যখন আমাদের কোনো শহীদ মিনার ছিল না!

তখন আমি প্রাথমিকের শিক্ষার্থী। জীবনের প্রথম স্কুল, একটি ভাঙাচুরা স্কুল। টিনের চালে অসংখ্য ছোট বড় মাঝারি আকারের ছিদ্র। আমরা ক্লাস করি, উপরে তাকাই, শত শত আলোক বর্ষ হতে আসা আলো টিনের ছিদ্র দিয়ে আমাদের চোখে পড়ে, গায়ে পড়ে, বোর্ডে আড়াআড়ি রেখা হয়ে যায়! কী অদ্ভুত আনন্দ আমাদের ক্লাসরুমে। আমাদের সাথে আলোও পড়ে!
আমাদের টিনের বেড়ার নিচের অংশ জং ধরে খসে পড়েছে। জায়গায় জায়গায় এক থেকে দেড় হাত ফাঁকা, নাই হয়ে গেছে! বিড়াল কুকুর সেখান দিয়ে আসা যাওয়া করে। রাতের বেলায় ঘুমায়। টের পেয়ে স্যার একদিন সেই জায়গা ভাঙা টিন দিয়ে বন্ধ করে দিল। সকাল সকাল আমরা নিজেরাই নিজেদের বেঞ্চ পরিষ্কার করে বসি। আমাদের কোনো দপ্তরি নেই, আমাদের কোনো কষ্ট নেই, কল চাপিয়ে পানি খাই, স্যারদের পানির জগ ভরে রাখি, মাঝে মধ্যে ঘণ্টা বাজাই। মিলেমিশে কাজ করি কারণ আমাদের জন্য একটা নতুন ভবন তৈরি করছে সরকার। আমরা তাই সরকারকে সাহায্য করি এইসব কাজ করে!
তখন সবে প্রথম শ্রেণি, ক্লাসে মনোযোগ কম, বাইরে বেশি! আমরা ক্লাসে বসেই ভাঙা জানলা আর বেড়ার ফাঁক দিয়ে আমাদের স্কুলের নতুন ভবনের সঙ্গে কথা বলি। নিজেরাই ঠিক করি আমাদের ক্লাসরুম কোনটা হবে! আমাদের সিট আমরাই ঠিক করি। কে কার পাশে বসব, কোথায় কোথায় আমরা কী কী করব। আমাদের স্কুল, সিদ্ধান্ত তো আমাদেরই নিতে হবে!
হঠাৎ আমাদের ভীষণ মন খারাপ। দুই দিন বাদেই তো একুশে ফেব্রুয়ারি! আমাদের শহীদ মিনার কোথায়? এই স্কুলে তখন কোনো স্থায়ী শহীদ মিনার ছিল না। প্রতিবছর বানানো হয় এক দিনের জন্য। তারপর ভেঙে যায়! এভাবে কী হয়! হেড স্যার বললেন, ‘নতুন ভবনের সঙ্গে আমার একটা শহীদ মিনারও বানাব। তোমরা মন খারাপ করো না। এবার একটা অস্থায়ী শহীদ মিনার করে একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন করব।’ আমাদের মন তাতে ভালো হয়না! ক্লাসে মন নেই, আনন্দ নেই কোথাও! কোনো উপায় না দেখে ৪র্থ ও ৫ম শ্রেণির আপু, ভাইয়াদের সঙ্গে আমরা ছোটরা শহীদ মিনার বানাতে লেগে পড়লাম।
আমাদের কাজ সামান্যই তবুও আমরা সারাদিন কাজ করি। আমাদের শিক্ষকরাই সমস্ত দায়িত্ব পালন করেন। তারা বাঁশ আর কাঠ দিয়ে আমাদের জন্য বানালেন একটি চমৎকার শহীদ মিনার। আমরা কাঁদা মাটি দিয়ে বানালাম বেদি। বড়রা কাগজে আঠা মাখিয়ে বাঁশ আর কাঠের কাঠামোতে তা লাগিয়ে দিল। সারা শরীর কাঁদায় মেখে, হাতে আঁচড় কেটে আমার সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরি। গোসল করে কিছু একটা মুখে দিয়ে সবাই আবার স্কুলে ছুটি একটু বাদেই। কিছুতেই শহীদ মিনারকে একা রাখা যাবে না! আমরা রাত বারোটায় ফুল দেই তারপর বাড়ি ফিরি। নিজেদের বানানো শহিদ মিনারকে নিজেরাই দীর্ঘ দিন টিকিয়ে রাখি! এটা আমাদের!
মাধ্যমিকে অবশ্য একটা শহীদ মিনার ছিল কিন্তু অবস্থা নড়বড়ে! আবার দেখা দিল সমস্যা! আমাদের বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আমরা আবার বানিয়ে ফেললাম কলাগাছ দিয়ে একটা প্রাকৃতিক শহীদ মিনার! নবম ও দশম শ্রেণির উদ্যোগে তৈরি হলো এই নান্দনিক শহীদ মিনার। আমরা যারা ছোট তারা হাত লাগিয়েছি মাত্র। তবুও ভাবখানা এমন-আমরা না থাকলে কী শহীদ মিনার এত সুন্দর করে কেউ বানাতে পারতো!
যখন কলেজে উঠলাম! নতুন কলেজ, আমরা প্রথম ব্যাচ। আমাদের স্থায়ী কোনো ক্যাম্পাস নেই। পাশেই আরেকটা কলেজ, সেই কলেজের প্রশাসনিক ভবনের নিচতলায় আমাদের ক্লাস, ২য় তলায় একাডেমিক কাজ আর তৃতীয় তলায় আবাসিক ছাত্রীনিবাস! শহিদ মিনার নেই! দুই বছর কেটে গেলে অন্য কলেজের শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে। তাতে কী! শহীদের কাছে শ্রদ্ধা পৌঁছাতে পারলেই তো হলো! প্রায় ২২ বছর পর এবার কলেজে গিয়ে দেখলাম-কী নেই এখানে! সব আছে, সব। সবচেয়ে সুন্দর হয়েছে শহীদের জন্য নির্মিত মিনার! আনন্দের চোখে পানি এসে গেল! নিজেদের একটা শহীদ মিনার-ই তো চেয়েছিলাম!
ইডেন কলেজে পড়ার সময় পেলাম প্রথম শহীদ মিনার। মিনারের চারপাশে ফুলের গাছ। ফুলের বাগানে দাঁড়িয়ে আছে ইডেন কলেজের শহীদ মিনার। এখানে বারোমাস ফুটে থাকে ফুল! বারোমাস শহীদের জন্য ফোঁটে ফুল। হলে থাকি। একুশের প্রথম প্রহরে (রাত ১২ টায়) শিক্ষকদের সঙ্গে প্রথম শহীদ মিনারে ফুল দেয়া! জীবনে কোন আক্ষেপ নেই, দুঃখ নেই, হতাশা নেই। পুরোটাই নিবেদন! শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতার।
অনার্স তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় ‘হাজারীবাগ গার্লস স্কুল এন্ড কলেজে’ পার্ট টাইম চাকরি করি। ক্লাস নিই সপ্তাহে ৩দিন, দুটো করে ক্লাস। অনেক অনেক সীমাবদ্ধতা থাকার পরও এই পুরনো শহরের অবহেলিত জনপদের এইখানে একটা ছোট শহিদ মিনার আছে। তবে সংস্কার জরুরি। প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বললে, পরিচ্ছন্ন হয়ে ওঠে আমাদের প্রিয় এই শহীদ মিনার!
তারপর, ঠিকানা বদলাই। আশ্রয় হয়ে ধরা পড়ে ‘মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ’। নতুন ক্যাম্পাস হচ্ছে, নতুন নতুন ভবন তৈরি হচ্ছে। এটা আছে তো ওটা নেই। তবে কাজ চলছে পুরোদমে। সব হবে সব। সময় লাগবে। আমরা শব্দ আর ধুলোবালিকে তোয়াক্কা না করেই একঝাঁক তরুণের জীবন শুরু হলো এখানেই। ধীরে ধীরে আমাদের সব হলো। আধুনিক সব সুবিধা পেলাম। দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা আর ভালো ফলাফলের অংশীদারিত্ব পেলাম। পেলাম না কেবল একটা শহীদ মিনার! একদিন প্রিন্সিপাল স্যার ক্লাস ভিজিটে এলে সাহস করে বলেই ফেললাম, ‘স্যার, আমাদের একটা শহীদ মিনার লাগবে। খুব দরকার!’ স্যার মুখের দিকে তাকালেন। হাত দিয়ে একটা জায়গায় দিখিয়ে বললেন, ‘ওখানেই হবে এই ক্যাম্পাসের শহীদ মিনার! আর ঐ হলো প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। আমাদের সব হবে।’ কয়েকদিনের মধ্যেই আমাদের শহীদ মিনার হলো! প্রতিবছর শহীদের জন্য শ্রদ্ধা নয়, তাদের জন্য আমাদের শ্রদ্ধা প্রতিদিনের! আমাদের যখন কোন শহীদ মিনার ছিল না তখনো আমাদের শ্রদ্ধায় কোন ঘাটতি ছিল না!
আয়শা জাহান নূপুর: শিক্ষক, কবি ও সংগঠক
