তারানাথ তান্ত্রিক সমগ্র,অলৌকিকতার অমোঘ হাতছানি, আর আছে অদ্ভুত মায়া

বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য নাম বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তার লেখায় নিসর্গ ও জীবনের গভীরতাকে আমরা চিনি। কিন্তু সেই বিভূতিভূষণ যখন রহস্য ও অলৌকিকতার অলিগলিতে পা বাড়ান, তখনই জন্ম নেয় ‘তারানাথ তান্ত্রিক’। পরবর্তীতে তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এই চরিত্রটিকে তার নিজস্ব শৈলীতে আরও সমৃদ্ধ করেছেন।

এটি কেবল ভূতের গল্পের বই নয়। এটি হলো মানুষের অভিজ্ঞতার বাইরের জগতের সাথে মুখোমুখি হওয়ার এক দলিল। তারানাথ চরিত্রটি কোনো সাধারণ ওঝা বা তান্ত্রিক নয়; সে যেন এক মহাকালের সাক্ষী। তার মুখে শোনা গল্পগুলো কোনোটি আমাদের শিহরিত করে, কোনোটি আবার ভাবায়—পৃথিবীতে এমন অনেক কিছু আছে যা বিজ্ঞান বা যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
তারানাথ যখন তার পুরোনো তামাকের নলিটি হাতে নিয়ে আসর জমায়, পাঠক তখন আর নিজের ঘরে থাকে না। সে চলে যায় কুয়াশাচ্ছন্ন কোনো শ্মশানে, নিঝুম কোনো গ্রামে, কিংবা মানুষের অবচেতন মনের অতল গভীরে।
অধিকাংশ হরর গল্পের উদ্দেশ্য থাকে ভয় দেখানো। কিন্তু তারানাথ তান্ত্রিকের গল্পের উদ্দেশ্য হলো মানুষকে বিস্ময়ের এক নতুন জগতে নিয়ে যাওয়া। এখানে ভয় আছে, কিন্তু তার চেয়ে বেশি আছে এক অদ্ভুত মায়া।
বিভূতিভূষণের লেখনীতে অলৌকিক ঘটনাগুলোও যেন খুব স্বাভাবিকভাবে ঘটে যায়। তার বর্ণনায় প্রকৃতি, পরিবেশ এবং মানুষের মানসিক গঠন এমনভাবে উঠে আসে যে, পাঠক সহজেই বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়—হ্যাঁ, এমনটা ঘটতেই পারে।
বিভূতিভূষণের লেখনীতে অলৌকিকতা যখন উঠে আসে, তখন তা আমাদের চেনা পৃথিবীরই যেন এক লুকানো অংশ হয়ে ধরা দেয়। এখানে ভূত মানেই কেবল ভয় নয়, বরং এমন সব রহস্য যা মানুষের যুক্তির বাইরে। তারানাথ তান্ত্রিক চরিত্রটি এমন এক ব্যক্তিত্ব, যে যেন মহাকালের সবটুকু অভিজ্ঞতা নিজের ঝোলায় নিয়ে বসে আছে। তার প্রতিটি গল্প পাঠকমাত্রকেই এক নিগূঢ় ঘোর বা ‘ট্র্যান্স’-এ নিয়ে যায়।

দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে হাতে এল ‘তারানাথ তান্ত্রিক সমগ্র’। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলম আর তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুন্সিয়ানায় লেখা এই বইটি কেবল কিছু গল্পের সংকলন নয়, বরং এটি এক অদ্ভুত ঘোর, এক মায়াবী জগতের দরজা।
আমি কোনো জ্ঞানী সমালোচক নই, জটিল সাহিত্যতত্ত্বের কচকচানি আমার পোষায় না। আমি কেবল মুগ্ধতার গল্প জানি। ‘তারানাথ তান্ত্রিক’ পড়ার সময় যে স্বাদ আমি পেয়েছি, তা অন্য কোনো বইয়ের সাথে মেলানো ভার।

বই, পত্রিকা, সিনেমা, গান—এই জীবনের বড় একটা সময় আমি ব্যয় করেছি এদের পেছনে। মাঝে মাঝে মনে হয়, এতো খরচা কি আদৌ ঠিক? কিন্তু একজন বইখোর যখন হয়, তখন তাকে বাঁধবে কে? এই হাতখরচের বেহিসাবি অভ্যাস থেকে নিজের লাগাম টেনে ধরার চেষ্টা অনেকবার করেছি, কিন্তু পুরোপুরি সফল হইনি। আর হবই বা কেন? বই তো কেবল কাগজের সমষ্টি নয়, বই তো আত্মার আত্মীয়।

জীবনে কখনোই কোনো বইয়ের রিভিউ পড়ার প্রয়োজন বোধ করিনি। নিজের পিপাসা থেকেই বইয়ের দুনিয়ায় ডুব দিয়েছি। চারপাশে এখনো শত-শত বই পড়ে আছে, চোখ বন্ধ করে যেগুলোর ভেতরে হারিয়ে যাওয়া যায়। আক্ষেপ একটাই—হায় মানবজীবন! এতো অল্প সময়, কিন্তু পড়ার মতো বই অগণিত।

তবুও আমি সেই তারানাথ তান্ত্রিকের মতোই অপেক্ষায় আছি। তারানাথ যেমন রহস্যের জাল বুনে বসে থাকে, আমিও তেমনি অপেক্ষায় থাকি—কখন আমার জানালায় এসে বসবে সেই আশ্চর্য পাখি? সেই নতুন কোনো বই, যা আমাকে আবারও নতুন কোনো জগতের খবর দেবে।

আমার এই ‘তারানাথ তান্ত্রিক’ পাঠ-অভিজ্ঞতার পেছনে জাকারিয়া জুয়েলের অবদান অনস্বীকার্য। করোনার কঠিন সময়ে চিকিৎসার জন্য যখন সে চেন্নাই শহরে গিয়েছিল, ফেরার সময় তার হাত ধরে এল এই মহামূল্যবান উপহার—’তারানাথ তান্ত্রিক’। সে যখন দেশে ফিরে এসে বলল, “নেন, পইড়েন!”, তখন সেই মুহূর্তের আনন্দ ছিল ভাষায় প্রকাশ করার মতো।
তাঁর কারণেই বইটি পড়ার সুযোগ হলো, আর সেই সুযোগটি আমার পড়ার টেবিলকে করেছে আরও সমৃদ্ধ। তাঁর প্রতি অসীম ভালোবাসা ও শুভকামনা রইল।

বই কেবল পড়ার জন্য নয়, বই হোক আত্মার আত্মীয়। কারণ এই যান্ত্রিক জীবনে বই-ই তো আমাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী, যে কোনোদিন মিথ্যে বলে না, কোনোদিন একা ফেলে যায় না। ভালো বই মানেই তো এক আশ্চর্য পাখি, যা আমাদের প্রতিদিনকার একঘেয়ে জীবন থেকে ডানা মেলে উড়িয়ে নিয়ে যায় অজানার দেশে।

আরও পড়ুন