আহমদ ছফার রচনায় ‘আলী কেনানে’র উপাখ্যান

ছদ্মবেশী মানুষের জীবনে কয়েকটি চরিত্র লুকিয়ে থাকে, ভালো চরিত্র খারাপ চরিত্র সবই থাকে। ভালো চরিত্রটাও অবশ্য খারাপ চরিত্রের কোনো সুযোগ সন্ধানের নিমিত্তেই। ভালো চরিত্র মানুষের মাঝে প্রকাশ করে খারাপ চরিত্রের স্বার্থ হাসিল করাই তখন তাদের উদ্দেশ্য। অন্তরালের চরিত্রই আসল। এবং সময়ে সময়ে তাকে নানা চরিত্রের পরিবর্তনও করতে হয়। এরাই হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য বিষফোঁড়া। মহাত্মা আহমদ ছফার উপন্যাস একজন আলি কেনানের উত্থান পতন এর অনন্য এক চরিত্রের আবিষ্কার হচ্ছে ‘আলি কেনান’। যার এক জীবনে বেশ কয়েকটি চরিত্রের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটে। তার জীবন উপাখ্যান পাঠ করার পর দেখবেন আসলে আমাদের আশেপাশে এমন অহরহ আলি কেনান চরিত্রের লোক ঘুরে বেরায় প্রতিদিন, প্রতিক্ষণে। খেয়াল করে দেখেছেন কি কখনও?
বলুন দেখি আলি কেনান কোথায় নেই? আমাদের সমাজে, রাষ্ট্রে এমনকি আমি/আপনি এখন যেখানে বসে আছি বা দাঁড়িয়ে আছি সেখানেও কোনো না কোনো আলি কেনান বসে আছে কোনো এক বহুরূপীর অন্তরালে। ‘আহমদ ছফা’ যে আলি কেনানকে আবিষ্কার করেছেন তার এক জীবনে বেশ কয়েকটি চরিত্রের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে কাজ সম্পাদন করেছে। কখনো সে হয়েছে প্রশাসনের খুব ক্ষমতাবান লোক (অথচ সে প্রশাসনের কেউ ছিল না), আবার কখনো ভিক্ষুক, মাজারের আলি বাবা, সুযোগ সন্ধানে সেজেছে জয় বাংলার দরবেশ। সব চরিত্রই ছিল তার মুখোশদারী। সব মিলিয়ে ‘আহমদ ছফা’ তার (আলি কেনান) জীবনের উপাখ্যানকে নাম দিয়েছেন একজন আলি কেনানের উত্থান পতন। আলি কেনানের যেমন উত্থানের গল্প আছে তেমনি পতনের গল্পও আছে। সেই উপাখ্যানকেই রচনা করেছেন আহমদ ছফা। মূলত এসব নিয়েই ছিল আহমদ ছফার কারসাজি, সমাজের চোখে ভালো হয়ে থাকা বা সাধু সেজে থাকা ভণ্ড লোকদের সত্য মুখোশ উন্মোচন করা।
সমাজের চোখে সাধু সেজে থাকা যেসব ভদ্রলোক দিনের আলোয় বেশ্যাদের দিকে ঘৃণা বা নিন্দা ছড়ায় সেই তারাই আবার সন্ধ্যা হওয়ার পর তাদেরকে রাতের রাণী বানায়। আহমদ ছফা আলি কেনানের এই উপাখ্যানে সেসব চরিত্রের ঘটনাও তুলে এনেছেন। তারপর প্রসঙ্গের খাতিরে বলতে হয়। আমাদের আশেপাশে দেখবেন প্রতিনিয়ত অনেক দালাল ও ভণ্ড প্রকৃতির লোক ঘুরে বেরায়। সবচেয়ে রহস্যময় বিষয় হচ্ছে এসব দালালরা খুবই মিষ্টিভাষী হয় এবং ভাবসাব দেখলে মনে হবে সে খুব ক্ষমতাবান। বর্তমানে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মেডিকেল থেকে শুরু করে সরকারি/বেসরকারী সব অফিস আদালত প্রত্যেকটি সেক্টরেই এই ভণ্ড দালালদের অবস্থান বিরজমান। এদের মিষ্টিভাষী কথাবার্তা, আপনার প্রতি তার আবেগ আপ্যয়ন দেখে বুঝতেই পারবেন না যে, সে একটা ভণ্ড ও দালাল প্রকৃতির লোক। সে চাটুকারিতা করে আপনার কাছ থেকে তার সার্থ হাসিল করবে। কিভাবে করবে টেরই পাবেন না। আপনি বুঝতে পারবেন তবে যথেষ্ট সময় চলে যাওয়ার পর। মজার বিষয় হচ্ছে এই দালালদের দরবেশ বাবার মত রুপেও দেখা যায়। সে তার বিষয়ে এমন কারিশমা দেখাবে আপনি তার প্রতি বিশ্বাস রাখতে বাধ্য হবার মতই। যে দরবেশ বাবাকে আমরা দেখছিলাম আহমদ ছফার এই রচনার। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গেও এই দালাল প্রকৃতির লোকদের দেখা যায়। যতদিন রাজনৈতিক ব্যক্তির নেতৃত্ব থাকবে তার সাথে কাজ করবে। আবার যখনই উনার ক্ষমতা অধপতন সৃষ্টি হবে দালাল সুযোগ বুঝে তার পেছনেই ছুরি মারবে। এরাই হচ্ছে আলি কেনান প্রকৃতির লোক। আর এদের যেমন একটা উত্থান আছে দিনশেষে তাদের জন্য নিষ্ঠুর পতনও অপেক্ষা করে। আহমদ ছফা মূলত আলি কেনানের চরিত্রের মাধ্যমে সেসব প্রকৃতির লোকদের কাহিনি তুলে ধরতে চেয়েছেন, এবং একটা বার্তা দিতে চেয়েছেন। যেখানে আলি কেনান ছিল এক ব্যঙ্গাত্মক চরিত্র।
আলি কেনানের শেষ পরিণতি কি হয়েছিল? সবকিছু হারিয়ে হতে হয়েছিল তাকে নিঃস্ব। এমনকি বাড়ি সবশেষে বাড়ি ফিরে যাওয়ার মতও অবস্থা ছিল না তখন তার। তার শেষ পতন এসেছিল কিভাবে? এসেছিল এক প্রবাসী মহিলার রূপ লাবন্যের লালসায় পড়ে। যার জন্য আলি কেনান সব কিছু সব টাকা উজাড় করে দিতে তৈরি ছিল। মহিলা যখন তার অন্য প্রেমিকের সঙ্গে চলে গেল। তখন তার মনে হল যেন তার সব চলে গেল। তার কিছু অংশ এখানে উদ্ধৃতি করছি;
‘ঘরে ডুকে সে তোষকটা উল্টায়। তোষকের নিচে ভাঁজে ভাঁজে রাখা টাকার তোড়া। অনেক টাকা অনেক ভান্ডিল। সব একসঙ্গে জড়ো করে আবার চিৎকার আড়ম্ব করে, আমার ভেস্তের হুর, আমার আসমানের চান, আমার হইলদা পাখি। তুই আমার কাছে আয়। এই ট্যাহা বেবাক তোর।’ কিন্তু সেই পাখি কি আসে? আসে না। আসার কথাও না।
আলি কেনানের উত্থান ও পতনের গল্পে আলি কেনানের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর উত্তর-পূর্ব একটা মিল পাওয়া যায়। সেটা হচ্ছে শেখ মুজিবের মৃত্যুর পূর্বে তার পাশে থাকা লোকজন, শুভাকাঙ্ক্ষীর অভাব ছিল না অথচ তার মৃত্যুর পর পাশে কেউ নেই বললেই চলে। ঠিক তেমনি আলি কেনানের যখন সব ছিল তখন তার মুরিদ, সাগরিদের অভাব ছিল না, কিন্তু পতনের পর দেখল তার পাশে কেউ নেই। চারপাশ শূন্য, হাহাকার। এমনকি আরও একটি মিল হচ্ছে শেখ মুজিবের মৃত্যুর ঘটনায় যেমন তারই আশেপাশের লোকজন জড়িত ছিল তেমন আলি কেনানের শেষ পতনের সময় তার মুরিদেরাই সুযোগ নিয়েছিল। এই গল্পের আলি কেনান অবশ্য শেখ মুজিবুরকে চিনত, যদিও সে শেখ মুজিবকে সে কখনো দেখে না বা শেখ মুজিবও তাকে চিনতো না। তবুও যেন আহমদ ছফা এখানে তাদের মধ্যে একটা যোগসূত্র করেছেন। এমনকি শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডের কাছাকাছি সময়ই আলি কেনানের পতনের কাহিনি রচিত হয়েছে। আলি কেনানের হইলদা পাখি যখন চলে গেল সে সে ঘরে এসে চিৎকার চেচামেচি করে বিছানার নিছে থাকা সকল টাকা পয়সা ছুড়ে মারতে লাগল। পাশের রুমেই তার মুরিদেরা। মুরিদেরা কি আর সেই সুযোগ আর লোভ সামলাতে পারে? কিছুক্ষণ পর আলি কেনান ঘুমিয়ে পড়লে মুরিদেরা তার টাকা পয়সা সব নিয়ে গা ঢাকা দিয়ে চলে যায়। সকালে ঘুম থেকে উঠে আলি কেনান দেখে ঘরে কেউ নেই, ঘরে শুধু সেই একা। মুরিদেরা তো রাতেই হাওয়া হয়ে গেছে। অথচ এই মুরিদেরাই একসময় তার কথায় উঠতো, বসতো। আলি কেনান ঘরে ও মাজারে কাউকে না পেয়ে রাস্তার কাছে চলে এলো। সেখানে এসে মোড়ের দোকানে রেডিওতে শুনতে পেল শেখ মুজিবের মৃত্যু সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে। সেটা শুনে আলি কেনানের প্রতিক্রিয়া ছিল এমন;
‘শেখ মুজিবর বাঁইচ্যা নাই, আমি ঢাহায় থাকুম কেরে? হের সমাজতন্ত্র অইলনা আমি হইলদ্যা পাখিরে হারাইলাম। ভোলায় চইল্যা যামু। অই তরা আমারে লঞ্চের একটা টিকেট কাইট্যা দে। কিন্তু তার চিৎকার হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে থাকলো। সময় নষ্ট না করে শোবার ঘরে ঢুকে তোষকটা উল্টে পাল্টে দেখলো। অবাক কাণ্ড। একটা আধুলিও পড়ে নেই। কাল এই তোষকের তলায় থরে থরে সাজানো ছিলো টাকার বান্ডিল। আজ কিছু নেই। সব হাওয়া। মাজারে ঢুকে গলা চড়িয়ে বলতে থাকলো, হাতে একটা পয়সাও নাই। আমি ভোলায় মা বাপের কাছে ফেরত যামু কেমনে? কেমনে যামু? মাজারের ভেতরে তার কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হতে থাকলো-কেমনে যামু? কেমনে যামু?…’
এই বলে যেন তার সকল উত্থানের গল্প হাওয়ায় ভেসে যেতে থাকে। আর এভাবেই রচিত হয় উত্থান পতনের গল্প।
লেখক : মনোয়ার পারভেজ
বই : একজন আলি কেনানের উত্থান পতন
লেখক: আহমদ ছফা
প্রথম প্রকাশ : ১ জানুয়ারি ১৯৮৮
পৃষ্ঠা: ৭৯
মূল্য : ২০০ টাকা
