ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ মননের আকাশে অনির্বাণ নক্ষত্র

আজ ১০ জুলাই, উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদ ও পণ্ডিত ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্-এর জন্মদিন। ১৮৮৫ সালের এই দিনে পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা জেলার পেয়ারা গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মফিজউদ্দিন আহমদ এবং মা হুরুন্নেসা। মায়ের প্রবল ইচ্ছাতেই তাঁর নাম রাখা হয়েছিল ‘শহীদুল্লাহ’ যা পরবর্তীকালে তাঁর ক্ষণজন্মা হওয়ার লক্ষণ হিসেবে প্রমাণিত হয়। ১৮টিরও বেশি ভাষায় পারদর্শী এই মনীষী কেবল ভাষাবিদ ছিলেন না, ছিলেন একাধারে শিক্ষাবিদ ও দার্শনিক।
ড. শহীদুল্লাহ্-এর জন্মদিন আমাদের কেবল শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ দেয় না বরং এটি আত্মসমালোচনা ও ভবিষ্যতের পথনির্দেশনা দেয়। আজকের প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে বাংলা ভাষাকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পূর্ণাঙ্গ ভাষায় উন্নীত করাই হোক আমাদের জাতীয় লক্ষ্য।
দেশের প্রথম সম্পূর্ণ রঙিন বই ও প্রকাশনাবিষয়ক পত্রিকা বইচারিতা পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যাটি (জুলাই-নভেম্বর ২০২২) ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্কে প্রচ্ছদে ধারণ করে যে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে, তা আজকের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বিশ্বাস করতেন—ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং এর ভেতরে ঘুমিয়ে থাকে হাজার বছরের ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি ও দর্শন।
প্রখ্যাত লেখক, গবেষক ও সংগঠক মোহাম্মদ আব্দুল হাই ‘ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্-এর বাঙালির মানস ও সম্প্রীতির চেতনা’ শিরোনামে যে প্রচ্ছদ রচনাটি লিখেছেন, তা এই সংখ্যার এক অনন্য সম্পদ। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন যে, ড. শহীদুল্লাহ্-এর জীবন ও দর্শন কেবল একজন ভাষাবিদের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তাঁর কর্ম ও চিন্তা এই ভূখণ্ডের মানুষের অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক প্রদীপ্ত প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তাঁর জীবন ও কাজ বিশ্লেষণ করলে আমরা বুঝতে পারি, তিনি কেবল শব্দ নিয়ে কাজ করেননি, বরং বাঙালির হাজার বছরের লোকসংস্কৃতি, দর্শন ও স্বপ্নের এক আত্মপরিচয় নির্মাণ করেছেন।
প্রচ্ছদ রচনার দ্বিতীয় অংশে গবেষক ড. নাজনিন নাহার অত্যন্ত মুনশিয়ানার সঙ্গে ‘ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্’র রচনার বর্তমানতা’ শিরোনামে তাঁর বিশাল কর্মযজ্ঞের সমকালীন গুরুত্ব বিশ্লেষণ করেছেন। এছাড়া, আ. জা. ম. তকীউল্লাহর লেখা ‘মুক্তির দিশারী মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্’ বইটি নিয়ে ড. শহীদুল্লাহ্-এর নাতনি শান্তা মারিয়া এক আবেগঘন স্মৃতিকথার অবতারণা করেছেন, যা পাঠককে গভীরভাবে স্মৃতিকাতর করবে।
পত্রিকাটি সাজানো হয়েছে বই ও প্রকাশনাবিষয়ক নানা বৈচিত্র্যে। ড. মো. রিরাজুল ইসলাম ‘আল মাহমুদ: লোকজ জীবনের রূপকার’ নিবন্ধে আল মাহমুদের কাব্যের শিকড় সন্ধানী রূপটি তুলে ধরেছেন। উপন্যাস বিভাগে সাদরিল শাহজাহান জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে শাহাদুজ্জামানের ডকু-ফিকশনের ওপর মনস্তাত্ত্বিক ও পাঠক-কেন্দ্রিক বিশ্লেষণ পেশ করেছেন। ‘লুইপা’র কালসাপ’ উপন্যাস নিয়ে জাকিয়া রহমান যে বিশ্লেষণ করেছেন, তা চর্যাপদের মতো দুরূহ বিষয়কে সহজভাবে বোঝার পথ প্রশস্ত করে। এছাড়া, রেজোয়ান আহমেদ ‘অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী’র না পাওয়া বা পাওয়ার আখ্যান নিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ লিখেছেন।
মুক্তিযুদ্ধ ও ইতিহাস বিষয়ক নিবন্ধে মারুফ রসুল ‘মেয়ে বিচ্ছু: আজিমপুরের মুক্তিযোদ্ধা কাহিনী’কে একটি প্রামাণ্য দলিল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অন্যদিকে, ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ ‘মুক্তিযুদ্ধে রেডিও’ গ্রন্থের ওপর আলোকপাত করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি বিশেষ অনুষঙ্গকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
সামাজিক ও মননশীল প্রবন্ধের মধ্যে হোসেন মোহাম্মদ জাকির ‘শিশুর মানসিক বিকাশ ও সামাজিক দক্ষতা জিপিএ-৫ চেয়েও জরুরি’ নিবন্ধটি বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার অন্ধ প্রতিযোগিতা নিয়ে অভিভাবক সমাজকে একটি কঠোর অথচ সত্য বার্তা দিয়েছে। ড. সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায় ‘এমনিতে যাঁরা দিব্যি বলেন বাঙালি এবং মুসলমান’ প্রবন্ধে বাঙালি পরিচয়ের রাজনীতির দার্শনিক ও যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ড. তারিকুজ্জামান মোহাম্মদ আব্দুল হাইয়ের ‘বাঙালির ধর্মচিন্তা’ গ্রন্থটির ওপর দর্শনশাস্ত্রের আলোকে আলোকপাত করেছেন।
বই ও পাঠাভ্যাস নিয়ে ফারহানা মোবিন ‘ছাপা বই পড়ার উপকারিতা’ ও সঞ্জিত দত্ত ‘বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না’ শিরোনামে অনুপ্রেরণামূলক প্রবন্ধ লিখেছেন।
এছাড়া, এলিজা বিনতে এলাহী ‘ট্রাভেলস অব ইবনে বতুতা’ নিয়ে ভ্রমণসাহিত্যের অভিজ্ঞতা এবং সাকার মোস্তফা নাগরা লিপির পুঁথির ওপর আলোচনা করেছেন। পত্রিকাটির নিয়মিত বিভাগগুলো—যেমন: বই পরিচিতি, বই বাজার, শব্দজট ও কুইজ—পাঠকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে।
বইচারিতা মূলত তাদের জন্য, যারা পাঠকে কেবল অবসর যাপন নয়, বরং জীবনের গভীর অনুসন্ধানের মাধ্যম মনে করেন। এর সূচিপত্র বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এটি একটি পরিকল্পিত সংকলন, যা পাঠকদের রুচি ও মনন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। সম্পাদক আবু সাঈদ বলেন, ‘বই ও প্রকাশনাবিষয়ক দেশে সম্পূর্ণ রঙিন পত্রিকা না থাকায় আমরা চেষ্টা করছি, বই ও প্রকাশনার নানা বিষয় বইচারিতার পাতায় তুলে ধরতে।’
১৬০ পৃষ্ঠার ৯০ টাকা মূল্যের এই পত্রিকাটি বাংলাদেশ ও কলকাতায় পাওয়া যাচ্ছে। ঢাকার কাঁটাবনের স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশন, শাহবাগের বাতিঘর, পাঠক সমাবেশ, প্রথমা এবং ধানমন্ডির বেঙ্গল বই-এ পাওয়া যাবে। এ ছাড়া রকমারি ও প্রথমা ডটকমেও পাওয়া যাবে।
মাসুম বিল্লাহ : ইনসাইট কন্ট্রিবিউটর, বইচারিতা
