কবি তৈমুর খানের কাব্যগ্রন্থ ‘বৃত্তের ভেতরে জল’- এ পাঠকের প্রতিবিম্ব

সমকালীন সাহিত্য জগতে তৈমুর খান এক উল্লেখযোগ্য নাম। পদ্য, গদ্য…এক কথায় সাহিত্যের প্রায় সব কয়টি অঙ্গনে তিনি সচ্ছন্দে বিচরণ করে চলেছেন। সহজাত সাবলীল এবং প্রজ্ঞায় নির্মিত তাঁর কবিতাগুলো মননশীল পাঠককে চমকিত ও রসতৃপ্ত করে তোলে। 

সাম্প্রতিককালে তাঁর কাব্যগ্রন্থ বৃত্তের ভেতরে জল পাঠ করে এক অদ্ভুত তৃপ্তি পেয়েছি। কবিতায় দৃষ্টিপাত করে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক চরম বিশ্বাসের আনন্দ, তা এই কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতা পাঠ করে আমার উপলব্ধি ঘটেছে, এবং আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি।

আগন্তুক প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত দুই মলাটের মধ্যে তেষট্টি খানা অসামান্য কবিতার সমারোহে গড়ে উঠেছে এই অনবদ্য কাব্যগ্রন্থখানি। এই গ্রন্থের বুদ্ধিদীপ্ত এবং দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ অঙ্কন করেছেন শিল্পী সন্তু কর্মকার। 

প্রথমেই স্বীকার করে নিই,আমার এই লেখা শুধু একজন সচেতন পাঠকের পাঠ প্রতিক্রিয়া মাত্র। পাণ্ডিত্য কিংবা সমালোচনা করবার মতন ধৃষ্টতা বা যোগ্যতা আমার নেই। কিন্তু কখনো কখনো কোনো অতুলনীয় সৃষ্টি যখন সর্ব শ্রেণির মানুষের চক্ষু-কর্ণ এবং মস্তিষ্ক-হৃদয়ে তৃপ্তি দেয়, তখন সেই সৃষ্টি চূড়ান্ত সার্থক বলে মান্যতা পায়। কবি তৈমুর খানের কাব্যগ্রন্থ সেই পথকেই অনুসরণ করেছে। 

বহু যুগ ধরে সাহিত্যের পরিমণ্ডলে এই সমাজ সচেতক বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও কবি একান্তে কাব্য সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। প্রচার, সম্মান, সম্মাননা সমস্ত বস্তুতান্ত্রিক লোভনীয় আকর্ষণকে সযত্নে পরিহার করে তিনি এক নিরলস সাধকের ন্যায় তাঁর কাব্য সাধনায় মগ্ন হয়ে আছেন। বৃত্তের ভেতরে জল তাঁর সার্থক উদাহরণ।

কবি তৈমুর খানের কবিতার অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো চমৎকার ও দুর্লভ চিত্রকল্পের ব্যবহার। অবচেতন মনের চিত্র ও পরবাস্তবতার অদ্ভুত সংমিশ্রণ তাঁর লেখায় প্রকাশ পায়। শব্দ চয়নে তিনি যে একজন প্রকৃত শব্দশিল্পী, তা প্রমাণিত হয় তাঁর রচনায়। তিনি অসীম শব্দব্রহ্মের অনুসন্ধানী কবি। 

“আমাদের প্রাগৈতিহাসিক সরোবরে 
ফুটেছে কমল
প্রাচীন হাঁসেরা সাঁতার কেটে ফেরে
রাতের পাহাড় থেকে কল্লোলিনী আসে
অনেক জ্যোতিষ্কের আলো পড়ে ঘাসে 
তারপর বহু জন্ম ঘুরে
একটি সকাল অনন্তকালের উঠোনে নামে।”
(নতুন দিন কবিতার পংক্তি।) 

অসাধারণ শব্দচয়ন। অনবদ্য চিত্রকল্প। বাস্তব আর পরাবাস্তবের অদ্ভুত মিশ্রণে কবিতাখানি এক বর্ণিল চিত্রকল্প হয়ে পাঠকের চোখে ধরা পড়েছে। এই অভিনবত্বের কারণে নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে তৈমুর খান বাংলা কবিতায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবার সৎ ও দুঃসাহসিক প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছেন। প্রথাগত অন্তহীন ও ছন্দের বাঁধন ভেঙ্গে তিনি কবিতার ভাষাকে একেবারে নাগরিক মুখের ভাষায় পরিণত করেছেন। রবীন্দ্র উত্তরকালে জীবনানন্দ দাশ হয়ে বুদ্ধদেব বসু, শক্তি চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ কবিদের যে নিজস্বতা সৃষ্টি হয়েছে, সেই পথের সার্থক উত্তরসূরী তৈমুর খান। তাঁর ‘হলুদ ফ্যাকাশে বেঁচে থাকা ‘ কবিতায় তিনি উচ্চারণ করছেন-

সভ্যতা রাস্তায় দ্রুত যান গুলি/ বিচিত্র আলো ও আওয়াজ ছুটে যায়/ তাদের গর্জন থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারি?/ হৃদয় কেঁপে ওঠে হৃদয়হীনার কাছে/ হলুদ ফ্যাকাশে বেঁচে থাকা/প্রত্যহ ম্রিয়মাণ কোনো নিগূঢ় বসতি খোঁজে

গদ্য ছন্দে শৈলী নির্মাণে শব্দ এবং দেশজ বাকরীতি অত্যন্ত নিপুণভাবে ব্যবহার করেছেন। শুধুমাত্র রোমান্টিক কল্পনার চেয়ে সমসাময়িক সাধারণ মানুষের অস্তিত্বের সংগ্রাম, মধ্যবিত্তের জীবন যন্ত্রণাকে কবিতার মূল উপজীব্য করেছেন। তাইতো তাঁর কন্ঠে প্রতিধ্বনি শোনা যায় –

 ‘রঙিন বিপ্লব আসে
বিপ্লব দেখিনিকো
কিছু কিছু মৃতমুখ ভেসে আসে
সেই মুখে ভাষা পাঠ করে ইতিহাস।
ইতিহাসের পিরামিডের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকি
ভেতরে কাদের বিলাসী পোশাক

দীপ্ত ভঙ্গিমায় কবি এই উচ্চারণ করেছে। তিনি একজন প্রান্তিক কবি হয়েও বিশ্বজনীন বোধ তাঁর কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে। আবার কখনো কখনো তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে নাগরিক জীবনের বিচ্ছিন্নতা ও একাকীত্ব।

আবহমান কাল ধরে কবিদের কলমে প্রেমের মূর্তি ধরা দিয়েছে বিভিন্ন আঙ্গিকে, বিভিন্ন স্বরূপে। আধুনিক কবিদের কবিতায় প্রেমের স্বরূপ অনেকটাই ব্যক্তিক,বাস্তবধর্মী ও বহুমাত্রিক। আধুনিক কবিদের রোমান্টিক কল্পনার বাইরে একটি একটি সংবেদনশীল দৃষ্টিপাতে মানুষের রক্ত মাংসের দেহ, মানসিক দ্বন্দ্ব একাকীত্ব ও জটিল আবেগকে কেন্দ্র করে তাঁদের কলমে প্রেমের জন্ম হয়েছে নব নব রূপে।আধুনিক কবিরা প্রেমকে কেবল ঐশ্বরিক বা নিছক মিলন হিসেবে না দেখে এর পিছনে অতৃপ্তি ও ক্ষরণকেও তুলে ধরেন। কবি তৈমুর খান এর ব্যতিক্রম নয়। বৃত্তের ভিতরে জল কাব্যগ্রন্থেও এরকম কয়েকটি কবিতার দৃষ্টান্ত আছে, যেখানে চিরাচরিত প্রেমের চিত্রাংকন না করে বরং তার ভেতরে রক্ত মাংস মজ্জা ও ক্ষরণকে দ্বিধাহীন ভাবে প্রকাশ করেছেন।

 ‘কুমারী দিন’ কবিতায় কবি লিখেছেন- ‘মৃত সাপ গুলি কখনো কখনো জেগে ওঠে/ এদেরও প্রেমিকা বলে ডাকি/মৃত শত্রুর দেশে বেড়াতে এসে/যেমন তাদেরও বন্ধু ভাবি’

আর কোন কবি এভাবে দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারণ করতে পারে? কিংবা, ‘স্তব্ধতার কথা’ কবিতায় তিনি স্বীকারোক্তি করছেন-

স্তব্ধতা গাঢ় হচ্ছে বলে/
আজ কী ময়ূর এলো বনে/
দেখি নাকো। চেতনার বারান্দায়/
রোদের চাবি পড়ে আছে/
ইচ্ছে করে না দরজা খুলি-/

এই পংক্তিগুলো তো এক বিষন্ন প্রেমের ইঙ্গিত করে। তাই নয় কি?

আধুনিক কবিদের কলমে শুধু প্রেম নয়, দ্রোহকালের যন্ত্রণাও গভীরভাবে ফুটে ওঠে। এই অস্থির সময়ে বৃত্তের ভেতরে জল কাব্যগ্রন্থের কবি নিজেকে যেনো একজন দ্রোহীমানুষ হিসেবে আবিষ্কার করেন, যা এক ধরনের মানসিক ও শারীরিক দ্বৈততা বা যন্ত্রণা সৃষ্টি করে। যুগের পরিবর্তনে মানুষের মূল্যবোধ ও প্রকৃতির অবক্ষয় আধুনিক কবিতা গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। কবির মনস্তত্ত্বে অতীতের স্মৃতি বা রোমান্টিক ভাবনার সাথে বর্তমানে নির্মম বস্তুবাদী জটিল বাস্তবের এক চিরন্তন দ্বন্দ্ব চলে। চেতনার কবি তৈমুর খান এই দ্রোহকালের প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে সময়কে অস্বীকার করতে পারেন না। তাঁর চেতনা মাঝে মাঝে তীক্ষ্ণ তরবারির ন্যায় ঝলসে ওঠে, প্রলয়ের সমুদ্রের মত গর্জে ওঠে। অজান্তে কখন তাঁর কলম হয়ে ওঠে স্বৈরাচারীর বিরুদ্ধে পরশুরামের কঠিন কুঠার। তাইতো তাঁর কলম গর্জে ওঠে-

সচকিত করে আমাদের
সচকিত করে হট্টগোল/রাজার সিংহাসন/আমরা বধ হতে থাকি
বধ হতে হতে/বধ হতে হতে শুনি গর্জন।( বধ)
অথবা 
হিংস্র সাম্রাজ্য জুড়ে নিঃস্ব জাগরণ
কোথাও ঘুমের দরোজা নেই
তবুও সারারাত নিঃসঙ্গ যাতায়াত করে (দিগ্বিজয়ী)

বৃত্তের ভিতরে জল কাব্যগ্রন্থতে কবি স্বীকারোক্তি করেছেন-এই কাব্যগ্রন্থের মধ্যে তিনি প্রাগৈতিহাসিক জীবনের প্রজ্ঞা থেকে সভ্যতার আলোক দিশারী পথের যাত্রায় নিজের স্বরূপ অন্বেষণ করছেন। নিজের একাকিত্বের ভাষায় যেমন প্রেম, প্রত্যাশা আছে, তেমনি বিরহের অবগাহনে নির্বাসনের কাতরতাও আছে।

তবুও ত্রিকালদর্শী কবিদের মতন তিনি আশার বাণী শোনায় তাঁর কবিতার পাতায়-
‘সে আসবে।
তার নন্দিত সমুদ্রযান
অলৌকিক স্রোতে ভাসবে একদিন’ 
কবির এই বিশ্বাসটুকুই বর্তমানের অন্ধযুগে হতাশগ্রস্ত মানুষকে আশার বাণী শোনায়।

কাব্যগ্রন্থের একটি অত্যন্ত বলিষ্ঠ কবিতা- 

ধ্বংসযুগ 

ধ্বংস ডেকেছে আমাকে
ইতিহাসের ছায়া পড়া বিপ্লবের মাঠে
দু’একটা মোরগ শুধু
ধর্ম নিরপেক্ষ বার্তা দেয় 
কোথাও কি ধর্ম আছে তবে? 
তবুও দেখি জ্যোৎস্নায় ধর্মের ষাঁড়েরা ঘোরে
চোখ রাঙায়, শিং বের করে তেড়ে আসে

কবি কখনো কোনো একটি নির্দিষ্ট যুগের প্রতিনিধিত্ব করেন না। তিনি যুগোতীর্ণ। যে কবিতা যুগ বা সময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, সে কবিতা কখনো মহৎ সৃষ্টি হতে পারে না। কিন্তু তৈমুর খান এমন একজন কবি, একদিন তাঁর কবিতা সময়কে অতিক্রম করে, যুগকে অতিক্রম করে যুগান্তরের পথে এগিয়ে চলবে এই বিশ্বাস রাখি। 

এমন একটি কাব্যগ্রন্থ পাঠক মহলে উপহার দেওয়ার জন্য কবিকে অনেক শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ। আশা করি আগামী দিনেও তাঁর শক্তিশালী কলমের আঁচড়ে এরকমই বলিষ্ঠ কবিতা আমরা পাব, সেই কাব্যিক যাত্রাপথ হোক ফুলেলা সুন্দর। আমার দৃঢ়বিশ্বাস বৌদ্ধিক পাঠক মহলে তাঁর কবিতা আলোড়ন তুলবেই। 

জয়ন্ত পাল : লেখক

আরও পড়ুন