দ্য কনফেশন


ঘটনাটা ঘটেছিল আবুল মন্সুর রোডে-উদীচীর বাম পাশে যে কদমগাছ, তার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা, বিরাট দ্বিতল লাল রঙের রমিজ জোয়ার্দারের বাড়িতে। রমিজ দম্পতির দুজনেই এখন আর বেঁচে নেই। এবং তাঁদের পাঁচ ছেলেমেয়েরা কোনো কোনো বছর  ঈদে এ বাড়িতে আসে। বড় ছেলে আমেরিকায়। সেই কদিন আগে দেশে আসায় জনশূন্য নিস্তব্ধ বাড়ি সাফ সুতোর করে এখন পুরোই গমগমে।

এই পরিষ্কার করার কাজটি বরাবর করে রাবেয়ার মা। একসময় এই বাড়িরই গৃহকর্মী ছিল সে। বাড়ির ছেলেমেয়েরা অনেকটা তার কোলেই মানুষ। এখন এরা আসলে, খবর দিলে সে আসে।

বাড়িটার স্থাপত্যে অনেকটা পুরোনো দিনের জমিদার বাড়ির ধাঁচ। দোতলার বারান্দার ওপরদিকে নকশাকাটা  গ্রিল আর নিচে সুড়কির তৈরি নানা ছোট ছোট মূর্তির মুখ। সেই মূর্তির ফাঁকে জমে থাকা ঝুল মুছতে মুছতে রাবেয়ার মা বলতে থাকে, “কি সংসার কি হলো! স্যার বাঁচে থাকতি দিনে কত পাতে পড়তো এই বাড়িতি-এখন ঝুল ফেলতি হচ্ছে। খুব ভালো মানুষ ছিল তুমার বাপ।”

ডাইনিং টেবিলে সকালের খাওয়া শেষ করে তিন বোন চা হাতে গল্পে মত্ত। ভবনের দু’পাশে দুটি প্রহরীর মতো কাঁঠালি চাপা। সামনে ইটের রাস্তা আর দু’দিকে জবা, গোলাপ, করমচা লেবু নানা ফুল ফলের ঝোপ। তাদের গা ঘেঁষে দুপাশের দেওয়াল বেয়ে দাঁড়িয়ে কিছু নারিকেল সুপারি গাছ আর সামনেই মস্ত লোহার ফটক। ফটকের পরেই শহরের ব্যস্ত রাস্তা দেখা যায়। দোতালার বারান্দা থেকে যা স্পষ্ট দেখা যায়। সেদিকে তাকিয়ে, তিন বোন রাবেয়ার কথায় মাঝে মাঝে সম্মতি সূচক হু হাও করছিল।  ছোট মেয়ে সীমা বলল, “খালা, এখানে কালকের কেক আছে, তুমি নিয়ে যেও।”

রাবেয়ার মা হালকা হেসে মাথার আঁচলটা টেনে বলে, “রাখো নিবানী। কত কিছু দিত তুমার মা! আমার না দিয়ে কোনোদিন কিছু খায়নি। এত অল্প বয়সি চলে গেল! সব ভাইগ্য গো।”


এদিকে সকালের খাওয়া শেষে সূর্যের তেজ একটু বাড়তেই বাচ্চাদের আস্তানা পেছনের বাগান। মাটি খুঁড়ে একদল মার্বেল পুঁতে রাখছে, আর অন্যদলের কাজ সেটি খুঁজে বের করা। এই খেলাটা তারা শিখেছে রাবেয়ার মা’র নাতির কাছে। বাচ্চাদের দেখার দায়িত্ব মায়ার, মায়া মেজো মেয়ে লিমার হেল্পিং হ্যান্ড। অন্য বোনেরাও নিজেদের সঙ্গে করে হেল্পিং হ্যান্ড আর ড্রাইভার এনেছে।

মায়া একটু দূরে, বাতাবি লেবুর গাছের কাছে দাঁড়িয়ে। এ বাড়ির গাছের ডালপালা পত্রপল্লব ছাটা হয়না বহুদিন, তাই পাশের বাড়ির দিকেও হেলে পড়েছে অনেকটাই। সেই পাতার ফাঁক দিয়েই কোন একটা মুখ তাকিয়ে আছে মায়ার দিকে।

মায়ার চোখ খয়েরি। নতুন যৌবন পাওয়া যে কোনো বৃক্ষের মতোই বাড়ন্ত সতেরো-আঠারো বছরের শ্যামবর্ণ শরীর। সামনের দাঁত দুটো একটু উঁচু। সেই দাঁতের কিছুটা প্রায়ই দৃশ্যমান হচ্ছে কারণ মায়া কিছুক্ষণ পরপরই মুখ চেপে চেপে শব্দহীন হাসছে। বোঝা যাচ্ছে দেওয়ালের ওপারের মানুষটার সঙ্গে তার সম্পর্ক সহজ, আন্তরিক। ওপারের মানুষটার নাম রঞ্জু। বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ হবে। শুকনো, লম্বা, একটু উস্কোখুস্কো এলেমেলো কোকড়া চুলের রুক্ষ চেহারা-দেখলেই মনে হয় হ্যাঙ্গারে ঝোলানো একটা শরীর।

একসময় রঞ্জুর দাদার অবস্থা ভালোই ছিল। তবে সবাই বলে, তার বাবা ছিল নেশাখোর-অকালেই মারা যায়। বেঁচে থাকতে যা ছিল সব বেচে খেয়েছে। এখন ছেলেগুলো- রঞ্জুর ভাইয়েরা চুরি-চামারি, ছিনতাই করে খায়। তবে এই বাড়িটার একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে-এক পাশের দেওয়ালের মাঝখানে আধখানা কুয়া। বাকি অর্ধেকটা পড়েছে পাশের শরিকের বাড়িতে, যেটা এখন তিনতলা। কুয়ার পানি তোলার সময় ছাড়া দুই বাড়ির মধ্যে আর কোনো যোগাযোগ নেই। রাস্তায় দেখা হলে হয়তো শুধু-“ভালো আছো?”-এই পর্যন্তই। রঞ্জুর বাবা নেশাখোর হলেও তার বড় চাচা ছিল প্রফেসর; তাঁর ছেলেমেয়েরাও দেশে-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। তারাই পুরোনো বাড়ি ভেঙে নতুন তিনতলা তুললেও কুয়াটা রেখে দিয়েছে। হয়তো তাদের সম্মানের কারণেই এতো অপকর্মের পরেও রঞ্জুদের দিকে এই পাড়ায় কেউ সহজে আঙুল তোলে না। রঞ্জুরাও যাই করুক নিজেদের পাড়ার ভেতরে কিছু করে না।

বাতাবি লেবুর পাতার ফাঁকে রোদের লুকোচুরির মতো রঞ্জু আর মায়ার লুকোচুরি খেলা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। কারণ ঠিক তখনই ভেতর বাড়ি থেকে ভেসে এল এক গগনবিদারী চিৎকার-“মায়া”।

৩.
সকাল থেকেই ছোট মেয়ে সীমা বলছিল-তার ঘড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। যে ভাই আমেরিকা থেকে এসেছে, সেই এনেছিল ঘড়িটা। ভাই বিরক্ত হয়ে বলল, “এবার থেকে আর কিছুই আনবো না, একটা জিনিস তোরা যত্ন করে রাখিস না!”

সীমা প্রায় কেঁদে ওঠার ভঙ্গিতে, “ভাইজান, বিশ্বাস করো, আব্বার ঘরের ড্রেসিং টেবিলেই রেখেছিলাম!”

রিমা কিছুটা বিদ্রুপ করলো, “তাহলে হারালো কি করে? ওটার পা গজালো?”

“আপা, কতবার বলবো? ওখানেই রেখেছিলাম। আমার স্পষ্ট মনে আছে।”

“আচ্ছা, গতকাল থেকে কারা কারা এসেছিল? কে নেবে তোর ঘড়ি?”

সীমা কাগজ-কলম নিয়ে তালিকা করতে বসল, কিন্তু এরা তো সবাই পরিচিত, সম্মানী, স্বচ্ছল মানুষ। কারো তো কিছু নেওয়ার কথা না।

“আপা, কাজের লোক ছাড়া তো সন্দেহ করার কাউকে পাচ্ছি না।”

লিমা এতক্ষণ চুপচাপ শুয়ে চ্যানেল বদলাচ্ছিল। সেখান থেকে চোখ না তুলেই বলল,
“এত কাজের লোক আর ড্রাইভার কে নিয়েছে বুঝবি কীভাবে?”

রিমার যুক্তি- “ড্রাইভাররা তো ভেতরে আসে না। নিলে কাজের লোকেরাই নিয়েছে।”

আমেরিকায় থাকা বড় ভাবী খুব সেও তার নিশ্চিন্ত মতামত দিলো। —“প্রিটি সিওর, এদের মধ্যেই কেউ নিয়েছে। বলে না-অভাবে স্বভাব নষ্ট।”

রিমার মাথায় কি যেন একটা খেলল। এক মুহুর্ত চোখটা কিছুটা কুঁচকে সে জানাল— 

“আমার কিন্তু একজনকে সন্দেহ হচ্ছে-মায়া’কে। মায়ার যে ঐ চোর রঞ্জুর সঙ্গে সম্পর্ক আছে—এটা তো রাবেয়ার মা খালা আগেই বলেছে। সে নাকি নিজে চোখে দেখেছে বাগানের ভেতরে জাপটা জাপটি করতে।”

লিমা একটু বিরক্ত গলায়—“আরে প্রেম করা ওই ছুড়ির স্বভাব। আমার বাসার ছাদে যখন মিস্ত্রিরা কাজ করে, কাপড় আনতে গেলে মায়া হাওয়া হয়ে যায়-ডাকাডাকি করে আনতে হয়। তবে মায়া কাজ ভালো করে, অনেকদিন ধরে আছে-কখনো তো কিছু নেয়নি।”
“আপা, আমার মনে হয় রঞ্জুই ওকে এক্সপ্লয়ট করেছে। ছ্যাড়া তো লম্বা-চওড়া-ওই দেখে পটেছে মনে হয়। তুমি নিশ্চিত থাকো, মায়া চুরি করে রঞ্জুকে ঘড়িটা দিয়েছে।”

প্রথমে অন্য কাজের লোকদের ডাকা হলো। তারা সকলেই জানালো নেয়নি। রাবেয়ার মা এসে অকপট জবাব দেয়, “আমি একদিন দেখেছি-মায়া বাগানের ভেতর থেকে দেয়ালের ওপার দিয়ে রঞ্জুকে কিছু একটা দিচ্ছিল। তোমার মা বেঁচে থাকতে এই বাড়ি থেকে কেউ একটা কুটো সরানোর সাহস পায় নাই গো।”

লিমা এবার মায়াকে ডাকতে বলল।

৪.
মায়া ঘরে ঢুকে সিঁড়ির কাছে হাতল ধরে নত মুখে দাঁড়িয়ে। তার পরনে আকাশী মলিন সালোয়ার কামিজ। অবিন্যস্ত চুলে বাতাবী লেবুর একটা ফুল এসে মিশেছে। রিমা গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করল,
“মায়া, তুই কি ঘড়ি নিয়েছিস?”

মায়া বড় বড় ভয়ার্ত চোখে কিছুটা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, “আল্লাহর কিরে-আমি নেই নাই আম্মা।”

“তুই-ই নিছিস”! বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো রিমা। কথা কেমন করে আদায় করতে হয় জানিস না ভেবেছিস”-এই বলে চিৎকার করে এগিয়ে এসে অকস্মাৎ চুলের মুঠি ধরে সিঁড়ির রেলিংয়ে মাথা ঠুকে দিল।

রিমা নিজে গৃহিণী হলেও তার স্বামী পুলিশের আইজি-তাই তার ধারণা, রিমান্ডে জেরা করার মতো দক্ষতা এই বাড়িতে তার চেয়ে বেশি কারো নেই।

মুহূর্তেই যেন কপালের খানিকটা ফুলে গেলো। মত মুখে চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে।
“আম্মা, আমি নেই নাই… আমি নেই নাই…”

সীমার কথা,
“আপা, ওর ব্রেসিয়ারের ভেতর হাত দাও। হারামজাদিরা সব লুকায় ওইখানে।”

রিমা তল্লাশি চালিয়েও কিছু পেল না। সিঁড়ির নিচে চালের বস্তা রাখা, সেখানে কাজের লোকদের ব্যাগও ছিল। মায়ার সব জিনিসপত্র তন্নতন্ন করে খোঁজা হলো। সেই সাথে অন্য কাজের লোকদেরটাও তল্লাশি চলছে।

কোথাও কিছু না পেয়ে, হঠাৎ রিমা চুলের মুঠি ধরে মায়ার মাথাটা ঘুরিয়ে মেঝেতে আছড়ে মারল।
“মেরে ফেলব তোকে আজ! কতক্ষণ স্বীকার করবি না?”

ওপরে ফ্যান চলছে, তবু রিমা ঘামে ভিজে গেছে। রাবেয়ার মা এতক্ষণ ছড়িয়ে থাকা তল্লাশির জিনিসপত্র গোছাচ্ছিল। সে একটা হাত পাখা এনে রীমাকে বাতাস করা শুরু করলো। 

মায়া রীমার পা জড়িয়ে ধরে একই কথা, বার বার বলে যাচ্ছে-“আমি নেই নাই।”
আর তার এই একঘেয়ে উত্তরটাই যেন আরও ক্ষিপ্ত করে ফুঁসিয়ে তুলছে রিমাকে ফুটন্ত তেলের কড়াইয়ে সদ্য ফেলা পুরির মতো।

একসময় মায়া যেন অনেকটাই নিশ্চুপ নিস্তেজ।

“কথা বলছিস না কেন?”-রিমার গলায় অন্তিম ক্রোধ।
কারণ এতো প্রচেষ্টার পর কথা না বললে আজ তোর দাম কোথায় থাকে!

সীমা একবার থামাতে চাইল,
“আপা, ছাড়ো-অনেক হয়েছে। মরে যাবে তো!”

রিমা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে,
“এদের কৈ মাছের প্রাণ! ছোটলোকগুলো চুরি করবে, আবার এও জানে যে-মারধর করেই ছেড়ে দেবে। তাই এদের স্বভাবটাই না খারাপ হয়ে গেছে।”

হাতটা বাড়িয়ে কাছে থাকা দরজার হুড়কো দিয়ে মারতে শুরু করল সে।
“বল! কতক্ষণ বলবি না?”

মায়া “ও বাবা, বাবা” বলতে বলতে মুক্তির জন্য কাটা মুরগীর মতো ছটফট করছিল। কিন্তু কোথায় যাবে? চারদিক থেকে তাকে ঘিরে রেখেছে শত্রুরা। এই বেষ্টনী ভেঙে কি সে কখনো পৌঁছাতে পারবে তার ভালোবাসার মানুষ রঞ্জুর কাছে?

মায়া তার সর্বশক্তি দিয়ে শেষ চিৎকারটি যেন দিতে থাকে। রঞ্জু কি শুনতে পাচ্ছে? সে কি আসবে না তাকে বাচাতে?

“শেষবার বলছি-স্বীকার কর!”

কপাল নাক বেয়ে রক্ত পড়তে শুরু করেছে। এই সময় কেউ গরম পানি এনে ঢেলে দিল মায়ার গায়ে। মায়া এবার আর্তচিৎকার করে স্বীকারোক্তি দিলো-
“আমি নিছি আম্মা! আমি নিছি!”

“কোথায় রাখছিস?”

“জানি না… আম্মা, জানি না…”

পিঠে গরম পানি পড়েছে- প্রচণ্ড জ্বলুনী, কেউ যেন বিচুটি পাতা ঘষে ঘষে চামড়া  খুলে নিচ্ছে তার।
রিমা এক চড় মেরে বলল,
“জানিস না কেন? রঞ্জুকে দিয়েছিস?”

মায়ার দৃঢ় স্পষ্ট উত্তর,
“হ… রঞ্জুকে দিছি…”

এরপরই জ্ঞান হারাল সে।

ইশারা পেয়ে একজন কাজের লোক এসে রক্তাক্ত মায়াকে ভেতরে নিয়ে গেল।

রিমা কিছুটা প্রসন্ন গলায়—
“আমি আগেই বলেছিলাম-এই মেয়েটাই নিয়েছে।”

৫,

মোজাফফরের দোকানে তখন রেডিওতে গান বাজছে। রঞ্জু পা দোলাতে দোলাতে আড্ডা দিচ্ছিল। তাকে ডেকে পাঠানো হয়েছে সীমাদের বাড়িতে। চা-নাস্তাও দেওয়া হয়েছে

রঞ্জু মনে মনে ভাবছে-তাকে কেন ডাকা হয়েছে? কিছুটা আন্দাজ করার চেষ্টা করল-মায়ার ব্যাপারেই নিশ্চয়। সে নিজের মতো করে হিসাব কষতে কষতে মনে মনে ভাবছে—
“আবার পেট বাঁধিয়েছে নাকি?”
কিন্তু এত তাড়াতাড়ি বোঝা যায়? বিলকিসের ক্ষেত্রে তো কয়েক মাস লেগেছিল!

বিস্কুট চায়ে ডুবাতে ডুবাতে সে ঠিক করল-সব অস্বীকার করবে।

বড় ঘরে সবাই যখন জড়ো হলো-গম্ভীর মুখ, ভারী পরিবেশ।

রিমা ধীরে ধীরে বলল, “দেখ রঞ্জু, তুই আমাদের চোখের সামনে বড় হয়েছিস। অনেক স্নেহ করি তোকে।”

রঞ্জুর ঠোঁটে কিছুটা বিদ্রুপের হাসি। তবু সে শান্ত থাকে।

“তোকে আমরা কোন বিষয়ে বিব্রত করতে চাইনি। তবুও ডাকতে হলো। আশা করি তুই আমাদের সহযোগিতা করবি।”

রঞ্জু চুপ করে শুনছে। তবে মনে মনে সে অতিশয় অধৈর্য হয়ে উঠেছে তার ইচ্ছে করছিল, একটা উচিৎ শিক্ষা সে রিমাকে দেয়। কিন্তু নিজ পাড়ায় রঞ্জু কিছু করে না।

“তোকে বিব্রত করতে চাইনি, কিন্তু উপায় ছিল না। ”

রঞ্জু আর ধৈর্য রাখতে পারল না-
“ফুপু, কি বলবেন বলেন-আমার যেতে হবে।”

“মায়া তোকে যে ঘড়িটা দিয়েছে, সেটা দিয়ে দে।”

“কি বলছেন ফুপু? কিসের ঘড়ি?”

“নাটক করিস না। তোর সব আমরা জানি। এইটা তোর চাচা আমেরিকা থেকে এনেছে। অনেক শখের ঘড়ি রঞ্জু।”

রঞ্জুর চোখে আগুন জ্বলে উঠল।
“আমাকে কেউ কোনো ঘড়ি দেয়নি।”

“মায়া নিজে বলেছে।”

রঞ্জু থমকে গেল। সে চুরি করে-এটা সে জানে। কিন্তু এই চুরি সে করেনি। আর মায়া! সে কি সত্যিই দোষটা তার ঘাড়ে চাপিয়েছে? অথচ মেয়েটাকে কি নিস্পাপ আর সরল ভেবেছিল সে!

কিছুক্ষণ তর্কের পর রঞ্জু হাতে তুড়ি বাজিয়ে ইশারা দেয়, “মায়াকে ডাকেন।”

মায়া এসে কোনরকম দাঁড়াতেই রঞ্জু এক লাথি মারল। যে পেটে একদিন সন্তান হবে বলে মায়াকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল—আঘাতটা সেই পেটেই প্রথমে দিল! মায়া মুহূর্তেই শরীর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মেঝেতে পড়ে প্রস্রাব করে দিলো। রঞ্জু কয়েকটা লাথি মারল মায়ার পিঠে। পুরোনো দিনের লাল মেঝে ধীরে ধীরে আরও লাল হয়ে উঠছে। গলায় পা রেখে বলল,  “হারামি, ঘড়ি কই রাখছিস?”

মায়ার কোন সাড়া নেই।

“এই চুন্নি”।

এবারও সাড়া নেই। মেঝেতে নিথর পড়ে আছে মায়া। এই সময় ভেতর বাড়ি থেকে সীমাকে কেউ এসে বলল, ছোট আম্মা আপনার বান্ধবী রিভা এসেছে। সীমা বাইরের ঘরে বসাতে ইশারা করে রিভার সাথে কথা বলতে বেরিয়ে গেল। 

রিভা বসে আছে সোফায়। ওর পাশে রাখা হ্যান্ডব্যাগ থেকে কিছু বের করছে। সীমাকে দেখে—

“কিরে কেমন আছিস? আপারা সব কই?”

“আছে ভেতরে? তুই এসেছিস ভাল হয়েছে, যাবার আগে আবার দেখা হলো।”

“সে কারণেই তো আসলাম আর তুই সেদিন আমাদের বাড়িতে গিয়েছিলি না? ওজু করতে যেয়ে বাথরুমে রেখে এসেছিলি ঘড়িটা। নে ধর।” 

ঘড়িটা পেয়ে সীমা আনন্দিত হবার বদলে বরং যেন কিছুটা স্তব্ধ। ভেতর বাড়ি থেকে তখনও ভেসে আসছে রঞ্জুর ক্ষীণ চিৎকার- “এই চুন্নি, কথা বল, এই চুন্নি। ঘড়ি কই রাখছিস?”

লেখক : জান্নাতুন নাহার তন্দ্রা

আরও পড়ুন