বাংলা ভাষার ১০০ শব্দের প্রথম গল্পসংকলন : শত কথার শত গল্প প্রসঙ্গে কিছু কথা

শত কথার শত গল্প এর প্রথম খণ্ড বের হয় ২০১৮ সালের বইমেলায়!
প্রথম যখন বইটির সম্পাদক আবু সাঈদ বললেন, মাসুম বিল্লাহ ভাই, একশ শব্দের একটা গল্প দেন।…
আমি প্রথমটায় ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি, যে, কী বললেন তিনি! পরে যখন বুঝলাম তখন ভেতরে-ভেতরে একধরণের আগ্রহ, উদ্দীপনা ও চ্যালেঞ্জ কাজ করতেছিল! কারণ, এর আগে কখনো এভাবে শব্দ মেপে, শুনে ত কিছু লিখিনি। তাছাড়া এভাবে কখনো কোনো গল্প লেখা যায় কিনা, বা কেউ লিখেছে কিনা তা জানা ছিল না।
তবে বিখ্যাত লেখক হেমিংওয়ের এক লাইনের গল্পটা বিখ্যাতখ্যাত। তারপর লেখক লিডিয়া ডেভিস অণুগল্প লিখেও পুরষ্কার বাগিয়ে নিয়েছেন। আর আমারও প্রথম থেকে অণুগল্প লেখায় বেশ আগ্রহ।
যখন থেকে লিখি, তখন থেকেই একটা ব্যাপার খেয়াল করে দেখেছি, যে, আমার লেখার দৈর্ঘ্য কম। খুব অল্প কথা যা লেখার তা লেখা হয়ে যায়। চাইলেও বেশি কথায় লেখাটাকে টেনে বড় করতে পারি না। তখন বুঝেছি, আমার নিজের জাত, ধাত, সামর্থ্য এটাই। এটাই মেনেছি— আমার গন্ডি, সীমাবদ্ধতা ও ভবিতব্য।
আমি মনে করি, আমার ধারণায় কোনো ভুল ছিল না, নেইও। যে যার মতো করে লিখে এবং লিখবে। লেখক মাত্রই স্বতন্ত্র।
তাই, সাঈদ ভাই যখন গল্প চাইলেন, মানে ১০০ শব্দে, তখনই মনেমনে ভাবতে থাকলাম, এটা আমার জন্য পান্তাভাত। আমি না পারলে আর কে পারবে!
আমার মনে হয়, সবার আগেই আমি গল্প জমা দিয়েছিলাম।
গল্পটার শিরোনাম ছিল— ‘আয়না ভাঙার শব্দ’।
লেখাটা যখন লিখে শেষ করি, তখন শব্দ গোনার পালা এল। গুনলাম, ১৫০ শব্দের কম হলো। আবার শুরু হলো শব্দ কাটাকুটির খেলা। শেষমেশ ১০০ শব্দে রূপ নিল। তারপর গল্পটি সংকলনে জায়গাও পেল। তখন থেকে আমারও একপ্রকার নেশা ধরে গেল— ১০০ শব্দে একটা একটা করে গল্প লেখা।
এখন অনেকে হয়ত বলবেন, ১০০ শব্দে আবার গল্প হয় নাকি?
প্রথমে আমারও সন্দেহ হলেও এখন আর হয় না, এখন আমিও বলতে চাই— হয়, খুব হয়; এই যে দেখেন, আমার গল্পগুলোই পড়ে দেখতে পারেন।
ক্ষতি কী, লিখুক না—যার যেমন মনে চায়।
গত বছর জনপ্রিয় এক লেখকের একটা গল্পের বই দেখলাম, দুইটা তিনটা গল্প দিয়ে একটা মোটাসোটা বই! এক একটা গল্পই ১শ পৃষ্ঠার অধিক!!
একটা গল্প যদি ১শ পাতার উপরে হতে পারে, তাহলে আমি বা আমরা বিপরীত পথে হেঁটে—পাল্টা লিখলাম— মাত্র ১০০ শব্দে—১টা গল্প! হা হা…
আমার মতে, শব্দ, দৈর্ঘ্য বিষয় নয়, বিষয় হলো গল্পটা গল্প হয়ে উঠেছে কিনা, যদি হয় তাহলে আর চিন্তা নেই। না হলেই বরং চিন্তার কথা।
শত কথার গল্প এর প্রচলন ও বাংলা ভাষায় প্রথম সংকলন উদ্যোগ আবু সাঈদ নেন এবং ধারণাটি সফল ভাবে চালিয়ে নিচ্ছেন তিনি। এ পর্যন্ত মোট চারটি খণ্ড প্রকাশ হয়েছে। আগামী বছরও নিশ্চয়ই পঞ্চম খণ্ডও বের হবে!
তবে সবচে অবাক ব্যাপার এই যে, ২০১৮ সালের বইমেলার পর এই ১০০ শব্দের ধারণাটিকে উপজিব্য করে অনেকেই সংখ্যা বের করা শুরু করেছে। খুবই ভালো ব্যাপার। আমরা সাড়া ফেলতে পেরেছি তাহলে— বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু দৃষ্টিকটু এটাই যে, অনেকে প্রচার করে—বলে যে, তারাই প্রথম, তারাই প্রথম ধারণাটি চালু করেছে!
কী হাস্যকর! কী হাস্যকর!
তবে আমরা এসব নিয়ে ভাবছি না, আমরা জানি, ইতিহাস সবকিছুর বিচারক।
শত কথার শত গল্প’এর প্রথম খণ্ড থেকে শেষ অর্থাৎ চতুর্থ খণ্ড পর্যন্ত সম্পাদকের দপ্তরে আসা সবগুলো গল্প আমি আগেভাগে পড়ার, যাচাই-বাছাই ও সম্পাদনার সুযোগ পেয়েছি সম্পাদকের কল্যাণে।
মনে পড়ে, প্রথম খণ্ডের বইগুলো রাত তিনটা পর্যন্ত পড়েছি, বাছাই করেছিলাম। তখনকার একটা বিশেষ ঘটনার কথা মনে আছে খুব করে—
হালের এক জনপ্রিয় লেখকের গল্প পড়ে আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে গিয়েছিল— এটা ত কোনও গল্পই হয়নি! তার উপর গল্পটার শব্দ সংখ্যা ১০০ বদলে ছিল সাড়ে তিন শ শব্দ!
কী দুঃসাহস আমার, তাই না!?
হুম, শেষমেশ সে-লেখাটাকে কাটিংসাটিং করে ১০০ শব্দে করে দিয়েছিলাম, গল্প হওয়ার জন্য অনেক চেষ্টাও করতে হয়েছিল! তবুও মনমতো হয়নি।
সেই মুহূর্তে আমার পাশে বসে সব দেখছিলো আর ফিকফিক করে হাসতেছিল—গীতিকার ইকবাল রাশেদ।
যাক সেসব পুরনো গল্প। বর্তমানে ফিরি—
তৃতীয় খণ্ড প্রকাশ হয়েছে মার্চ ২০২১ সালে। এবার যেহেতু বইমেলায় যাইনি, সেকারণে সংকলনটি আমার হাতে এসে পৌছায়—৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখ!!
হুমমমম
অনেক পরে, হাতে পেয়েছি আমি।
যাক, তবু ত হাতে এসেছে, পড়ার সুযোগ হয়েছে।
দেরি করে হলেও এখন মতামত লিখতেও বসেছি। তবে বই আলোচনা, সমালোচনা লেখার ইচ্ছে ও আগ্রহ কোনোটাই আমার নেই। কখনো ছিলও না।
আমি জানি, যারা সত্যিকারের পাঠক তারা আমার এই লেখা পড়েও বইটা সংগ্রহ করে পড়বে। আর যারা পড়বে না তারা কোনো কিছুতেই পড়বে না। বরাবরের মতো শত কথার শত গল্প (এর তৃতীয় খন্ড) এ সংখ্যাটিও বেশ সুন্দর। বিখ্যাত লেখকদের লেখায়ও পাতা ভরে উঠেছে। বিষয়টা অনেক আনন্দের, অনেক উৎসাহের।
লেখক: আখতার হুসেন, আনিসুল হক, দন্ত্যস রওশন, শরীফুল ইসলাম ভূঁইয়া, সেলিনা হোসেন, হরিশংকর জলদাস, মাসরুর আরেফিন প্রমূখ।
এইসব প্রিয় লেখকদের গল্পের পাশাপাশি অঞ্জন আচার্য, ইব্রাহীম রাসেল, কোরবান আলী, খায়রুল বাবুই, ডানা মির্জা, সোহেল নওরোজসহ আরও বেশ কজন অপরিচিত লেখকদের লেখা অনেক ভালো লেগেছে আমার। এখানে সবার নাম লিখতে গেলে পাতা ভ’রে উঠবে!
তবে তাসনুভা অরিণ এর গল্পটা— এককথায় সুপার! উল্লেখ্য যে, অরিণের আগের দুটো গল্পসহ এবারের গল্পটি সেরা মনে হয়েছে আমার কাছে।
এবং হাবিবুল্লাহ ফাহাদ এর গল্পটিও আমার অসম্ভব ভালো লেগেছে।
সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ।
শত কথার শত গল্প প্রথম খন্ডের সময় থেকে মনেমনে একটা কথা আমি ভাবি— আচ্ছা, ১০০টা গল্প ১০০জন লেখক পড়েছে তো? মানে সবাই সবার গল্পটা পড়েছে তো! যদি পড়ে তাহলে তো হলোই— ভালো! আবারও বলব— শুধু নিজের লেখাটিই নয়, পড়ুন বইয়ের প্রতিটি লেখা (গল্প)।
ছড়িয়ে দিন ১০০টি গল্প। ১০০জন লেখককে।
সবশেষে, বইটির সম্পাদক ও প্রকাশক আবু সাঈদকে অশেষ ধন্যবাদ শ্রমসাধ্য এ কাজটির জন্য।
নিশ্চয়ই তার এ উদ্যোগ ও পরিশ্রম সার্থক ও সফল হবে, একদিন তিনি ও তার এ কাজটা ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নেবে…
বই কিনুন। বই পড়ুন। বই উপহার দিন।
বই হোক আত্মার আত্মীয়।
বই : শত কথার শত গল্প
খণ্ড : তৃতীয়
উদ্যোগ ও সম্পাদনা : আবু সাঈদ
প্রথম প্রকাশ : ১৮ মার্চ ২০২১
প্রচ্ছদ : নিয়াজ চৌধুরী তুলি
প্রকাশনী : স্বপ্ন ‘৭১ প্রকাশন
মূল্য : ২০০ টাকা
বইটি সরাসরি পেতে যোগাযোগ : 01723209448
