ফেরদৌস ফয়সালের ‘মক্কা মদিনার মুসাফির’

হজ ও ওমরাহ নিয়ে বাংলা ভাষায় লেখা বইয়ের সংখ্যা কম নয়, কিন্তু সেগুলোর প্রায় সবই মূলত বিধিবিধান কেন্দ্রিক—কীভাবে তাওয়াফ করতে হয়, কোন দোয়া কখন পড়তে হয়, কোন পথে কোথায় যেতে হয়। ফেরদৌস ফয়সালের মক্কা মদিনার মুসাফির সেই গতানুগতিক পথে হাঁটেনি। লেখক নিজেই বইয়ের শুরুতে স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এটি কোনো গাইডবুক নয়; বরং দুই দশকের বেশি সময় ধরে ২০বার হজ পালনের অভিজ্ঞতা থেকে গড়ে ওঠা এক সাংবাদিকের ভ্রমণ-বয়ান, যেখানে ধর্মীয় আবেগ আর সাংবাদিকতার পর্যবেক্ষণ পাশাপাশি চলেছে।
ছয়টি অধ্যায়ের কাঠামো
বইটিতে ছয়টি অধ্যায় রয়েছে। প্রথম অধ্যায়ে আছে ঢাকা থেকে মদিনা যাত্রা এবং মসজিদে নববিকেন্দ্রিক বিস্তারিত বিবরণ—মসজিদের পাঁচটি মেহরাব, জান্নাতুল বাকি কবরস্থান, বদর ও খন্দকের যুদ্ধক্ষেত্র ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। এখানে লেখক শুধু ইতিহাস বর্ণনা করেননি, বরং মসজিদে নববির ইমামতি ও মুয়াজ্জিনের পরম্পরা নিয়েও বেশ গবেষণাধর্মী তথ্য জুগিয়েছেন—যেমন বর্তমানে মসজিদে নববিতে সতেরোজন মুয়াজ্জিন নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন, এই তথ্যটি লেখক সৌদি গেজেটের বরাত দিয়ে উল্লেখ করেছেন।
দ্বিতীয় অধ্যায় কিছুটা ব্যতিক্রমী—এখানে লেখক হজের ইতিহাসে বাঙালি মুসলমানদের অংশগ্রহণের একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা টেনেছেন। মোগল আমলে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে হজযাত্রার সূচনা, ঔপনিবেশিক আমলে কলকাতা-চট্টগ্রাম থেকে জাহাজে হজযাত্রার ঝুঁকি ও মহামারির প্রকোপ, আর স্বাধীনতা-পরবর্তী বিমান-নির্ভর আধুনিক হজব্যবস্থা—এই দীর্ঘ পরিক্রমা একটি অধ্যায়ের মধ্যে সংক্ষেপে ধরার চেষ্টা প্রশংসনীয়। তৃতীয় ও চতুর্থ অধ্যায়ে যথাক্রমে মক্কায় ওমরাহ-কাবা পরিচিতি এবং হজ পালনের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। পঞ্চম অধ্যায়ে জেদ্দা ও তায়েফের ভ্রমণ, আর শেষ অধ্যায়ে লেখকের সামগ্রিক প্রবাস অভিজ্ঞতা ও দেশে প্রত্যাবর্তনের কথা।
সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গা: প্রবাসী বাঙালির বাস্তবতা
বইয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ সম্ভবত শেষ অধ্যায়, যেখানে লেখক সৌদি আরবে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবনযাত্রা নিয়ে একেবারে মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকতার নমুনা রেখেছেন। চাঁদপুরের একজন প্রবাসী টেইলার্স কর্মী, যিনি বারো বছর ধরে নারীদের আবায়া-বোরকা তৈরির কাজ করছেন, তাঁর সঙ্গে কথোপকথনের ভিত্তিতে লেখক তুলে ধরেছেন সৌদি সমাজে বিবাহবিচ্ছিন্ন নারীদের নিঃসঙ্গতা, প্রবাসী পুরুষদের একাধিক বিয়ের প্রবণতা, আর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সৌদি তরুণ-তরুণীদের বৈবাহিক জটিলতার গল্প। এই অংশগুলো নিছক ভ্রমণকাহিনি থেকে বেরিয়ে এসে সমাজবাস্তবতার দলিল হয়ে উঠেছে, যা বইটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
ভাষা ও উপস্থাপনা
লেখকের গদ্য সহজ, প্রাঞ্জল, এবং তথ্যবহুল। দীর্ঘ সাংবাদিকতা-জীবনের অভ্যাস স্পষ্ট—প্রতিটি অধ্যায়ে তথ্যসূত্র, পরিসংখ্যান ও স্থানীয় সূত্রের উদ্ধৃতি দেওয়ার চেষ্টা আছে, যা পাঠকের আস্থা তৈরি করে। তবে এই তথ্যঘনত্ব মাঝে মাঝে আবেগের প্রবাহে ছেদ ফেলে। যেমন মসজিদে নববির বর্ণনায় লেখক যখন আধ্যাত্মিক অনুভূতির কথা বলেন, তার পরপরই আবার ইতিহাস-পরিসংখ্যানে ফিরে যান—ফলে পাঠ-অভিজ্ঞতা মাঝেমধ্যে একটু খাপছাড়া মনে হতে পারে। যাঁরা নিরেট আবেগময়, কাব্যিক ভ্রমণগদ্য খোঁজেন, তাঁদের কাছে এই অংশগুলো তথ্যনির্ভর মনে হতে পারে। আবার যাঁরা তথ্য ও প্রেক্ষাপট চান, তাঁদের জন্য এটিই বইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি।
কাদের জন্য এই বই
যাঁরা প্রথমবার হজ বা ওমরাহয় যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের জন্য বইটি একধরনের মানসিক প্রস্তুতি হিসেবে কাজ করতে পারে—বিশেষত ভাষা ও পরিবেশগত অপরিচয়ের যে শঙ্কা নতুন হজযাত্রীদের মধ্যে থাকে, তা কিছুটা প্রশমিত করার চেষ্টা লেখক করেছেন। আবার যাঁরা সৌদি আরবে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবনযাপন নিয়ে কৌতূহলী, তাঁদের জন্যও শেষ অধ্যায়টি বিশেষভাবে পাঠযোগ্য।
তবে বইটির একটি সীমাবদ্ধতাও চোখে পড়ে—দ্বিতীয় অধ্যায়ে বাঙালি মুসলমানদের হজযাত্রার ইতিহাস যতটা বিস্তৃত হওয়ার দাবি রাখে, ততটা পরিসর এখানে পায়নি; একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে কয়েক পৃষ্ঠায় সংক্ষিপ্ত করে ফেলায় পাঠকের আগ্রহ অতৃপ্তই থেকে যায়। আরও বিস্তারিত গ্রন্থপঞ্জি বা মানচিত্র যোগ করা গেলে বইটির রেফারেন্স-মূল্য আরও বাড়ত।
সব মিলিয়ে মক্কা মদিনার মুসাফির নিছক একটি ধর্মীয় ভ্রমণকাহিনি নয়—এটি একজন দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সাংবাদিকের চোখে দেখা মক্কা-মদিনা-জেদ্দা-তায়েফের ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা ও সমকালীন সমাজবাস্তবতার মিশেল। বইটি পড়তে পড়তে পাঠক যেমন পবিত্র ভূমির ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হবেন, তেমনি জানবেন প্রবাসী বাংলাদেশিদের অজানা অনেক গল্পও। দুইশ চল্লিশ পৃষ্ঠার এই বই একবার পড়ে শেষ করার মতো নয়—বরং হজযাত্রার আগে বা পরে বারবার ফিরে দেখার মতো একটি সংগ্রহ হয়ে থাকতে পারে অনেক পাঠকের জন্য।
স্বপ্ন ‘৭১ প্রকাশন থেকে বইটি প্রকাশিত হয়েছে। বইটিতে সহযোগিতা করেছে সিটি ব্যাংক ও ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি
লেখক: ফারজানা হক
বইয়ের নাম: মক্কা মদিনার মুসাফির
লেখক: ফেরদৌস ফয়সাল
প্রকাশন: স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশন
পৃষ্ঠা: ২৪০
মূল্য: ৫০০ টাকা
প্রকাশকাল: জুন ২০২৬
পাওয়া যাবে: কাঁটাবনে স্বপ্ন ‘৭১, পাঠক সমাবেশ, বাতিঘর, রকমারি ডটকম, স্বপ্ন ‘৭১ ডটকমসহ বিভিন্ন অনলাইনে
