কানফুলের করুণ গান : শহুরে অসভ্যতার গল্প

হরেদরে লেখেন না হুমায়ুন কবির। পরিমিতি-বোধ ও চিন্তন-পরিসরের কারণে তার লেখা হয়ে ওঠে সার্থক রচনার উদাহরণ। কলম কথা বলে, সৃষ্ট চরিত্ররা ঘুরে বেড়ায় চোখের সামনে। তাঁর প্রকাশিত সর্বশেষ উপন্যাস কানফুলকানফুল না হলে বইটার নাম হতে পারত ভাড়াটিয়া। উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত বিধৃত হয়েছে নিম্ম বিত্ত একটা পরিবারের মর্মযাতনা। ভাগ্যান্বেষণে নোয়াখালী অঞ্চল থেকে আসা এক দম্পতি কীভাবে এই নির্মম-নিষ্ঠুর ঢাকা শহরে ‘টিকে’ থাকে-সেটাই বিধৃত হয়েছে ছত্রে ছত্রে। আদতে টিকে থাকে তারা? এটাকে বেঁচে থাকা বলে না, জীবন বলে না। কতজনই তো মানুষের চেহারা ধারণ করে থাকে, আদতেই কি মানুষ তারা! কতজন পারে মানুষ হিসেবে নিজেকে বিকশিত করতে, মানবরতন পরিচয় সমুন্নত রাখতে?

অত্যন্ত জীবনঘনিষ্ঠ এই উপন্যাস যত সামনের দিকে ধাবিত হয়েছে, পাঠক হিসেবে শিউরে উঠেছি। চরিত্রদের জীবনপ্রক্রিয়া দেখে রক্তক্ষরণ হয়েছে মনে। লেখক কীভাবে পারলেন পাষারের মতো এমন নিষ্ঠুর-নির্দয় বর্ণনা দিতে! মানুষের কষ্ট যাতনা লাঞ্ছনার কি শেষ থাকতে নেই? যেন অনিঃশেষ ধারাবাহিকতায় লেখক নির্মোহ ভাষ্যকার হয়ে দৃশ্যমালা রচনা করে গেছেন। এতই নির্বিকার তিনি, যেন কিছুতেই কিছু যায়-আসে না! দুঃখ-কষ্ট ও গ্লানিতে আঁচড় কাটে না।

উপন্যাসের নায়ক জিন্নত আলী কাজ করে একটা কনস্ট্রাকশন ফার্মে। দুর্নীতির দায়ে তার চাকরি চলে যায়। জেলখানায় থাকতে হয় কিছুদিন। কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে অনেক দৌড়ঝাঁপের পর তার চাকরি হয় ‘স্বপ্নপূরণ’ নামক একটা কোম্পানিতে। কিন্তু এই চাকরি দুঃস্বপ্ন হয়ে আসতে বেশি সময় লাগে না। জায়গা-জমিতে ঝামেলা থাকায় কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি একসময় স্বাভাবিক হবে ভেবে জিন্নত আলী আশায় আশায় থাকে। সেটা আর হয় না। এদিকে জীবন দুর্বিসহ হয়ে ওঠে। পাথরে-কাঁটায় হোঁচট খায়।

বাসা ভাড়া বাকি পড়তে থাকে। অর্থপিশাচ বাড়িওয়ালার ভ্রুকুটি দেখতে হয় দিন-রাত। জিন্নত আলীর স্ত্রী সাহিদাসহ এই পরিবারের সদস্য সংখ্যা পাঁচজন। তিন সন্তান- অপু, নবু ও চায়না। প্রথমবার বাড়ি ছাড়ার নোটিস পাওয়ার পরও যখন ভাড়া পরিশোধে ব্যর্থ হয়, তাদের খাট রেখে দেয় বাড়িওয়ালা। স্কুল-কলেজের খরচ ঠিকমতো চালাতে না পারায় বড় দুই ছেলেই উচ্ছন্নে যায়। বাড়িওয়ালা কর্তৃক বাবা-মায়ের অসম্মান দেখে মনুষ্যত্ব ফেরে তাদের। সিদ্ধান্ত নেয় বাবা-মায়ের গলগ্রহ হয়ে আর থাকবে না। নিজেরা কিছু একটা করবে। বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিদায় নেয় অপু-নবু। এরপর দীর্ঘসময় তাদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না। এসময় সাহিদার চিরায়ত মাতৃরূপ সামনে আসে। জিন্নত আলী বুকে পাথর বেঁধে ভুলে থাকতে পারলেও সাহিদার আহজারি থামে না। এই ফাঁকে তাদের কয়েকটা বাসা বদলাতে হয়। সমস্যা একটাই- সময়মতো ভাড়া পরিশোধ করতে না পারার কারণে চক্ষুশূল হওয়া।

ছেলেরা দূরে থাকলেও তারা বাবা-মায়ের খোঁজ পেত। তাদের কর্মক্ষেত্রে একজন লোক ছিল যে সাহিদা-জিন্নত আলীর খোঁজ দিত। বাবা-মায়ের জন্য তারা কিছু করতে পারেনি সত্য, কিন্তু গভীর তাড়না বোধ করি। জেগে ওঠে তাদের দায়িত্বশীল মন। এই দায়িত্বশীবোধ থেকেই বরাবরই বাসার বাইরে থাকত তারা, বাবা-মায়ের বোঝা বাড়ায়নি। কিন্তু অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ থাকে না। জিন্নত-সাহিদা দম্পতিরও দুঃখ ঘোচে না। সর্বশেষ বাড়িওয়ালা শর্ত দেয় ভাড়া দিতে না পারলে সাহিদার কানফুলটা গচ্ছিত রেখে যাওয়ার জন্য। সাহিদা কানফুলটা রেখেছিল মেয়ে চায়নার বিয়েতে দেবে বলে। এই অপ্রত্যাশিত আঘাতে মুষড়ে পড়ে সে। শেষপর্যন্ত ঠিকই কানফুল জমা দিয়ে যাতনা থেকে মুক্তি পেতে হয়। বাড়িওয়ালার লোভের গ্রাসে ক্ষতবিক্ষত হয় সাহিদার মাতৃময়ী রূপ। একসময় তারা সিদ্ধান্ত নেয় এই রাক্ষুসে শহরে থাকবে না। ফিরে যাবে গ্রামে। রাজধানী ঢাকায় যাদের বাড়ি আছে আর যারা আবাসন ব্যবসা করে-উভয়পক্ষই একপ্রকার ভূমিদস্যু, উল্লেখযোগ্য একটা অংশের অবস্থান গণবিরোধী। দুর্ভাগ্যের ফেরে জিন্নত আলী পড়েছে এই দুই শ্রেণির মানুষের খপ্পরে। জীবন-জীবিকার তাগিদে একসময় গ্রাম থেকে শহরে এসেছিল। এখন শহরে নিষ্পেষণে টিকতে না পেরে আবার ফিরে যাচ্ছে গ্রামে। সেই গ্রামে থাকাও কি সুখকর হবে? চলার মতো প্রয়োজনীয় অর্থ না থাকলে গ্রামের সবুজ প্রকৃতিও চোখে ধূসর হয়ে আসতে সময় লাগে না।

লেখকের বোধহয় তাড়া ছিল। সেটা পরিস্ফুটিত হয় উপন্যাসের শেষের দিকে। উপন্যাসের শুরুতে রাস্তায় একজন মহিলা ডেকেছিল জিন্নত আলীকে। উটকো বিপদের আশঙ্কায় জিন্নত তাকে এড়িয়ে যায়। শেষের দিকে এই মহিলার সঙ্গে ফের দেখা হওয়া নতুন কোনো ব্যঞ্জনা দেয় না। শুধু সম্পর্কসূত্রটা আবিষ্কৃত হয়। একইভাবে মায়ের কানফুল ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য কিডনি বিক্রি করে এক ছেলের টাকা আহরণ ঠিক বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। এখানে আরও বর্ণনা তথা প্রেক্ষাপট সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় স্পেসের দরকার ছিল। সেটা না থাকায় কেমন একটা সিনেমাটিক ভাব চলে এসেছে!
অল্পকিছু মুদ্রণপ্রমাদ, কাঠামোগত বিচ্যুতি বাদ দিলে বলা যায়- হুমায়ুন কবির ‘কানফুল’-এ ঠিকই ফোটাতে পেরেছেন আলোর ফুল, দিতে পেরেছেন শিল্পের মহিমা। লেখক হিসেবে তিনি কুশলী। অল্প কয়েকটি আঁচড়ে জীবনচিত্র নির্মাণে দক্ষ খেলুড়ে। অল্প কিছু চরিত্রের সন্নিবেশ ঘটিয়ে যেভাবে তিনি নিরন্ন, লোভী ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্ত-মানুষ তথা সমাজের ছিন্নছবি তুলে ধরেছেন- এটা তার শিল্প-মানসের কুশলতাকেই ঊর্ধ্বে তুলে ধরে।

প্রান্তিক মানুষের জীবনের ঘাটে ঘাটে যে এত জল ও দুঃখসাগরের জোয়ার-এসব খুব সহজেই দেখিয়ে দেয় ‘কানফুল’। এই কানফুল একজন নারীর নানাবিধ পরিচয়কে চাক্ষুষ করে তুলেছে। শেষপর্যন্ত জীবনযুদ্ধে পরাজিত সাহিদার কানফুল হয়ে উঠেছে সবার-পাঠকেরও। শহুরে অসভ্যতায় কানফুলের করুণ গান মর্ম স্পর্শ করে। হুমায়ুন কবির তার জাদুর কলমের ছোঁয়ায় এমন আরও উপন্যাসের ফুল উপহার দেবেন পাঠক হিসেবে প্রত্যাশা করি। ধন্যবাদ স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশনকে-ভালো একটা উপন্যাস পাঠকের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য। ড. শাহেদ ইকবালের লেখা ভূমিকা-কথনটি যথাযথ। লেখকের পাশাপাশি তাকেও সাধুবাদ।

শফিক হাসান: কবি ও লেখক

আরও পড়ুন