আমরা যা খুঁজি, তা আমাদের কাছেই থাকে—পাওলো কোয়েলহোর ‘দ্য আলকেমিস্ট’

পাওলো কোয়েলহো বলেন, ‘আমেরিকান প্রকাশনা সংস্থা হারপার কলিন্স থেকে আসা একটা চিঠির কথা মনে পড়ছে, যেখানে বলা হয়েছিল, ‘দ্য আলকেমিস্ট পড়া মানে খুব ভোরে জেগে উঠে সূর্যোদয় দেখা, বাকি পৃথিবী যখন ঘুমিয়ে।’
আমি তখন লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য লড়তে লড়তে নিজের পথ কোনোমতে আঁকড়ে আছি, যদিও সব অদৃশ্য স্বর আমাকে ক্রমাগত বলে চলেছে, ‘অসম্ভব, সে অসম্ভব…!’ কিন্তু একটু একটু করে আমার স্বপ্ন সত্যে পরিণত হচ্ছিল। শুধু আমেরিকাতেই বইটা লাখ লাখ কপি বিক্রি হচ্ছিল। ব্রাজিলের এক সাংবাদিক আমাকে ফোন করে জানালেন, আলকেমিস্ট পড়া অবস্থায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের ছবি তোলা হয়েছে। আমি যখন তুরস্কে, ভ্যানিটি ফেয়ার সাময়িকী খুলে দেখলাম, জুলিয়া রবার্টস বলছেন, বইটা তাঁর ভীষণ ভালো লেগেছে। মিয়ামির এক রাস্তায় একদিন একা হাঁটতে হাঁটতে শুনলাম একটা মেয়ে তার মাকে বলছে, ‘আলকেমিস্ট বইটা তুমি অবশ্যই পড়বে!’
হ্যাঁ, দ্য আলকেমিস্ট কেবল একটি উপন্যাস নয়, এটি একটি গ্লোবাল ফেনোমেনন। ১৯৮৮ সালে পর্তুগিজ ভাষায় প্রথম প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে এটি বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। ১৯৯৩ সালে ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশের পর থেকে এর জনপ্রিয়তা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। আজ পর্যন্ত এটি বিশ্বের কয়েকশ ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং সাত কোটিরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে, যা এটিকে সর্বকালের সর্বোচ্চ বিক্রিত বইগুলোর একটিতে পরিণত করেছে।
এবার আসুন বইটি পড়ার আগে অনুবাদক মুসা আলির বইটি সম্পর্কে পাঠককে কী জানাচ্ছেন, তা পড়ে আসি—
‘স্বপ্ন মানুষের জীবনে প্রধানতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পেরেছে কিনা, তা নিয়ে আজও সঠিক মিমাংসাসূত্রে আসা সম্ভব হয়নি। অনুষঙ্গটি যে কোটি টাকা প্রশ্নের সমতুল্য, তাতে অবশ্য কোনো সংশয় নেই। সেই স্বপ্নের দোল দ্য আলকেমিস্ট উপন্যাসের মূল চরিত্র সান্তিয়াগোর মধ্যে নতুন দ্যোতনা তৈরি করে দিতে পেরেছিল। ফলশ্রুতিও হয়েছিল মনে রাখার মতো। শেষ পর্যন্ত মেরু পরিবর্তন করতে করতে সে অভিনব দোটানার মুখোমুখি হতে বাধ্য হয়েছিল।
স্বপ্নে উদ্দীপ্ত হওয়ার পূর্বে সান্তিয়াগো ভেড়ার উপর যে বিশ্বাস গড়ে তুলতে পেরেছিল, তা মানুষে মানুষে বিশ্বাসের সীমান্ত ছাপিয়ে বাড়তে বাড়তে সাগরের তলদেশসদৃশ্য হয়ে উঠেছিল, যদিও তা ছিল স্বপ্নে দেখা অভিনব প্রাপ্তির তুলনায় কিছুই নয়। সেই বাস্তব দ্বন্দ্বকে সান্তিয়াগো কিছুতেই অস্বীকার করতে পারেনি। দ্বান্দ্বিকতা সব সময় মানুষকে নতুন করে অন্বেষণমুখী করে তোলে। সেই শর্ত সাদরে গ্রহণ করে সান্তিয়াগো নিজের পালিত ভেড়ার পাল বিক্রি করে নিজস্ব স্বপ্নকে সার্থক করে তুলতে পথে নেমেছিল। বোধ হয় সেই মুহূর্তে মনে করতে পারেনি একটি বিখ্যাত গানের প্রথম ছত্রটি—‘পথ হারাবো বলেই আমি পথে নেমেছি।’
জীবনে সাফল্য লাভের পথ যে আদৌ মসৃণ নয়, তাতেও সান্তিয়াগো এতটুকু বিচলিত হতে পারেনি। তাই বোধ হয় তাকে পিছনে তাকিয়ে অনুকূল ভাবনায় একবারও ধস্ত হতে দেখা যায়নি। বরং ভেবেছিল, চলার পথ দুর্গম হলেও তার পক্ষে সাফল্য লাভ করা সম্ভব। তাকে মিশরে পৌঁছাতেই হবে স্বপ্নে আদিষ্ট গুপ্তধন লাভ করতে।
সেই পর্বে তার পক্ষে সম্ভব হয়েছে এক বৃদ্ধের সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভ করা যিনি নিজেকে সালেমের রাজা হিসাবে পরিচয় দিয়েছেন। সান্তিয়াগো তখন এক অভিনব উদ্দীপনার মুখোমুখি। সেই উদ্দামতা, প্রতিকূলতা জয় করে সামনে চলার দৃঢ়প্রতিজ্ঞা আর সালেমের জীবন প্রবাহের আদলে নিজেকে চিহ্নিত করার দ্বান্দ্বিক পর্বে সান্তিয়াগো Aristotle কথিত Character is the man হয়ে উঠতে চেয়েছে।
অসংখ্য শাখাগ্রশাখা আর সবুজ পত্র-কুঞ্জের বাহার নিয়ে একটি ক্রমবর্ধমান বটবৃক্ষ এক সময় যেমন করে নিজেকে মহীরুহ করে তোলে, সান্তিয়াগো সেই অর্থে তখন অনুরূপ মানসিক অনুষঙ্গ ছুঁয়ে ফেলতে বদ্ধপরিকর। সত্যি সত্যি এক তুঙ্গ অবস্থান যা তাকে লাভ করতেই হবে। ঠিক তখনই তাকে প্রতারণার শিকার হয়ে সর্বস্ব খুইয়ে ফেলতে হয়। এমনি পকেটশূন্য হয়েও অবদমিত ইচ্ছা নিয়ে সান্তিয়াগো একটি স্ফটিক দোকানে কাজ নিয়েছিল। সেখানে নিজস্ব বুদ্ধিমত্তার জোরে শুধুমাত্র সে দোকানদারকে উপকৃত করেনি, নিজের স্বপ্নপূরণকে সার্থক করে তুলতে প্রয়োজনীয় অর্থ সঞ্চয় করতেও সমর্থ হয়েছিল।
পরবর্তী পর্বে ক্যারাভ্যানে সান্তিয়াগো দুর্গম সাহারা মরুভূমির যাত্রী। স্থানে স্থানে মরুদ্যানের প্রাকৃতিক হাতছানির মধ্যে ফাতিমার সান্নিধ্য লাভ করার মাধ্যমে ভালোবাসার যে উপলব্ধি ঘটেছিল তার মধ্যে, তাতে ছিল স্বপ্ন বনাম ভালোবাসার দ্বান্দ্বিকতা। যোগ বিয়োগ গুণ ভাগের নিরিখ দেখিয়ে ফাতিমা জানিয়ে দিয়েছিল, ভালোবাসা কখনো দূরের স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না বরং তা সার্থক পরিপূরক শক্তি হয়ে দেখা দেয়।
ফলত সান্তিয়াগো যখন এমনি অবিস্মরণীয় মগ্নতার মুখোমুখি, ঠিক তখন সে এমন একজন আলকেমিস্ট এর সন্ধান পেয়েছিল যিনি লোহাকে সোনার রূপান্তরিত করতে পারেন। সেই জাদুতে উদ্দীপ্ত সান্তিয়াগো আবার নতুন করে নিজেকে পাল্টাতে শুরু করেছিল। আলকেমিস্ট পারলে তার পক্ষেও পারা সম্ভব। স্বপ্নপূরণের পথে তা ছিল অভিনব বিস্ময়কর উন্মাদনা।
তাতেই সান্তিয়াগো সমুদ্রের গভীর তলদেশসদৃশ্য স্বপ্ন সঙ্গে নিয়ে পিরামিডের দেশে পৌঁছাতে পারলেও শেষ পর্যন্ত কঠোর বাস্তবে গুপ্তধন লাভ করতে পারল না কেন? কেন তার জীবনে গুপ্তধন প্রাপ্তির তুলনায় ভালোবাসা প্রাপ্তি অধিকতর শ্রেয় মনে হলো? একেবারে কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রশ্ন।
এ উপন্যাসের শেষ বাক্যে সান্তিয়াগো কেন বলল, ‘আমি আসছি ফাতিমা’? তাহলে তার জীবনে প্রকৃত গুপ্তধন কোনটি এবং কেন? তা কীভাবে কঠোর বাস্তবে লাভ করা সম্ভব? সেই প্রশ্নের কারুশিল্পের শেষ উপলব্ধিতে সান্তিয়াগো মৌলিক অর্থে character is the man হয়ে পাঠকের বুকের গভীরে চিরচিহ্নিত দিকদর্শন হয়ে উঠতে পেরেছে। কেবলমাত্র সেই কারণে এ উপন্যাস পড়তে পড়তে পরতে পরতে যে কেউ মগ্ন পাঠক না হয়ে পারবেন না, জীবনের স্বপ্নবিশ্লেষক হিসেবে নিজেকে খুঁজে পেতে পারেন।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সান্তিয়াগো, যে আন্দালুসিয়ার এক মেষপালক বালক। তার জীবনের লক্ষ্য ছিল গুপ্তধনের সন্ধানে মিশরের পিরামিড পর্যন্ত পৌঁছানো। কিন্তু এই আপাত সরল যাত্রাপথটি কি আসলেই কেবল ধন-সম্পদ পাওয়ার গল্প? না, পাঠক যখন বইটি পড়তে শুরু করে, সে খুব দ্রুত বুঝতে পারে—এটি আসলে মানুষের মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা এক চিরন্তন স্বপ্নের কথা।
সান্তিয়াগোর মেষপালক জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় আরামদায়ক বলয়ের (Comfort Zone) কথা, যা ছেড়ে বেরিয়ে আসার ভয় আমাদের সবারই আছে। কিন্তু মরুভূমির সেই বিশাল রিক্ততা আর উত্তপ্ত বালু যেন সান্তিয়াগোর জীবনের আয়না। পথে তার দেখা হওয়া রাজা মেলকিজেদেক বা আলকেমিস্টের সাথে কথোপকথনগুলো আসলে আমাদের নিজেদের ভেতরের কণ্ঠস্বরের বহিঃপ্রকাশ। এই গল্পের প্রতিটি বাঁক আমাদের শেখায় যে, ‘পার্সোনাল লিজেন্ড’ বা নিজের ব্যক্তিগত লক্ষ্য খুঁজে পাওয়ার চেয়ে বড় কোনো সার্থকতা মানুষের জীবনে নেই।
যখন সান্তিয়াগো বুঝতে পারে যে, তার কাঙ্ক্ষিত গুপ্তধন আসলে সেই একই জায়গায় লুকানো ছিল যেখান থেকে সে তার যাত্রা শুরু করেছিল, তখন একজন পাঠক হিসেবে আমি কেঁপে উঠেছি। এটিই হলো বইটির সবচেয়ে বড় দর্শন—আমরা যা খুঁজি, তা আমাদের কাছেই থাকে, শুধু তার জন্য প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা, কষ্ট এবং দূরপাল্লার ভ্রমণের প্রয়োজন হয়। বইটিতে কোয়েলহো বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন, আমরা যা হৃদয় থেকে সত্যিই চাই বা কামনা করি, পুরো মহাবিশ্ব আমাদের তা অর্জনে সাহায্য করে। সেই ব্যক্তিই সত্যিকার অর্থে জীবিত, যে তার স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য সাহসের সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছে। মরুভূমির কঠোরতা, আলকেমিস্টের জ্ঞান এবং প্রকৃতির সঙ্গে মেষপালক বালকের যে কথোপকথন—সবই রূপক অর্থে আমাদের জীবনেরই প্রতিফলন। বইটি পড়ে আমি উপলব্ধি করেছি যে, ব্যর্থতা বা হারিয়ে যাওয়া কোনো ক্ষতি নয়, বরং তা লক্ষ্যে পৌঁছানোর এক অপরিহার্য ধাপ মাত্র।
অনুবাদক মুসা আলি এই বইটির অনুবাদের ক্ষেত্রে ‘পাঠমুগ্ধতা’কে প্রাধান্য দিয়েছেন, যার ফলে মূল বইয়ের দার্শনিক গভীরতা বাংলাভাষী পাঠকদের কাছে অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে ধরা দিয়েছে। অন্যদিকে, স্বপ্ন ‘৭১ প্রকাশন সবসময়ই নান্দনিকতার পরিচয় দেয়। চমৎকার কাগজ, ছাপা এবং বাঁধাইয়ের পাশাপাশি তুলি ভাইয়ের প্রচ্ছদ বরাবরের মতোই শিল্পিত। প্রচ্ছদটি বইয়ের বিষয়বস্তু ও মেজাজের সাথে একাত্ম হয়ে এক অনন্য শিল্পরূপ পেয়েছে।
পাঠক হিসেবে আমারও পূর্বমুগ্ধতা ছিল পাওলো কোয়েলহোর প্রতি, তাঁর ‘আক্রায় পাওয়া পান্ডুলিপি’ বইটাও আমাকে অনেক বেশি মুগ্ধ করেছিল। আলকেমিস্ট বইটি পড়া মানে নিজের জীবনের খাতাটি নতুন করে খুলে দেখা। যারা এখনও ‘দ্য আলকেমিস্ট’ বইটি পড়েননি, আমি বলবো—আপনার আত্মার খোরাক জোগাতে বইটি পড়া জরুরি।
মাসুম বিল্লাহ : ইনসাইট কন্ট্রিবিউটর, বইচারিতা
শিরোনাম : দ্য আলকেমিস্ট
লেখক : পাওলো কোয়েলহো
অনুবাদক : মুসা আলি
প্রচ্ছদ : নিয়াজ চৌধুরী তুলি
প্রথম প্রকাশ : ২০২৬
বইয়ের ধরণ : উপন্যাস
প্রকাশনী : স্বপ্ন ‘৭১ প্রকাশন
পৃষ্ঠা : ১৮৪
মূল্য : ৩৫০ টাকা
