কলমে অতীত মানেই এক গভীর নিঃসঙ্গতা ও চেনা মুখের ভিড়।
আধুনিক বাংলা কাব্যের অন্যতম প্রধান কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বিভিন্ন কবিতায় শৈশব, গ্রামবাংলা এবং প্রিয় মুখগুলোর স্মৃতি বারবার ফিরে এসেছে। তাঁর একাধিক কাব্যগ্রন্থে এই নস্টালজিয়া ও মনখারাপের সুর প্রধান হয়ে উঠেছে। যেমন—”ভালোবাসা পিঁড়ি পেতে রেখেছিলো” কবিতায় লিখেছেন :
“‘ভালোবাসা পিঁড়ি পেতে রেখেছিলো উঠোনের কোণে।
ছায়া ছিলো, মায়া ছিলো, মুথা ঘাস ছিলো
ছাঁচতলায় আর ছিলো বৃষ্টিক্ষতগুলি…
ভালোবাসা পিঁড়ি পেতে রেখেছিলো উঠোনের কোণে
কিন্তু
সে পিঁড়িতে এসে এখনো বসেনি
কেউ, ধীর পায়ে এসে, ত্রস্ত একা একা
কেউ সে পিঁড়িতে এসে এখনো বসেনি
গভীর গভীরতর রাত হয়ে এলো
কেউ সে-পিঁড়িতে এসে এখনো বসেনি
গভীর গভীরতর রাত শেষ হলো
কেউ সে-পিঁড়িতে এসে এখনো বসেনি।”
(যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো)
মানুষ তার বর্তমানের চেয়ে তার অতীতের কাছে অনেক বেশি সত্য। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ কেবল তার জমা করা স্মৃতিগুলো নিয়েই বেঁচে থাকে। এই স্মৃতিই তার পরিচয়, তার বেঁচে থাকার আত্মিক দলিল।স্মৃতি হলো অতীত ও বর্তমানের সেতুবন্ধন। যা কিছু হারিয়ে গেছে, স্মৃতি তাকে হৃদয়ে অমর করে রাখে। এই কবিতাটি সেই পরিচয়টিই তুলে ধরেছে।
বিশ্বসাহিত্যের আলোচনায় স্মৃতির সরণি বা অতীতচারিতার কথা উঠলে ফরাসি ঔপন্যাসিক মার্সেল প্রুস্তের নাম সর্বাগ্রে আসে। স্মৃতিচারণের ওপর ভিত্তি করে লেখা এটি বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ ও প্রভাবশালী উপন্যাসমালা।
১৯১৩ থেকে ১৯২৭ সালের মধ্যে ৭ খণ্ডে প্রকাশিত এই মাস্টারপিস উপন্যাস: À la recherche du temps perdu-এ লেখক এক কাপ চায়ে ভেজানো ‘ম্যাডেলিন’ কেকের স্বাদ থেকে নিজের শৈশবের হারানো দিনে ফিরে যাওয়ার এক মনস্তাত্ত্বিক যাত্রা ফুটিয়ে তুলেছেন। একে সাহিত্য জগতে ‘অনিচ্ছাকৃত স্মৃতিচারণ’ বা Involuntary Memory-এর শ্রেষ্ঠ নিদর্শন বলা হয়। কিছুটা অংশ এরকম :
”The past is hidden somewhere outside the realm, beyond the reach of intellect, in some material object (in the sensation which that material object will give us) of which we have no idea. And it depends entirely on chance whether or not we come across this object before we die.”
অর্থাৎ অতীতকাল আমাদের বুদ্ধিবৃত্তির নাগালের বাইরে, জগতের কোনো এক অজ্ঞাত স্থানে কোনো জড় বস্তুর মধ্যে (সেই বস্তুটি আমাদের মনে যে সংবেদন বা অনুভূতির সৃষ্টি করে তার ভেতর) লুকিয়ে থাকে। আর আমরা মৃত্যুর আগে সেই বস্তুর দেখা পাব কি না, তা সম্পূর্ণভাবে ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে।
স্মৃতির সরণি কেবল নস্টালজিয়া বা মন খারাপের জায়গা নয়; এটি মানুষকে মানুষ হিসেবে বাঁচিয়ে রাখার এক অনবদ্য মাধ্যম। অতীতকে সঙ্গে নিয়েই মানুষের পথ চলা, আর সেই পথ চলাই জীবনকে শিল্প ও সাহিত্যে রূপায়িত করে। স্মৃতির এই দীর্ঘ পথচলাই মূলত শিল্প ও সাহিত্যকে প্রাণরস জুগিয়ে চলেছে, যেখানে অতীত কেবল অতীতের জায়গায় আটকে থাকে না, বরং তা বর্তমানের হাত ধরে অমরত্ব লাভ করে।
তৈমুর খান : কবি
