নার্গিসের পুনরাবির্ভাব

যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই
কেন মনে রাখ তা’রে।
ভুলে যাও মোরে ভুলে যাও একেবারে॥
আমি গান গাহি আপনার দুখে,
তুমি কেন আসি’ দাঁড়াও সমুখে,
আলেয়ার মত ডাকিয়ো না আর নিশীথ-অন্ধকারে॥

দয়া কর, মোরে দয়া কর, আর আমারে লইয়া
খেলো না নিঠুর খেলা।
শত কাঁদিলেও ফিরিবে না প্রিয় শুভ লগনের বেলা।
আমি ফিরি পথে, তাহে কার ক্ষতি
তব চোখে কেন সজল মিনতি,
আমি কি ভুলেও কোনোদিন এসে’ দাঁড়ায়েছি তব দ্বারে?
ভুলে যাও মোরে ভুলে যাও একেবারে।।

সালটা ১৯৩৭ সালের ১ জুলাই। কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন ১০৬ আপার চিৎপুর রোডে গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সালরুমে। বাল্যবন্ধু, সাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় কবির সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। সুদীর্ঘ ১৬ বছর পর প্রেমিকা তথা প্রথম স্ত্রী নার্গিস খানমের লেখা চিঠি কবির কাছে আসে। চিঠিটি বন্ধু শৈলজাকে পড়তে দেন নজরুল। পড়ার পর পাল্টা সুদীর্ঘ চিঠি লেখেন নজরুল। সঙ্গে ভূমিকায় বলা গান নৈবেদ্য স্বরূপ!

  চিঠির একাংশে কবি প্রেমিকা নার্গিসকে লিখছেন...

  ‘‘তোমার আজিকার রূপ কি, জানি না। আমি জানি তোমার সেই কিশোরী মূর্তিকে, যাকে দেবী মূর্তির মতো আমার হৃদয়বেদীতে অনন্ত প্রেম, অনন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম। সেদিনের তুমি সে বেদী গ্রহণ করলে না। পাষাণ দেবীর মতোই তুমি বেছে নিলে বেদনার বেদীপীঠ।... জীবন ভরে সেখানেই চলেছে আমার পূজা-আরতি। আজকার তুমি আমার কাছে মিথ্যা, ব্যর্থ, তাই তাকে পেতে চাইনে। জানিনে হয়তো সে রূপ দেখে বঞ্চিত হব, অধিকতর বেদনা পাব,--তাই তাকে অস্বীকার করেই চলেছি।

 দেখা? না-ই হল এ ধূলির ধরায়! প্রেমের ফুল এ ধূলিতলে হয়ে যায় ম্লান, দগ্ধ, হতশ্রী। তুমি যদি সত্যিই আমায় ভালবাস, আমাকে চাও, ওখান থেকেই আমাকে পাবে। লায়লি মজনুকে পায়নি, শিরি ফরহাদকে পায়নি, তবু তাদের মতো করে কেউ কারও প্রিয়তমকে পায়নি। আত্মহত্যা মহাপাপ, এ অতি পুরাতন কথা হলেও পরম সত্য। আত্মা অবিনশ্বর, আত্মাকে কেউ হত্যা করতে পারে না। প্রেমের সোনার কাঠির স্পর্শ যদি পেয়ে থাকো, তা হলে তোমার মতো ভাগ্যবতী কে আছে?

   তারি মায়া স্পর্শে তোমার সকল কিছু আলোয় আলোময় হয়ে উঠবে। দুঃখ নিয়ে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে গেলেই সেই দুঃখের অবসান হয় না। মানুষ ইচ্ছা করলে সাধনা দিয়ে, তপস্যা দিয়ে ভুলকে ফুল রূপে ফুটিয়ে তুলতে পারে। যদি কোনও ভুল করে থাক জীবনে এই জীবনেই তার সংশোধন করে যেতে হবে; তবেই পাবে আনন্দ, মুক্তি; তবেই হবে সর্বদুঃখের অবসান। নিজেকে উন্নত করতে চেষ্টা করো, স্বয়ং বিধাতা তোমার সহায় হবেন। আমি সংসার করছি, তবু চলে গেছি এই সংসারের বাধাকে অতিক্রম করে ঊর্ধ্বলোকে—সেখানে গেলে পৃথিবীর সকল অপূর্ণতা, সকল অপরাধ ক্ষমাসুন্দর চোখে পরম মনোহর মূর্তিতে দেখা দেয়।...’’


চিঠির শেষে কবির মিনতি, ‘‘যাক—আজ চলেছি জীবনের অস্তমান দিনের শেষ রশ্মি ধরে ভাঁটার স্রোতে, তোমার ক্ষমতা নেই সে পথ থেকে ফেরানোর। আর তার চেষ্টা করো না। তোমাকে লেখা এই আমার প্রথম ও শেষ চিঠি হোক। যেখানেই থাকি, বিশ্বাস করো, আমার অক্ষয় আশীর্বাদী কবচ তোমায় ঘিরে থাকবে। তুমি সুখী হও, শান্তি পাও—এই প্রার্থনা। আমায় যত মন্দ বলে বিশ্বাস করো, আমি তত মন্দ নই—এই আমার শেষ কৈফিয়ৎ!

              ইতি
             নিত্য শুভার্থী
            নজরুল ইসলাম

P.S
আমার ‘চক্রবাক’ নামক কবিতা-পুস্তকের কবিতাগুলো পড়েছ? তোমার বহু অভিযোগের উত্তর পাবে তাতে। তোমার কোনও পুস্তকে আমার সম্বন্ধে কটূক্তি ছিল।

                 ইতি
                ‘Gentleman’
  • * * * * *

নজরুল-নার্গিসের প্রেমকাহিনী লিখতে লিখতে রবীন্দ্রনাথের কথাতেই বলতে ইচ্ছে করে…

মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না?
কেন মেঘ আসে হৃদয়-আকাশে, তোমারে দেখিতে দেয় না?।
ক্ষণিক আলোকে আঁখির পলকে তোমায় যবে পাই দেখিতে
হারাই-হারাই সদা হয় ভয়, হারাইয়া ফেলি চকিতে ॥
কী করিলে বলো পাইব তোমারে, রাখিব আঁখিতে আঁখিতে।
এত প্রেম আমি কোথা পাব নাথ, তোমারে হৃদয়ে রাখিতে?
আর কারো পানে চাহিব না আর, করিব হে আমি প্রাণপণ–
তুমি যদি বল এখনি করিব বিষয়বাসনা বিসর্জন ॥

অধ্যাপক অরুণকুমার বসু তাঁর ‘নজরুল জীবনী’ গ্রন্থে লিখছেন, ‘‘কিন্তু নজরুল-জীবনে ১৯৩৭-এর সবচেয়ে স্মরণদুর্লভ ঘটনা হল কুমিল্লা থেকে এক ঝলক বাতাস ভেসে আসা। নার্গিস কবে নজরুলকে চিঠি লিখলেন, কোন ঠিকানায় চিঠি পাঠালেন, কেন এতকাল পরে হঠাৎ নজরুলকে চিঠি লিখতে গেলেন, এ সব জিজ্ঞাসা অমীমাংসিতই থাকবে। ১৩২৮-এর তেসরা আষাঢ় উভয়ের বিবাহ-জীবনের উপর নেমে এসেছিল বিচ্ছেদের অভিশাপ। হঠাৎ ১৩৪৪-এর আষাঢ়ে নার্গিস কেন সেই বিদারণ রেখাপাতের বর্ষপূর্তি স্মরণ করে নজরুলকে সেই বয়ঃসন্ধি বয়সের স্মৃতি উপহার দিতে চাইলেন? নার্গিসের এই পত্রটি নজরুল রক্ষা করেননি, কিন্তু নজরুলের পত্রটি প্রকাশিত হয়ে গেছে।’’

লক্ষ্যণীয়, নার্গিসকে লেখা চিঠিতে নজরুল আত্মহত্যার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে লিখেছন, ‘আত্মহত্যা মহাপাপ, এ অতি পুরাতন কথা হলেও পরম সত্য। আত্মা অবিনশ্বর।, আত্মাকে কেউ হত্যা করতে পারে না। প্রেমের সোনার কাঠির স্পর্শ যদি পেয়ে থাকো, তা হলে তোমার মতো ভাগ্যবতী কে আছে।’’ এ থেকে অনুমেয় যে নজরুলকে লেখা চিঠিতে নার্গিস আত্মহত্যার প্রসঙ্গের অবতারণা করেছিলেন! অধ্যাপক অরুণ বসুর বই পড়ে জানতে পারছি, নার্গিস নাকি নজরুলকে মোট চারটি চিঠি লিখেছিলেন। দ্বিতীয় চিঠির উত্তরেই ‘যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার না’ গানটি পাঠিয়েছিলেন। নার্গিস চতুর্থ চিঠিতে নাকি লিখেছিলেন...

 ‘‘আমি যে তার পথ চেয়ে আছি এবং তাকে না পেলে এভাবে বেঁচে থাকার কোনও অর্থ নেই, এসবই লিখেছিলাম। তাকে না পেলে আত্মহত্যার পথ বেছে নেব একথাও লিখেছিলাম। অনুরোধ করেছিলাম, প্রমীলাকে বিয়ে করেছ, এতে আমার কিছু আসে যায় না। ও যদি সত্যি আমায় ভালবেসে থাকে, তবে যেন একবার ঢাকায় এসে দেখা করে।...আমার বিপর্যয় চোখে দেখেও নজরুল এক মহামানবসুলভ উপদেশের ঢিল ছুঁড়ে সুদীর্ঘ উত্তর দিল।’’ (‘অন্তরঙ্গ আলোকে কবিপ্রিয়া’/বুলবুল ইসলাম)

নজরুলের চিঠির আলোয় নার্গিসের না-দেখা চিঠির বিষয় ও ভাষাভঙ্গি প্রসঙ্গে মুজফফর আহমদ তাঁর স্মৃতিকথায় লিখছেন, ‘‘মনে হচ্ছে নার্গিস লিখেছিলেন যে তাঁর নিকটে নজরুল একজন ‘দূত’ প্রেরণ করেছিল। সেই অছিলাতেই নার্গিস পত্র লিখেছিলেন। পনেরো বছর পরে হঠাৎ একখানা পত্র লেখার উপলক্ষের প্রয়োজন ছিল। নার্গিস বেগম নজরুলের ‘দূত’ পাঠানোর একটা বানানো কথাকেই নজরুলকে তাঁর পত্র লেখার অছিলা হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন।’’

 ভূমিকায় বলা গান (যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই) প্রসঙ্গে মুজফফর লিখছেন,

‘‘এখানেই নজরুল আসল কথা বলেছে। সে কবি মানুষ। কবিত্মময় ভাষায় কথাটা বলেছে। আর যারা কবি নয়, আমাদের নিকটে ব্যাপারটা যেভাবে ফুটে উঠেছে তা আমি আগেই বলেছি। অর্থাৎ নজরুল ইসলাম নার্গিসকে একান্তভাবে ভালবেসেছিল। কোনও খাদ ছিল না সেই ভালবাসায়। আর, নার্গিস প্রথমে ভালবাসার অভিনয় করেছিলেন। পরে সেই অভিনয়ের পরদাও তুলে দিয়ে নিজের যে মূর্তি তিনি দেখিয়েছিলেন আশাহত নজরুল তার সামনে আর তিষ্ঠোতে পারেনি।

১৯২১ সালের ছয়ই জুলাই তারিখের রাত্রে এই কথাই নজরুল আমায় বলেছিল। পনেরো বছর পরে যে পত্র নার্গিসকে সে লিখেছিল তারও মানে এই-ই দাঁড়ায়। অবস্থা বিপাকে পড়ে আলী আকবর খানেরা (নার্গিসের মামা) নজরুলকে বিদায় করতে বাধ্য হয়েছিলেন, যদিও তাঁদের প্রথম পরিকল্পনা অনুসারে এটা তাঁদের একেবারেই কাম্য ছিল না। তাঁদের এই পরিকল্পনার সময় নজরুলকে তাঁরা একটি অসহায় প্রাণী ভেবেছিলেন। কিন্তু সে দিন নজরুল যদি চলে না যেত তবে তার পৌরুষ প্রচণ্ড ঘা খেত। নার্গিস সংক্রান্ত কথা খুব ঘনিষ্ট বন্ধু ছাড়া আর কাউকে সে বলেনি। শ্রীশৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় সেদিন নজরুলের বড় বন্ধু ছিলেন। আমার স্মৃতি ঠিক আছে কিনা তা যাচাই করার জন্য আমি কিছুদিন আগে শ্রীশৈলজানন্দকে জিজ্ঞাসা করেও জেনেছি যে তাঁর নিকটেও নজরুল এই একই কথা বলেছিল।…’’

মনে রাখতে হবে, নার্গিসের সঙ্গে চিঠি চালাচালির সময় নজরুল সক্রিয় জীবনের সায়াহ্ণে এসে পৌঁছেছেন। স্ত্রী প্রমীলা সেনগুপ্ত নিম্নাঙ্গ অবশ হয়ে শয্যাশায়ী। দুই কিশোর পুত্র। এর ঠিক পাঁচ বছর পরেই কবি নিজেই নির্বাক হয়ে যাবেন! তখন খ্যাতির শীর্ষে কবি। শেষবারের মতো ‘হেস্তনেস্ত’ করতে মরিয়া নার্গিস!

এক স্মৃতিচারণায় নার্গিস বলছেন, ‘‘১৯৩৭-এর ৪ঠা নভেম্বর মামার এক বন্ধু মোমেনসাহীর অধ্যাপক হেলালউদ্দিন সাহেবের সাহায্যে আমার মামাতো ভাই নওয়াজেস মোহম্মদ খান ও ওয়াজেদ আলী খানকে নিয়ে কলকাতার শিয়ালদহ হোটেলে নজরুলের সঙ্গে জীবনের শেষবারের মতো সাক্ষাৎ করি। নজরুল আমাকে দেখে অনেকটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। প্রথমে আমরা কেউ কথা বলতে পারিনি। জড়তা কাটিয়ে উঠলে নজরুল বলল, তুমি যাও, আমি ইমিডিয়েটলি ঢাকা আসছি, একটা সুরাহা করব। নজরুল তার পারিবারিক বিপর্যয়ের কথা বারবার বলল। বলল, প্রমীলা কিংবা তার মা তোমাকে কিছুতেই সহ্য করবে না। সুতরাং ঢাকাতেই তুমি থাকবে। এমনি করে ও সেদিন আমাদের বিদায় করল। তার ইমিডিয়েটলি আর এল না।’’ (‘অন্তরঙ্গ আলোকে কবিপ্রিয়া’/ বুলবুল ইসলাম)

সবশেষে অধ্যাপক অরুণকুমার বসুর নিরীক্ষণ, ‘‘একে সত্য বলে বিশ্বাস করা যাবে, না চরিত্রহনন বলে অগ্রাহ্য করা হবে, সে বিচার উত্তরকালের হাতে ন্যস্ত থাক।’’

  • * * * * *

কৃতজ্ঞতাস্বীকারঃ
১) ‘নজরুল জীবনী’/ অরুণকুমার বসু/ আনন্দ পাবলিশার্স
২) ‘কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা’/ মুজফফর আহমদ/ ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড

মেহবুব কাদের চৌধুরী : লেখক ও সাংবাদিক, কলকাতা, ভারত

আরও পড়ুন