আয়শা জাহান নূপুরের গুচ্ছকবিতা

মৃত্যুর আগে জবানবন্দী

স্মৃতিচারণায় বিশেষ কিছু বলবার সময় পেরিয়ে গেছে বলেছি।
শেষ ট্রেন চলে যাওয়ার আগে প্লাটফর্মে অগণিত কোলাহল।
বৃষ্টি শূন্য মেঘে আকাশ ভাসছে, চোখের কাজলে শান্ত সমুদ্র।
উইন্ডস্ক্রিনে ঝাপসা সব, দর্শক শূন্য আসন এখানে অব্যবহৃত।
মেয়াদাত্তীর্ণ পারফিউমের মতো পড়ে আছে প্রেমের কবিতা।
বেঁচে গেছি বলে যে নাবিক প্রাণ খুলে গাইতো, আজ সে মৃত।
অর্বাচীনের মতো খুলে গেছে প্রেমিকার বারও হাতের বুনন। 
আমি স্বপ্ন দেখতে গিয়ে অসংখ্য রাত ঘুমের মধ্যে কেঁদেছি।
বলেছি তো, আমার স্মৃতিচারণায় বিশেষ কিছু বলবার নেই।
জন্মাবার পর থেকেই নিজেকে সত্তর বছরের বৃদ্ধ- ই দেখেছি।
আমার শৈশব, কৈশোর, যৌবন বলে কোনো বায়বীয় শব্দ নেই
ভাগাভাগি করে আমি বেঁচে আছি সত্য, মৃত্যুকে ভালোবেসে।
নামবার মতো সুলভ কোনো স্টেশন পাইনি বলে, আজও নামিনি।
যদি একবারও মনে হতো এখনো আমি সব বদলে দিতে পারি,
ঠিক এ বিশ্বাসটুকু থাকলেই সাঁতার দিতাম দূর্লভ জীবন নদীতে।
হে অপরিচিত সকল, করুনা করার আগে আমাকে ভালোবেসে ক্ষমা করো।

যৌথ প্রেমের খামার -১

দিন দিন কলেবরে ছোট হয়ে যাবে প্রেম, জানি সে কথা। তবুও বেঁচে থাকার অপেক্ষা,
বুঁদ হয়ে থাকে ডাকবাক্সের ঢাকনার মুখে।
এই ভেবে বেঁচে আছি-
হেমন্তের আকাশ ছুঁয়ে উড়ে আসবে একটা গোত্রহীন পাখি, মুখে নিয়ে আশ্চর্য নরম দিন।

যৌথ প্রেমের খামার – ২
এবার একটু থেমে থাকা বৃষ্টির জন্য ভালোবাসা রাখি, যার গত বসন্তের কোনো কথা মনে নেই। একটা কোকিল ডেকে ডেকে হয়রান হয়ে উড়ে গেছে, ফেলে তাঁর প্রিয় সলজ্জ, বিনীত পালক। পাতাকুড়ানি ভরেছে তার গোপন সিন্দুক। সেবার শীতের মুখে ভাত হয়েছিল মৃদু কুয়াশায়। 

তুমি কি জানো, সে বসন্তেই আমি ঋতুবতী সুন্দরের মিলন দেখেছিলাম মেঘের ভেতর, স্বর্গের পথে যেতে যেতে!

যৌথ প্রেমের খামার -৩

পড়ন্ত বিকেলের মতো তোমার বিষণ্ণ দিন।
আহা! কতদিন ছুঁয়ে দেখি না!
মেঘের দিনের মতো তোমার আশ্চর্য ঘোলাটে চোখ।
আহা! কতদিন বৃষ্টি দেখি না!
এ বড্ড বিরক্তির শহর।
বিশ্বাস কর, আমি সত্যিই ভাবি- 
একদিন আমাকে নিয়ে তুমি কিংবা 
তোমাকে নিয়ে আমি সাঁতার দিব স্রোতের বিপরীত নদীতে।
আমার ঠোঁটে এখন কাঠগোলাপের দিন। 
শিশিরে মুখ রেখে বলে যাবে, ‘এমন মহুয়ার ঘ্রাণ পৃথিবী পায়নি আর।’
বিশ্বাস কর, আমি সত্যিই ভাবি- 
একদিন আমরাই হব উড়াল পাখি।
পাখনা থেকে ঝরে পড়বে অনিবার্য আগামী। 
তাই বুক পকেটে কিছু বীজ রাখি আমি।

যৌথ প্রেমের খামার -৪

ধরো, আমি পুরোপুরি সেরে ওঠলাম। ঝকঝকে রোদ ওঠে গেল শহরে। কোনো মেঘ নেই আর কবিতার গায়ে। কেবল অভিমানের শিশিরে লেপ্টে আছে আমার শরীর। তুমি তখন কী করবে?

আগে সেরে ওঠো।

ধরো, চিকিৎসাবিদ্যার যে খাতাটা জমা আছে সেখানে আমার অসুখের কোনো নাম নেই। এক্সরে মেশিনে ব্লার হয়ে দেখা দিল বুকের জমিন! কেবল তোমার কথা মনে পড়তেই আবার চলতে থাকল রক্তস্রোত। তুমি তখন কী করবে? 

আগে সেরে তো ওঠো।

ধরো, চোখের কাজল ছলকে ভেসে গেল তোমার বুক পকেট! তুমি সেই রংয়ে ক্যানভাসে আঁকলে মেঘ। মেঘের ভেতর আমি। এতো কাছে পেয়ে তুলোর মতো ছুঁড়ে দিচ্ছি প্রেম, তোমার বুকে। তুমি তখন কী করবে? 

আমার শেষ ইচ্ছে, তোমার এ অসুখ যেন না সারে !

যৌথ প্রেমের খামার – ৫

এই যে দাহকাল, পথের শেষে উড়ে যায় পাখি!
মুখে তার গান, বিষাদে শিখেছিল এতকাল!
দুরত্বকে ঠোঁটে নিয়ে একদিন আমিও পাখি হবো।
ভুলে যাবো ওড়ার কৌশল!
এই যে খুঁটে খুঁটে গড়ে গেছি যত ইমারত!
পিতামহ বলেছিল মিলবে না কোনো হিসাব!
সব বৃথা অনাদায়ী থেকে যাবে।
পাখির ডানা থেকে খসে যাবে মহাকাল!
এই যে অপার বিস্ময়, মিশে যাবে অপরিচিতদের দলে!
ছোটাছুটি ভাগ হয়ে যাবে, না পেয়ে উপায়!
তুমি আমি চিরকাল ভালোবেসে সরে যাব,
বুকে নিয়ে অসীম আঁধার!

যার কোন নাম হয় না 

অনেক কিছুই বেনামী চিঠির মতো পড়ে থাকে ডাকঘরে।
কেউ রাখে না প্রাপকহীন এ মৃত ঠিকানার খোঁজ।
অথবা বদলে গেছে বহু বদলে সমস্ত সমীকরণ।
দখল হয়ে গেছে শৈশবের মাঠ, শান্ত পুকুর, নিজস্ব বিকেল।
মিঠে রোদের মধুমঞ্জুরী আর নবজাতক আমের মুকুল।
কবিতা মুছে গেছে অক্ষর থেকে, কবির হৃদয় কাটে নির্ঘুম।
উঠে গেছে হরিচরণের পাঠশালা, তাঁতি পাড়া, হাওয়ার ঘর,
আর…আর একটা অপ্রকাশিত পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনি।
যেখানে জগদীশের বোতাম খোলা বুকে
মিহি বাতাস নামলেই – কেঁপে উঠতো নরম উদাস ঘাস।
আদুরে গলায় ঝরতো, ‘তুই পাশে থাকলে কিছুই মনে থাকে না,
মাইরি! দেখতো সব ঠিক আছে কী না!’
আজ সেখানে টুং টাং চুড়ির আওয়াজ,
গভীর রাতে জেগে থাকে নিদ্রাহীন চোখ,
চাপা হাসি আর ধ্রুপদী শব্দের কর্মশালা।
কত কিছু অনাধিকারে চলে যায়…! কত কিছু! জানা হয় না।
এই যেমন, পাড়ার ক্লাব সরে গেছে সবার অলক্ষে।
ঝিকমিক বাতি জ্বলছে কমিউনিটি সেন্টারের শরীর জুড়ে।
কি আশ্চর্য নিয়মে ঘুড়ি উড়ার আকাশে জমছে ধোঁয়ার স্তুপ। 
আমাদের যৌথ জীবনও সরে গেছে বাঁকা পথ ধরে বহুদূর!
হুট হাট শীত নামে, কার্নিসে জমে না আর গেরস্থালি ঝুল।

একটি পৃথিবীর কবিতা

সেই সব পাতা ঝরা দিনগুলো স্মৃতি অ্যালবামে জমে ওঠে।
আকাশের জমিনে ফুটে থাকা অসংখ্য শিমুল ছিল প্রেরণায়।
আমরা প্রত্যেকেই সে বেলায় ফুল নয় আগুনই দেখতাম।
সে দৃশ্য আমাদের চোখে দেখা উজ্জ্বলতর মূহুর্ত হয়ে থাকে।
আঁধারের উঠোনে সকলি এক একটা পারিজাত,
দেবতার বাগানে চুরি হওয়া প্রয়োজনীয় প্রেম।
জীবনের গভীরে আরও এক দর্শনের পাঠ।
জীবনের গভীরে আরও এক মিথ্যার আবাদ আমরা পরিহাস করতাম, নিজেকে ভালোবেসে।
এই ক্ষয়ে যাওয়া পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই স্বীকার করে, একটি ভুল চিঠি তার ঠিকানায় এসেছে।
এই বিস্তীর্ণ আলোতেও ধরা পরে নিজেদের প্রগাঢ় অন্ধকার, যা সম্পর্কের খুব কাছে বাস করে।
তবুও আমরা মেখেছি বিশ্বাসের মলম জরায়ূতে।
বিনীত পাঠ নিয়েছি বৈশ্বিক পাঠশালায়।
মূল্যবোধ বেড়ে উঠুক ফলবতী বৃক্ষের মতোন।
মানবতা বাচুক বোধ আর ভালোবাসার কবিতায়।

উনুনে মৃত মাছ

আমাকে ভালোবেসে যে একদিন দীর্ঘ চিঠি লিখত,
দেনার দায়ে সে আজ দেউলিয়া! 
তাতেও তার কোনো দুঃখ নেই! 
দুঃখ হলো, এই দুর্মূল্যের বাজারে, দেউলিয়া হয়েও
সে যদি আমাকে আর একটা চিঠি লিখতে পারত!
আমাকে ভালোবেসে যে একদিন ঘর ছেড়েছিল
সে এখন পুরদস্তুর একজন মিস্ত্রী। 
তাতেও কোনো দুঃখ নেই। 
দুঃখ আমার একটাই, 
পুড়ে পুড়েও যদি তার নিজের একখান ঘর হত!
আমাকে মুগ্ধ করতে যে নিত্যনতুন সানগ্লাস কিনত,
সে এখন শহরের বড় চশমার দোকানের মালিক। 
যেখানে নিয়ম করে নামকরা ডাক্তাররা বসেন। 
অথচ এখন সে আর চোখে দেখে না!
সব কিছুর বিনিময়ে সে যদি একবার আমাকে দেখতে পেত!
যে কিশোরকে ভালোবেসে আমার একলা কেটেছে জীবন 
সে এখন বৃদ্ধ! শিশুর মতো বিছানায় গড়াগড়ি খায়!
পুরোনো কোনো কিছুই মনে নেই তার। তাকিয়ে থাকে কোথায়?  
তোলপাড় হয় ভেতর বাহির –
আমাকে যদি সে একটি বার চিনত!

আসক্তির নমুনাগার

বিষাদেও তোমার মতো বিরহ নেই।
সদ্যজাত ধবধবে ফুল উরুতে ভাসিয়ে,
ডুবে যাই মহাসমুদ্রের প্রণয় বাজারে।
বিক্রিত পণ্যের পাট চুকে গেলে, 
কিনে নেই কিছু বায়বীয় সন্ধ্যা।

প্রকাণ্ড তরমুজের দেহে লুকিয়ে থাকা রক্তের মিছিল পেরিয়ে
হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যাই সুতীব্র শরীরে।
কিছুতেই আসক্তি নেই আমার।
অথচ, তুমি ছাড়া পৃথিবীর সব নেশা-ই কেটে গেল!

আরও পড়ুন